তখনো গড়িয়া থেকে টালিগঞ্জ রুটে মেট্রোর কাজ আরম্ভ হয়নি। আমার মামাবাড়ির পিছন দিকটায় অনেকটা জমি ছিল। সেটা পেরোলেই আদিগঙ্গা। সন্ধে হলে নিকষ কালো অন্ধকার গঙ্গার পাড়ের জঙ্গলকে গ্রাস করে নিত। সেই অন্ধকার ভেদ করে শেয়ালের ডাক তীব্র হয়ে উঠত। মামাবাড়িতে তখন বিরাট বাগান ছিল। আশপাশের বাড়িতেও নানান গাছগাছালি ছিল।

আমার দাদাবাবার (অর্থাৎ দাদুর) বাগান করার খুব শখ ছিল। আসলে পূর্ববঙ্গ থেকে নিঃস্ব হয়ে আসা মানুষদের গাছগাছালির প্রতি একটা অমোঘ টান ছিল যে। সে টান এতটাই তীব্র যে দাদাবাবা রোজ কোর্ট থেকে ফিরে টর্চ নিয়ে বাগানে যেত গাছের পরিচর্যা করতে। আমার মায়েরা নয় ভাইবোন। সবাই এই টর্চ ধরে থাকার দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চাইত। মামাবাড়িতে তখন যেসব ফুলের গাছ ছিল, ওই কলোনি পাড়ায় সেসব গাছ বাগানে থাকা মানে বিলাসিতা বৈকি। পপি, ডায়ন্থাস, বাহারি ঝুমকো লতা – আরও কত কী। বুয়ার (সেজ মাসি) কাছে শুনেছি, একবার দাদাবাবা খুব আশা নিয়ে একটা কালো গোলাপের চারা পুঁতেছিল। রোজ কালো গোলাপ ফোটার অপেক্ষায় থাকত। অবশেষে একদিন সত্যি সত্যি সেই কালো গোলাপ ফুটল, ওঁর চোখেমুখে সে কী আনন্দ! ভোরবেলা বাড়ির সকলকে ঘুম থেকে তুলে বাগানে নিয়ে গিয়েছিল কালো গোলাপ দেখাতে। দাদাবাবা চলে যাওয়ার পর আমার ছোটমাসি আর বড়মামা এই বাগানকে আগলে রেখেছিল। এখনও মনে পড়ে শীত পড়লে ডালিয়া, বড় বড় গাঁদা আর গোলাপফুলে বাগান ভরে থাকত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গ্রীষ্মের আম্রপালি আম, বর্ষার হাসনুহানা, শরতের বাতাবি লেবু, হেমন্তের কচুপাতায় জমা শিশির, শীতের গোলাপ আর ডালিয়া এবং বসন্তে আম্রপালি আমের মুকুলকে সঙ্গে নিয়ে আমার মামাবাড়ির বাগানের বয়স বাড়তে থাকে। এখন সেসব শুধুই গল্প।

পুজো, লক্ষ্মীপুজো সব মিটে গেলে সেই বাগানে ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে।’ লক্ষ্মীপুজোর পর যে উৎসবের জন্য বাড়ির সবাই মুখিয়ে থাকে তা হল ভাইফোঁটা।

বছর কুড়ি আগের এক হেমন্তের ভোর। কুয়াশার পর্দা চিরে যখন সবে ভোরের আলো প্রকট হত, ঠিক সেইসময় আমার মা, মাসিরা বাগানে যেত শিশির তুলতে। বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী ভাইদের মঙ্গল কামনার জন্য শিশির, প্রদীপের শীর্ষের কালি, চন্দন আর দুব্বা ঘাস – এই চারটে জিনিসেরই প্রয়োজন। কচুপাতার উপর শিশির জমত। সেই পাতা কাত করে ওরা বাটিতে শিশির সংগ্রহ করত। হাতের তালুকে বাটির মত করে বাগানের ঘাসের উপর বুলিয়ে দিলেই অনেকটা শিশির পাওয়া যেত।

