আতঙ্কিত হবার কারণ আছে। মণিপুরে প্রতিবেশী নিধনের আগুন এখনো সম্পূর্ণ নির্বাপিত হয়নি। এবং ভারত-ইতিহাসে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের নামে প্রতিবেশী-বিদ্বেষের যে কলঙ্কময় অধ্যায়টি নিত্যদিন নিজেকে পুষ্ট ও নবায়িত করে চলেছে, তাতে আমাদের রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কুড়মি-মাহাতদের তফসিলি জনজাতি (এসটি) তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে একটা আন্দোলন চলছে। এর পক্ষে, দৃশ্যত, ভালই জনসমর্থন আছে বলে মনে হচ্ছে। উল্টোদিকে সাঁওতালদের মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে এসটি তালিভুক্ত গোষ্ঠীগুলির কোনো কোনো অংশ থেকে এই আন্দোলনের বিরুদ্ধতার কথা শোনা যাচ্ছে। এখনো পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধতা বিবৃতিতেই সীমিত আছে, রাস্তার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু, তাঁরাও যদি রাস্তার আন্দোলনে নামেন, তাহলে যে কোনো মুহূর্তে ঝাড়গ্রাম থেকে মানভূম পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল প্রতিবেশী নিধনের মত্ততার শিকার হয়ে উঠবে। বর্তমান কুড়মি-মাহাত আন্দোলনের ভৌগোলিক পরিধিটির দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পাব, কীভাবে, মাত্র এক দশক আগে এই অঞ্চলটিকে এক উন্মত্ত রাজনৈতিক হিংস্রতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল।

এটি ছিল সেই অঞ্চল যা ১৯৮০-র দশকে ছিল ঝাড়খণ্ডকে আলাদা রাজ্য করার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের একটি জীবন্ত কেন্দ্র। তখন আন্দোলনকারীরা যে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের প্রস্তাব রেখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল বর্তমানে যা ঝাড়খণ্ড রাজ্য, ২০০০ সালে যার গঠন, তার সঙ্গে পশ্চিমবাংলার পুরুলিয়া-বাঁকুড়া-মেদিনীপুর, ওডিশার ময়ূরভঞ্জ, কেওনঝাড় এবং বর্তমান ছত্তিশগড়ের সরগুজা। প্রবীণ নাগরিকদের স্মরণে থাকবে, পশ্চিমবাংলার যে অঞ্চলে ঝাড়খণ্ড আন্দোলন খুব বিস্তার ও অনেকটা রাজনৈতিক প্রভুত্ব অর্জন করে, সেটি হল বর্তমান ঝাড়গ্রাম জেলা। উল্লেখযোগ্য সংযোগের ব্যাপার হল, এই অঞ্চলটিই এ সহস্রাব্দের প্রথম দশকে এক হিংস্র রাজনৈতিক কার্যকলাপের সম্মুখীন হয়, তথাকথিত মাওবাদীদের সশস্ত্র নেতৃত্বে। আবার এই অঞ্চলটিই বর্তমানে কুড়মি-মাহাত আন্দোলনের কেন্দ্র। এই সংযোগটি কাকতালীয় না হওয়াই স্বাভাবিক। যা-ই হোক, বর্তমান আলোচনায় আমাদের এই সংযোগের উল্লেখটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। এ সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ভিন্ন পরিসর ও কর্তৃত্বের দাবি রাখে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

