অর্ক মুখার্জি

পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পূর্ব ঘোষণা মত গত ১৪ সেপ্টেম্বর আয়োজিত একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে। কমিশনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্তব্যের জন্য, ফলপ্রকাশ কিসের ভিত্তিতে হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ফলপ্রকাশের সময়ে দেখা গেল, কেবল লিখিত পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতেই ফলপ্রকাশ করা হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীরা কেবল মাত্র নিজের নিজের ফল দেখতে পাবেন। কেন্দ্রীয়ভাবে সবার ফল এক জায়গায় দেখার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ৭ নভেম্বর রাত আটটার সময়ে ফলপ্রকাশের কথা বললেও রাত আটটার পরে কমিশনের সাইট বসে যায় এবং পরীক্ষার্থীরা চেষ্টা করেও ফল দেখতে পাননি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ডিজিটাল বাংলা গড়ার কথা বলছে, বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রে ডিজিটাল পরিষেবা চালু করা হচ্ছে। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফল দেখার সময়ে সাইট যেভাবে বসে গেল, তা কমিশনের অপদার্থতা এবং সবকিছু সঠিকভাবে চালানোর সদিচ্ছার অভাবকেই নির্দেশ করে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু রাত সাড়ে নটার পর নিজের এক্স হ্যান্ডেলে ফলাফল প্রকাশের কথা জানান, অথচ সাইট বসে যাওয়া নিয়ে একটি বাক্যও ব্যয় করেননি।

কমিশনও কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা বার্তা দেওয়ার মধ্যে যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই বহু পরীক্ষার্থী সারারাত চেষ্টা করেও ফল দেখতে পাননি। এমনকি পরদিন একটা নতুন ওয়েবসাইট চালু করা হলেও সেই ওয়েবসাইট কিছুক্ষণ পরেই বিকল হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমে কর্তারা যুক্তি দিয়েছেন –শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য ফর্ম পূরণ চালু থাকার জন্য আবেদনকারীরা সাইটে ঢোকার চেষ্টা করছেন, আবার পরীক্ষার ফল দেখার জন্যে আরেক দল মানুষও সাইটে ঢোকার চেষ্টা করছেন – এই দুরকম ভার্চুয়াল ভিড়ের চাপ ওয়েবসাইট সামলাতে পারেনি, তাই বসে গিয়েছিল। প্রশ্ন জাগে, কর্তারা কি জানতেন না যে ফল বেরোবার পর স্বাভাবিকভাবেই সাইটে ট্র্যাফিক বাড়বে? আগে থেকে ব্যবস্থা নিলেই তো এভাবে পরীক্ষার্থীদের উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তির মধ্যে কাটাতে হত না।

পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর গড়ে দশ লক্ষ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। পাঁচ-ছ বছর আগে ইন্টারনেট থেকে ফলাফল দেখতে সমস্যা হলেও, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ গত কয়েক বছরে কোনো বিভ্রাট ছাড়াই ফলাফল প্রকাশ করেছে। উচ্চমাধ্যমিক বা পিএসসি ক্লার্কশিপ পরীক্ষার জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য। পঁয়ত্রিশ খানা বিষয়ে ২,২৯,৪৯৭ পরীক্ষার্থী একাদশ-দ্বাদশের এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা ক্লার্কশিপ পরীক্ষার তুলনায় এই সংখ্যা নগণ্য। তাহলে স্কুল সার্ভিস কমিশন কেন হিমশিম খেল? সবচেয়ে বড় কথা, পরদিন বিকেল পর্যন্তও অবস্থার উন্নতি হল না কেন? ফলাফল বার হওয়ার ২৪ ঘন্টা পরেও অনেক পরীক্ষার্থী নিজের ফল জানতে পারেননি। এত দীর্ঘ সময় বিচলিত হয়ে যাঁদের কাটাতে হল কমিশনের ডিজিটাল পরিকাঠামোগত ব্যর্থতার জন্য, অন্তত মানবিকতার খাতিরে সরকারিভাবে তাঁদের একটা বার্তা দেওয়া উচিত ছিল না? শিক্ষামন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের চাকরি বাতিলের নির্দেশ আসার পর তো বারবার বলেছেন যে তাঁরা মানবিক থাকবেন। তাহলে এই ডিজিটাল বিভ্রাটের জন্য গুজব রটতে থাকায় ফল দেখতে না পেয়ে যাঁরা দুশ্চিন্তায় ভুগলেন, তাঁদের কথা কী করে ভুলে গেলেন?