তারপর শুরু হত জলখাবারের তোড়জোড়। বাঙালির খাদ্য অভিধানে জলখাবার শব্দটা বড়ই মধুর। খাদ্যরসিক বাঙালির সকাল আর সান্ধ্যকালীন জলখাবারের পার্থক্যও খুব বৈচিত্র্যপূর্ণ। তখন উনুনে রান্না হত। প্রত্যেক দিন উনুন ধরানোই একটা কঠিন কাজ ছিল। রোজ অতগুলো মানুষের জন্য জলখাবার তৈরি করা আমার দিদিমার হয়ে উঠত না। তাই বেশিরভাগ দিন জলখাবারে চা, পাঁউরুটিই বরাদ্দ থাকত। সন্ধেবেলা কোর্ট থেকে ফেরার সময় আমার দাদাবাবা কচুরি আর সিঙাড়া নিয়ে আসত। আর কোনোদিন বেশি পয়সা না থাকলে হাতিঘোড়া বিস্কুট। আমিও খেয়েছি এই হাতিঘোড়া বিস্কুট। এখনকার বাচ্চারা এই বিস্কুটের কথা জানে না বোধহয়।

আমার মা, মাসি, মামারা যখন একটু বড় হল তখন বুম্মা, অর্থাৎ আমার দিদিমা, জলখাবারের সময়ে সবার হাতে পয়সা দিয়ে দিত। কেউ কচুরি খেত, কেউ জিলিপি খেত – এভাবেই দিন চলত। ভাইফোঁটার দিন মানি আর পাপু (বড় মাসি আর মেজো মাসি) রান্নার দায়িত্বে থাকত। সেদিন রান্নার থেকে আমার দিদিমার ছুটি। ওই দিন দাদাবাবা বুম্মাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের দিদির বাড়ি ফোঁটা নিতে যেত। বছরে দুদিন বুম্মা কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরত – মায়েদের পিসির বাড়িতে বিজয়া করতে যাওয়ার দিন আর ভাইফোঁটার দিন।

ভাইফোঁটার জলখাবারে থাকত লুচি, নতুন আলুর দম, সুজি, গোকুল পিঠে। কোনো কোনো বছর কড়াইশুঁটির কচুরিও হয়েছে। আমার বড়মাসি নতুন আলু দিয়ে শুকনো শুকনো করে একটা চমৎকার আলুর দম রাঁধত। কাঠখোলায় ধনে, জিরে, মৌরি, তেজপাজা আর শুকনো লঙ্কা ভেজে নিয়ে গুঁড়ো করে রাখত। সিদ্ধ করা নতুন আলু তেলে সাঁতলে নিয়ে ওই মশলা মিশিয়ে নামানোর আগে আমচুরের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হত। মানির বিয়ের পর ভাইফোঁটার জলখাবারের এলাহি আয়োজন হত। আমার বড়মেসো আর মানি ভবানীপুরের তেওয়ারি থেকে নানারকম মিষ্টি, সিঙাড়া, নোনতা খাবার নিয়ে আসত।

বুয়ার (আমার সেজো মাসি) বিয়ে হওয়ার পর থেকে আজ অবধি ভাইফোঁটার জল খাবারের দায়িত্ব বুয়াই পালন করে চলেছে। প্রত্যেক বছর ভীষণ যত্ন নিয়ে প্রায় ১৫ রকমের মিষ্টি আর ১৫ রকমের নোনতা খাবার বুয়া বানিয়ে নিয়ে আসে। মিষ্টির মধ্যে ক্ষীর নারকেলের সন্দেশ, বাটি সন্দেশ, খইয়ের হালুয়া, মুগের লাড্ডু এইসব থাকে। আর নোনতার মধ্যে দইবড়া, ইডলি, আলু নারকেল দেওয়া ঘুগনি, প্যাটিস, মাংসের কাবাব – আরও কত কী যে থাকে বুয়ার ঝুলিতে।

