হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবার ঝাড়খণ্ডে। এখানে ৮১টি বিধানসভা আসনের ২৮টি তফসিলি উপজাতির জন্য সংরক্ষিত। অর্থাৎ ওই আসনগুলোতে সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে তফসিলি উপজাতির হতেই হবে। তার মানে প্রায় ৩৫% আসন এখানে তাঁদের জন্য সংরক্ষিত। ভারতের শেষ আদমশুমারি অনুসারে, সেই ২০১১ সালে, ঝাড়খণ্ডে আদিবাসীদের জনসংখ্যা ছিল ৮৬ লক্ষ, যা রাজ্যের তখনকার জনসংখ্যার ২৬.২%, ভারতের তৎকালীন তফসিলি উপজাতি জনসংখ্যার প্রায় ৮.৩%। কিন্তু রাজ্য হিসাবে ধরলে ঝাড়খণ্ডেই তফসিলি উপজাতির ভোটার সর্বাধিক – মোট ভোটারের ২৮%।
এই আসনগুলিতে দিল্লির মসনদে বসা, সংসদে বৃহত্তম দল, ভারতীয় জনতা পার্টি প্রায়শই পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। দেখা যাক ২০১৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল। সেবার বিজেপি তফসিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত ২৮টি আসনের মধ্যে মাত্র দুটো জিতেছিল আর রাজ্যে জিতেছিল ২৫ খানা আসন, যা ২০১৪ সালে ছিল ৩৭। ওদিকে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা ওই সংরক্ষিত আসনের ১৯ খানাই জিতেছিল, আর জোটের সদস্য কংগ্রেস জিতেছিল ছখানা। জেএমএম রাজ্যের ৩০ আসনে জয়লাভ করে এবং কংগ্রেস (১৬), আরজেডি (১) ইত্যাদির সঙ্গে মিলে জোট সরকার গঠন করে। ২০১৪ সালের পর ফের মুখ্যমন্ত্রী হন হেমন্ত সোরেন। যদিও ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর মাত্র এক বছর পাঁচ মাসের কাছাকাছি ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন। বড় অশান্ত ঝাড়খণ্ডের রাজনীতি। মাঝপথে অনেককেই গদি ছাড়তে হয়েছে ২০০০ সালে বিহার ভেঙে এই রাজ্য গঠন হওয়ার পর থেকে। বিজেপির রঘুবর দাস ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো মুখ্যমন্ত্রী টানা পাঁচবছর ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। মোট তিনবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে ঝাড়খণ্ডে। আবার এই রাজ্যেই নির্দল প্রার্থী হিসাবে জয়ী মধু কোড়া মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যান ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে – আর সেই পদে থাকেন প্রায় এক বছর। একাধিক দলের সদস্য তাঁকে ‘সেফ ক্যান্ডিডেট’ হিসাবে সমর্থন দিয়েছিলেন। আবার হেমন্ত ২০১৯ সালের শেষে মুখ্যমন্ত্রী হলেও চারবছর পর জমি সংক্রান্ত এক মোকদ্দমায় ইডির হাতে গ্রেফতার হয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদ ছাড়তে বাধ্য হন প্রায় পাঁচমাসের জন্য।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এদিকে বিজেপি এবছর – হেমন্ত গ্রেফতার হওয়ার প্রায় চারমাস পরে – সাধারণ নির্বাচনে লোকসভায় তফসিলি উপজাতির জন্য সংরক্ষিত পাঁচটা লোকসভা আসনেই হেরে যায়। আদিবাসী ভোটের তাৎপর্য উপলব্ধি করে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সোরেনের মতই সাঁওতাল বাবুলাল মারান্ডিকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি করা হয়েছিল। তাতেও লাভ হয়নি। ওদিকে দেশের রাষ্ট্রপতিও তফসিলি উপজাতির মহিলা। তবুও আদিবাসীগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে ভাল ফল করতে পারেনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল। শোনা যায়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ দ্বারা পরিচালিত বনবাসী কল্যাণ আশ্রম নাকি ঝাড়খণ্ডের ওই অংশগুলোতে তেমনভাবে কাজ করতে পারেনি। তার কিছুটা নাকি বিজেপির কিছু নেতার সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ার ফল। কিন্তু এবার বিধানসভা নির্বাচনে ওই সংগঠন সক্রিয় হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সত্যি সত্যি সেই বৃক্ষরোপণ হয়েছে কিনা তার পরিচয় পাওয়া যাবে আগামী শনিবার ভোটের ফলে।
আরো পড়ুন আদিবাসী মহিলা রাষ্ট্রপতি হলেই নিম্নবর্গের মানুষের হাল ফিরবে না
