ধরা যাক, সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা অথবা কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রশ্ন এল – ইয়েমেনীয় ক্ষুদ্র দোকানী, মেক্সিকো থেকে আগত ঠাকুমা/দিদিমা, সেনেগালিয় ট্যাক্সিচালক, উজবেক নার্স, ত্রিনিদাদিয় রাঁধুনি, ইথিওপিয় কাকিমা/মাসিমা। এঁদের মধ্যে মিল কোথায়? অনেকরকম উত্তর হতে পারে, যার একটা হল – নিউ ইয়র্ক শহরের নব নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি বিজয়ী হওয়ার পরের ভাষণে এঁদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন ‘আমাদের শহরের রাজনীতি আপনাদের মত যাদের ভুলে গেছে, তাঁরা এই আন্দোলনকে আপন করে নিয়েছেন। আপনাদের ধন্যবাদ।’ এরকম টুকরো টুকরো বহু শহরবাসীর সঙ্গে ওঁর সাক্ষাতের, আলোচনার এবং তাঁদের কথা শোনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানান জোহরান।
এসব নির্বাচনে জিতে গদগদ আদিখ্যেতা বলে মনে হতেই পারে। মজার ব্যাপার, অনেকে আবার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করতে চাইছেন যে ভোটপ্রার্থী জোহরান এবং বিজেতা জোহরানের মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাঁর ওই বক্তৃতা এবং হাবভাব থেকেই নাকি সেটা স্পষ্ট। যে বিনয় ও কৌতুকপ্রিয়তা ওঁর প্রচারে এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রাইমারিতে জেতার পরেও লক্ষণীয় ছিল, তা বদলে গিয়ে কিঞ্চিৎ ঔদ্ধত্য দেখা যাচ্ছে। সবাইকে সঙ্গে না নিলেও চলবে – এরকম হাবভাব উঁকি দিচ্ছে। কেউ কেউ এরকম বলছেন। এসব শুনে গুলিয়ে যাচ্ছে বলে জেতার পরের বক্তৃতাটা খুঁটিয়ে পড়ে দেখলাম – অনেকটা জুড়েই এই জয় যে আপামর শহরবাসীর, তা মনে করানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘরভাড়া বাড়তে না দেওয়া, বেশি সংখ্যায় শিক্ষাকর্মী নিয়োগ, বিনামূল্যে জনসাধারণের যানবাহন (বিশেষ করে বাসযাত্রার) ব্যবস্থা, সার্বিক শিশু পরিচর্যা (ইউনিভার্সাল চাইল্ড কেয়ার) ইত্যাদি পূরণ করার অঙ্গীকার করেছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এইসব বড় বড় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত করতে পারবেন কিনা, পারলেও কতটা, সে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন, কিন্তু আসল ঔদ্ধত্যটা খেয়াল করলাম একটা বিশেষ পংক্তিতে ‘…আমি নবীন, যদিও বড় হবার চেষ্টাও চালিয়ে যাই। আমি মুসলমান। আমি গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী। আর সবচাইতে বড় কথা, এগুলোর কোনোটার জন্যই আমি ক্ষমাপ্রার্থী নই।’
বটেই তো, এই তো অকাট্য প্রমাণ যে ক্ষমতার মোহে একেবারে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন জোহরান, মুখোশ খুলে ফেলে স্বরূপ প্রকাশ করছেন। ওঁর সমর্থক অথচ সাবধানী যাঁরা, তাঁরাও হয়ত ভাবছেন যে আর যা-ই হোক, ধর্মের কথা বলার কী দরকার ছিল? এমনিতেই তো ইহুদীবিদ্বেষী তকমা ছিল, একটু একটু করে সেটা যদিও ফিকে হত।
কিন্তু জোহরানের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ভাবাদর্শ – কোনোটাই তো নতুন নয়। লুকোনো ছিল না, কারোর অজানাও নয়। ওই একই ভাষণে কিন্তু এক জায়গায় জোহরান বিশেষ করে নিউ ইয়র্কবাসী ইহুদীদের পাশে দাঁড়িয়ে ইহুদীবিদ্বেষ মোকাবিলার কথাও বলেছেন। কিন্তু তারপরেই যে বললেন ‘নিউ ইয়র্কবাসী দশ লক্ষাধিক মুসলমান যেন উপলব্ধি করতে পারেন যে এই শহর, ক্ষমতার অলিগলি তাঁদেরও’, সেটা অনেকের ঔদ্ধত্য মনে হল।
