অর্ক মুখার্জি

ঐচ্ছিক বিষয়ের পরীক্ষা বাদ দিলে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ। কয়েকবছর আগেও পশ্চিমবঙ্গে স্কুল স্তরের পড়াশোনা আবর্তিত হত মাধ্যমিককে ঘিরে। বাংলায় ছাত্রজীবনের প্রথম বড় ম্যাচ ছিল মাধ্যমিক। কিন্তু লক্ষ করে দেখলে বোঝা যায়, আজ মাধ্যমিক আর রাজ্যের পড়াশোনার মধ্যমণি নয়। শহরে আর মফস্বলে এখন মূলত সিবিএসই ও আইসিএসই বোর্ডের দশম শ্রেণির পরীক্ষা ঘিরে পড়াশোনা আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হল? যে অভিভাবকরা আজ সন্তানের জন্য বিকল্প বোর্ড বেছে নিচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশ কিন্তু মাধ্যমিক বোর্ডেরই ছাত্রছাত্রী ছিলেন। মানলাম ইংরিজি মাধ্যমের কদর অনেক অভিভাবকের কাছেই একটু বেশি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদেরও তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুল আছে। সেইসব স্কুলকে তো তেমন কেউ বাছছেন না? কেন? এর কারণ খুঁজতে হলে কয়েকটা দিক আলোচনা করতে হবে।

১) এখন বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া সংস্থাগুলো কৌশলী বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি করছে যে তাঁরা ভাবছেন, দ্বাদশ শ্রেণি পরবর্তী শিক্ষার জন্য তাঁদের পঞ্চম, ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণি থেকেই পরিকল্পনা করে এগোতে হবে এবং সন্তানদের ওইসব প্রশিক্ষণে যুক্ত করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা ভাবছেন, ওই ধরনের অধিকাংশ সংস্থা যেহেতু ইংরিজি বা হিন্দিতে ক্লাস করায় এবং এনসিইআরটি পাঠক্রম অনুসরণ করে তাই সন্তানকে প্রথম থেকেই সেই পাঠক্রমে পড়াশোনার করার অভ্যাস করিয়ে দেওয়া ভাল। ঝাঁ চকচকে বিজ্ঞাপনের মহিমায় এবং বিভিন্ন অফারের সম্মোহনে সন্তানের ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, তাকে প্রতিযোগিতায় লড়ে যাওয়ার উপযোগী করে তুলতে অভিভাবকরা পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বদলে সর্বভারতীয় বোর্ডগুলোর উপরেই ভরসা করছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২) মাধ্যমিক বোর্ডের সঙ্গে কিছু কিছু ব্যাপারে সর্বভারতীয় বোর্ডগুলোর অবশ্যই পার্থক্য আছে। যেমন ইংরিজি পাঠক্রমে মাধ্যমিক বোর্ডে এখনো রাইটিং স্কিলস অংশে চিঠি লেখা গুরুত্ব পায়, অথচ ইমেল শেখানো হয় না। বহু বাঙালি লেখক ইংরিজিতে লেখালিখি করলেও, গ্রামবাংলার গল্প বা বাঙালি লেখকদের লেখা কিন্তু মাধ্যমিকের ইংরিজি পাঠক্রমে নেই।

৩) সরকারের তরফ থেকে বর্তমানে স্কুলগুলোর শিক্ষকসংখ্যা পর্যাপ্ত বলে দাবি করা হলেও, আসল ছবি কিন্তু অন্য। মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের বেহাল দশা স্কুলগুলোকে কঙ্কালসার করে ফেলেছে। বিশেষ করে কোভিড অতিমারীর সময়ে যেভাবে অপরিকল্পিত বদলি করা হয়েছে, তাতে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। ইসলামপুরের সোনাপুর মহাত্মা গান্ধী উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ৩,৫০০; বিহার থেকেও অনেক পড়ুয়া আসে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় পঠনপাঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনজন শিক্ষক বদলি নিয়ে অন্য জেলায় চলে গিয়েছেন। অঙ্ক, ভৌতবিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান, বাংলার শিক্ষকের অভাব দেখা দিয়েছে।

