শুভ নায়েক। এতদিনে বিস্মৃত নাম। যেমন কোরপান শাহ। বিনয় কুমার। সিদ্ধার্থ মান্ডালে। কিষাণলাল ভীল। এঁরাও বিস্মৃত নাম। কোনও কুইজ প্রতিযোগিতায় বা চাকরির পরীক্ষায় এঁদের নামে প্রশ্ন আসবে না। প্রতি সন্ধ্যায় বিতর্কে উত্তাল নিউজরুমে কখনও আলোচ্য হবেন না এঁরা। শিক্ষিত-স্বচ্ছলবিত্ত বৃত্তের ‘ইন্ডিয়া বনাম ভারত’ তর্কপরিসরেও এঁরা নেই। আসলে ইন্ডিয়া বা ভারত সবেতেই এঁদের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান একই থেকে যায়। এঁরা পিষে যান। গণপিটুনির শিকার হন। উচ্চবর্গের পায়ের তলায় দলে যান। অগুন্তি। কিছু ঘটনা খবরে দেখানো হয়, ছাপা হয়। অধিকাংশই দেখানো হয় না, ছাপা হয় না। দেখানো বা ছাপা খবরটিও দ্রুত হারিয়ে যায়। এটাই স্বাভাবিক বোধহয়। দশক-শতক-সহস্রাব্দ ধরে এমনটা হতে হতে স্বাভাবিক হয়ে গেছে এসব। সামাজিক-রাজনৈতিক যে বৃত্ত সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে মুখর, তাদের দাবিমুখর স্লোগানে মিছিলেই বা এঁরা কতটুকু জায়গা পান? ইস্যু আসে, ইস্যু মিলিয়ে যায়। পরের নামটি জানার জন্য অপেক্ষা। দ্রুতই ভেসে ওঠে পরের নামটি। যেমন অতিসাম্প্রতিক ভেসে ওঠা নাম শুভ নায়েক। বয়স ১২। বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের বড়চারা গ্রাম। চুরির অভিযোগে গ্রামের মাতব্বরদের গণপিটুনিতে মৃত। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩।
শুভ নায়েকের বিরুদ্ধে দোকান থেকে খাবার চুরি করার অভিযোগ ওঠে। সবংয়ের বড়ছাড়া গ্রামে একটি দোকানের মালিক হঠাৎ নাকি খেয়াল করেন দোকান থেকে কিছু খাদ্যদ্রব্য উধাও। আশেপাশের কয়েকজন অভিযোগ করেন তাঁদের দোকান বা বাড়ি থেকেও বাসনকোসন উধাও হয়েছে। বারো বছরের শুভ অভিযুক্ত হয়। কারণ তার জাতি-পরিচয়, কারণ তার দারিদ্র্য, কারণ তার নামে নাকি আগেও অপ্রমাণিত অভিযোগ উঠেছে। একপ্রস্থ গণধোলাইয়ের পরে ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে। সে রাতেই সালিশি সভা বসায় এলাকার মাতব্বররা, যার নেতৃত্বে স্থানীয় তৃণমূল নেতা মনোরঞ্জন মাল। চুরির অপবাদ প্রমাণ করা না গেলেও প্রকাশ্যে শুভকে হেনস্থা করা হয়। একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে মাতব্বররা প্রথমে শুভর মাথা কামিয়ে দেয়, তারপর নৃশংসভাবে মারধর করে। মৃতপ্রায় শুভকে ফেলে যাওয়া হয় তার বাড়ির সামনে। পরেরদিন ভোরে মারা যায় সে। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে, “ফুটবলের মত ওকে লাথি মারছিল লোকগুলো। বাচ্চাটা ক্ষিধেয় ছটফট করছিল। জল চাইছিল। ওরা বলছিল লোধারা সবকটা চোর। সবক শেখাতে হবে ওদের”। মনোরঞ্জনের মত লোকেদের কাছে শুভ এবং শুভরা অবমানুষ। লোধা শবর জনজাতির মানুষকে ইচ্ছে মত দাগিয়ে দেওয়া যায়, অপমান করা যায়, নির্দয়ভাবে পেটানো যায় কিংবা ক্ষমতাবানের ইচ্ছে হলে মেরেও ফেলা যায়। একাধিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী শুভদের ঘর প্রায় না-থাকার মতই, আর্থিক অবস্থা প্রান্তিকতম এবং অহরহ তাদের জাতিগত বৈষম্যের শিকার হতে হয়। যথারীতি শাসক দলের নেতাকর্মীরা খুনের দায় ঝেড়ে