এবার আসা যাক বাবুলালের কথায়। ২০০০ সালে ঝাড়খণ্ড বিহার ভেঙে ঝাড়খণ্ড গঠন করা হয়, তখন এই নতুন রাজ্যের সীমায় আসা তৎকালীন বিহার বিধানসভার বিধায়কদের নিয়েই তৈরি হয় নতুন বিধানসভা। এনডিএ জোটের নেতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির বাবুলাল। ঝাড়খণ্ডের বহু মানুষ, এমনকি বিপক্ষের কিছু সদস্যও ব্যক্তিগত মহলে বলে থাকেন যে সেইসময় যতটুকু পেরেছেন, রাজ্যের উন্নতির চেষ্টা করেছেন বাবুলাল। কিন্তু খিচুড়ি সরকারের জোটসঙ্গীদের ধরে রাখতে না পেরে তাঁকে সরে যেতে হয়। গদিতে বসেন বিজেপির অর্জুন মুন্ডা। ২০০৫ সালে ঝাড়খণ্ডের প্রথম নির্বাচনে বিজেপি শরিকদের সঙ্গে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হন অর্জুন মুন্ডা। পরেরবছরই দল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বাবুলাল, দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তাঁকে উপযুক্ত স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। তারপর গঠন করেন ঝাড়খণ্ড বিকাশ মোর্চা (প্রজাতান্ত্রিক)। এরপরের নির্বাচনে, অর্থাৎ ২০০৯ সালে, ২৫ আসনে প্রার্থী দিয়ে তাঁর দল জেতে ১১ খানা আসন। কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিজেপি-জেডিইউ জোট এবং জেএমএমের মধ্যে এক সমঝোতার ফর্মুলা তৈরি করা হয়। নির্দল এবং অন্যান্য ছোট দলের সহায়তায় সরকার গঠিত হয়। সেবার জোট সরকারের নেতা হন জেএমএম প্রধান শিবু সোরেন – মাত্র ১০ দিনের জন্য। তবে অর্জুন মুন্ডা, মধু কোড়ার পর আবার ২০০৮ সালের অগাস্ট মাসে শিবু গদিতে বসেন। এবার পাঁচমাসের কম সময় পান। তারপরই সেই ৩৪৫ দিনের রাষ্ট্রপতি শাসন। মজার কথা, শিবু দুবারই মুখ্যমন্ত্রী হন বিধানসভার সদস্য না হয়েই। দুবারই ছমাসের মধ্যে নির্বাচনে দাঁড়াবার আগেই ক্ষমতাচ্যুত হন। আসলে ঝাড়খণ্ডের রাজনীতি এত উত্তাল যে সেখানে ক্ষমতায় আসার চেয়ে বেশি কঠিন মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা।
ফিরে আসা যাক বাবুলালের কথায়। পরের নির্বাচনে, অর্থাৎ ২০১৪ সালে, সর্বসাকুল্যে আটটা আসন পায় তাঁর দল। ২০১৯ সালে কমতে কমতে তিন। বেগতিক দেখে বিজেপির হাত ধরার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। বিজেপিকে সরকার গড়তে সাহায্য করেন। কিন্তু অতীতে দল ছাড়ার পরে বলা একটা কথা তাঁকে ধাওয়া করে ফেরে। তিনি বলেছিলেন যে দলে ফেরার চেয়ে কুতুব মিনার থেকে ঝাঁপ দেওয়াই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করবেন। এহেন নেতা ফিরে এলেও বিজেপির কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্ব তাঁকে প্রায় একঘরে করে রাখেন। তারপর সাঁওতাল ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তাঁকে আবার পদমর্যাদা দেওয়া হয়। রাজ্য বিজেপির সভাপতি হওয়ার পর কিছুটা মান ফিরে পান। এমনকি ঝাড়খণ্ডের কিছু উঠতি কংগ্রেসি নেতাদেরও দেখা যেত তাঁর আশপাশে ঘুরঘুর করতে। যদিও বয়স ৬৫ – যা রাজনীতিতে কোনো কারণেই বৃদ্ধাবস্থা বলা যায় না – তবু হাসিমুখ, কিছুটা লাজুক বাবুলাল যেন আর কিছুতেই উঠে দাড়াঁতে পারছেন না। তাঁকে ঘিরে ভিড় কমতে শুরু করেছে। বিজেপি আবার নতুন মুখ খুঁজে ফিরছে। কিন্তু এখনো বাবুলালের কাছে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। সেদিনকার ফলাফলের উপর নির্ভর করবে তাঁর ভাগ্য।
তাই এবার বিজেপি হাতিয়ার করেছে ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশকারীদের। জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে বলা হচ্ছে, হেমন্তের নেতৃত্বাধীন সরকার নাকি অনুপ্রবেশকারীদের দলে দলে ঝাড়খণ্ডে নিয়ে আসছে এবং আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তাই নাকি রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সরকার পরিবর্তন প্রয়োজন। এই তাস ফেলে যদি বিজেপি সাফল্য পায়, তবে আশা করা যায় আগামী দিনে পার্শ্ববর্তী বিহার আর পশ্চিমবাংলার ভোটেও একই তাস ব্যবহার করা হবে।
অন্যদিকে আবার অভিযোগ উঠছে, দরকার পড়লে জেএমএম বিজেপির দিকেও ঘেঁষতে পারে। এই তত্ত্বের সমর্থনে বলা হচ্ছে, হেমন্ত তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখলের যে মামলা চলছে তা মিটিয়ে ফেলতে বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’-এ ঢুকে পড়তে পারেন। তবে ক্ষমতাসীন জোটের অভিযোগ – এই গুজব রটানো হচ্ছে তাদের মনোবল ভাঙার জন্য। বিজেপিও এমন সম্ভাবনার কথা মানতে নারাজ। এসব কিছু দুষ্টু লোকের কল্পনাপ্রসূত প্রচার বলেই তারা মনে করছে। ইন্ডিয়া জোট এবার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার আগে জল্পনা ছড়িয়েছিল যে কংগ্রেস আর জেএমএম – দুপক্ষই নাকি একলা চলো রে নীতি নেবে। তবে শেষপর্যন্ত তা ঘটেনি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।





