পশ্চিমবঙ্গের কোনো শাসকেরই শিল্পায়ন নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুম হয় না। প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বামফ্রন্ট, অধুনা তৃণমূল – শিল্পায়ন নিয়ে বাগাড়ম্বর, কাজিয়া, অনন্ত তর্ক বিতর্ক আর অনন্ত কুকাজ। রাজ্যবাসী এসবেরই সাক্ষী। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, পাটশিল্প, সব জমানাতেই অবহেলিত হয়ে রইল। এ সত্যিই এক আশ্চর্য বিষয়। আগে তাও এই নিয়ে কিছু চর্চা, কিছু লেখালিখি, কিছু লড়াই, সেমিনার – এসব হত। কিন্তু আজকাল তাও বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ খুব সুপরিকল্পিতভাবে এই শিল্পকে হত্যা করতে করতে যাওয়ার এতগুলো বছর পরে এখনো আমাদের রাজ্যের প্রায় ২,৫০,০০০ শ্রমিক চটশিল্পে কাজ করেন। প্রায় ৪০-৪৫ লক্ষ কৃষক পাট উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত আছেন। স্বাধীনতার পর থেকেই যেভাবে সমস্ত কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার এই শিল্পকে সমূলে বিনাশ করার চক্রান্ত করে এসেছে, তা না করে যদি এই শিল্পের উন্নতিসাধন করা হত, তাহলে আজ এই শিল্পে এর দশ গুণ শ্রমিক কাজ পেতেন। আরও লক্ষ লক্ষ কৃষক পাট উৎপাদন করে দু পয়সা লাভের মুখ দেখতে পেতেন। পাট সংক্রান্ত গবেষণা এবং বিপণনে বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থান হতে পারত। পট্টবস্ত্রের ফ্যাশন শিল্পের বিকাশে একটা বড় পদক্ষেপ নেওয়া যেত। সর্বোপরি এ হত উন্নয়ন বা বিকাশের এমন এক মডেল, একদিকে যা প্রবলভাবে দেশজ, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব। কিন্তু আজ পর্যন্ত বাম, ডান কেউই এই শিল্পে মনোযোগ দিল না। শিল্পায়ন নিয়ে শুধুই বাগাড়ম্বর, নাকি কান্না আর অভিনয় চলে। কারোরই কোনো সত্যিকারের উদ্যোগ চোখে পড়ল না।

ভারতে চটশিল্পের পত্তন করে ইংরেজরা। আগে স্কটল্যান্ডের ডান্ডিতে চটকল ছিল। ভারত থেকে কাঁচা পাট নিয়ে গিয়ে সেখানে উৎপাদন হত। ভারতে পাটের ব্যবহার বহু প্রাচীনকাল থেকে রয়েছে। কুটিরশিল্পের মাধ্যমে পাট থেকে দড়ি, বস্তা, মোটা কাপড় প্রভৃতি তৈরি হত। দরিদ্র মানুষ পাটের পোশাকও পরতেন। ইউরোপের বাজারে পাটের জনপ্রিয়তা তৈরি হয় ১৮৫৩ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর। কারণ রাশিয়া থেকে আসা যে প্রাকৃতিক তন্তু তখন চালু ছিল তা আর তত সুলভ ছিল না। ফলে ডান্ডিতে ১৮৩০ সালে তৈরি হওয়া চটকল থেকে তৈরি পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা গগনচুম্বী হয়ে ওঠে। চাহিদা বৃদ্ধির ধাক্কায় ইংরেজরা তখন ভারতে একের পর এক চটকল তৈরি করতে শুরু করে। ভারতে পাট প্রধানত পূর্বদিকেই উৎপন্ন হয়। তার মধ্যে অবশ্যই অগ্রগণ্য ছিল অবিভক্ত বাংলা। ফলে কলকাতার নিকটবর্তী হুগলী নদীর দুই পাড়ে ইংরেজরা একের পর এক চটকল তৈরি করতে থাকে। চটশিল্প এতদঞ্চলে এক প্রধান শিল্প হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে চটকলগুলোর মালিকানার বদল হতে থাকল। ব্রিটিশ মালিকরা আর যাই হোক, ছিল শিল্পপতি। নয়া মালিকরা ছিল মূলত ভারতীয় বণিক সম্প্রদায়, যারা সবে শিল্পপতি হয়ে উঠছিল। উনবিংশ শতক থেকেই কিছু মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী পাটের ব্যবসাদার হিসাবে উঠে আসে। বিড়লারা তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ১৯২০ সাল নাগাদ বিড়লারা ভারত থেকে কাঁচা পাট রফতানিকার তালিকায় তিন নম্বরে ছিল। অধিকাংশ চটকলেই বিড়লারা ছিল জোগানদার। