নওফেল মহম্মদ সফিউল্লা
মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র গির্জার মোড় থেকে ব্যারাক স্কোয়্যারের দিকে এগিয়ে গেলে ঋত্বিক সদনের উল্টোদিকে একরাশ অভিমান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ত্রিদিব চৌধুরী। এই পথ ধরে মোহন মোড়ের দিকে এগোলে বিশাল হনুমান মন্দিরের আড়ালে ঢাকা পড়েছেন ডক্টর রেজাউল করিম। অথচ সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া এই জেলা অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দল, মাস্টারদা সূর্যসেনের কৃষ্ণনাথ কলেজ, বিপ্লবী নলিনীকান্ত বাগচীদের পরম্পরাকে পাথেয় করেই ত্রিদিব, রেজাউল, সৈয়দ বদরুদ্দোজা, তিমিরবরণ ভাদুড়ি সহ অনেকের হাত ধরে এগোতে শুরু করেছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, সম্প্রীতির অনন্য নজির সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। আজকের ফেসবুক, ইউটিইব, এক্স হ্যান্ডেলের যুগে প্রায় চাপা পড়ে গেছে জেলার সেই সোনালী দিনগুলি। আমরা যদি ৫-৬ দশক আগের মুর্শিদাবাদের দিকে ফিরে দেখি, খুঁজে পাব সেইসব দিন। দুটি ঘটনার কথা স্মরণ করলে কিছুটা বুঝতে পারব সেদিন কেমন ছিল ভাগীরথীর দুই পাড়।
১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচন। বহরমপুর কেন্দ্রে জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী অধ্যাপক শিক্ষাবিদ ডঃ রেজাউল করিম, আরএসপির প্রার্থী বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রিদিব। একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ্যেই জ্ঞাপন করতেন, একান্তে মত বিনিময় করতেন। কিন্তু করিম সাহেব নির্বাচনী প্রচারে বেরোচ্ছেন না। দলের অনেক অনুরোধে বহরমপুর শহরের কাত্যায়নী ওষুধের দোকানের সামনে প্রকাশ্য সভা থেকে করিম সাহেব নিজের দলকে বিব্রত করে বলে ফেললেন ‘ঢাকু (ত্রিদিবের ডাকনাম) বড় ভাল ছেলে, স্বাধীনতা সংগ্রামী। আমার অত্যন্ত প্রিয়। তোমাদের তাকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠানো উচিত।’ আজকের দিনে শুধু মুর্শিদাবাদ কেন, গোটা বিশ্বে এরকম ঘটনা কল্পনা করা যায় কি?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আরেকটি ঘটনা বলি। করিম সাহেব তখন বহরমপুর মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সরস্বতীপুজোর আগের রাতে হঠাৎ খবর এল – পুরোহিতের মাতৃবিয়োগ হওয়ার কারণে তিনি পুজো করতে পারবেন না। পুরোহিত কোথায় পাওয়া যাবে এই দুশ্চিন্তায় যখন ছাত্রীরা দিশেহারা, তখন কলেজের অধ্যক্ষা ছাত্রীদের প্রস্তাব দিলেন ‘করিম সাহেবকে পুজোটা করতে বললে কেমন হয়? তাঁর থেকে বড় ব্রাহ্মণ তো দেখিনি।’ ছাত্রীরা সানন্দে প্রস্তাব মেনে নিলেন। করিম সাহেব নিষ্ঠাপূর্বক পুজো সম্পন্ন করলেন। একবার আমরা চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখি, আজ যদি করিম সাহেব বেঁচে থাকতেন আর কোনো পুরোহিতের পরিবর্তে করিম সাহেব পুজোর মন্ত্র পাঠ করতেন, তাহলে মুর্শিদাবাদে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হত।
এই ছিল সেদিনের মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি। এতগুলো কথা বলার কারণ, কয়েকদিন আগে তিমিরবরণের হাতে গড়া সংস্কৃতির বেলডাঙায় ঐতিহ্যবাহী কার্তিকপুজোকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী। এই ঘটনা আরও একবার আজকের মুর্শিদাবাদ নিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবাদমাধ্যম, সোশাল মিডিয়া সহ নানা মাধ্যম থেকে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা হল, বেলডাঙার কার্তিকপুজোয় এক মণ্ডপের বাইরে আলোকসজ্জায় মুসলমান এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সমস্ত নাগরিকের ভাবাবেগে আঘাত করার মত কিছু শব্দ প্রচারিত হয়েছে। তার প্রতিবাদ করতে আসা কিছু মানুষের উপর প্রশাসনের একাংশ আক্রমণ করে বলে এলাকার মানুষের অভিযোগ। প্রাথমিকভাবে প্রশাসনের একাংশের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই এই আলোকসজ্জা বন্ধ করার উদ্যোগ দ্রুত গ্রহণ করা যায়নি। ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয় এলাকা জুড়ে। এই সোশাল মিডিয়ার যুগে এ ঘটনার খবর স্বভাবতই জেলা ও রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যথারীতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় বিভিন্ন অশুভ শক্তির সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক প্রচার। এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, ততক্ষণে প্রশাসনের একাংশ এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের উদ্যোগে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। আমরা অনেকেই এতে আপাতত স্বস্তি পেয়েছি। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে বারবার বেলডাঙা সহ গোটা মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রান্তে এরকম বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনার খবর শিরোনামে আসছে, যা রাজ্য রাজনীতি তথা জাতীয় রাজনীতিতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশেষ জায়গা করে নিচ্ছে। এটি একদিকে যেমন ভীষণ আশঙ্কার, অন্যদিকে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব – এই ধরনের ঘটনা কাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করতে বারবার সংগঠিত করা হচ্ছে তা জনগণকে দেখিয়ে দেওয়া।
আরো পড়ুন সংঘের আসাম মডেল পশ্চিমবঙ্গে আনলেন শুভাপ্রসন্ন