কেউ জিজ্ঞেস করতেই পারেন, কেন কাজ শুরু করার আগেই জোহরানের একটা ভাষণ নিয়ে এত কথা? আসলে এই অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখার প্রবণতা থেকেই বোঝা যায় যে কোন অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করছে জোহরানের জন্য। শাসকের সৎ উদ্দেশ্য এবং নিপুণ প্রয়াস সত্ত্বেও নিউ ইয়র্কের মত জটিল শহরের বহুমুখী সমস্যার মোকাবিলা করা সহজ নয়। তদুপরি থাকবে মিডিয়ার নিরলস কাটাছেঁড়া এবং বিরোধী (রিপাবলিকান ও মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট) রাজনৈতিক মতাদর্শ, উগ্র পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রপতির নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ এবং অসহযোগিতা। জোহরানের জয়ের রাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য দুই রাজ্যে ডেমোক্র্যাট রাজ্যপাল নির্বাচিত হয়েছেন। খেয়াল করে দেখলাম, ডেমোক্র্যাটপন্থী রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাই আপ্রাণ চেষ্টা করছেন প্রমাণ করতে যে জোহরানের জয় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জনমতের প্রতিফলনের একটা অঙ্গ মাত্র। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা জোহরানের জয়কে জুজুর মত ব্যবহার করে লোককে ভয় দেখাচ্ছে ‘ওই দ্যাখো, পুরো ডেমোক্র্যাট দলটাকে উগ্র বামপন্থীরা গ্রাস করে ফেলেছে। ওদের জেতালেই সর্বনাশ।’ গণতান্ত্রিক সমাজবাদীদের নিয়ে ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যেও যে একটা অস্বস্তি রয়েছে, তা অবশ্য ঠিকই। বিভিন্ন জায়গায় এই ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ রাজনীতিবিদদের জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। ফলে দলের পক্ষে তাঁরা অপরিহার্য, কিন্তু দেশব্যাপী রাজনৈতিক খেলায় মধ্যপন্থীরা বেশি গ্রহণযোগ্য – এটাই প্রচলিত ধারণা। হয়ত ধারণাটা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়, কিন্তু গতবছরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলের পর মধ্যপন্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, সে প্রশ্নও উঠে গেছে।
আরো পড়ুন কর্পোরেট লোভের ভূমিকা ফাঁস করেছেন বলেই ফ্রাঞ্চেসকা চক্ষুশূল
জোহরানের জয় অনেককে ১২ বছর আগে বিল ডি ব্লাসিওর কথা মনে করাচ্ছে। ডি ব্লাসিও নিউ ইয়র্কের আর্থসামাজিক অসাম্যের মোকাবিলা করার অঙ্গীকার নিয়ে প্রচার করেন এবং মেয়র নির্বাচিত হন। বামপন্থীরা খুবই আশাবাদী ছিলেন যে ওঁর শাসন গোটা দেশের সামনে উদাহরণ তৈরি করবে। কিন্তু আট বছর পর ডি ব্লাসিওর মেয়াদ যখন শেষ হয়, ততদিনে জনপ্রিয়তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল। অনেক কাজই করে উঠতে পারেননি। তার উপর উনি মিয়ামির এক সভায় চে গুয়েভারাকে উদ্ধৃত করেন, যা ওঁর দলের লোকজন ভালোভাবে নেয়নি। তাই পরে ডি ব্লাসিও ক্ষমা চান।
কয়েকমাস আগেই লিখেছিলাম যে প্রাইমারিতে জিতলেও সাধারণ নির্বাচনে জয় সহজ হবে না। সেই কঠিন কাজ বাস্তবায়িত করার জন্য জোহরানকে কুর্নিশ। তবে এই জয় যতখানি ওঁর, ততটাই লক্ষাধিক নানা বয়সের স্বেচ্ছাসেবকদের। তরুণ প্রজন্মের বহু মানুষ সেই বাহিনীতে ছিলেন। তাঁদের সমবেতভাবে দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে প্রচার যে ফলপ্রসূ হয়েছে তার প্রমাণ হল তরুণ ভোটারদের মধ্যে (বিশেষত ৪৫ বছরের কম বয়সের ভোটদাতাদের মধ্যে এবং ৩০ বছরের কম বয়সের ভোটদাতাদের মধ্যে) জোহরানের বিপুল জয়, একাধিক এক্সিট পোল যা জানাচ্ছে।
