আমাদের ছাত্রবেলায় স্কুলবাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে যে দুই বালিকা-বালক হাতে বই নিয়ে নটরাজ পেন্সিলে চেপে স্কুলে যাওয়ার কথা প্রচার করেছিল, সেই সরলমতি, হাসিখুশি ছেলেমেয়েদেরই পরের প্রজন্মে এসে স্কুল যাওয়া ব্যাপারটাই যে এ রাজ্যের একটা বড় অংশের কাছে ক্রমশ অনাবশ্যক হয়ে পড়বে – একথা কে-ই বা আঁচ করতে পেরেছিল? ইংরাজি সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এ সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা পরিকাঠামোর কালানুক্রমিক বিবর্তন আর সার্বিক অবক্ষয়ের চিত্রটি উঠে আসায় অনেকেই সম্ভবত নড়েচড়ে বসেছেন, চেনা-অচেনা পরিসরে চর্চাও হয়েছে বিস্তর। শিক্ষার হারে গোটা দেশের মধ্যে যে রাজ্য দেড় দশক আগেও প্রথম সারিতে ছিল, যে রাজ্যের প্রচণ্ড সংস্কৃতিবান অধিবাসীরা সুযোগ পেলেই হৃত অভিজাত গর্বের কথা শোনাতে ছাড়ে না, অদ্ভুতভাবে তাদেরই একাংশ কর্পোরেট অফিসপাড়ায় গিয়ে ঝুপড়িবাসীদের ‘ঝুপস’ বলে ডাকতে পারে। তাদের রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে এ ধরনের আলোচনা কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয়, এক অর্থে বিষম ঝাঁকুনিও।

যে খান তিনেক কেস স্টাডি (পড়ুন হতাশা-চিত্র) দিয়ে শুরু হচ্ছে লেখা, তার দুখানা বাঁকুড়ার, একখানা ঝাড়গ্রামের। অর্থাৎ সূচনাতেই রাজ্যের বিপন্ন অঞ্চলগুলোর কয়েকটার ততোধিক বিপন্নতার খতিয়ান তুলে ধরে বুঝিয়ে দেওয়া – পরে কী আসতে চলেছে। প্রতিবেদন যত এগোয়, যে ধরনের সংখ্যা আর তথ্যের বিষবাষ্পে ঝলসে যেতে হয় ক্রমশ, তাতে শুরুর ওই তিনখানা ঘটনাকে ক্ষণিকের ‘ইয়ে তো বস ট্রেলার’ বলেই মনে হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ওই প্রতিবেদনে যে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেখান থেকে খুব নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বলতে গেলে এটাই যে, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা উভমুখী সংকটের মধ্যে পড়েছে। নিয়োগ দুর্নীতির কবলে পড়ে স্কুলে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা যে দিনকে দিন বিপদসীমা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেটা তো ২৩ জুলাই, ২০২২ তারিখে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই দিনের আলোর মত পরিষ্কার। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে কমেছে। সে হার এমনই যে, বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত অংশে মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের (এমএসকে) মত জরুরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা একসময় প্রতিবছর নিয়ম করে বেড়েছে, বৃদ্ধির শতকরা হারও নেহাত মন্দ ছিল না। গত কয়েক বছরে সে সংখ্যাও বিপরীতমুখী। এমনকি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের যে ব্যাচ দুবছর পরে উচ্চমাধ্যমিকে বসছে, সেখানেও দুটো বছরের পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় বিস্তর ফারাক, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বেমালুম ভ্যানিশ। এটা যদি হয় সংকটের এক পিঠ, অন্য পিঠে চোখ রাঙাচ্ছে এ রাজ্যের বর্তমান শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত – ৭০:১ (যা আসলে হওয়া উচিত ৩০:১, ২০০৮ সালে যা ছিল ৩৫:১)।

