তুলনামূলক অর্থনীতি চর্চার সবচেয়ে বড় বিপদ হল সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষিত। বাস্তব অবস্থার ফারাক ব্যতিরেকে জোগানের পরিমাণ, বাজারমূল্যের তারতম্য কিংবা সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির হার সংক্রান্ত যে কোনো আলোচনাই শেষ অবধি বাস্তবোচিত সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। সঙ্কটের সময় এই বিষয়টি আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়ে। পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি হল এমনই এক সূচক। ব্যাপারখানা কী দেখে নেওয়া যাক।

সাধারণ জীবনযাপনে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের একটা তালিকা ভেবে নিন। এবার সেইসব জিনিসের একটা গাঁটরি কল্পনা করুন। সেই গাঁটরি কোন জায়গায় কত দামে বিক্রি হচ্ছে সেটাই তুলে ধরে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কীভাবে পড়ছে। এমন একটা সূচক বুঝিয়ে দেয় সাধারণ মানুষ কীভাবে জীবন ধারণ করছেন, মাথাপিছু গড় আয়ের হিসাব কষে উন্নয়ন বুঝতে বা বোঝাতে যে ফাঁকিটুকু রয়ে যায়, তত্ত্বের সাথে তথ্যের ব্যবধান কিছুটা হলেও এতে কমে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো একটা রাজ্যের কিংবা একটা গোটা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পর্যালোচনা করা যায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের রাজ্যে সরকার বলে একটা ব্যাপার এখনো আছে। প্রশ্ন করা যেতে পারে তার কাজ কী? নবজোয়ারের নাম করে গ্রামে গ্রামে নিজেদের দলের ভেঙে পড়া নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন? নাকি দুর্নীতির সামাজিকীকরণের ফলে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেওয়া, যে চুরি হবেই। তুমি নিজের ভাগটুকু নিয়ে মাথা ঘামাও? পশ্চিমবঙ্গে এখন রাজ্য সরকারের বক্তব্য কার্যত একটাই “কেন্দ্র আমাদের প্রাপ্য টাকা দিচ্ছে না।” এসবের পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি হাজির করছেন কেন্দ্র ও রাজ্যের হর্তাকর্তারা। সেইসব তর্জনগর্জনের আড়ালে আসল কথাটি ঘুরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে দু পক্ষেরই। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা বিজেপি – কেউই কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে নয়। বরং উন্নয়ন বলতে তারা ব্যবসাদারের নতুন দোকান খোলাটুকুই বোঝে।

আমাদের দেশে কর্পোরেট পুঁজি অনেকদিন ধরেই বিনিয়োগের নতুন ফিকির হিসাবে কৃষিক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছে। মোদী সরকার তাদের দুঃখ বুঝেই নয়া কৃষি আইন নিয়ে আসেন। পুঁজির দুঃখ যদিও ঘোচেনি, দেশের কৃষকরা সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করেছেন। কিন্তু এতেই গল্পের শেষ ভাবলে মুশকিল। গরম চাটু থেকে উনুনে ঝাঁপ দেওয়া হয়নি বলে পায়ের তলা পুড়ে যাওয়া কোনো সমস্যা নয় – এমন ভাবা চলে না। সহজ সত্যিটা এই, যে কৃষিকাজ লাভজনক নয়, কারণ দেশ কিংবা রাজ্যের মাথায় যাঁরা রয়েছেন তাঁরা মানুষের ভোটে নির্বাচিত হলেও, কাজ করেন মুনাফার কারবারিদের সেবাদাস হিসাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করে যে দেশে, সেখানে খাদ্যপণ্যের বাজারে চাহিদা কমতে পারে না। বাস্তবে যা ঘটছে তা হল, পেটে খিদে চেপে রেখে দেশের মানুষ (মূলত গ্রামের বাসিন্দারা) গ্রামের বাসিন্দারা প্রয়োজনের চাইতে কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। হাতে টাকা নেই। কারণ টাকা আকাশ থেকে পড়ে না, রোজগার থাকতে হয়। আমাদের রাজ্যে রোজগার না পাওয়াই মানুষের সার্বিক দুর্দশার প্রধান কারণ।