উল্লেখ করে রাখা দরকার যে, কুড়মি মাহাতরা ব্রিটিশ ভারতে তফসিলি জনজাতি তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তৎকালীন ভারত সরকার ১৯৩১ সালে তাঁদের নাম জনজাতি তালিকা থেকে বাদ দেয়। অবশ্য, এটা সরকারের পক্ষে সহজ হয়েছিল কুড়মি-মাহাতদেরই একটা বড় আকারের আন্দোলনের সুবাদে। সে আন্দোলন ছিল সমাজশাস্ত্রী এম এন শ্রীনিবাস যাকে ‘সংস্কৃতায়ন’-এর ঝোঁক বলে অভিহিত করেছেন, তাই। কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বলশালী অংশটি নিজেদের ক্ষত্রিয় পরিচয় দাবি করে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় তাঁদের তফসিলি জনজাতি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় (এ বিষয়ে আমি অন্যত্র আলোচনা করেছি। আগ্রহীরা সেই আলোচনা মার্কসবাদী পথ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে দেখতে পারেন)। অবশ্য এর এই অর্থ করা চলে না যে, যেকোনো কারণেই হোক না কেন, কোনো গোষ্ঠী একবার তফসিল-বহির্ভূত হয়ে গেলে পুনরায় তফসিলে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানাতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর লোকেরা যদি মনে করেন যে, তাঁদের সামাজিক অবস্থা জনজাতি গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, তাহলে তাঁরা তফসিলি জনজাতিভুক্তির দাবি করতেই পারেন। কুড়মি-মাহাত গোষ্ঠীর একাংশ সেই ১৯৮০-র দশক থেকেই নিজেদের জনজাতি পরিচিতির দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন। এর পুরোধা ছিলেন নৃবিজ্ঞানী পশুপতি প্রসাদ মাহাত। অধ্যাপক মাহাত নিজে পুরুলিয়া জেলার এক কুড়মি-মাহাত পরিবারে জন্মানো মানুষ, তাঁর প্রায় সারাজীবনের গবেষণার বিরাট অংশ জুড়ে ছিল ঝাড়খণ্ডী মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও রাজনীতি। সেই সঙ্গে ১৯৮০-র দশকে তীব্র হয়ে ওঠা ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবিতে সংগঠিত আন্দোলনের তিনি ছিলেন এক অগ্রগণ্য চিন্তাজীবী নেতা। আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তিটিকে প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করে তোলার ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর তাত্ত্বিক প্রকল্পগুলির একটা ছিল, ঝাড়খণ্ড সাংস্কৃতিক অঞ্চলের কয়েকটি জনগোষ্ঠী, যেমন সাঁওতাল, মুণ্ডা, হো, কোড়া, মাহলি, কোল এবং কুড়মি-মাহাতরা একটিই বৃহৎ খেরোয়াল জনগোষ্ঠীর সদস্য। এঁদের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিতে প্রভূত সাযুজ্য। কৃষিকর্ম, অরণ্য ও পশুপাখির সঙ্গে তাঁদের জীবনী-সম্পর্ক, সঙ্গীত, নৃত্য, মানুষে মানুষে বার্তালাপ – সবদিক দিয়েই এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে আত্মীয়তার নানা অভিজ্ঞান বিদ্যমান। এই যুক্তিকে আরও প্রসারিত করে ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রামদয়াল মুণ্ডা, বিন্ধ্যেশ্বরী প্রসাদ কেশরী, সন্তোষ রাণা, একে রায়ের মতো বুদ্ধি-প্রসারকরা এক বৃহত্তর ঝাড়খণ্ডী পরিচিতির কথা তুলে ধরেন। এই পরিচিতির মধ্যে তাঁরা সরকারিভাবে ঘোষিত জনজাতীয় গোষ্ঠীগুলি এবং অধ্যাপক মাহাতর দাবি করা খেরোয়াল বংশোদ্ভুত কুড়মি-মাহাত গোষ্ঠীটির সঙ্গে যোগ করেন এই অঞ্চলে বসবাসকারী কুমোর, কামার, তেলি, গোয়ালা, সদগোপ, প্রভৃতি হিন্দু মধ্য-সম্প্রদায়, ডোম, বাগদি, শুঁড়ি, প্রভৃতি হিন্দু নিম্নবর্ণের অন্তর্ভুক্ত তফসিলি (এসসি) জাতি, এবং জোলা, মোমিন, প্রভৃতি মুসলমান গোষ্ঠীগুলিকেও (আগ্রহী পাঠক সন্তোষ রাণার ২০১৮ সালে গাঙচিল প্রকাশিত প্রবন্ধসংগ্রহ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ‘ঝাড়খণ্ড আন্দোলন প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধটি দেখতে পারেন)।

