উর্বী মুখোপাধ্যায়
বিগত প্রায় পাঁচ দশক ধরে বাংলা সাহিত্য, বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলা কবিতার, ইংরিজি অনুবাদের কাজ করে গেছেন সদ্যপ্রয়াত কবি-অধ্যাপক উইলিয়ম রাদিচে। রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীতে প্রধান অনুদিত কবিদের মধ্যে অন্যতম এবং ইংরেজি ভাষায় রবীন্দ্রকাব্যের অনুবাদের অন্যতম প্রধান প্রণেতা রবি ঠাকুর স্বয়ং। স্বাভাবিকভাবেই তাই রাদিচের অনুবাদক হিসাবে স্বীকৃতি অর্জনের পথ মসৃণ ছিল না। আমি প্রত্যক্ষত সাহিত্যের ছাত্রী নই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজ সম্পর্কে আগ্রহও অনেকাংশেই পরিবার সূত্রে, সে অর্থে এই বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান আমার স্বল্পই। আমার বাবা শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায় ছিলেন রবীন্দ্র গবেষক এবং ১৯৮০-র দশকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তাই নানা ভাষাভাষী রবীন্দ্র গবেষক ও অনুবাদকদের কাছ থেকে দেখা ও তাঁদের কাজকর্মের ধরন সম্পর্কে স্মৃতি আমার সেই ছোটবেলা থেকেই। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জাপানী অনুবাদক ও গবেষক কাজুও আজুমা এবং রাদিচে। যদিও প্রায় দুই প্রজন্মের তফাত ছিল তাঁদের বয়স ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে। বাবার কাছে শুনেছিলাম, আজুমার রবীন্দ্রপ্রীতির বীজ ছিল সেই প্যান-এশীয় সাংস্কৃতিক চেতনায়। অন্যদিকে রাদিচে আগের প্রজন্মের পাশ্চাত্যের ওরিয়েন্টালিজমের আবেশ থেকে মুক্ত হয়ে নতুন করে আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে।
একটা ঘটনা মনে পড়ে। বাবার কাছে এক সুদীর্ঘ চিঠি এসেছে রাদিচের কাছ থেকে। ততদিনে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন, কাজ করছেন কিছু ছোটগল্প নিয়ে। কোনও এক গল্পে পেয়েছিলেন এক অত্যাচারী ঔপনিবেশিক সাহেব র্যাডিসের নাম। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন যে এই র্যাডিস সাহেব তাঁরই পূর্বপুরুষ। বলা যায় এঁর ভারত প্রবাসের কথা শুনেই তিনি আগ্রহী হয়েছিলেন ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে। কিন্তু ঔপনিবেশিকতার উগ্র স্বরূপ যে তাঁর আগ্রহ আর পারিবারিক সূত্রের মধ্যে দ্বৈরথ তৈরি করতে পারে তা নিয়ে তিনি সচেতন ছিলেন না। এক তরুণ গবেষকের সত্তা নাড়া খেয়ে যায়। এক ঔপনিবেশিক অতীতের যন্ত্রণা সেখানে ছত্রে ছত্রে। বাবা সেই চিঠির উত্তর লিখে আমায় পড়ে শোনালেন। সেখানে আইরিশ গোরার আত্মপরিচিতির অনুসন্ধানের উল্লেখ ছিল। সেই সূত্রে আনন্দময়ী, ভারতবর্ষ ও রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক মানবতাবাদের প্রসঙ্গ। সে চিঠির কী উত্তর এসেছিল জানি না। কিন্তু এর পর থেকে বাবাকে লেখা চিঠিতে রাদিচে আর ডক্টর মুখোপাধ্যায় সম্বোধন করতেন না, ইংরেজি চিঠিতে বাংলা হরফে লিখতেন ‘প্রিয় শুভেন্দুবাবু’।