আমাদের বাড়িতে যখন যৌথ পরিবার ছিল তখন খুব বড় করে ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান হত। আমার ঠাকুরদারা তিন ভাই। তাদের সব ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন একসঙ্গে খুব হইহুল্লোড় করত। জলখাবারের দায়িত্বে থাকত আম আর বুকুলি (আমার ঠাকুমা আর আমার বাবার কাকিমা)। বুকুলি ছোট্ট ছোট্ট করে লুচি বানাত। যাকে বলে জামাই লুচি। ফরিদপুরে নতুন জামাই বাড়িতে এলে কিম্বা বাসি বিয়ের দিন ওরকম জামাই লুচি দেওয়া হত। জামাই লুচির বিশেষত্ব হল একবারেই গোটাটা মুখে পুরে ফেলা যায়। জামাই লুচির সঙ্গে থাকত আলু গোলমরিচ আর মোহনভোগ। বুকুলির আলু গোলমরিচ খাবার জন্য প্রতি রবিবার আমরা মুখিয়ে থাকতাম। গোলমরিচের ঝাল, গাওয়া ঘিয়ের গন্ধ আর ঈষৎ মিষ্টি। বাদামি মোহনভোগ থেকে ঘি চুঁইয়ে পড়ত। ভর্তার মত মণ্ড পাকিয়ে বুকুলি থালার একপাশে মোহনভোগ পরিবেশন করত।

বাঙালিদের একটা খুব বড় গুণ হল, আমরা সবকিছুই বড্ড তাড়াতাড়ি আপন করে নিতে পারি। আমাদের জলখাবারের তালিকায় অজান্তেই চীনে খাবার চাউমিনের অনুপ্রবেশ ঘটল। আমরা তাকে আমাদের মত করে শীতের হরেকরকম সবজি, আলু, চীনেবাদাম দিয়ে আপন করে নিলাম। শীতকালীন সবজি দেওয়া চাউমিন স্কুলের টিফিন বাক্সে স্থায়ী জায়গা করে নিল। সঙ্গে কখনো কখনো ডিম দেওয়া হত।

আরো পড়ুন মগজের কারফিউ ভেঙে ঢিল ছুড়ল জুইগাটো

গরমকালের জল খাবারের মধ্যে ফলাহার, সাবু মাখা উল্লেখযোগ্য। ভেজানো চিঁড়ে, ঘরে পাতা দই, মরশুমের ফল দিয়ে অসম্ভব উপাদেয় একটা জলখাবার। আমার মা একটা ঝাল সাবু মাখা বানায়, যা গরমের দিনে খুব তৃপ্তিকর। ভেজানো সাবু, জল, চিনি, নারকল কোরা, কাঁচালঙ্কা, গন্ধরাজ লেবু পাতা আর লেবুর রস দিয়ে তৈরি।

পশ্চিমের খাবার আমাদের জলখাবারকে প্রভাবিত করেছে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে। প্যান কেক থেকে গোলা রুটি, বেঁচে যাওয়া রুটি দিয়ে চট জলদি পিৎজা তৈরি করে ফেলা – এসব এখন আমাদের অভ্যাস।

সন্ধেবেলা মুষলধারে বৃষ্টি, তার মধ্যেই নাটকের রিহার্সালের ফাঁকে সকলে গোল হয়ে বসে মুড়ি মাখা খাওয়া বড় প্রিয় এক জলখাবারের দৃশ্য। শীতের সকালে মেথির শাক, লাল মুলো, পালং শাক, ফুলকপি দিয়ে পরোটাও বাঙালির খাবার টেবিলে স্বমহিমায় ঠাঁই পেয়েছে।

বহু যুগ ধরে নতুন, পুরনোর প্রভাব নিয়ে বাঙালির জলখাবারের থালা সমৃদ্ধ হয়েছে। পৌষ মাস পড়ে গেল। এখন সকাল সন্ধে জলখাবারে থাকবে মরশুমি সবজি, নতুন গুড়ের আনাগোনা। নদীয়া থেকে শিউলিরা আসবে খেজুর গাছে হাঁড়ি ঝোলাতে। পৌষের সোনা রোদের সেই উত্তাপ সবার খাবার থালায় উপচে পড়ুক।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.