ফেলে শুভর মৃত্যুকে ‘বিষ খেয়ে আত্মহত্যা’ প্রমাণ করতে চায়। শুভর মা বলেন, “আমাদের চাষের জমি নেই, ঘরে খাবার নেই। বিষ কিনব কোত্থেকে? আমরা শবর, ছোটজাত বলেই বাবুরা মিথ্যে তকমা দিয়ে মেরে ফেলে এইভাবে।” শুভর দাদা পরিযায়ী শ্রমিক পরমেশ্বর নায়েকের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আপাতত গ্রেপ্তার করেছে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাসহ গণপিটুনিতে যুক্ত সাতজন মাতব্বরকে। আদৌ এইসব মাতব্বররা শাস্তি পাবেন, নাকি শাসক দলের রংয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছাড়া পেয়ে যাবেন, তা বিচারাধীন প্রশ্ন। কিন্তু শুভর মৃত্যু আরও অনেক প্রশ্ন হাজির করে। লোধা শবর জনজাতির মানুষকে ‘অপরাধী/চোর’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার মত ঘৃণ্য কাজ কি এখনো অবাধে চলবে? ক্ষমতাশালী উচ্চবর্গ এত অনায়াসে প্রান্তিক নিম্নবর্গকে খুন করতে পারে? ২০২৩ সালেও? প্রগতি আর উন্নতির ঢাকঢোল পিটিয়ে দলিত, নিপীড়িত জনজাতির আর্ত স্বর ঢেকে রাখার রাষ্ট্রীয় প্রয়াস আর কতদিন চলবে? রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা স্থানীয় স্তরে ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে, সালিশি সভায় নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে; শাসক এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় কেন? গ্রামসমাজের ক্ষমতা হাতে রাখার জন্য মনোরঞ্জন বা তার মত মাতব্বরদের তোল্লাই দিয়ে শাসিতের সঙ্গে (বিশেষত আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিকদের) না-মানুষের মত আচরণ করে শাসক কোন সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
#
কোরপান শাহ। ২০১৪ সালে নীলরতন সরকার মেডিকাল কলেজের হোস্টেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় কোরপানকে। সংবাদমাধ্যম জানায় ভবঘুরে কোরপানকে ছাত্রাবাসের পাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখে সন্দেহের বশে তাকে চোর আখ্যা দেওয়া হয়। তারপর তাকে খুঁটিতে বেঁধে গণপিটুনি দেয় আবাসিক ছাত্ররা। হবু ডাক্তারদের নিখুঁত মারে কোরপান মারা যান।
বিনয় কুমার উত্তরপ্রদেশের একজন দলিত বালক। পরিবারের অভিযোগ, কাজের শেষে মজুরি চাওয়ার ‘অপরাধে’ বারামারপুর গ্রামের দিগ্বিজয় যাদব এবং তার সঙ্গীরা বিনয়কে বীভৎস মার মারে। স্থানীয় হাসপাতাল থেকে বিনয়ের মৃত্যুর খবর জানতে পারে তাঁর পরিবার। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩।
১৯৯৮ সালে পুলিসি হেফাজতে মৃত্যু ঘটে বুধন শবরের। বুধন ছিলেন খেরিয়া শবর জনজাতির এক প্রান্তিক চাষী। পুলিস প্রথমে তাঁর আত্মহত্যার তত্ত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করে ময়না তদন্তের রিপোর্টে কারসাজি করলেও পরে প্রমাণ হয় যে পুলিসের অত্যাচারেই বুধন শবরের মৃত্যু হয়েছিল। আদালত পুলিসকে নির্দেশ দেয় বুধনের পরিবারকে মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে।