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মজুতদারি, আড়তদারি, কালোবাজারি আর ফাটকায় টাকা লাগিয়ে এরা যথেষ্ট টাকাপয়সা করেছিল। ১৯২৬-১৯২৯ সালের মধ্যে এদের মধ্যে কেউ কেউ উৎপাদনে মনোযোগ দিতে শুরু করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল জানকীনাথ মফতলাল, সুরজমল নগরমল প্রমুখ। স্বাধীনতার পর এরাই ব্রিটিশদের কাছ থেকে মিলগুলি নিজেদের হাতে নিতে থাকে। বিড়লাদের মত আরও কয়েকটি গোষ্ঠী ছিল, যারা ব্রিটিশ মালিকদের কাছ থেকে চটকলগুলো কিনে নিতে থাকে। যদিও মানসিকতায় এরা তখনো ছিল বণিক-ব্যবসায়ী-দালাল-ফড়ে। আর মজার ব্যাপার হল, আজও মোটের উপর চটকলের মালিকরা একইরকম আছে।

পাটশিল্পের এই মালিক শ্রেণিকে বুঝতে না পারলে এই শিল্পের সংকটকেও বোঝা যাবে না। এই ফড়ে মালিকরা এই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিয়ে কখনোই ভাবিত ছিল না। এরা পাটশিল্পকে চটজলদি টাকা কামানোর একটা ক্ষেত্র হিসাবেই চিরকাল দেখে এসেছে। এদের মধ্যে বহু মালিক কারখানা হাতে নিয়েই লিজে অন্যকে চালাতে দিয়েছে। এই লিজিরা কিছুদিন একেকটা কারখানা চালিয়েছে, আবার যখনই কোনো সমস্যায় পড়েছে তখনই কারখানা ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে। অনেক মালিক কয়েকবছর কারখানা চালিয়ে লাভটুকু নিয়ে সরে পড়েছে। কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ থেকেছে, তারপর আদালতের মধ্যস্থতায় অন্য কেউ কারখানা চালানোর দায়িত্ব পেয়েছে। অধিকাংশ সময়েই দেখা গেছে এরা ছিল আগের মালিকের জোগানদার, যাদের বহু টাকা বাকি পড়ে রয়েছে। এই পাওনাদাররা আবার কয়েক বছর মিল চালিয়ে কিছু টাকা উসুল করে সরে পড়েছে। কারখানা আবার বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবেই অধিকাংশ চটকল চলেছে এবং চলছে।

স্বাধীনতার পর ভারতের নয়া শাসকশ্রেণি একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র গড়ে তোলে। বহু ভারি শিল্প এই রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রেই বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প পাটশিল্পকে ফেলে রাখা হল এই ফড়ে-মালিকদের হাতে। ফলে এই শিল্পের শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হল বিচিত্র স্তরবিন্যাস। যত দিন যেতে লাগল, ততই স্থায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা কমতে শুরু করল এবং নানা ধরনের শ্রমিকের উৎপত্তি হতে লাগল। ভারতের আর কোনো সংগঠিত শিল্পে শ্রমিকদের এত বিচিত্র স্তরবিন্যাস দেখা যাবে না, যা এই শিল্পে দেখা যায়। এখানে স্থায়ী, স্পেশাল বদলি, ভাউচার শ্রমিক, জিরো নম্বর শ্রমিক, ভাগা শ্রমিক, ট্রেনি শ্রমিক এবং চুক্তি-শ্রমিক প্রভৃতি স্তরবিন্যাস আছে। স্পেশাল বদলি বছরে ২২০ দিনের বেশি কাজ পান না। বেতন ছাড়া শুধু প্রভিডেন্ট ফান্ড পান। ভাউচার শ্রমিকদের নাম কোম্পানির পে রোলে থাকে না। এঁরা বেতন পান ভাউচারে। পিএফ, গ্র‍্যাচুইটি কিছুই এঁদের নেই। জিরো নম্বর শ্রমিক আবার পাটশিল্পের মালিকদের অভূতপূর্ব বদমাইশির ফল। ‘শিল্পে লাভ হচ্ছে না’ – এই অজুহাতে পাটকলে শ্রমিকদের পিএফ এবং গ্র‍্যাচুইটি না দেওয়া মালিকদের একটা বড় কারসাজি। যদিও প্রতি মাসে নিয়ম করে শ্রমিকদের কাছে থেকে টাকা কাটা হয়। অবসর গ্রহণের