ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় একাদশ স্থান অধিকার করা অনেক ছাত্রছাত্রীর স্বপ্ন। তারপর খড়্গপুর আইআইটিতে দু-দুটো জাতীয় স্তরের রোবোটিক্স গবেষণার দলে স্থান পেলে তো কথাই নেই। তার উপর যদি আপনি বরাবরের ভাল ছাত্র হওয়ার জন্য আসাম সরকারের স্কলারশিপ পান তাহলে তো সোনায় সোহাগা। আসামের তিনসুকিয়ার বাসিন্দা ফয়জান আহমেদ এই সবকটা কৃতিত্বই অর্জন করেছিলেন। উপরন্তু তিনি আইআইটিতে পড়তে পড়তেই অনলাইনে অঙ্ক শেখাতেন, ডলারে আয় করতেন।
দেশের সেরা ছাত্রদের অন্যতম, রেহানা আর সেলিম আহমেদের একমাত্র সন্তান ফয়জান মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। এক বছর আগে আজকের দিনে ২৩ বছরের ফয়জানকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। তিনদিন পরে তাঁর আংশিক পচে যাওয়া দেহ উদ্ধার হয় তাঁর হোস্টেলের ঘর থেকে। সেইসময় খড়্গপুর পুলিস আর আইআইটি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল ফয়জান অবসাদের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু তাঁর পরিবার এই তত্ত্ব মেনে না নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। প্রথম ময়না তদন্তের রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসাবে বলা হয়েছিল মৃত ব্যক্তি তাঁর বাঁ হাতের শিরা কেটে ফেলেন এবং তার ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু এই তথ্য বিচারপতি রাজশেখর মান্থাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তিনি মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করতে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ডাঃ অজয় গুপ্তকে নিযুক্ত করেন। প্রথম ময়না তদন্তের ভিডিও ক্লিপ দেখে ডাঃ গুপ্ত ফয়জানের শরীরে হেমাটোমার লক্ষণ চিহ্নিত করেন। তাই তিনি কলকাতা হাইকোর্টের কাছে দ্বিতীয় ময়না তদন্তের অনুরোধ জানান। কলকাতা মেডিকাল কলেজে নতুন করে ময়না তদন্ত করানোর অনুরোধও করেন, যা আদালত মেনে নেয়। প্রথম ময়না তদন্ত হয়েছিল মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
উত্তোলনের পর ফয়জানের দেহ ডিব্রুগড় থেকে নিয়ে আসা হয়। দ্বিতীয় ময়না তদন্তে ডাঃ গুপ্তের সঙ্গে প্রথমবারের ভারপ্রাপ্ত ডাক্তার আর ফয়জানের মা-ও উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয়বারের রিপোর্টে পরিষ্কার হয়ে যায় যে ফয়জানের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, হত্যা। সমস্ত রিপোর্ট দেখে বিচারপতি মান্থা বরিষ্ঠ আইপিএস অফিসার কে জয়রমনের নেতৃত্বে একটা বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেন।
উল্লেখ্য, আইআইটি খড়্গপুর এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিস বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন করে। আইআইটির দাবি ছিল মামলাটাই খারিজ করে দেওয়া হোক, কারণ বিচারপতি মান্থা নাকি একতরফা রায় দিয়েছেন। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের দাবি ছিল খড়্গপুর পুলিসকেই তদন্ত করার দায়িত্ব দিতে হবে। কিন্তু ডিভিশন বেঞ্চ বিচারপতি মান্থার রায়ই বহাল রাখে। না সংবাদমাধ্যমে তেমন কভারেজ ছিল, না রাজ্য সরকার বা আইআইটির দিক থেকে কোনো সহযোগিতা করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে র্যাগিং অথবা খুনের অন্যান্য ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের যে মনোযোগ পেয়ে থাকে, ফয়জানের ঘটনায় তা দেখা যায়নি। রাজ্য সরকার আর আইআইটি বরং ফয়জানের পরিবারের ন্যায়বিচারের সন্ধানে বাধা সৃষ্টিই করেছে। ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি শিবজ্ঞানম আর বিচারপতি ভট্টাচার্য মন্তব্যও করেন, যে রাজ্য সরকার দ্বিতীয় ময়না তদন্তে যা পাওয়া গেছে তার চেয়ে সিট যেন তদন্ত না করে তা নিয়েই বেশি চিন্তিত।
আরো পড়ুন যাদবপুর কাণ্ডে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন
“আমি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে চিঠি লিখেছিলাম, মিডিয়ার মাধ্যমে তাঁর কাছে অনেক আবেদনও জানিয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যানকেও চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু দুজনের কেউই সাড়া দেননি,” বললেন ফয়জানের মা রেহানা।
তিনি আরও বলেন “এক বছর আগে যখন আমার ছেলের মৃতদেহ উদ্ধার হল, আমি ভেবেছিলাম আইআইটি কর্তৃপক্ষের সাহায্য পাব। কিন্তু যেভাবে আজ ওঁরা আমাদের ন্যায়বিচার পেতে বাধা দিচ্ছেন তাতে আমি প্রায়ই ভাবি, এঁরা কাকে বাঁচাচ্ছেন?”
ফয়জানের বাবা-মায়ের লড়াইয়ের পাশে সাধারণ নাগরিকদেরও দাঁড়ানো দরকার। তাঁদের কৌঁসুলি রণজিৎ চ্যাটার্জি বললেন “লম্বা লড়াইয়ের পরে আমরা সিট পেলাম। কিন্তু জানি না কেসের কী অগ্রগতি হচ্ছে। আজ (৯ অক্টোবর) মামলার শুনানি ছিল, কিন্তু রাজ্য সরকার শুনানিতে এলই না।”
১৬ অগাস্ট ডিভিশন বেঞ্চের শুনানির পর থেকে আর কোনো শুনানি হয়নি।
মূল প্রতিবেদন: ইনিউজরুম
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