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তখনো উইলিয়ম রাদিচেকে স্বচক্ষে দেখিনি। প্রথম দেখি আটের দশকের শেষদিকে। একহারা লম্বা চেহারা, বাড়ির সদর দরজা দিয়েও ঢুকেছিলেন বেঁকেচুরে। সেবার বাবা রাদিচের অনুবাদ এবং রবীন্দ্রনাথ নিয়ে দূরদর্শনের হয়ে একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি তাঁর প্রথম গবেষণার বিষয় মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ছেড়ে রবি ঠাকুরের দিকে ঝুঁকলেন? রাদিচে তাঁর বিরাট হাতটা উলটো করে বলেছিলেন ‘বাংলা ভাষাচর্চায় সেটাই তো স্বাভাবিক পরিণতি… নয় কি?’ তবে রবীন্দ্রনাথের গল্প বা প্রবন্ধের চেয়েও তিনি বোধহয় কবিতা অনুবাদ করতে বেশি ভালোবাসতেন। মনে আছে, রবীন্দ্রনাথের ‘মরণমিলন’ কবিতার ‘অত চুপিচুপি কেন কথা কও/ওগো মরণ, হে মোর মরণ,’ পংক্তিগুলির ইংরিজি অনুবাদে তিনি ‘হে মোর মরণ’-কে ‘ও মাই ডেথ’ না লিখে ‘ডেথ! ডেথ!’ করায় প্রথমে খুব খটকা লেগেছিল। কিন্তু কবিতাটি আক্ষরিক অনুবাদ করার ক্ষেত্রে বোধহয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রাচ্যের মৃত্যুচেতনা, যা প্রায় অনাবিলভাবে মৃত্যুকে জড়িয়ে ধরতে পারে ‘মোর মরণ’ বলে। কিন্তু ইংরিজি অনুবাদে কবিতার রসভঙ্গ না করে তিনি ডেথ শব্দটিকে অদ্ভুতভাবে অনুরণিত করেন প্রায় গোটা কবিতা জুড়ে, প্রায় প্রিয়তমের নামোচ্চারণের মত করে। কবিতাটি পাঠের পর তাই মরণ আর মিলন একাকার হয়ে যায়। আসলে রাদিচে সাহেব নিজে ছিলেন কবি, শুধু অনুবাদক নয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইংরিজিতে অনুবাদের সময়ে তাই তিনি সেই কবির স্বাধীনতা বারবার ব্যবহার করে তাকে একটি স্থান দিতে চেয়েছিলেন। সে কারণে অনেক সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছিলেন। অনেকে বলেছেন যে তাঁর কবিতা রবীন্দ্রনাথের ভাষা থেকে সরে গেছে। আত্মপক্ষ সমর্থনে রাদিচের যুক্তি ছিল – তিনি যা করেছেন, কবিতার জন্য করেছেন।
আরো পড়ুন মেঘনাদবধ নিয়ে বেঁচে আছেন এক আজাদ ভারতীয়
বাবাকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রকরণ নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা করেন। তার মধ্যে তিনি লিখেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের কবিতার স্তবকের দৈর্ঘ্যের কোনো বাঁধাধরা আকার নেই। কোথাও তা দীর্ঘ, কোথাও সংক্ষিপ্ত। এই অসমান কিন্তু অবিন্যস্ত স্তবকগুলিকে তিনি একত্রে শাড়ির ভাঁজের মত অসমান কিন্তু লাবণ্যময় বলে বর্ণনা করেছিলেন। এই উপমাটিতে আমার খুব মজা লেগেছিল।
তবে গদ্য অনুবাদ করার সময়ে রাদিচে সাহেব অনেক বেশি সতর্ক থাকতেন প্রতিটি শব্দ, ভাষা ও তার ব্যঞ্জনা নিয়ে। মনে আছে, একবার কোনো গল্প অনুবাদ করার সময়ে তিনি নৌকার গুণ টানা ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলেন না। বাবা চিঠিতে তাঁকে ছবি এঁকে নৌকার গুণ টানা কাকে বলে বুঝিয়েছিলেন।
বাবা আর রাদিচের সাক্ষাতেও অনুবাদের খুঁটিনাটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হত। রাদিচে সাহেব স্যুট পরে থাকলেও সাহেবি কেতা ভেঙে কলকাতায় থাকাকালীন আমাদের বাড়ি আসতেন সম্পূর্ণ নোটিস ছাড়াই। ১৯৯৩ সালে রাদিচে যখন কলকাতায় আসেন, আমাদের আনোয়ার শাহ রোডের দোতলার ঘরটিতে তেমনভাবেই এসে এক আলোচনা চলছিল দীর্ঘক্ষণ ধরে। আমার তখন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পরবর্তী ছুটি। মা বাড়ি ছিলেন না। দুপুরে রান্না ছিল