প্রায় ২,৫০০ পড়ুয়া রামপুর উচ্চ বিদ্যাপীঠ বিদ্যালয়ের, শিক্ষক ৩৮ জন। প্রধানত বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকেরই অভাব। শুধু তাই নয়, প্রত্যেক শ্রেণির ক্ষেত্রেই দু-তিনটে বিভাগকে একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস চালাতে হচ্ছে। চূড়ামন উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা, ইংরেজি এবং বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে প্রায় নজন শিক্ষকের অভাব রয়েছে। ইংরিজি ও ইতিহাসের দুই শিক্ষক বদলি নিয়ে চলে গিয়েছেন, পরিবর্তে কোনো শিক্ষক মেলেনি। ক্লাসঘরের সংখ্যাও কম। এত কম শিক্ষক থাকায় প্রায় ১,৩০০ পড়ুয়া নিয়ে বিদ্যালয়ে পঠনপাঠন চালানো অসম্ভব হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।

ডালখোলা গার্লস হাইস্কুলে বিজ্ঞানের কোনো শিক্ষিকাই নেই। দুজন শিক্ষিকা ছিলেন, তাঁরা বদলি নিয়ে চলে গিয়েছেন। প্রধান শিক্ষিকা সীমা ভাওয়াল জানান, বিভিন্ন বিষয়ের চার শিক্ষিকা ইতিমধ্যেই বদলি নিয়ে চলে গিয়েছেন, আরও একজন বদলির আবেদন করেছেন। আরও দুজন একই আবেদন জানাতে চলেছেন। ফলে বিদ্যালয়ের পঠনপাঠন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ প্রতিটি শ্রেণিতেই প্রায় ১২০ জন ছাত্রী।

শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে হাওড়ার উলুবেড়িয়ার একটি মাধ্যমিক স্কুলও। বর্তমানে সেই স্কুলে ৬০৩ জন ছাত্রছাত্রী। গত কয়েকবছর ধরে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার ফলেই সমস্যা। প্রত্যন্ত গ্রাম কাঁটাবেড়িয়ায় শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ১৯৬৯ সালে গ্রামের শিক্ষানুরাগী মানুষ এবং স্থানীয় ক্লাবের উদ্যোগে গ্রামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই স্কুল ১৯৮৪ সালে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে স্কুলে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত রয়েছেন মাত্র চারজন পুরো সময়ের শিক্ষক, শিক্ষিকা এবং দুজন আংশিক সময়ের শিক্ষক। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার ফলে বাংলার শিক্ষক নিচ্ছেন বিজ্ঞান বিষয়ের ক্লাস। প্রায়ই ক্লাস ফাঁকা থাকে।

বলা বাহুল্য, অপরিকল্পিত বদলির ফলে বিভিন্ন স্কুলে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত নষ্ট হচ্ছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি মডেল স্কুলে ২২ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য আটজন শিক্ষক রয়েছে, অনুপাত ২.৭৫:১। অন্যদিকে ওই জেলারই নারানপুর হাইস্কুলে ২,০০০ ছাত্রছাত্রী রয়েছে, শিক্ষক সংখ্যা ২২। অনুপাত ৮২.১১:১।

আরো পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার পরিকাঠামো নেই, স্কুলছুট না হওয়াই অস্বাভাবিক

৪) মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোতে আধুনিক পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। অনেক জায়গায় শিক্ষক, শিক্ষিকারা শিক্ষার অনুকূল পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব থাকলেও সে ব্যাপারে নীরব। অদ্ভুত আলস্য কাজ করছে। আজকের তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে অভিভাবকরা এরকম আলসেমি পছন্দ করেন না। ফলে অনেক বেশি টাকা খরচ হলেও ভরসা রাখছেন বেসরকারি শিক্ষা পরিকাঠামোয়। মনে করছেন মাধ্যমিক বোর্ডের শিক্ষাব্যবস্থা অগোছালো, অনিশ্চিত, টলমলে।