ওই একই বছরে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পাঢ়ি জনজাতির গায়ে ‘অপরাধী’ তকমা এঁটে দেওয়ার পক্ষে মতামত দেন। তাঁর মতে, সরকারি কোনও সুযোগসুবিধা বা উন্নয়ন পাঢ়ি জনজাতিকে বদলাতে পারেনি এবং পারবে না। প্রজন্মান্তরে তারা অপরাধীই থেকে যাবে। উচ্চবর্গীয় মুখ্যমন্ত্রী নিপীড়িত জনজাতিকে মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পক্ষেই সায় দেন। প্রশাসনিক মদতে প্রান্তিক জনজাতির উপরে নিপীড়ন অব্যাহত থাকে। ২০০১ সালে সন্তানের অন্যায্য গ্রেপ্তারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত এক পাঢ়ি নারী আদালতে নিজের গায়ে আগুন দেন। ক্ষিপ্ত সরকারি গুন্ডাবাহিনী পাঢ়ি জনজাতির গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ২০০৬ সালে মধ্যপ্রদেশে এক পুলিস আধিকারিক অভিযুক্ত হন এক ভিল নারীকে ধর্ষণের দায়ে।
২০১৮ সালে কেরালার আগালিতে মধু নামক এক আদিবাসী যুবককে খাবার চুরির অপরাধে গ্রেফতার করে প্রকাশ্যে গণপিটুনি দেওয়া হয়, ভিডিও করা হয়। লাঠি ও রডের নির্মম আঘাতে মধু মারা যাওয়ার পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করতে আসে। সম্প্রতি কেরালার উচ্চ আদালত ১৪ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
২০২১ সালের জুন মাসে রাজস্থানে গোরক্ষক বাহিনী বাবু ভিল ও পিন্টু ভিলের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গরু পাচারের অভিযোগ তুলে উন্মত্ত গোরক্ষক বাহিনী গণপিটুনি দিলে বাবু ভিল মারা যান।
এই বছরের মে মাসে ঝাড়খণ্ডে মিঠুন খেরওয়ার নামে এক আদিবাসী যুবকের মৃত্যু হয় গণপিটুনিতে। খাবার চুরির অভিযোগে তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে প্রবল মারধর করে গ্রামবাসীরা।
উপর্যুক্ত তথ্যাবলী এবং এমন অসংখ্য ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, ভারতবর্ষ ২০২৩ সালেও বর্বর মানসিকতায় অসুস্থ হয়ে আছে। রাজনৈতিক রং নির্বিশেষে সমস্ত রাজ্যেই দলিত ও আদিবাসীদের গণধোলাই দেওয়া স্বাভাবিক হয়ে গেছে। নেহাত সন্দেহের বশে কিংবা জাতি/বর্ণগত পরিচয় দেখে কোনো মানুষকে পিটিয়ে খুন করার বর্বরতা ‘সভ্য’ সমাজের বিকৃতি। প্রান্তিকতম আদিবাসী জনজাতির মানুষকে ‘জন্মগত চোর’ দেগে দেওয়া বা তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে পিটিয়ে মারা ভারতবর্ষের ব্যাধি। এই ব্যাধির প্রকোপ রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে বাড়ে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দলিত এবং আদিবাসীদের বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনা যথাক্রমে ২৮১.৭৫% এবং ৫৭৫.৩৩% বেড়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যায়। জাতীয় অপরাধ নথিভুক্তি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী এই সময়ের মধ্যে আদিবাসী জনজাতির মানুষের উপরে নির্যাতনের ৭২,৩৬৭টি মামলা রুজু হয়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ পুলিস প্রশাসন।
