অর্ক মুখার্জি

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে পালটে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণের নামে সেমিস্টার ব্যবস্থা চালু করেছে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ একাদশ ও দ্বাদশ – দুটি শ্রেণির জন্য এই ব্যবস্থা ঘোষণা করলেও ২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক পুরনো ব্যবস্থা অনুযায়ীই আয়োজিত হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা সেমিস্টার ব্যবস্থায় হবে। সেমিস্টার ব্যবস্থায় প্রথম সেমিস্টারের প্রশ্নপত্র সম্পূর্ণ সঠিক বিকল্প বেছে নেওয়ার প্রশ্ন (MCQ) দিয়ে তৈরি হয় এবং দ্বিতীয় সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নভিত্তিক। প্রথম যখন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল, তখন শিক্ষা মহল আশা-আশঙ্কার দোলাচলে ভুগছিল। আশা ছিল – নতুন ব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মানিয়ে নিয়ে পরবর্তীকালের বিভিন্ন প্রবেশিকা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, যেগুলি অধিকাংশই বিকল্প বেছে নেওয়ার প্রশ্নভিত্তিক, সেগুলির জন্য তৈরি হতে পারবে। আশঙ্কা ছিল – ছাত্রছাত্রীরা মানিয়ে না নিতে পারলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়বে এবং শিক্ষাব্যবস্থার মানের অবনতি ঘটবে। প্রকৃত মেধা স্বীকৃত পাবে না এবং পড়াশোনার আসল উদ্দেশ্য – বিষয়কে ভালো করে জানা – সফল হবে না।

একাদশ শ্রেণির দুটি সেমিস্টার ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। কিছু স্কুলে দুটি সেমিস্টারের ফলও বেরিয়ে গেছে। কিছু স্কুলে প্রথমটির ফলে বেরোলেও দ্বিতীয়টির বেরোয়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, শিক্ষার আধুনিকীকরণের নামে যে ব্যবস্থা চালু করা হল ছাত্রছাত্রীদের আরও বেশি করে প্রবেশিকা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলির জন্য প্রস্তুত করতে, আরও বেশি করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য – সেই ব্যবস্থায় সংসদের দাবি মত ছাত্রছাত্রীরা কি আদৌ উপকৃত হল; নাকি ‘আধুনিকীকরণ’, ‘বিজ্ঞানসম্মত’ বা ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ’ – এইসব শ্রুতিমধুর শব্দ বা শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হলেও, দেখা গেল আসলে এ এক নিষ্ফল ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রথম সেমিস্টার, অর্থাৎ সঠিক বিকল্প বেছে নেওয়ার প্রশ্নপত্রে ছাত্রছাত্রীরা মোটামুটি ভাল নম্বরই পেয়েছিল। যদিও এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, প্রশ্ন করার ভার সংসদ স্কুলগুলোকেই দিয়েছিল। তাই সব ছাত্রছাত্রী যে একই মানের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে তা নয়। যদি সংসদ নিজে প্রশ্ন করত, তাহলে গোটা বাংলা জুড়ে সমস্ত বিষয়ে প্রশ্নের মান অভিন্ন থাকত, কিন্তু সংসদ সে দায়িত্ব নেয়নি। নিন্দুকদের দাবি, সংসদ ইচ্ছা করেই প্রশ্ন তৈরি করার দায় এড়িয়ে গেছে। প্রধান উদ্দেশ্য – কিছু বিদ্যালয়কে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া। স্কুলে প্রশ্ন তৈরি করলে প্রশ্নের মান সহজ হবে, না অতি সহজ, নাকি জটিল – তা স্কুলের হাতেই থাকবে। বর্তমানে অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষকের ঘাটতি থাকার কারণে সংসদও ভাল করেই জানত যে, প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ের আগে অনেক বিষয়ের সিলেবাস শেষ করাই যাবে না। সংসদ প্রশ্ন তৈরি করলে এবং প্রশ্ন যা পড়ানো হয়েছে তার বাইরে থেকে এলে সোশাল মিডিয়ায় মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ত, সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলে আরও একবার শিক্ষক নিয়োগে ব্যর্থতার জন্য সরকারকে কথা শুনতে হত। সবচেয়ে বড় কথা, পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ স্কুলের যে হাড় জিরজিরে দশা তা বেআব্রু হয়ে যেত।

দ্বিতীয় সেমিস্টারের ফল কিন্তু প্রথম সেমিস্টারের চেয়ে অন্য ছবি দেখাচ্ছে। আগেই উল্লেখ করেছি, দ্বিতীয় সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত এবং রচনাধর্মী প্রশ্নভিত্তিক। অর্থাৎ উত্তর লেখার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের বিষয়টিকে গুছিয়ে উপস্থাপন করার দক্ষতা এবং নিজস্বতা দরকার হয়। এই ক্ষমতার বিকাশ তখনই হতে পারে, যখন ছাত্রছাত্রীরা সারাবছর অভ্যাস ও অনুশীলনের মধ্যে থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই সেমিস্টার ব্যবস্থায় সেই সুযোগ ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয়নি। প্রথম ছমাস কেবল অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর অনুশীলন করার পর সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যসূচিতে নতুন ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর পক্ষেই কঠিন। স্কুলের তরফ থেকে বিষয়গুলো পড়ানো হলেও, অনুশীলন করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সময় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার উপর একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টারের অনেকটা সময় দুর্গাপুজোর ছুটি, পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা এবং গতবছর (২০২৪) দ্বাদশ শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষার জন্যও নষ্ট হয়েছে।

ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রথম সেমিস্টারে ভাল নম্বর পাওয়া ছাত্রছাত্রীরাও অনেকে দ্বিতীয় সেমিস্টারে খুব কম নম্বর পেয়েছে। কেউ কেউ শূন্যও পেয়েছে। অনেক স্কুল কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের সাপ্লিমেন্টারি এড়িয়ে এদের দ্বাদশ শ্রেণিতে তুলবে তা নিয়ে চিন্তিত। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সোশাল মিডিয়ায় গুরুগম্ভীর আলোচনা থেকে শুরু করে স্থূল মিম – কিছুই বাদ নেই।

কিন্তু কেন এমন হল?

প্রথমেই বলতে হয় – সংসদ যে দাবি করেছিল MCQ সবসময় ছাত্রছাত্রীদের গভীরভাবে বিষয় চর্চায় আগ্রহী করে তোলে, তা অতিসরলীকরণ ছাড়া কিছুই নয়। প্রশ্নের মান সহজ থেকে অতি সহজ হলে বা সাজেশনের ভিত্তিতে প্রশ্ন তৈরি হলে ছাত্রছাত্রীরা যে অনেক বেশি নম্বর পাবে তা বলাই বাহুল্য। সবচেয়ে বড় কথা, এরকম পরিকল্পিতভাবে বেশি নম্বর দেওয়ার জন্য অনৈতিকভাবে তৈরি পরীক্ষাব্যবস্থা ছাত্রছাত্রীদের মেরুদণ্ড দুর্বল করে দেয় এবং শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কখনো সফল করতে পারে না।

আরো পড়ুন মলিন মাধ্যমিক পরীক্ষা মলিনতর হচ্ছে, প্রতিকার প্রয়োজন এখনই

MCQ ব্যবস্থায় বেশি নম্বর পাওয়ার আরেকটি কারণ ‘হল কালেকশন’। পরীক্ষা চালানোর সময়ে অনেক সময় কিছু শিক্ষক, শিক্ষিকা টোকাটুকিতে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দেন। মোবাইল ফোনের অবৈধ ব্যবহার করে বাইরে থেকে উত্তর জেনে নেওয়ার অন্যায় প্রবণতাকেও ছাড় দেওয়া হয়। সমস্যা হল, দ্বিতীয় সেমিস্টারে রচনাধর্মী প্রশ্নে এইভাবে নম্বর পাওয়া যায় না। তার উপর ছেলেমেয়েরা প্রায় ছমাস রচনাধর্মী প্রশ্নের প্রস্তুতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে অনেকের কাছে এই পড়াশোনা বিরক্তিকর মনে হয়। ছেলেমেয়েদের ভাবপ্রকাশের মৌলিক দক্ষতা কমে যায় দীর্ঘ অনভ্যাসের কারণে। তাই দেখা যাচ্ছে, অল্প কিছু ছাত্রছাত্রী, যারা মূলত গৃহশিক্ষক নির্ভর এবং পারিবারিকভাবেও পড়াশোনায় সাহায্য পায়, তারা ছাড়া বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী এই তথাকথিত আধুনিকীকরণে বিপদেই পড়েছে।

একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ছেলেমেয়েদের মৌলিকত্ব বৃদ্ধি, নিজস্বতায় শান দেওয়া, তথ্য ও তত্ত্ব আয়ত্ত করা এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতার চর্চা – এসবের সুযোগ পাওয়া উচিত। অতি সংক্ষিপ্ত, সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের সামঞ্জস্যই তা সুনিশ্চিত করতে পারে। একথা সংসদ কি বুঝে উঠতে পারছে না? ছাত্রছাত্রীদের প্রতিভার বিকাশ এবং বিষয় চর্চার উপযুক্ত সময় হল একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি। সেখানে যদি তাদের কোনো কোনো সেমিস্টারে কেবল অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের জালে আবদ্ধ করা হয়, তা তাদের শিক্ষার ক্ষতি, চেতনা গড়ে ওঠারও পরিপন্থী।

শিক্ষার আধুনিকীকরণের বিজ্ঞাপনী কায়দায় মানুষকে না ভুলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রুগ্ন সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার টিকাকরণ দরকার। তার প্রথম ধাপ হল, এই সেমিস্টার ব্যবস্থাকে কীভাবে সত্যি সত্যি ছাত্রছাত্রীদের মানবসম্পদ হিসাবে গড়ে তোলার কাজে লাগানো যায়, তা সুনিশ্চিত করা। এমনিতেই বেসরকারি স্কুলের দাপুটে প্রচারে এবং সরকারের দুর্নীতি ও উদাসীনতায় বঙ্গের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার নাভিশ্বাস উঠে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট আবার প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষকের চাকরি বাতিল করল, যেখানে শিক্ষক এমনিতেই বাড়ন্ত। তাই প্রশ্ন থেকে যায় – সেমিস্টার ব্যবস্থা কার জন্যে? ছাত্রছাত্রীদের শেখানোর জন্যে, নাকি সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার জন্যে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.