এ প্রসঙ্গে ফিরে দেখতে হবে এবছরের প্রথমার্ধে সম্পন্ন হওয়া লোকসভা নির্বাচনের সময়ে। রামনবমীকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের একাংশের চূড়ান্ত ব্যর্থতায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। এরকম ঘটলে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের যে দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা দরকার, তা না করে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজ্যের শাসক দলের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর (অতীতে বিজেপির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন) প্রকাশ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক জনবিন্যাস উল্লেখ করে হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালাতে উস্কানি দিয়েছিলেন। অথচ প্রশাসন থেকে শুরু করে তাঁর দল – কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং মানবতাবাদের মুখোশ খুলে ফেলে তথাকথিত ধর্মগুরু কার্তিক মহারাজ হুমায়ুনদের হাত থেকে সনাতন ধর্ম রক্ষা করার জন্য নানা শব্দবাণ প্রয়োগ করেন। সেই মন্তব্য একশ্রেণির মিডিয়ায় নিয়ম করে প্রচার করা হল ঘৃণা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে। সম্প্রতি সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে হুমায়ুন আর কার্তিক মহারাজের এক অনুষ্ঠানবাড়িতে খোশমেজাজে একত্রে তোলা ছবি কিন্তু দেখা গেছে। অথচ এঁরা ওখান থেকে বেরিয়েই যে নিজেদের ঘৃণ্য রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ফের ঘৃণার চাষ করতে দ্বিধা করবেন না, তাতে সন্দেহ নেই।
এই সময়কালেই দেখা গেছে যে বিহারের একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সুরে মুর্শিদাবাদ বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ মুর্শিদাবাদ, মালদা জেলা সমেত বিহার ও ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশ নিয়ে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরির দাবি তুলে মিছিল করেছেন। তিনি মনে করেন মুর্শিদাবাদ জেলা দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। কিছুদিন আগে আমরা এও লক্ষ্য করেছি যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সামনেই স্বনামধন্য অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী (একদা সিপিএম ঘনিষ্ঠ, পরে তৃণমূলের হাত ধরে রাজ্যসভার সাংসদ হয়ে বর্তমানে বিজেপি নেতা) প্রকাশ্যে বিভেদের রাজনীতিতে নিজের নম্বর বাড়াতে হুমায়ুন কবীরের ৭০-৩০ মন্তব্যের পালটা হুঙ্কার ছুড়েছেন। প্রশাসন নির্বিকার, কেবল কলকাতার সল্টলেকের এক বাসিন্দা মিঠুনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানিয়েছেন। এসব দেখে মনে হয়, বিদ্বেষের রাজনীতির কাছে প্রশাসন বারবার আত্মসমর্পণ করছে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের দিন কাটছে উৎকণ্ঠায়।
অথচ এই সময়ে মুর্শিদাবাদের তৃণমূল ও বিজেপির প্রভাবশালী নেতাদের দায়িত্ব ছিল জেলার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত মানোন্নয়নের প্রশ্নে একসাথে কাজ করা, জেলায় কীভাবে নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে তার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে এগোবার পরিকল্পনা করা, যাতে জেলার কয়েক লক্ষ যুবককে পরিযায়ী শ্রমিকের খাতায় নাম লিখিয়ে সুদূর দক্ষিণ ভারত অথবা মধ্যপ্রাচ্যে পরিবার পরিজন ছেড়ে থাকতে না হয়। জেলার বিড়ি শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা, তিমিরবরণের অসমাপ্ত কাজ – বেলডাঙার বন্ধ চিনিকলের চিমনি সচল করতে কী সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা ঠিক করা। নদিয়ার সীমানা সংলগ্ন জাতীয় সড়কের ধারে রেজিনগরে ১৮৭ একর জমিতে যে শিল্পতালুক গড়ার পরিকল্পনা ছিল বামফ্রন্ট সরকারের, বর্তমান সরকার কেন সে ব্যাপারে এখনো কিছু করে উঠতে পারছে না? সর্বোপরি নবাবী ঐতিহ্যের মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আর তার স্থাপত্যগুলোকে কেন্দ্র করে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগও গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হল, রাজ্য ও কেন্দ্রের দুই শাসক দলের নেতারা এসব কাজ না করে প্রতিদিন রাজনীতিতে ধর্ম টেনে এনে এই জেলাকে বিদ্বেষ ও ধর্মীয় মেরুকরণের পরীক্ষাগার বানাতে ব্যস্ত।
স্বাধীনতার পরে মুর্শিদাবাদে জনকল্যাণের যে রাজনীতির পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই রাজনীতিকে গত কয়েক দশকে চাপা দিতে দিতে আজকের রাজনীতির কারবারিরা আদিত্যনাথের ‘বটেঙ্গে তো কটেঙ্গে’ স্লোগানের মত উস্কানিমূলক রাজনীতির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষ ছড়িয়ে ক্ষমতায় থাকার কৌশল গ্রহণ করেছে। তাই প্রতিদিন সুবিধাবাদী, বিভেদকামীদের ভিড় বাড়ছে মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে। গুণী মানুষেরা অনেকেই হয়ত একবুক অভিমান নিয়ে নিজেদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এই রাজনীতি আর তার স্বার্থে রচিত অর্থনীতিই সকালে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের সবকিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই আমাদের প্রিয় মুর্শিদাবাদে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য দূর করে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করা জরুরি। প্রয়োজন ভাগীরথীর দুই পাড়ে আমাদের চেতনায়, চর্চায় ত্রিদিব, রেজাউলদের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা।
নিবন্ধকার প্রগতিশীল ছাত্র ইউনিয়নের সর্বভারতীয় নেতা
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








