সম্পাদকমণ্ডলীর অনুরোধে এ লেখা লিখতে বসেছি। নয়ত সরকারি স্কুলের একজন কর্মরত শিক্ষক হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাজগতের এই বিপর্যয় নিয়ে লেখা আর নিজেদের অবিচুয়ারি লেখার মধ্যে বিশেষ তফাত খুঁজে পাচ্ছি না। এর আগেও এ রাজ্যের স্কুল ও শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে টুকটাক আলোচনা করেছি এখানেই, সেজন্য কিছু ভাবনাচিন্তা করতে হয়েছে, কিছু বইপত্র এবং ইন্টারনেট ঘাঁটতে হয়েছে। একটা লেখার ছক মাথায় কিছুটা সাজিয়ে নিয়ে লেখা শুরু করেছি, তারপর লেখাই নিজেকে শেষ অব্দি টেনে নিয়ে গেছে। আজ লিখতে বসে মাথাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। এসএসসি দুর্নীতির ঘটনাক্রম শুরু থেকে অনুসরণ করেছি, ঘনিষ্ঠ মহলে এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দিনের পর দিন খুঁটিয়ে আলোচনা করেছি, খবর দেখেছি, পুরনো মামলার উল্লেখ খুঁজে দেখেছি, পরশু চূড়ান্ত ফল দেখলাম। যা আশঙ্কা করেছিলাম সেটাই হয়েছে, কিন্তু তারপরেও কী লিখব ভেবে পাচ্ছি না। তার কারণ এই বিপর্যয়ের মধ্যে যারা পড়েনি, তাদের এর প্রকৃত অভিঘাত বোঝানো প্রায় অসম্ভব। সম্পাদকমণ্ডলী সম্ভবত শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মরত একজনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টা তুলে ধরতে চেয়েছেন, তাই আমাকে লিখতে বলা।
প্রিয় পাঠক, ঘটনাক্রম এবং তথ্যের মধ্যে এই মুহূর্তে এমন কিছু নেই যা আপনাদের অজানা। তাই সেসবের চর্বিতচর্বণ করে আপনাদের ধৈর্য্চ্যুতি ঘটাব না। আমি শুধুমাত্র আমার ধারণাটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রাজ্যের যে কোনো সচেতন মানুষের কাছে অনেকদিন আগে থেকেই একটা বিষয় খুব পরিষ্কার যে, বাংলার সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা মমতা ব্যানার্জির সরকারের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় অন্তর্জলি যাত্রায় বেরিয়েছে। দশ হাজারের কাছাকাছি স্কুল (প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয় মিলিয়ে) বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষক অথবা ছাত্রছাত্রীর অভাবে। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান, যারা পরীক্ষায় বসছে তাদের অধিকাংশের কাছেই বোর্ডের পরীক্ষা দুটো গুরুত্বহীন। কারণ এ রাজ্যের সরকারি স্কুলে পাঠরত ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের বুঝে ফেলেছেন, পড়াশোনা আর পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট আর এ রাজ্যে ভাল কাজের নিশ্চয়তা দেয় না, ভিনরাজ্যে প্রবাসী হওয়াই ভবিষ্যৎ। তাই ক্লাসের পর ক্লাস ফাঁকা, হাতে গোনা অনিয়মিত ছাত্রছাত্রীর সম্পূর্ণ নিরাসক্ত, ভাবলেশহীন মুখ শিক্ষক শিক্ষিকাদের অবসাদের দিকে ঠেলে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
এই দায় কার? গত ১০-১২ বছরে এ রাজ্যে কর্মক্ষেত্র হিসাবে ঔজ্জ্বল্যে সবার প্রথমে থাকা সরকারি স্কুল প্রায় খন্ডহরে পরিণত হল কাদের জন্য? কার, কাদের, কোন ব্ল্যাক ম্যাজিকে এ কাজ সম্ভব হল? উত্তর তো আপনাদের জানা।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা পড়ল গত পরশু। তবে এটাই একমাত্র ঘা নয়, আরও দু-একটা বাকি আছে। এখন শুরু হয়েছে ওই ঘা নিয়ে তরজা। তার মধ্যে ঢোকার আগে, পাঠক, আপনাদের সামনে সহজ সাধারণ কিছু প্রশ্নোত্তর রাখছি। এগুলোও আপনাদের জানা, তবু খুব স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি।
১. দুর্নীতি করেছে কারা?