দশ-পনেরো বছর আগের অবস্থার তুলনায় এত বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী কমার পরেও এমন অসাম্যই যেখানে ঘোর বাস্তব, সেখানে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের দুর্গতির কথা ভেবে আঁতকে উঠতে হয়। দিন কয়েক আগে এক পরিচিত শিক্ষিকার মুখে শুনলাম, তাঁদের উপর কর্তৃপক্ষের হুকুম হয়েছে স্কুলছুট খুঁজে বার করার। পাঠক্রম মেনে পড়ানো আর পরীক্ষা নেওয়া ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের খোঁজ রাখা শিক্ষক হিসাবে অবশ্যই তাঁদের নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, স্কুলছুটদের ফিরিয়ে আনলে বৃহত্তর স্বার্থেও সমাজেরই লাভ। সাদা মনে দুটো তত্ত্বই মান্য, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কি আদৌ সেই প্রমিত পরিকাঠামোর নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত?

প্রথমত, শিক্ষক আর কর্মীর আকালে এখন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য নানা কাজের চাপ নেওয়া একরকম প্রথাসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় পড়ানোটাই গৌণ (নির্বাচনের ডিউটির কথা ছেড়েই দিলাম)। সেখানে ডেটাবেস মিলিয়ে স্কুলছুটদের খুঁজতে যাওয়ার আরও একটা বাড়তি চাপ কেন তাঁরা নিতে যাবেন – এ প্রশ্ন খুব অন্যায্য নয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠে আসে সরকারের ভূমিকা নিয়ে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছাত্রছাত্রী খুঁজে বার করার আদেশ না হয় চাকরি বাঁচানোর ভয়ে মেনে নিলেন, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের জোরালো দাবি সরকার বাহাদুর কবে মানবেন?

এখন কথা হচ্ছে, স্বাধীনোত্তরকালে ভাল মানের চাকরির মত, পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে-স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়েও আশঙ্কা দীর্ঘদিনের। আর্থিক অভাবে বা পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, তা নিয়ে সাহিত্য, সিনেমাও কম হয়নি। দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদক যেমন লিখেছেন – কংগ্রেসি জমানায় স্কুলশিক্ষকদের বেতন বা স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে সদর্থক ভাবনার অভাব ছিল। সে ঘাটতি অনেকটা মিটেছিল বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি পরিচালিত যে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে স্কুল সার্ভিস কমিশন আইন বিধানসভায় পাশ হয় ১৯৯৭ সালে, সে নিয়োগ প্রক্রিয়াও ছিল অনিয়মিত এবং পার্টি ক্যাডারদের দুর্নীতির আখড়া। অর্থাৎ সর্বস্তরে শিক্ষা প্রসার এবং শিক্ষাব্যবস্থার গোলমালগুলো দূর করার জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির ভাবনা বামফ্রন্ট সরকারের বরাবর ছিল। যে রাজ্যে বহুবছর ধরেই শিল্পের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, সেখানে একটা বড় সময় ধরে স্কুল সার্ভিস কমিশন হয়ে উঠেছিল বহু তরুণ, তরুণীর আশা ভরসা।

পশ্চিমবঙ্গে মিড ডে মিল প্রকল্প শুরু হয়েছিল এই শতকের একদম শুরুর দিকে, ২০০৩ সালে। রোজ বাহারি টিফিন নিয়ে যাওয়া আমাদের শহুরে প্রজন্ম বলত, ওটা আসলে স্কুল-পালানো ছেলেমেয়েদের আটকানোর ফিকির। ফোক্কড় কমেডিয়ানরা হাততালি কুড়োতে মঞ্চে কবি সেজে ‘বিদ্যালয়ে’-র সঙ্গে ‘ডালভাতে’-র ছন্দ মিলিয়ে বলল – ওটা অন্ত্যমিল না, মিড ডে মিল। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণিসংকীর্ণতা যেমনই থাক (সে তো আমরা পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকেও সুবিধাভোগীর চশমায় দেখেই বিরোধিতা করেছি), প্রাইমারি স্কুলে দুপুরে গরম ভাত-ডাল-তরকারির আয়োজন উপস্থিতির হার বাড়িয়েছিল। শিক্ষা নিয়ে গবেষণা অন্তত তাই বলে।

আরো পড়ুন স্কুলে ফিরছে ফেল: সবটাই কি নম্বর দিয়ে মাপা যায়?

পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা বা মিড ডে মিলের পরেও কি স্কুলছুট ছেলেমেয়ে ছিল না? ছিল। হয়ত সংখ্যাটাও খুব কম ছিল না। এসএসসির রমরমার যুগেও টাকা নিয়ে নিয়োগের ঘটনা ছুটকো ছাটকা ঘটেছে। কিন্তু সবটাই এমন বেলাগাম হয়ে যায়নি। কলকাতার বাইরে বেসরকারি স্কুলের দৌরাত্ম্য শুরু হয়নি, কলকাতার বেসরকারি স্কুলেও লক্ষ টাকার অনুদান নেওয়ার অনুশীলন কল্পনাতীত ছিল। আমরা যারা মিশনারি স্কুলে পড়েছি, তারাও পরে বুঝতে পেরেছি, স্কুল যতই স্বাধীনভাবে চলুক, একটা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ কোথাও কাজ করেছে। ‘পরম পিতা যীশু সকলেরই মঙ্গল করেন’ পড়তে হয়েছে আমাদের। কিন্তু জিওর্দানো ব্রুনোর শাহাদত বরণ বা গ্যালিলিও গ্যালিলেইয়ের লাঞ্ছনার ইতিহাস পড়তে গিয়ে আমরা বিজ্ঞানীদের পক্ষেই দাঁড়াতে পেরেছি, চার্চের পক্ষে নয়। সেটা সম্ভব হয়েছিল নির্দেশিত পাঠক্রমের সৌজন্যে। আমাদের শিক্ষা ধর্মীয় পক্ষপাতকে প্রশ্রয় দিত না।

সমালোচনার জায়গা যে ছিল না তা নয়। আমাদের যাঁরা পড়াতেন, তাঁদের অধিকাংশেরই মৌলিক জ্ঞান এত গভীর ছিল, বিবিধ বিষয় একটা স্তর পর্যন্ত আমরা মোটামুটি যত্ন করেই শিখতে পেরেছি, সেখানে অযাচিত কৃত্রিমতা ছিল না। সমস্যার জায়গা ছিল অন্য। পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে ভাল-খারাপ নির্ধারণের যে ঔপনিবেশিক অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, উপনিবেশোত্তর, আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশে সে অভ্যাসের কোনো নড়চড় হয়নি। তার উপর নয়ের দশক-পরবর্তী দুনিয়ায় বাকি সবকিছুর মত শিক্ষা সম্পর্কেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছিল। বাজার অর্থনীতির যুগে শিক্ষকদের পক্ষেও শিক্ষকতাকে শুধুমাত্র মহৎ সামাজিক দায়িত্ব বলে গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি, সেটা আর পাঁচটা সবেতন কাজের মতই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উদ্বৃত্ত অর্থের আশায় টিউশনির ব্যবসাও তখন থেকেই ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। ২০০০ সাল নাগাদ বামফ্রন্ট সরকারের তরফে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুল, কলেজের শিক্ষকদের টিউশনির উপর লাগাম দেওয়ার চেষ্টা হলেও তার কোনো প্রভাব পড়েনি। সরকারকেই পিছু হটতে হয়। সব মিলিয়ে, শিক্ষা কেবলমাত্র পরীক্ষায় ভাল নম্বর আর সেই সুবাদে ভাল চাকরি পাওয়ার স্বর্গের সিঁড়ি হয়েই থেকে গিয়েছিল।