কাজ নেই কেন? কারণ কাজ নিজের ইচ্ছায় মেলে না, তার উপযুক্ত পরিকাঠামো লাগে। সেই দায় আদানি আম্বানিরা কোনোদিন নেয়নি, নেবেও না। সরকার নির্বাচিত করতে হয় এইজন্যই। তাই ক্ষমতাসীন রাজনীতিই নির্ধারণ করে দেয় জনসাধারণের ভবিতব্য। এই সত্যটুকু বুঝতে অসুবিধা হলেই নয়া উদারবাদের সুবিধা। তাই উঠতে বসতে প্রচার চলে অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। মুনাফার হিসাব কষে সময় ফুরিয়ে যায় বলেই ধ্রুপদী পুঁজিবাদ সরাসরি রাজনীতিতে নামতে চায়নি, জনসাধারণের দুর্দশা ঘোচাতে তত্ত্ব হাজির করেছিল – সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাজারই হল সর্বরোগহর বটিকা। আজ অবধি আর যারই হোক, জনগণের হিতসাধনে এই তত্ত্ব কাজে দেয়নি। অথচ নতুন করে বাজারে এসেছে বিকেন্দ্রীকরণের যুক্তি। এবার অবশ্য ভোল একটু বদলেছে। আগে বলা হত অর্থশাস্ত্র, এখন বলা হয় ফিনান্স ম্যানেজমেন্ট। অর্থনীতি আপাতত দুরূহ, দুর্বোধ্য ইকোনমেট্রিক্সের জগতে ঢুকে পড়েছে। তার মর্যাদারক্ষায় প্রতি বছর একটা করে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় আর জনসাধারণ ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকেন।

তৃণমূল সরকারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এতক্ষণ যা যা বলা হল তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। কোনোদিন থাকবে এমন আশা ঘোর তৃণমূল সমর্থকদেরও নেই। খুব বেশি হলে তারা যা করতে পারে তাকে হুজুগ বলে। অনেকগুলো গাড়িসমেত কনভয় নিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে অভিষেক সেটুকুই করতে চাইছেন।

উন্নয়নের নামে আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা মূলত দুটো। প্রথমটা জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল আরবান রিনিউয়াল মিশন (জেএনএনইউআরএম), আরেকটা নরেন্দ্র মোদীর কৃপাধন্য অটল মিশন ফর রিজুভিনেশন অ্যান্ড আরবান ট্রান্সফর্মেশন বা ছোট করে ‘অম্রুত’। আরও একটা পরিকল্পনা সদ্য আসরে নেমেছে, তার নাম স্মার্ট সিটি মিশন। মোদী জমানায় স্মার্ট আর ডিজিটাল শব্দদুটোই আমাদের জাতীয় স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ফলে জনসাধারণের দুর্দশা কীভাবে চেপে রেখে কমিয়ে দেখানো যায় সে ব্যাপারে আমরা যেমন ক্রমশ স্মার্ট হতে পারছি, অন্যদিকে যাবতীয় বাস্তব সমস্যার ভার্চুয়াল (ডিজিটাল) সমাধানও খুঁজে চলেছি। মোদী সবকিছুতেই একটা করে নম্বর অথবা কার্ড বের করে চলেছেন, আমাদের রাজ্যে প্রত্যেকটা কার্ড পিছু নাম একজনের থাকলেও কীভাবে সুবিধাটুকু অন্যের হতে পারে তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

সম্প্রতি অক্সফ্যাম একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেখিয়েছে, সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি রয়েছে এমন দশ শতাংশ ভারতীয় এবং চালচুলো নেই এমন দশ শতাংশের মধ্যেকার ফারাক ক্রমশ বাড়ছে।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভারত সরকারের কর্মসূচি এখনও নয়ের দশকের নগরায়ন ভাবনার বাইরে বেরোতে পারেনি। নাম পাল্টে কতটুকুই বা হয়? উন্নয়নের এই মডেলে আসলে যা হয় তা হল পুঁজি উৎপাদনের নামে বিভিন্ন শহরের মধ্যে বিনিয়োগ টেনে আনার প্রতিযোগিতা। বিনিয়োগ হয়েছে একথা সত্য, কিন্তু তার ফল সীমাবদ্ধ থেকেছে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতেই। অক্সফ্যামের প্রতিবেদন সে কথাই প্রমাণ করছে।

পুঁজি উৎপাদন মানে কী? পণ্য উৎপাদনের জন্য মুনাফার হার বেশি এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে ক্রমাগত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টেনে আনা, নাগরিকদের উপর বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া, ক্রমবর্ধমান সম্পত্তি কর চাপিয়ে দিয়ে রাজস্ব আদায় এবং অনাদায়ের ফলে সরকারি বরাদ্দে কাটছাঁট। এই প্রক্রিয়ার কোথাও সাধারণ মানুষের জীবনের কিছু থাকে না, সবটাই চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতির অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল।

আরো পড়ুন ‘১৯৯১ থেকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পথ ত্যাগ করার ফল গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১০১তম স্থান’