বস্তুত, এই তত্ত্বায়নটির সঙ্গে বাস্তব রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির যোগ ছিল খুবই সজীব। ১৯৮০-র দশকে নতুন করে উজ্জীবিত ঝাড়খণ্ড আলাদা রাজ্যের দাবিতে ইতোমধ্যেই এমন একটি সামূহিক নেতৃত্ব উঠে এসেছিল যা ঝাড়খণ্ডী পরিচিতির প্রসারিত রূপটিকেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বে অগ্রগামীদের মধ্যে ছিলেন শিবু সোরেন, সাইমন মারান্ডি, নরেন হাঁসদা (সাঁওতাল), নির্মল মাহাত, বিনোদ বিহারী মাহাত, মনোরঞ্জন মাহাত (কুড়মি-মাহাত), সুরজ মণ্ডল (শুঁড়ি), এন ই হোরো (মুন্ডা), লিয়াকত আলির (মুসলমান) মত মানুষ। একে রায় এবং সন্তোষ রাণার মতো ঘোষিত বামপন্থীরাও এর তাত্ত্বিক ও বাস্তব রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সাদরে গ্রহণীয় হয়ে ওঠেন। উল্লিখিত নেতারা কেবল উদাহরণ মাত্র। সেইসময় সারা ঝাড়খণ্ড সাংকৃতিক ক্ষেত্র জুড়ে এক ব্যাপক, অন্তর্গ্রাহী নেতৃত্ব উঠে আসে। এই বাস্তবতা ঝাড়খণ্ড স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবির তাত্ত্বিক সারবত্তাকে আরও প্রসারিত করতে সাহায্য করে, “হিন্দু-মুসলিম-শিখ-ইশাই, সব-ঝাড়খণ্ডী-ভাই-ভাই” জাতীয় স্লোগান বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এককথায় ঝাড়খণ্ড আন্দোলনে তত্ত্ব ও বাস্তব ক্রিয়া-প্রক্রিয়া পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চলেছে।

দৈনন্দিন রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি এই ক্রিয়া প্রক্রিয়া খুবই গভীরভাবে দেখা যায় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। প্রধানত কুড়মি-মাহাতদের সমাজে জন্ম নেওয়া ঝুমুর গান যেন হয়ে উঠল ঝাড়খণ্ডী সাংস্কৃতিক পরিচিতির সংহত প্রতীক। সম্ভবত সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রটিও এরকম একটি আন্দোলনের আবাহন করে চলেছিল, অপেক্ষা করছিল নিজেকে লোকসমাজের কণ্ঠস্বর হিসাবে তুলে ধরার। আগ্রহী মানুষ লক্ষ করে থাকবেন, ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়টা হচ্ছে ঝুমুরসহ স্থানীয় ভাষায় রচিত, স্থানীয় আঙ্গিকে গাওয়া সঙ্গীতের এক ব্যাপক প্রসারের কাল। পাতাল রেলে শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে করতে গান গাইছিলেন বিজয় মাহাত। ঝাড়খণ্ডী শ্রমিকদের খোঁজখবর করতে আসা পশুপতি মাহাত ও সন্তোষ রাণা বিজয়ের গান শুনে তাঁকে তুলে নিয়ে যান ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের এক সাংস্কৃতিক সংগঠক রূপে মানুষের সামনে হাজির করতে। ঠিক সেই সময়েই উৎকলি ব্রাহ্মণ জমিদার বংশোদ্ভূত, কিন্তু শ্রেণিচ্যুত ও সর্বহারা কবি ভবতোষ সতপথী খুঁজে ফিরছিলেন এক নিজস্ব আঙ্গিক। তাঁর কলমে আশ্রয় নিল ঝাড়গ্রাম অঞ্চলের কুড়মালি ভাষা (পুরুলিয়া অঞ্চলে ব্যবহৃত কুড়মালিতে মাগধী-প্রাকৃতের প্রভাব অনেক বেশি, ঝাড়গ্রাম অঞ্চলের কুড়মালিতে আধুনিক বাংলার সঙ্গে সাদৃশ্য তুলনায় বেশি)। তাঁর কবিতা ‘সিরি চুনারাম মাহাত’ লোকেদের মুখে মুখে, তাঁর লেখা কবিতাপংক্তিগুলি দেওয়ালে দেওয়ালে, মিছিলে মিছিলে শোভা  পেতে লাগল (সুখের কথা, সম্প্রতি, ২০১৮ সালে, ফটিক চাঁদ ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ভবতোষ রচনা সমগ্র ১; প্রকাশক বর্ণমালা, ঝাড়গ্রাম। এই গ্রন্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপকার) । সুনীল মাহাতর মত রচয়িতারা লিখতে লাগলেন নতুন ঝুমুর। বিজয় মাহাত একদিকে ‘ভাদর মাসে খরখইস্যা জামাই আইল লিতে গ’ বা ‘সজনিলো সজনি দিনগে এদিন ঘুরিকে না আসে’-র মত পুরাতন গানগুলিকে পুনরুদ্ধার ও পরিবেশনের পাশাপাশি গাইতে লাগলেন সুনীল মাহাতর লেখা ‘বিহার বলে তুঁই ছুট বেঙ্গল বলে দূর হটো তবে ঝাড়খণ্ড কি ঝাঁপ দিবেক জলে হে’-র মত নতুন ঝুমুর। আর তার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ভবতোষ সতপথীর কবিতায় সুরারোপ করে দিবারাত্র এক করে দেওয়া জনসমাবেশগুলিকে মাতিয়ে দেওয়া সঙ্গীতের বিপুল ঐশ্বর্য।