তাতে হয়ত রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের জোগান দিব্যি বজায় থাকে, কিন্তু শিক্ষার যে মৌলিক গুরুত্ব – মানুষকে চিন্তার পথ দেখানো বা নতুন ভাবনায় উৎসাহিত করা – সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা ক্রমশ থিতিয়ে যায়। অনেকের কাছেই বিষয়ের প্রতি ভালবাসা বা বিদ্বেষের মানদণ্ডও হয়ে ওঠে ওই পরীক্ষার নম্বর। সরকারি স্কুলের কথা বলতে পারব না, আমাদের দাম্ভিক শিক্ষকদের দেখেছি, বিজ্ঞান আর কলা বিভাগের অকারণ বিভাজনরেখা টেনে দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন – ‘সায়েন্স’ পড়ে মেধাবীরা আর ‘আর্টস’ পড়ে দুর্বল ছাত্রছাত্রীরা। অথচ কথাটা যে ভুল, তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হাতের কাছেই ছিলেন। তাঁর শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ভাষণ-গদ্য-চিঠিপত্র মিলিয়ে সংখ্যাটা একশোর বেশি। তাঁর ‘তোতাকাহিনী’ পাঠক্রমে ঢোকানো হল বটে, কিন্তু বাস্তবের প্রয়োগটা আসলে ওই তোতার উপর অত্যাচারের ঢঙেই হল। রচয়িতা ঠাকুর সেই পড়ে থাকলেন নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়ার দলেই।

তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে এত গ্রাম্ভারি তত্ত্ব আলোচনার ঝামেলাই রাখেনি। যেটুকু যা ছিল, সবটাই নিপুণ হাতে ধ্বংস করা হয়েছে। স্কুল ভালো না লাগলে পত্রপাঠ পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারে শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান। তার বদলে দৈনিক মজুরিতে কাজে ঢুকলে দুটো বাড়তি পয়সা আসবে ঘরে। পড়াশোনা তাকে উপস্থিত কোনো আর্থিক নিরাপত্তা দিচ্ছে না। কেন্দ্রীয় নীতির আনুকূল্যে অর্থনৈতিক অসাম্য বেড়েছে, কলকাতার মধ্যবিত্ত আরও বেশি করে ‘স্ট্যাটাস’ বজায় রাখার চেষ্টায় মন দিতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েকে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করেছে, সরকারপোষিত স্কুলগুলোর বেশিরভাগই হয়ে দাঁড়িয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের শেষ আশ্রয়, যাদের ভালমন্দে রাষ্ট্রের আসলে কিচ্ছুটি যায় আসে না। একই ক্লাসরুমে গরিবের ছেলে বসন্ত-শ্যামও পড়ছে, আবার বড়লোকের ঘরের দুলাল ডনি-রাধুও পড়ছে, সাতের দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত হংসরাজ ছবির সে কলকাতা এখন সুদূর অতীত। দুই দশক আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি স্কুলের ছেলেমেয়ে আর হাতে গোনা বেসরকারি স্কুলের ছেলেমেয়ের মধ্যে যে পারস্পরিক অবজ্ঞা-বিদ্বেষ ছিল, আজ বিদ্বেষের রাজনীতির যুগে সেটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে তা আন্দাজ করে নেওয়া কঠিন নয়।

প্রাক-এসএসসি যুগের শিক্ষক-শিক্ষিকারা আজ প্রায় সকলেই অবসরে। প্রথম দিকের এসএসসি-উত্তীর্ণ প্রজন্মও পঞ্চাশের আশেপাশে। বেসরকারি স্কুলে চালু নামমাত্র টাকার (মাঝেমধ্যে মোটা অঙ্কের বেতনও) বিনিময়ে সবরকমভাবে নিংড়ে নেওয়ার কর্পোরেট সংস্কৃতি। শিক্ষার মান এমনিতেই তলানিতে, খুব বড় পরিবর্তন না হলে (যার আশু সম্ভাবনা প্রায় নেই) দশ বছর পরের ভবিষ্যৎটা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।