পর যখন শ্রমিক হাতে কোনো টাকাই পান না, তখন মালিক আবার তাঁকে কাজে লাগিয়ে দেয়। ১৯৯৯ সালের এক ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী পিএফ/গ্র‍্যাচুইটি দিতে না পারলে কাজ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এই চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মালিকরা পিএফ/গ্র‍্যাচুইটি দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। তার পরিবর্তে এঁদের ফের কাজে লাগানো হয়। কারখানার শ্রমিকদের পরিচয় হিসাবে একটা নম্বর থাকে। এই শ্রমিকরা সেই নম্বরটাও হারান বলে এঁদের নাম জিরো নম্বর শ্রমিক। এঁদের তৈরি পণ্য কারখানার রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে তা কালো টাকা তৈরির বড় জায়গা হিসাবে কাজ করে। অবসর গ্রহণের পর এই জিরো নম্বর শ্রমিকরা যখন কাজ শুরু করেন, তখন এক অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি হয়। এঁদের ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে থাকে, কিন্তু অবসরকালীন সুযোগসুবিধা না পাওয়ার কারণে কাজও ছাড়তে পারেন না। একসময় এঁরা আর কাজ করতে পারেন না, তখন এঁরা নিজের বেতনের একটা অংশ অন্য কোনো বেকার শ্রমিককে দিয়ে কাজ করান। এই ভাগে কাজ করা শ্রমিকদের বলা হয় ভাগা শ্রমিক। কোম্পানির কাছে তাঁদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই কোনো সুযোগসুবিধাও নেই বা দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনো ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা তাঁরা পান না। এছাড়াও আছেন ট্রেনি এবং চুক্তি শ্রমিকরা।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে চটকলগুলোতে কী পরিমাণ শোষণ চলে। এখানে মালিক শ্রেণিকে প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করা অপরাধী ছাড়া আর কিছু বলা সম্ভব নয়। অথচ আজ পর্যন্ত কোনো সরকার, কী কেন্দ্রের কী রাজ্যের, এই বদমাইশ মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। চটকলগুলোকে সরকারি মালিকানায় নিয়ে আসার কোনো উদ্যোগও কেউ নেয়নি। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর বামফ্রন্ট সরকার অধিষ্ঠিত ছিল। তারাও মালিকদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস করেনি, উপরন্তু ‘কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে’ – এই অজুহাতে মালিকদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। বামফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেক দলের চটকলগুলোতে ইউনিয়ন আছে। তাদের সঙ্গে মালিকদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং ঘনিষ্ঠ। প্রকৃতপক্ষে তারা সর্বদাই শ্রমিকদের বিপক্ষে মালিকদের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছে। আর দক্ষিণপন্থী কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেস তো তাদের শ্রেণিচরিত্রের কারণে কাজই করে মালিকদের স্বার্থে। সুতরাং শ্রমিকরা পড়েছেন এক অদ্ভুত নেতৃত্বহীনতার মধ্যে। পাশাপাশি এটাও লক্ষণীয়, যে পাটশিল্পের শ্রমিকদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সমাজের অন্যান্য অংশেরও মাথাব্যথা চিরকালই কম। কানোরিয়া জুটমিলের লড়াইয়ের মত একটা-দুটো ব্যতিক্রম বাদ দিলে পাটশিল্পের লড়াই সমাজের অন্য অংশের কাছ থেকে খুব একটা সংহতিও পায়নি। হয়ত এই শিল্পের শ্রমিকদের বিপুল অংশ ভিনরাজ্যের, বিশেষ করে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের, হওয়ার কারণে আম বাঙালি তাদের সঙ্গে খুব একটা একাত্ম বোধ করেনি।