#
ব্রিটিশ উপনিবেশ পর্বে ভারতের আদিবাসী জনজাতিদের চিহ্নিত ও বর্গীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ঔপনিবেশিকরা নিজেদের শাসনের স্বার্থেই এ কাজ শুরু করেছিল। প্রশাসনিক স্তরে হিন্দু-মুসলমান বাইনারির বাইরের বৃহত্তর মানবজাতির সংস্কৃতি, অভ্যাস, ধর্ম, নৃতাত্ত্বিক অবস্থান পর্যবেক্ষণ না করলে শাসন চালানো দায়। এও উল্লেখ্য যে, ঔপনিবেশিক ভারতে সিপাহী বিদ্রোহ ও অন্যান্য সংগঠিত দ্রোহের বহু আগে থেকেই ব্রিটিশদের আদিবাসী জনজাতির প্রতিস্পর্ধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের আদিবাসী জনজাতি স্বাধীনতার দাবিতে ও জমির অধিকারের দাবিতে ব্রিটিশ ও দেশি উচ্চবর্গের মিলিত অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আদিবাসী জনজাতিকে চিহ্নিত করার কাজে ব্রিটিশ আমলা কিংবা তাঁদের অধস্তনদের উপরে হিন্দুসমাজের প্রভাব নিশ্চিতভাবেই ছিল। আর এই চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার আদিবাসীবিরোধী আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বেও যে আইনগুলির অনেকটাই বলবৎ ছিল বা নতুন রূপে বলবৎ হয়েছে। হিন্দু-মুসলমান বাইনারির বাইরে তুলনামূলকভাবে সামাজিক প্রতিপত্তিহীন আদিবাসীদের বিষয়ে ব্রিটিশদের নির্যাতনমূলক ও অসংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে অপরাধপ্রবণ জনজাতি হিসাবে নির্দিষ্ট কিছু জনজাতিকে চিহ্নিত করে দেওয়ার মধ্যে। ব্রিটিশরা লোধা জনজাতির মানুষদের অপরাধপ্রবণ দাগিয়ে দেওয়ার ফলে তাদের সামাজিক অবস্থান ছিল না-মানুষের সমান। ১৯৪৭ সালের পরে ব্রিটিশদের ওই আইন বাতিল করে ভারত সরকার ‘হ্যাবিচুয়াল অফেন্ডার্স অ্যাক্ট’ বলবৎ করে। লোধা জনজাতি প্রথমে ‘ডিনোটিফায়েড ট্রাইব’ ঘোষিত হয় এবং ১৯৭১ সাল থেকে তাঁদের ‘প্রিমিটিভ ট্রাইবাল গ্রুপ’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এইসব তকমা আর চাপিয়ে দেওয়া পরিচিতিকরণের খেলায় লোধা জনজাতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে। প্রবোধ ভৌমিকের প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, ১৯৬৮ সালে লোধারা অপরাধ করেছে এই অভিযোগে বেশ কয়েকজন সাঁওতাল লোধা জনজাতির গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে। ১৯৭৯ সালে মাহাতোরা সুবর্ণরেখার পাড়ে লোধা জনজাতির ৩১ জন মানুষের শিরশ্ছেদ করে। মাহাতোরা অভিযোগ করেছিল পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোধা জনজাতি তাদের গ্রামে ডাকাতি করেছে, তাই অপরাধের শাস্তি দিতে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রের আন্তরিক উদ্যোগ ছিল না বলেই লোধা জনজাতি সম্পর্কে উচ্চবর্গ হিন্দুদের এবং অন্য আদিবাসী জনজাতির (যাঁরা আর্থসামাজিক সম্মানে লোধাদের চেয়ে উপরে) ধারণা কিছুমাত্র পাল্টায়নি। রাষ্ট্র কিছু প্রকল্প, কিছু অনুদান ঘোষণা করেই খালাস; কিন্তু উচ্চতর সমাজের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হল কিনা তা দেখেনি, সেই চেষ্টাও করেনি। তাঁদের নিম্নতম ও পদদলিত জাতি পরিচিতির জন্যে তাঁরা স্থায়ী কাজের সুযোগ পাননি, শিক্ষার সুযোগ পাননি এবং স্থায়ী বাসস্থান কিংবা অন্নসংস্থান থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আর এই মৌলিক অধিকারগুলি থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলেই তাঁদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটেনি। খাতায় কলমে ‘না-অপরাধী’ ঘোষিত হলেও মূলস্রোতে ব্রাত্য হয়ে বারংবার অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সরকারি উদ্যোগের। রাষ্ট্রের সংবেদনশীল উদ্যোগ ও প্রচারের দ্বারা লোধা শবরদের সম্পর্কে ঘোষিত ঘৃণ্য তকমা মুছে ফেলা যেত। কিন্তু ১৯৪৭-পরবর্তী কোনো সরকারই সেই অতিপ্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়নি।
আরো পড়ুন আদিবাসী মহিলা রাষ্ট্রপতি হলেই নিম্নবর্গের মানুষের হাল ফিরবে না
লোধা শবরদের সামাজিক অসম্মান ও মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার দুটি জ্বলন্ত প্রমাণ (১) ১৯৯২ সালে চুনি কোটালের আত্মহত্যা এবং (২) ২০০৪ সালে ঘটে যাওয়া আমলাশোল গণমৃত্যু। চুনি কোটালের মৃত্যু সামাজিক উচ্চবর্গ দ্বারা সংঘটিত প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। আর আমলাশোলে অনাহারে গণমৃত্যুর ঘটনা নাগরিক স্তরে বেশ কিছুদিন শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। যদিও, অনাহার শব্দটি স্বীকার করতে এবং উন্নয়নহীন পরিবেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তবতা স্বীকার করতে রাষ্ট্রের যথেষ্ট দ্বিধা ছিল। আরও অসংখ্য ঘটনা এমন ঘটেছে যাতে লোধা শবরদের মানবাধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। খবরে যা আসে না, পুলিস ফাইলে যা লেখা থাকে না, এমন অনেক অপমানজনক ঘটনা লোধাদের প্রতিদিন সহ্য করতে হয়। সরকারি তথ্য বলছে ১৯৭৯-১৯৮২ সালের মধ্যে লোধা জনজাতির ৪২ জন ব্যক্তিকে ‘চুরি/অপরাধ’-এর অভিযোগে গণধোলাই দিয়ে হত্যা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার বিভিন্ন থানায় ও জেলে লোধা শবর জনজাতির প্রচুর মানুষ অপরাধের অভিযোগ ও ‘জন্মগত অপরাধী’ তকমা নিয়ে জেলবন্দি; আর্থিক অনটনে মামলা লড়তে পারেন না বলে তাঁরা ন্যায়বিচার পান না। গণেশ দেবী লিখেছিলেন “ক্রিমিন্যাল ট্রাইব অ্যাক্ট প্রত্যাহার বা হ্যাবিচুয়াল অফেন্ডার্স অ্যাক্টের পরে জনজাতিগুলির ওপরে ঘটা নির্যাতন কিছুমাত্র কমেনি। পুলিস-প্রশাসন থেকে শুরু করে অন্যান্য জাতি-বর্ণের মানুষ এঁদের জন্মগত অপরাধী হিসাবেই দেখে। ফলে তাঁদের প্রতি আচরণে চূড়ান্ত অমানবিকতা দেখা যায়।”
#
শুভ নায়েকের পরিবার সরকারকে আরও বিপন্ন করে তুলেছে এই বলে, যে তাঁদের নিয়মিত খাদ্য, বাসস্থান ও থিতু জীবিকার অভাব। অধিকাংশ লোধা পরিবারেই এমন সংকট। এমন অভিযোগ সরকারকে অযোগ্য প্রমাণ করে এবং প্রচারের ফানুস ফুটো করে দেয়। লোধা শবর জনজাতির এই অভাব অভিযোগ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০০৪ সালে আমলাশোলের ঘটনার পরে করা এক সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, অস্থায়ী দিনমজুরি আর অরণ্যোপাদানের আয়ই তাঁদের মূল সংস্থান। ২০০৪ সালে সরকারি তত্ত্বাবধানে যে বাড়ি তাঁদের বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা বসবাসের যোগ্য নয়। কোনোরকমে দায়সারা গাঁথনির বাড়িতে টিনের চাল – কয়েক মাসের মধ্যেই তার অবস্থা শোচনীয়। একটি পরিবারের বয়ানে জানা যাচ্ছে, কাগজে কলমে ২০০৪ সালেই ০.১৫ একর জমির পাট্টা পেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তবে সে জমি চোখে দেখেননি। যে সরকারি আধিকারিক পাট্টার কাগজে সই করেছিলেন, তিনি কোনো জমিই বাস্তবে তাঁদের দেখাতে পারেননি।