সরকার (মন্ত্রীসান্ত্রী, পদাধিকারী), ঘুষখোর নেতা নেত্রী, পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা এবং এক চূড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র।
২. টাকা লেনদেন করেছে কারা?
শাসক দলের নেতানেত্রী, পরীক্ষা পরিচালক সংস্থার পদাধিকারী এবং অযোগ্য পরীক্ষার্থীরা।
৩. তথ্য নষ্ট করেছে কারা?
সরকার (মন্ত্রীসান্ত্রী, পদাধিকারী), ঘুষখোর নেতা নেত্রী, পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা এবং এক চূড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র।
৪. সঠিকভাবে কাজটা করার দায়িত্ব কাদের ছিল?
পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা, তার পদাধিকারী এবং সরকারের।
৫. সঠিকভাবে পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করার দায় কার ছিল?
পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা এবং সরকারের।
৬. আদালত তথ্য চেয়েছে কার কাছে?
পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা, সরকারের শিক্ষা দফতরের কাছে।
৭. সঠিক তথ্য দিতে কে বা কারা অপারগ হয়েছে?
পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা ও সরকারের শিক্ষা দফতর।
৮. যাবতীয় কেলেঙ্কারির তথ্যপ্রমাণ কাদের বিরুদ্ধে?
পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা, তার পদাধিকারী, সরকারি দলের নেতা, মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে।
৯. যাবতীয় দায় বিচারপ্রার্থীদের ঘাড়ে চাপাচ্ছে কারা?
সরকার, নেতা, মন্ত্রী, পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা।
১০. এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কারা?
রাজ্যের সরকারি স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রী, চাকরি হারানো এবং না হারানো শিক্ষক শিক্ষিকা, সন্তানকে সরকারি স্কুলে পাঠানো রাজ্যের নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র অভিভাবকরা।
আমরা সত্যিই ঠান্ডা রক্তের ক্লীবে পরিণত হয়েছি। নইলে এই প্রকাশ্য চুরি এবং তার মর্মান্তিক ফলাফলের পরেও শাসক দলের মাথা সজ্ঞান মিথ্যাভাষণ এবং অর্থহীন প্রলাপ চালিয়ে যেতে পারতেন না আর শিক্ষামন্ত্রীকে গত ৭২ ঘন্টায় পদত্যাগ করতে হত, শাসক দলের গ্রাম শহরের ছোট বড় নেতাদের এলাকা ছাড়া হয়ে যেতে হত। কিন্তু শাসক দলের কৃতিত্ব এখানেই যে ১৪ বছরে বাঙালির চামড়া এত মোটা হয়ে গেছে যে এসবে সে আর উত্তেজিত হয় না।
তাহলে মোদ্দা ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? উত্তরটা আমি আগেই দিয়ে রেখেছি।
পাঠক, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরবর্তী ঘটনাক্রম খেয়াল করুন। সরকারপোষিত একটা অংশ নেমে পড়েছে মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের লোকদেখানো প্রচেষ্টায়। রিভিউ পিটিশন নামক একটা অর্থহীন বিষয় (সুপ্রিম কোর্টে যার ব্যর্থতার হার ৯৯.৯৯%) নিয়ে হইচই করার চেষ্টা হচ্ছে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রয়েছে মূলধারার বঙ্গীয় সংবাদমাধ্যম। যাদের মূল দায়িত্ব হল মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে কোনোভাবেই না চটানো। সরকারি পয়সায় বিদেশ ঘোরা, সেরা পাঁচতারা হোটেলে থাকার লোভ কজন ছাড়তে পারেন? ফাউ হিসাবে চামচ, তোয়ালে। পুজোয়, পয়লা বৈশাখে পাঞ্জাবি দেন কে? কৃতজ্ঞতা বলে একটা ব্যাপার আছে তো, নাকি? আপনাকে সত্যি খবর দিয়ে নামকরা সাংবাদিকরা নিজেদের সুখের বারোটা বাজাবেন কেন? এত আবদার করবেন না।