অন্যদিকে আমাদের রাজ্যের প্রায় ৪০-৪৫ লক্ষ কৃষক পাটচাষের সঙ্গে জড়িত। পাটচাষের অবস্থা বর্তমানে খুবই করুণ। এর প্রধান কারণ হল জলের অভাব। পাট পচানোর জন্যে ডোবা, পুকুর প্রভৃতি প্রয়োজন। কিন্তু ক্রমাগত বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বর্ষার খামখেয়ালিপনা বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে নানা কারণে ডোবা, পুকুর প্রভৃতির ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সর্বোপরি ব্যাপক সরকারি উদাসীনতায় পাট চাষের উপযুক্ত পরিকাঠামোও গড়ে তোলা যাচ্ছে না। উপরন্তু পাটশিল্পের ফড়ে-দালাল-মালিকদের কল্যাণে রাজ্য থেকে পাট সংগ্রহ লাটে উঠেছে। পাটচাষিরা পাটের দাম পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ বা নেপাল থেকে অপেক্ষাকৃত শস্তায় পাট আমদানি করে অধিকাংশ জুটমিল কাজ চালাচ্ছে। ফলে পাটশিল্পের সঙ্গে জড়িত কৃষকদের অবস্থাও ভয়ানক হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা গত ১০০ বছরে নানা উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে। ১৮৮০-১৯৪৫ পর্যন্ত প্যাকেজিং শিল্পে পাট ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই সময়ে পাটের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে গেছে। কিন্তু ১৯৪৫ পরবর্তী বিশ্বে ধীরে ধীরে আসর জমিয়ে বসেছে প্লাস্টিক। রাসায়নিক শিল্পের রমরমা শুরু হয়েছে এই সময় থেকেই। প্লাস্টিক হল রাসায়নিক শিল্পের একটি উপজাত পণ্য। সুতরাং যে পরিমাণে রাসায়নিক শিল্প গোটা বিশ্বকে কব্জা করে নিল, সেই পরিমাণে প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রেও পাটের পরিবর্তে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ল। কিন্তু প্রকৃতি-পরিবেশের উপর প্লাস্টিকের ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষ করে বিশ্ব বাজার গত কয়েক দশকে আবার প্লাস্টিক থেকে ধীরে ধীরে পাটের দিকে হেলছে। বিশ্ব বাজারে পাটের চাহিদা তীব্র গতিতে বাড়ছে। ২০২২ সালে গোটা পৃথিবীতে ২.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পাটের কারবার হয়েছিল। আগামী দশ বছরে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৪.৯ বিলিয়ন ডলারে। জলবায়ু এবং ভূপ্রকৃতির কারণে কাঁচা পাট উৎপাদিত হয় পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশে। অধুনা শ্রীলঙ্কা আর নেপালও পাট চাষ করছে। চটকলের মাধ্যমে পাটজাতীয় পণ্য উৎপাদিত হয় মূলত ভারত এবং বাংলাদেশে। শ্রীলঙ্কা পাটজাত পণ্য উৎপাদনে নবাগত দেশ। সেক্ষেত্রে পাটের বর্ধিত বিশ্ব বাজারকে ধরার কথা ছিল কার? নিঃসন্দেহে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাপেক্ষা শিল্পোন্নত দেশ হিসাবে ভারতের। কিন্তু আমাদের অপদার্থ ফড়ে-দালাল-মালিক শ্রেণি বিশ্ব বাজার দখল করবে কী, তারা দেশিয় বাজারের চাহিদা সামলাতেই বাংলাদেশ থেকে আসা পাটজাত দ্রব্যের ব্যবসায় নেমে পড়েছে। নিজেদের কারখানাগুলো বন্ধ রেখে তারা শস্তায় আমদানি করে সরকারি বরাত সরবরাহ করছে। আর বিশ্ব বাজারে পাটজাত দ্রব্যের প্রধান রফতানিকারী দেশ হিসাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। ভাবা যায়?