বস্তুত, ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের সুবাদে সারা ঝাড়খণ্ড সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র জুড়ে নবজাগরণ ঘটল ঝুমুরের, পাশাপাশি মকর-টুসু-বাঁধনার মতো সাঁওতাল-মাহাত-মুণ্ডাদের কাছে সমান আদরের পরব। সাঁওতাল ও কুড়মি-মাহাত একই খেরোয়াল বংশোদ্ভূত কিনা তার নৃতাত্বিক প্রমাণ খুব একটা সন্ধান করা হয়নি। কিন্তু তাঁদের মধ্যে যে একটা নাড়ির টান ছিলই সেটা খুব স্পষ্ট করে উঠে এল ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সাঁওতাল গাইতে লাগল ঝুমুর, আর দীর্ঘ পদযাত্রার কালে সান্ধ্য বিশ্রামের আগে কুড়মি-মাহাত গ্রামে ডব-জোহারে আপ্যায়িত হলেন অতিথি পদযাত্রীরা।

আরো পড়ুন শুধু কালীপুজো নয়, এ মরসুম বাঁদনা পরবেরও

এই নাড়ির টানকে গুরুত্ব দিতে, নাকি এই টানের মধ্যেকার সুফলা রাজনৈতিক সম্ভাবনাটিকে চিহ্নিত করতে পেরে তার সদ্বব্যবহারের উদ্দেশ্যে বর্তমান ঝাড়খণ্ড সরকার বিধানসভায় কুড়মি-মাহাতদের জনজাতি তালিকাভুক্তির বিষয়টি নিয়ে প্রস্তাব পাস করেছে, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যেদিক দিয়েই হোক, এক সাঁওতাল মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে কুড়মি-মাহাতদের জনজাতিভুক্তির প্রস্তাব রাজনৈতিক এবং সামাজিক – দুদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। “কুড়মি-মাহাতরা জনজাতিভুক্ত হলে আমাদের ভাগ মারা যাবে”, ঝাড়খণ্ডের সাঁওতালদের মধ্যে এমন কোনো দুশ্চিন্তা চাগিয়ে তোলা যায়নি। বরং তাঁরা বুঝেছেন যে, কুড়মি-মাহাতরা জনজাতিভুক্ত হলে মোট জনজাতির জনসংখ্যা বাড়বে, যার ফলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক দিয়ে জনজাতীয়রাই লাভবান হবেন।