খুব স্বাভাবিকভাবেই স্কুল সংকটের জের গিয়ে পড়েছে কলেজ শিক্ষায়। গত কয়েক বছর ধরে স্নাতক স্তরের কলেজগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদে মাছি তাড়ানোর অবস্থা। ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের কলেজগুলোতে মোট ৩০% আসন শূন্য পড়ে ছিল। অবস্থা এমনই যে, আশা প্রায় নেই জেনেও নভেম্বর মাসে নতুন করে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে বলে ঘোষণা করে রাজ্য সরকারের শিক্ষা দফতর। চটজলদি চাকরির আশায় নামমাত্র মাইনের সরকারি কলেজে না গিয়ে পারলে জমি-বাড়ি বেচে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাওয়ার ধারাবাহিকতাও লাগামছাড়া, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি মন্দা সত্ত্বেও।

কিছুই না থাকলে আছে ডিজিটাল দুনিয়ার অপরিহার্য হাতছানি। রিল বা ভিডিও বানিয়ে লাখ লাখ ভিউ কুড়োনোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ওসব করে কোনোভাবে দুপয়সা কামিয়ে নিতে পারলেই ব্যবসাদাররা বসে আছে প্রোমোট করবে বলে। ঝাঁ চকচকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্রী উচ্চারণে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে, যার জেরে আরও একদল বিশ্বাস করতে শুরু করবে – পড়াশোনা বা চাকরি আদৌ দরকার নেই। এককথায়, রিল আছে, ইউটিউব আছে, নিত্যদিনের রাজনৈতিক সার্কাস আছে, শিল্পও নাকি আছে। কেবল পড়াশোনা আর চাকরিটাই নেই।

একখানা সাম্প্রতিক সরকারি রিপোর্টের কথা বলি। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার ১৭.৮% হলেও প্রাথমিক স্তরে সে হার শূন্য। এমনকি শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাতও নাকি গোটা রাজ্যে ৩১:১, যা কিনা প্রাথমিক স্তরে আরও কম – ২৩:১। সরকারি স্কুলে ভর্তির হার কমলেও মোট ভর্তির অনুপাত (গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও বা জিইআর) এখনো একশোর উপরে। মানে সর্বভারতীয় পরিসংখ্যানের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে। হিসাব দেখে বোমকে গেলেও মনে না হয়ে উপায় নেই যে, টেট-এসএসসি নিয়ে এত দুর্নীতি, বান্ধবীসহ মন্ত্রীর গ্রেফতারি, ধর্না, পুলিসি হুজ্জতি, স্কুলে স্কুলে শিক্ষকের আকালের পরেও এমন আশা জাগানো রিপোর্ট যাঁরা বার করতে পারেন, তাঁদের এইবেলা এসব বেরসিক সমীক্ষার কাজ ছেড়ে দিয়ে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বা ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’-ই হয়ে যাওয়াই উচিত। ওতে লাভ আরও বেশি।

এসব ধাষ্টামোর বাইরে কেউ কেউ অবশ্য এখনো মাটি কামড়ে লড়ে যাচ্ছেন। বারাসতের কাছে আমডাঙার একটা স্কুলে সেদিন গিয়েছিলাম। দেখলাম ছেলেমেয়েরা বড় হইহই করে বাঁচে। দেওয়াল জুড়ে ছবি আঁকে, টুকিটাকি জিনিস দিয়ে পুতুল বানায়, সম্প্রীতির গান গায়, বসন্তোৎসব এলে আমবাগানের উঠোনটা পরিষ্কার করে ফেলে আলপনা দেয়, অঙ্ক শেখে হাতে কলমে। ‘শিক্ষাদান কেমন হওয়া উচিত’-এর প্রতর্ক থেকে ‘শিক্ষা আদৌ প্রয়োজন কিনা’-র প্রশ্নে নেমে আসতে আসতে একটা গোটা প্রজন্ম নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেল। আমডাঙার ওই শিশুদের মত অনেকে, যারা ফুল-পুতুলের মত এটাও জানে যে, দূর প্যালেস্তাইনে তাদের বন্ধুরা কত কষ্টে আছে – তাদের হাত ধরার পক্ষে কি বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.