৫) বিভিন্ন উদ্যোগে বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুল বেশিমাত্রায় শহর, আধা শহর, মফস্বল, বর্ধিষ্ণু গ্রামে গড়ে উঠছে। সঙ্গে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে নীট, জয়েন্ট এন্ট্রান্সের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া হবে ক্লাসের সাধারণ পঠনপাঠনের পাশাপাশি। ওইসব স্কুলের এই দাবি কতটা সত্যি কতটা মিথ্যা তা বিচার করার মত বিজ্ঞানভিত্তিক পরিসংখ্যান নেই। অথচ বিজ্ঞাপনের গুণে মা-বাবারা মনে করছেন বাংলা মাধ্যমের থেকে ইংরিজি মাধ্যমের কৌলীন্য বেশি এবং তাঁদের কমপ্ল্যান বেবিদের জন্য ইংরিজি মাধ্যমের পুষ্টি প্রথম থেকে দরকার। সেই তুলনায় মাধ্যমিক বোর্ডের স্কুলে পড়লে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা হাড় জিরজিরে হয়ে যাবে।

৬) গত কয়েকবছর ধরে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির কথা যেভাবে সামনে এসেছে, যোগ্য প্রার্থীদের রাস্তায় বসে অনশন করতে হয়েছে এবং অযোগ্য লোকেদের অবৈধভাবে শিক্ষক পদ হাসিল করার কথা প্রকাশিত হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই মাধ্যমিক শিক্ষার মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। এমন নয় যে বেসরকারি স্কুলগুলোতে কোনো অযোগ্য শিক্ষক নেই বা স্বজনপোষণ হয় না। কিন্তু হলেও তা এইভাবে প্রকাশ্যে এসে প্রতিষ্ঠিত সত্যের রূপ নেয়নি বা সামাজিক অন্যায় হিসাবে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষের কাছে উপস্থাপিত হয়নি।

৭) অনেক জায়গায় মাধ্যমিক স্তরে স্কুল যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাওয়া এবং পড়াশোনার জন্য স্কুলের শিক্ষকদের উপর নির্ভর না করার প্রবণতাও রয়েছে। ইংরিজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরাও গৃহশিক্ষকের সাহায্য নেয় বা কোচিংয়ে যায়। কিন্তু তারা সেখান থেকে সাহায্য নেয় স্কুলের ক্লাসে তা প্রয়োগ করতে। মাধ্যমিক বোর্ডের স্কুলগুলোতে ক্লাস অনিয়মিত হয়ে যাওয়ার ফলে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী সমান্তরাল গৃহশিক্ষক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেই যা শেখার শেখে। সেটাই তাদের একমাত্র শিক্ষা। স্কুলের বিশেষ ভূমিকা থাকে না।

৮) ইদানীংকালে রাজ্য সরকারের অন্যতম শিক্ষক তুষ্টিকরণ নীতি হল তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে ছুটি ঘোষণা করা বা কোনো কোনো সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা। গরম একটু বেশি পড়লে বা শীত একটু বেশি পড়লেই ছুটি ঘোষণা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই পড়ানোর সময় কমে যাচ্ছে। এই ছুটির মেজাজ পড়াশোনার ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে, যা কখনোই কাম্য নয়। অন্য বোর্ডের স্কুলগুলোতে কিন্তু এত ছুটি থাকে না।

৯) প্রতিবছর যেভাবে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠছে, তাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রতি সৎ ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যেও সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে, যা কখনো কাম্য নয়।

সরকার যদি সচেতন না হয় তাহলে মাধ্যমিক বোর্ডের স্কুলগুলোতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রী কমতে থাকবে। হয়ত নাম নথিভুক্ত থাকবে কিন্তু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ক্রমশ কমবে। আস্তে সরকারী উদাসীনতায়, বিজ্ঞাপননির্ভর বেসরকারি স্কুলের রমরমায়, অভিভাবকদের অবিশ্বাসে, দুর্বল ও মন্থর পরিষেবার কারণে এবং পরিকাঠামোর অভাবে আরও ফিকে হবে বাংলা মাধ্যমে পড়ে বড় হওয়া সবার প্রিয় ‘মাধ্যমিক’।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.