আরো পড়ুন রুগ্ন জুটমিল: চাই শ্রমিক, কৃষকের যৌথ লড়াই

দেশিয় বাজারের অবস্থা কী? স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বাধীন ও স্বকীয় বিকাশের পরিবর্তে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদ তথা কর্পোরেটনির্ভর বিকাশের রাস্তা গ্রহণ করেছিল। কৃষিক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লবের নামে ব্যাপক আকারে রাসায়নিক চাষাবাদ শুরু হয়েছিল। পাল্লা দিয়ে প্যাকেজিংয়েও বাড়ল প্লাস্টিকের রমরমা। কিন্তু পাট শ্রমিক এবং পাটচাষিদের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে ১৯৮৭ সালে তৈরি হল Jute Packaging Materials (Compulsory use in Packing Commodities) Act, যা সংক্ষেপে জুট প্যাকেজিং অ্যাক্ট বলে পরিচিত। এই আইনের দ্বারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে চট ও চটজাত বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হল।

কিন্তু যে পরিমাণে পাটশিল্পের শ্রমিকদের আন্দোলন দুর্বল হয়েছে, পরিবেশ সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অভাব রয়েছে, সেই পরিমাণে এই আইনকে গত দুই দশক ধরে ক্রমাগত লঘু করা হয়েছে। আর বর্তমানে নরেন্দ্র মোদীরা তো আইনটা একেবারে তুলে দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন। এরপরেও সরকারি বরাত পূরণ করার মত উৎপাদন করার ক্ষমতা আমাদের পাটশিল্পের মালিকদের হচ্ছে না। তাঁরা বাংলাদেশের মাল বিক্রি করছেন। শিল্পপতি নয়, তাদের আসল দালাল-ফড়ে-বণিক চরিত্র এভাবেই বারবার প্রকট হয়ে পড়ছে। সরকার ঠুঁটো জগন্নাথ। অথচ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান নিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিনিদ্র রাত কাটায় না এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই। বামফ্রন্ট তো শিল্পস্থাপনে এমনই উদগ্রীব ছিল যে চার-ফসলি, পাঁচ-ফসলি জমিও অকাতরে শিল্পপতিদের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত ছিল। আর তৃণমূল কংগ্রেসের তো শুধু চোখের জল ফেলার নাটকই সম্বল। আজ পর্যন্ত তারা কোনো শিল্পনীতিই তৈরি করিতে পারেনি। অথচ চটকলগুলোর সঠিক পরিচালনায় যদি এই বদমাইশ মালিক শ্রেণিকে বাধ্য করা যেত, দরকারে মিলগুলোকে অধিগ্রহণ করে উৎপাদন বজায় রাখা যেত, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও সুযোগসুবিধা দেওয়া যেত, শুধুমাত্র চিরাচরিত পাটের বস্তা নয়, যে বিভিন্ন নতুন পণ্য আজকাল পাট থেকে উৎপাদিত হচ্ছে (যেমন পাটজাত কার্পেট, হস্তশিল্প, জুতো, বস্ত্র ইত্যাদি) তাতে আগ্রাসীভাবে অংশ নেওয়া যেত, পাটচাষিদের উৎসাহ ভাতা এবং পাট চাষের পরিকাঠামোর দিকে নজর দেওয়া যেত, তাহলে পাট হয়ে দাঁড়াত পশ্চিমবাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের জায়গা। আজ পর্যন্ত তা কেউই করল না।

এই পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে একমাত্র সচেতন নাগরিক সমাজের প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে। তা গড়ে ওঠার পূর্ব শর্ত হল প্রকৃতি, পরিবেশ ও পাটশিল্পের গুরুত্ব নিয়ে সর্বস্তরে ব্যাপক আলোচনা। জনগণ যদি সচেতন না হন, এই অনাচার চলতেই থাকবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.