বর্তমান শাসক দলও তাঁদের আর্থসামাজিক সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারেনি। বরং মনোরঞ্জনের মত অসংবেদী মনুষ্যত্বহীনদের ক্ষমতা-কাঠামোয় বসিয়েছে, যাঁরা মাতব্বর সেজে প্রান্তিকতম আদিবাসীকে খুনের ঘটনায় প্রত্যক্ষ অভিযুক্ত। নিউজক্লিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ১১টি শবর পরিবার অরণ্য অধিকার আইন ২০০৬ মোতাবেক জমির পাট্টা পেয়েছে। সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে সরকারি সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন তাঁরা। নিরক্ষরতার জন্য সরকারি দপ্তরে তদ্বির করাও হয়ে ওঠে না। যদিও বা চুনি কোটালের মত কেউ সামান্য সুযোগসুবিধা পেয়ে দারিদ্র্য-অনাহার জয় করে উচ্চশিক্ষায় আঙিনায় পৌঁছন, তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়। শুভ নায়েকের একমাত্র অপরাধ – তার জাতি পরিচয়। গণেশ দেবী, মহাশ্বেতা দেবী, প্রবোধ ভৌমিকের মত কয়েকজন লোধা শবর জনজাতির বিরুদ্ধে ঘটে চলা অসম্মান, বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। কিন্তু সামাজিক উচ্চবর্গর মনোভাব কিছুমাত্র বদলায়নি। ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মধ্যযুগীয় বর্বরতার মিশেল – লোধা শবর মাত্রই অপরাধী এবং অপরাধীদের দৈহিক-মানসিক নির্যাতন করে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে। এমন পাশবিক আচরণের সঙ্গে জুড়েছে ক্রমবর্ধমান হিংসাত্মক মানসিকতা, বহু ক্ষেত্রে যাতে রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ মদত দেয়। সামাজিক অপরাধ ক্রমস্বাভাবিক হয়ে এলে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ ঝাপসা হয়ে আসে। নিম্নবর্গের কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করে ক্ষমতাশালীর অশ্লীল প্রদর্শন বাড়ে। শুভ নায়েকের খুনের ইতিহাস আছে। নির্দিষ্ট আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। ব্রিটিশ প্রশাসকরা ‘অপরাধী জনজাতি আইন’ চাপিয়ে দিয়েছিল আর উত্তর-ঔপনিবেশিক চেতনায় তা এখনো গেড়ে বসে আছে। হয়ত থাকবেও, যদি না রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংবেদনশীল অনুশীলন নিরন্তর চালানো হয়। আর একুশ শতকের অতি-আধুনিক নাগরিকদেরও এটুকু বোঝা কর্তব্য, যে জাতি-পরিচয় দিয়ে মানুষ বিচার হয় না। লোধা শবর জনজাতির বলেই কাউকে চোর দাগিয়ে শাস্তি দেওয়া যায় না। গণধোলাই মানসিক বিকৃতি এবং নৈতিক অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ। চুনি, শুভ, কিষাণলাল, মধুরা আর ফিরবেন না। কিন্তু স্বঘোষিত মূলস্রোতের স্বঘোষিত সভ্য মানুষ প্রকৃতার্থে সভ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই পারেন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