গোলমালের এখানেই শেষ নয়। ফলপ্রকাশের পর এক অদ্ভুত খেলা লক্ষ করা গেছে। বলতে দ্বিধা নেই, কমিশন চাকরিপ্রার্থীদের নিয়ে খেলতে পারদর্শী। কথাটা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি হারানো শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা হাড়ে হাড়ে বোঝেন। কিছু বিষয়ে দেখা গেছে, চূড়ান্ত ‘আনসার কি’ অনুযায়ী কিছু কিছু বিষয়ে একটা প্রশ্নের সব বিকল্প উত্তরেই নম্বর দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অধিকাংশ প্রশ্নে কিন্তু ভুল ছিল না। হয়ত উত্তরের বিকল্পগুলোর মধ্যে দুটোকে সঠিক ধরা যেতে পারে। কিন্তু চারটে বিকল্পকেই সঠিক বলে ধরা হয়েছে এবং নম্বর দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস ও ভূগোলের মত বিষয়ে পাঁচ বা তার বেশি সংখ্যক প্রশ্নে এরকম করা হয়েছে। আবার অন্যদিকে অনেক পরীক্ষার্থীর অভিযোগ, কিছু বিষয়ে (যেমন ভূগোল, বাংলা) ভুল বিকল্পকে উত্তর হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। কোন বিষয়ে ৬০ নম্বরের প্রশ্নে যদি পাঁচখানা প্রশ্নে সকলেই নম্বর পেয়ে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে যারা অপেক্ষাকৃত ভাল পরীক্ষা দিয়েছে এবং যাদের পরীক্ষা খারাপ হয়েছিল, তাদের নম্বরের ব্যবধান কমবে। এ কি কমিশনের দুরভিসন্ধি? প্রশ্ন ঠিক থাকলে ভুল উত্তরের জন্যও নম্বর দেওয়া মেধা, সততা এবং নীতির পরিপন্থী। সোজা ভাষায়, নম্বর পাইয়ে দেওয়ার অবৈধ ফন্দি।

আরো পড়ুন বাংলার সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা অন্তহীন অন্ধকারে

কমিশন ভালো করেই জানে, এইসব ফন্দি ফিকির আটকাতে যোগ্য, আইন ও অধিকারসচেতন পরীক্ষার্থীরা আদালতে যাবেন। শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষার পরই সাংবাদিক সম্মেলন করতে করতে হালকা চালে বলেছিলেন, কারোর কিছু অপছন্দ হলে আদালতের দরজা খোলা আছে। ভুল বিকল্পে নম্বর দেওয়া বা পাওয়া শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো পরীক্ষার্থীরই পছন্দ হওয়ার কথা নয়। কেউ আদালতে যাওয়া মানেই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া চালু হবে, নিয়োগ আটকে থাকবে। কমিশন তা জানে। সুতরাং মনে করলে অন্যায় হবে না যে ইচ্ছা করেই এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে যাতে শিক্ষক নিয়োগ আবার বিচারাধীন হয়ে পড়ে। ব্রাত্যবাবু নাট্যজগতের লোক, চমৎকার অভিনয় করেন। পরিচালক হিসাবেও দক্ষ বলে শোনা যায়। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে স্বচ্ছতা, সততা এবং যোগ্য পরীক্ষার্থীদের শিক্ষকের চাকরি পাওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং হচ্ছেন। কমিশনের কথা ছেড়েই দিলাম।

মনে প্রশ্ন জাগে, শিক্ষক নিয়োগে এত বিতর্ক, অস্বচ্ছতা, কিছু লোককে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অসাধু প্রচেষ্টা, অযোগ্যদের প্রছন্ন মদত দেওয়ার জাল থেকে তৃণমূল সরকার বেরিয়ে আসতে পারছে না, বরং ক্রমশ আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়ছে কোন বাধ্যবাধকতায়?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.