মানতাশা আহমেদ

গত শুক্রবার (৭ নভেম্বর), সারা দেশের পথকুকুর ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলার শুনানিতে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, বাসস্ট্যান্ড ও ডিপো আর রেল স্টেশন থেকে কুকুরগুলোকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমালস অ্যাক্ট, ১৯৬০-এর সূত্র অনুযায়ী তৈরি অ্যানিমাল বার্থ কন্ট্রোল (ABC) রুলস, ২০২৩ অনুসারে দেশজুড়ে কুকুরদের বন্ধ্যা করে এবং ভ্যাক্সিন দিয়ে আশ্রয়স্থলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে অগাস্ট মাসে আদালত দিল্লিকে পথকুকুরহীন করার এক নির্দেশে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল, যে নির্দেশ নিয়ে সারা দেশে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

বেওয়ারিশ কুকুরদের নিয়ে বহুকাল ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। একদিকে আছে জননিরাপত্তা এবং জলাতঙ্ক নিয়ে সত্যিকারের চিন্তা, অন্যদিকে সহানুভূতি, বাস্তুতন্ত্র আর পশু অধিকারের প্রশ্ন। পৌর সংস্থাগুলো যত দ্রুত বেওয়ারিশ কুকুরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তত সমাজকর্মীরা গভীরতর কাঠামোগত সমস্যাগুলোকে অগ্রাহ্য করে তাড়াহুড়ো করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিরুদ্ধে সাবধান করছেন। তাঁরা এখন সারা দেশে কুকুরদের জন্যে যে আশ্রয়স্থলগুলো রয়েছে সেগুলোর সংখ্যা ও সহজলভ্যতার প্রশ্নও তুলছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ইন্দোরের পশু অধিকার কর্মী বন্দনা পথকুকুরদের কল্যাণের জন্যে কাজ করছেন আট বছরের বেশি সময় ধরে। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশনও দাখিল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সাম্প্রতিক আদেশ কুকুরের মানুষকে কামড়ে দেওয়ার সমস্যার শিকড়ে যায়নি। তিনি বললেন ‘যে কোনো পশুর মৌলিক প্রয়োজন হল ভালো করে খেতে পাওয়া এবং ভালো ব্যবহার পাওয়া। যদি রাস্তার কুকুরদের যত্ন নেওয়া হয়, ম্যাট বা ড্রামে আশ্রয় দেওয়া হয়, মারধোর না করা হয় বা পরিত্যাগ না করা হয়, মানুষকে কামড়ে দেওয়ার ঘটনা প্রায় শূন্য হয়ে যাবে।’

তাঁর মতে আসল সমাধান হল গোষ্ঠীগত দায়িত্ব। স্থানীয় বাসিন্দা, পৌর সংস্থা এবং রাষ্ট্রচালিত ক্যাম্পেনগুলোর একত্রে পথকুকুরদের খাবার, ভ্যাক্সিন এবং বন্ধ্যাকরণের ব্যবস্থা করা দরকার। বন্দনা বললেন যে ভারতে অসুস্থ, বয়স্ক বা প্রতিবন্ধী পশুদের জন্যে আশ্রয়স্থল আছে। কিন্তু সুস্থ পথকুকুররা বাস্তুতন্ত্রের অংশ, তাদের জোর করে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ইউরোপে ধেড়ে ইঁদুর থেকে হওয়া প্লেগের উদাহরণ দিয়ে তিনি বললেন, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করলে নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বললেন যে নিয়ম করে ভ্যাক্সিনেশন অভিযান, বন্ধ্যাকরণ কেন্দ্র এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত; পথকুকুরদের ঝাড়ে বংশে সরিয়ে দেওয়াকে নয়। ‘শেল্টারে পাঠিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। মানুষকে কুকুর কামড়ে দেয় কারণ মানুষ সচেতন নন। কর্তৃপক্ষও তাই। ডেঙ্গু বা কোভিডের মত জলাতঙ্ক আটকানোর দায়িত্বও তো তাঁদেরই। সরকার যদি একটা বড়সড় বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প চালু করে আর নাগরিকরা কুকুরদের প্রতি সদয় হন, তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

রাস্তা থেকে কুকুর সরিয়ে দেওয়ার প্রচারাভিযান এবং সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা

এই ধরনের সংবেদনশীল ব্যাপারে জনমত তৈরি করায় সংবাদমাধ্যম নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়। কোভিড-১৯ সচেতনতা অভিযান থেকে শুরু করে পোলিও এবং স্বচ্ছ ভারত প্রচারাভিযান – সবেতেই মিডিয়া ঐতিহাসিকভাবে মানুষের বিশ্বাস তৈরি করার ব্যাপারে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