সরকারি ব্যয়বরাদ্দ এমনই আরেক সূচক। কেউ হয়ত বলবেন, ব্যয় তো আয়ের উপরে নির্ভরশীল। তাহলে সরকারি বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে যাওয়ার উপায় কী? এখানেই আসে সরকারি পরিকল্পনার প্রসঙ্গ। সমবায় সম্পর্কে, গণউদ্যোগ সম্পর্কে এবং সবশেষে বিকল্প হিসাবে কর্তৃপক্ষের রাজনীতি কেমন? সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয়বরাদ্দের জন্য উপযুক্ত তহবিল (সরকারি অর্থভাণ্ডার) না থাকলে সরকার বাজার থেকে ঋণ নিতে পারে, সেই অর্থ উপযুক্ত পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করা হলে সুদ কেন, আসলও শোধ করে দেওয়া যায়। শর্ত একটাই – এহেন ব্যয়ের লক্ষ্য হবে বাজারের চাহিদাকে কার্যকরী ও যতদূর সম্ভব স্থায়ীভাবে বাড়িয়ে তোলা। বুনিয়াদি প্রয়োজনে মানুষের চাহিদা মিটলে তবেই হাতে থাকা অর্থটুকু বাড়তি বলে বিবেচিত হয়। সেই টাকাই বিনিয়োগ যোগ্য। ব্যাঙ্ক, বিমা সহ যাবতীয় পণ্যের বাজার তেজি হয় তখনই, যদি মানুষের হাতে সেইসব পণ্য কেনার মত যথেষ্ট অর্থ থাকে। তাই খাদ্য, জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা – এসব খাতে খরচকে খয়রাতি বলে তাচ্ছিল্যের টিপ্পনী কাটেন যাঁরা, তারা হয় অর্থশাস্ত্রের বুনিয়াদি প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করেন (ফিনান্স ক্যাপিটালনির্ভর পুঁজিবাদ ঠিক যে কাজটা করে), নয়ত ফাটকা কারবারজনিত মুনাফার বৈধ কিংবা অবৈধ অংশীদার থাকার সুযোগ হারাতে চান না।

এহেন জাঁতাকলে পড়ে গ্রামবাংলার অবস্থাটা ঠিক কী? এর উত্তর শুধু আমাদের রাজ্যের অবস্থা বিচার করলে বোঝা যায় না। মানুষের সমাজে যতই বৈচিত্র্য থাকুক, আজও দুনিয়ার এক প্রান্তের কার্যকারণ সম্পর্ক আরেক প্রান্তেও মিলে যায়। তাই দুনিয়াটা কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে তা ইচ্ছা না থাকলেও বুঝতে হবে।

পরবর্তী অংশ আগামীকাল

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. এইটা কি ধরণের ” stream of consciousness ” type লেখা। এই ধরণের একপেশে সরলীকরণ ব্যখ্যা কেবলমাত্র ideologue রাই দেন,সে বামপন্থী আর ডানপন্থীই ..বিবেক দেবরায় বাবু ও এমনি ill-logical stream of consciousness লেখা লেখেন।

    কোনো development economists ধ্রুপদী ধনতন্ত্র কথা বলেন না। তারা কেউ দাবি করেনা…free market হলো চরম উপায়। তারা কেবল দাবি করেন ….ব্যবসা বাণিজ্য সরকার “চালিত” না হয়। কিন্তু তারা সবাই মুক্ত বাজার কে ” regulation” র আওতায় আনতে চায় …’regulation’ ও ‘collectivisation’ আলাদা জিনিস ।
    কমিউনিস্টরা তো ” collectivisation” কে সর্বরোগহর মনে করে…তার কি কোনো যুক্তি আছে???

    Free market is okay..just সরকারকে to invest করতে হবে…social sector এ … যথা.education ,স্বাস্থ্য, অন্ন..of least advantaged people ( নিন্মবিত্ত ও দরিদ্র) … market should not dominate these sectors

    কোনো Marxist তত্ত্বই ” absolute equality” আনবে না। কিন্তু বামপন্থী ও বামপন্থীরা যদি stream of consciousness type যুক্তি না সাজিয়ে development economists ( আমাদের অমর্ত্য সেন ই তো রয়েছে) দের কথা শুনতেন …কিন্তু hardcoreভদ্রলোক কমিউনিস্টরা dialectical logic র পাল্লায় পড়ে সবাই কে শোধন বাদী বলে দেন…

    কিন্তু এই কমিউনিস্টরাই কোনোদিন কোনো উল্খেযোগ্য শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি??
    উচ্চ বর্ণের কমিউনিস্টদের কোনো বালাই নেই ওসব বিষয়ে খরচ করার…they want to be চিরস্থায়ী vanguard of নিন্মবিত্তদের.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.