যাক সে কথা। আসল ব্যাপার হল, এই পেটোয়া সাংবাদিককুলের সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধিতে এতটাই মরচে ধরেছে যে দুটো লাইন সঠিকভাবে পড়ে অনুবাদ করে দেওয়াও এঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে গেছে। নইলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা নির্দেশ দিলেন ‘চাকরি বাতিল হওয়া শিক্ষক শিক্ষিকাদের মধ্যে যাঁরা রাজ্য সরকারের অন্য চাকরি ছেড়ে এসেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে তাঁদের পুরনো পদে পুনরায় নিয়োগ করার বন্দোবস্ত করতে হবে সরকারকে’, আর সাংবাদিকরা বোঝালেন – চাকরিহারাদের তিন মাসের মধ্যে পুনর্নিয়োগের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। ফলে রায়ের দিন রাতেই ভয়ানক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ল। সকালে অবশ্য বাজারি সংবাদমাধ্যম সোশাল মিডিয়ায় ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইল। এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, এ শুধুই তাড়াহুড়োয় ঘটে যাওয়া ভুল। বরং তাৎক্ষণিক ক্রোধ প্রশমিত করার অপচেষ্টা বলেই সন্দেহ হয়। বাংলার এই সর্বনাশে জনপ্রিয় বঙ্গীয় সংবাদমাধ্যম (শাসকের প্রচারমাধ্যম) তার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারবে না।
কিন্ত সে নীতিকথা আলোচনা করে আমার, আপনার কী লাভ? কুকুরের ল্যাজ তো আর সোজা করা সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল এবং বিরোধী দলনেতার উল্লেখ না করলে একটা সনাতনী অন্যায় হবে। সেই বিরোধী দলনেতা, যিনি এই চরম দুর্নীতির সময়ে ছিলেন শাসক দলের নয়নের মণি। বাবা আর ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মেদিনীপুরের অঘোষিত সম্রাট। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, দুই মেদিনীপুর আর মুর্শিদাবাদ জেলায় চাকরিহারার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পাঠক, খেয়াল করবেন, এই পরম সনাতনী বিরোধী দলনেতা সেইসময় ছিলেন শাসক দলের পক্ষ থেকে মুর্শিদাবাদসহ উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক। বাকিটুকু ভেবে নেওয়ার ভার রইল আপনাদের উপর।
আরো পড়ুন একেবারে নিট দুর্নীতি, একটুও জল মেশানো নেই
এখন অধিকারীমশাই তাঁর স্বভাবোচিত নির্লজ্জতায় বলছেন, ২০২৬ সালে ক্ষমতায় এলে যোগ্যদের ফের নিয়োগের ব্যবস্থা করবেন। অনুগত সাংবাদিককুল একবারও প্রশ্ন করে না – সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সেটা কীভাবে সম্ভব? এমন সংবাদমাধ্যম পাওয়ার (পোষার) কৃতিত্ব কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না।
এইসব রাজনৈতিক অসভ্যতা এবং নির্মমতা বাদ দিলেও যে বিপদে বাংলার শিক্ষাজগৎ আর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী পড়েছে বলে আমরা বুঝতে পারছি, তার নিরাময়ের উপায় কী? বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই মুহূর্তে কোনো উপায় আমার অন্তত চোখে পড়ছে না। কারণ বিপদ আরও বাকি আছে, যদিও বিস্তারিত বলে আশঙ্কা ছড়াতে রাজি নই।
সবশেষে একটি সহজ ও সাধারণ প্রশ্ন – এই বিপদ দূর করার দায়িত্ব কার? রাজ্য সরকারের, সেই সরকারকে নির্বাচিত করা এ রাজ্যের প্রায় ৫০% জনতার। কিন্তু এই রাজ্য সরকারের কাছে শিক্ষা বিপর্যয়ের সমাধান চাওয়া আর মশার কাছে ম্যালেরিয়ার উপশমের উপায় চাওয়া একই ব্যাপার।
আমার বিশ্বাস, মানুষই শেষ কথা বলেন। সেই বিশ্বাসটুকু ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো আলো দেখতে পাচ্ছি না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