অথচ কুকুরদের সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে যে সাংবাদিকতা চলছে তা প্রায়শই সচেতনতা তৈরি করার বদলে আতঙ্কে ধুয়ো দিচ্ছে। মানুষকে ভ্যাক্সিনেশন, বন্ধ্যাকরণ মানবিক ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতন করার বদলে সংবাদমাধ্যমের কভারেজ বারবার কুকুরের কামড়ের ঘটনাগুলোকে রগরগে করে তুলেছে। ফলে মানুষ বেওয়ারিশ কুকুর মানেই ভয়ের বস্তু বলে ভেবে নিচ্ছেন।

আরো পড়ুন পথকুকুরদের সম্পর্কে রায়ে চিন্তিত হওয়া উচিত সকলের

নারী নিরাপত্তা, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পোলিও এবং যক্ষ্মা নিয়ে সচেতনতার ব্যাপারে প্রচারাভিযান চালু করা হয়েছিল জরুরি ভিত্তিতে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধকেও অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং তাতে মিডিয়ার আতঙ্ক তৈরি করার বদলে সঙ্গী হিসাবে কাজ করা দরকার।

তথ্য যা বলছে

সমস্যার মাত্রা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৪ সালেই সারা ভারতে ৩৭,১৫,৭১৩ খানা কুকুরের কামড়ের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। বছরের মাঝামাঝি পর্যন্তই ৪,২৯,৬৬৪ ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। রাজ্যভিত্তিক তথ্য দেখলে এক রাজ্যে ২৫,২১০ খানা ঘটনা পাওয়া গেছে, অন্য এক রাজ্যে ৩,১৯৬। মানুষের ভয়ের কারণ হল জলাতঙ্ক, যার কোনো চিকিৎসা নেই এবং মৃত্যু অনিবার্য। ভারত সরকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে জলাতঙ্কের টিকা দেয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ জীবনদায়ী চিকিৎসা সম্পর্কে জানেন না এবং কামড় খাওয়া মাত্রই কী কী করতে হয় তাও তাঁদের জানা নেই। এক্ষেত্রেও মিডিয়া সচেতনতা তৈরি করলে তা জীবন আর মৃত্যুর তফাত হয়ে দাঁড়াতে পারে। সত্যিই কি রাস্তা থেকে সমস্ত কুকুর সরিয়ে দেওয়ার দরকার আছে?

যা হতে চলেছে

সুপ্রিম কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ থেকে যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তা হল, আদালত বেওয়ারিশ পশুর সংখ্যা কমাতে বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প চালাতে এবং রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলো যাতে পশুগণনার হিসাব অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে চালু আশ্রয়স্থল রাখে, তা নিশ্চিত করতে উদগ্রীব।

কিন্তু বৃহত্তর বিতর্কটা এখনো অমীমাংসিত। সেটা হল, ভারতের কি সুস্থ বেওয়ারিশ কুকুরদের জন্যে বিপুল পরিমাণ সংস্থান খরচ করে আশ্রয়স্থল তৈরি করা উচিত? নাকি নিয়ম করে টিকাকরণ, বন্ধ্যাকরণ এবং জনগোষ্ঠীভিত্তিক পরিচর্যার উপরে জোর দেওয়া উচিত? বন্দনার মত কর্মীদের কাছে উত্তরটা পরিষ্কার ‘কুকুররা আমাদের শহর বা মফস্বলের বাইরের জিনিস নয়। তারা আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অঙ্গ। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন, ভ্যাক্সিনেট করুন, তারা বিপদ হয়ে উঠবে না।’

আদালতের আদেশ অনুযায়ী বন্ধ্যাকরণ এবং টিকাকরণের পর বেওয়ারিশ কুকুরদের আশ্রয়স্থলে পাঠিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আদেশে বলা নেই যে রাজ্যগুলোর এই মুহূর্তে যথেষ্ট পরিমাণ চালু আশ্রয়স্থল আছে কিনা, বা ভারত জুড়ে বিভিন্ন ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক অবস্থার মধ্যে নতুন আশ্রয়স্থল বানানোর ক্ষমতা আছে কিনা।

এই আদেশের তাড়া দেখে অনেক প্রশ্ন জাগছে। কারণ আদেশটা দেওয়া হয়েছে এমন একটা সময়ে যখন বিহার নির্বাচন, ভোট চুরির জোরালো অভিযোগ এবং দিল্লির বায়ুদূষণ নিয়ে নাগরিকদের রাস্তায় নেমে আসার মত বড় বড় ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে বেওয়ারিশ কুকুরদের ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিলে হয়ত সাধারণ মানুষের মনোযোগ বৃহত্তর প্রশাসনিক সমস্যাগুলো থেকে সরে যেতে পারে।

নিবন্ধকার স্বাধীন সাংবাদিক। প্রধানত শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে লেখালিখি করেন। অতীতে ডেকান হেরাল্ড ও দ্য হিন্দু কাগজে কাজ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.