বলা বাহুল্য, একদিকে আকাশ ছোঁয়া প্রত্যাশা, অন্যদিকে বহুমুখী বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে জোহরানকে। দলের প্রার্থী হিসাবে সমর্থন জানালেও, প্রাতিষ্ঠানিক ডেমোক্র্যাটরা, যেমন নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজ্যপাল ক্যাথি হোকাল, জোহরানের নানা পরিকল্পনার (যেমন ধনীদের জন্য কর বৃদ্ধি) সঙ্গে সহমত নন। চাক শুমারের মত ডাকসাইটে নেতা আবার সমর্থনও জানাননি। বারাক ওবামার মত কিছু ক্ষেত্রে জোহরানকে হয়ত আপোস করতেই হবে। সেই আপোস মনঃপূত না হলে প্রচারে অংশ নেওয়া হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক এবং যে লক্ষ লক্ষ বামমনস্ক মানুষ ওঁকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেছেন, তাঁরা রুষ্ট হতে পারেন। আবার কোনো কোনো বহুজাতিক সংস্থা নাকি হুংকার দিয়েছে যে জোহরান যে শহরের মেয়র সেখান থেকে তারা পাততাড়ি গোটাবে। আবার এমনও শোনা যাচ্ছে যে অনেক পুঁজিবাদী সংস্থা এই সমাজবাদীর সঙ্গে সহাবস্থানের বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে।
এসবের গুরুত্ব এবং জটিলতা নিয়ে বোধহয় এই মুহূর্তে জোহরানের চেয়ে বেশি সচেতন কেউ নন। পয়লা জানুয়ারি থেকে মেয়র হিসাবে কাজ শুরুর প্রস্তুতি এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। পরামর্শ ও পরিকল্পনার জন্য যে পরিষদ তৈরি করেছেন জোহরান, তার অনেকেরই প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা আছে। এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন কয়েকজন মহিলা। নির্বাচনের আগেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, শলাপরামর্শ করেছেন ওবামাও। তবে সরাসরি অনুমোদন (endorsement) করেননি। অনেকে বলছেন তার সম্ভাব্য কারণ হল, উনি অতীতেও মেয়র নির্বাচনে কারোর পক্ষ নেননি। বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকসান্দ্রা ওকাসিও কর্তেজরা তো প্রকাশ্যেই জোহরানের প্রচারসঙ্গী ছিলেন।
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও, মানুষের আশা এবং লড়াইকে হাতিয়ার করে আসা এই জয়কে ছোট করে দেখা যাবে না। আমার পরিচিত এক বাঙালি ভদ্রলোক ভারি সুন্দর বললেন ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ যা-ই হোক না কেন, এই যে ভারতীয় এবং আফ্রিকার বংশোদ্ভূত, বাদামি চামড়ার এক মুসলমান অভিবাসী সন্তান পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরের মেয়র হবে, আমরা যারা নানান বৈষম্যের মধ্যেও ছেলেপিলে মানুষ করার চেষ্টা করি এখানে, তাদের কাছে এটা একটা বিরাট আশার আলো। বিশেষ করে আজকের এই বিদ্বেষ মাখা রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে। নিউ ইয়র্কের মেয়র যদি হাত দিয়ে বিরিয়ানি খেতে পারে, আমাদের আর পায় কে!’ কৌতূহলীদের জানিয়ে রাখি – এই ভদ্রলোক মুসলমান নন।
পরিশেষে আর একটা কুইজের প্রশ্ন। ইউজিন ভিক্টর ডেবস এবং জওহরলাল নেহরুকে একই ভাষণে কে, কখন উদ্ধৃত করেন? সঙ্গে বোনাস পয়েন্টের জন্য প্রশ্ন – নেহরুকে উদ্ধৃত করে বক্তা নতুন করে কাদের চক্ষুশূল হন?
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