বাপ-বেটিতে খাওয়ার মত কাঁচকলার তরকারি আর ডাল ভাত। আমি অনেকক্ষণ দুপুরের খাওয়ারের জন্য অপেক্ষা করে পড়ন্ত বেলায় দুই গবেষককেই খেতে ডাকি। সাহেব রাজি হয়ে গেলেন তৎক্ষণাৎ। হাত দিয়ে চেটেপুটে খেলেন সেই খাবার। আমি তখন অতিথিকে এই খাবার দিয়ে অত্যন্ত কুণ্ঠিত। তখন তো জানতাম না যে বাবার সঙ্গে এই তাঁর শেষ সাক্ষাৎ। বাবা চলে গেলেন সে বছর ১২ নভেম্বর, অকস্মাৎ। মৃত্যুর পর ১৯৯৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় রাদিচে এক মর্মস্পর্শী প্রবন্ধ লেখেন বাবার সম্পর্কে, যার শিরোনাম ছিল ‘আ গাইড টু টেগোর’। রবীন্দ্রনাথকে বোঝায় দুদেশের দুই প্রজন্মের মানুষের প্রচেষ্টা ও অনুসন্ধানের ছবি সেখানে উঠে এসেছিল ছত্রে ছত্রে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বাবার পথে হাঁটিনি। পড়েছিলাম ইতিহাস। গবেষণা করি ভারতীয় চলচ্চিত্রে মধ্যযুগের নির্মাণ নিয়ে। সেই গবেষণার কাজ করতে আমি যাই রাদিচের কর্মক্ষেত্র লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে, যদিও আমাদের বিভাগ ছিল ভিন্ন। আমি ইতিহাসে আর উনি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগে। বাবার মৃত্যু এতটাই অতর্কিত ছিল যে অনেকসময় সে মৃত্যু আমাকে তাড়া করে বেড়াত। অনেকসময় পিতৃবন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারতাম না, সেই সূত্রে বাবার কথা উঠবে বলে। তবুও ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে গবেষণা করতে গিয়ে রাদিচের সঙ্গে দেখা করি। আমার গবেষণায় হিন্দি সিনেমা ও ইতিহাসচর্চার কথা শুনে বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে চেয়ে বলেছিলেন, ‘শুভেন্দুবাবু তোমার এ আগ্রহ জানতেন?’ আরও কুণ্ঠিত হয়েছিলাম। আমি যে বাবার পথে হাঁটিনি, সেকথা যেন তাঁর কাছে ফাঁস হয়ে গেছে।
কিন্তু রাদিচে আমার খোঁজ নিতেন। বিলেতে থাকাকালীন কোনো এক সেপ্টেম্বর মাসে মেঘ ডেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এসেছিল লন্ডনে। আমি ব্যাংকের সামনে আটকে যাই। সাহেবদের হাতের ছাতাও সে বৃষ্টি সামলাতে পারছিল না। হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল ‘কোন্ খেপা শ্রাবণ ছুটে এল আশ্বিনেরই আঙিনায়।’ তাকিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে আছেন রাদিচে সাহেব। আমাকে দেখে মিটিমিটি হাসছেন।
গবেষণা শেষ করে দেখা করেছিলাম। খুশি হয়ে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর নিজের কবিতার বই গিফটস। আমি খুব একটা কবিতার পাঠক নই, তবুও ভাল লেগেছিল। কিন্তু জানি না, কোন কুণ্ঠাবশত, সেকথা তাঁকে জানানো হয়নি। এমনকি তাঁর মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ার খবর পেয়েও কেন জানি না খবর নিতে সাহস করিনি।
এবছর ১২ নভেম্বর ছিল আমার বাবার একত্রিশতম মৃত্যুবার্ষিকী। সকালে ঘুম ভেঙে উঠেই খবর পেলাম ১১ নভেম্বর রাদিচেও প্রয়াত হয়েছেন। হেমন্তিকা দুজনকেই আঁচলের তলে নিয়ে নিলেন। সেই অনুবাদের ঝাপসা আলো… আরও কি অস্পষ্ট হল?
নিবন্ধকার ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাসোশিয়েট প্রফেসর। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