ঝাড়খণ্ড বিধানসভার প্রস্তাবটি রূপায়িত করতে ভারত সরকারের অনুমোদন লাগবে। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রস্তাব যথার্থ নয় – এমন একটা অজুহাত দেখিয়ে ভারত সরকার সেই অনুমোদন আটকে রেখেছে। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের আগে কুড়মি-মাহাতদের তফসিলি জনজাতিভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, সেই লক্ষে এতদিন কোনো পদক্ষেপ নেননি। এখন নানা কারণে কুড়মি-মাহাতদের মধ্য থেকে নিজেদের জনজাতিভুক্তির দাবিটা আন্দোলনের রূপ নিল। কারণগুলো কী তা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণে না গিয়েও, মোটা দাগে তাদের কয়েকটিকে চিহ্নিত করা যায়। এদের মধ্যে একটা হল, কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে সামাজিক-আর্থনীতিক-রাজনৈতিক সুযোগসুবিধার ব্যাপারে বঞ্চনাবোধের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি। বঞ্চনা থাকলেই বিদ্রোহ হয় না, তার জন্য প্রয়োজন মানুষের মধ্যে সেই বঞ্চনা বিষয়ে বোধ। ১৯৭০-এর দশকের নকশাল আন্দোলন, তার পরের দশকের ঝাড়খণ্ড আন্দোলন এবং এই সহস্রাব্দের গোড়ায় লালগড় রাজনীতি – এই এলাকার মানুষের মধ্যে বঞ্চনাবোধের প্রকাশ। কুড়মি-মাহাতদের জনজাতিভুক্তির দাবির মধ্য দিয়ে আসলে এই অঞ্চলের কুড়মি-মাহাত সমাজের মধ্যে গড়ে ওঠা বঞ্চনাবোধই অভিব্যক্ত হচ্ছে। এই বঞ্চনাবোধের নির্মাণে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিরও একটা প্রকাশ্য ভূমিকা আছে – তা হল তাঁরই দলের প্রতীকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়া এবং মন্ত্রীসভায় জায়গা পাওয়া চূড়ামণি মাহাতকে প্রকাশ্য সভায় অপমান।

চূড়ামণি মাহাত কুড়মি-মাহাত সমাজের প্রতিনিধিস্থানীয় কিনা, বা তিনি কতটা জনপ্রিয় – সে প্রশ্ন অবান্তর। প্রকাশ্য সভায় তাঁর অপমান কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে একটি সামগ্রিক সামাজিক অপমান হিসাবে গণ্য হল। এই ক্ষত নিরাময়ের একটি উপায় হতে পারত, তাঁরই দেওয়া, কুড়মি-মাহাতদের জনজাতিভুক্তির বিষয়টি বিধানসভায় পাস করিয়ে ভারত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি। কিন্তু মমতা সে পথে গেলেন না। কুড়মি-মাহাতদের ক্ষোভ তীব্র হতে লাগল, আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও গভীরতা বাড়তে লাগল। তাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার বদলে সরকার, মন্ত্রীর গাড়িতে ঢিল ছোঁড়ার অজুহাত সম্বল করে দমনপীড়নের পথ নিল, আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার করল। পাশাপাশি, সাঁওতাল ও অন্যান্য জনজাতিদের মধ্য থেকে এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে যেসব বিবৃতি ও আবেদন-নিবেদনের ব্যাপার ঘটছে সেগুলির পিছনে সরকারের বা সরকারি দলের মদত নেই – একথা হলফ করে বলা যায় না। আবার গোষ্ঠী-সম্পর্ককে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ও প্রতিবেশী নিধনের উন্মাদনায় পরিণত করতে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বিজেপি যে কেবল নিরীহ দর্শক হয়ে বসে থাকবে তা বলা যায় না। এক বিজেপি নেতা তো প্রকাশ্যে কুড়মি-মাহাতদের সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন এবং তাঁদের হুমকি দিয়েছেন। যদিও অন্য এক নেতা খানিক মলম লাগাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, বিজেপি নেতার কটূক্তি ও হুমকি তাঁর চারিত্রিক প্রগলভতা বলে ধরে নেওয়া চলে না – বস্তুত রাজনৈতিক নেতাদের কোনো কথাবার্তাকেই ‘মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া’ বলে মেনে নেওয়া কঠিন। মুখ যদি ফস্কায়ও, তার পিছনেও একটা পরিকল্পনা থাকে। হতে পারে, ঝাড়খণ্ডে সাঁওতাল মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে কুড়মি-মাহাতদের জনজাতিভুক্তির দাবি যে উদার রাজনৈতিক পরিসর সৃষ্টি করেছে, তাকে বানচাল করার জন্য পশ্চিমবাংলা থেকে একটা প্রতিবেশী-বিদ্বেষী গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বাষ্প ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যা-ই ঘটুক না কেন, এই আন্দোলন তৃণমূল ও বিজেপি – এই দুই বৃহৎ শক্তির কাছেই অস্বস্তিকর। অস্বস্তির কারণ, এই অঞ্চলের আন্দোলনের পূর্ব ইতিহাস, যা নির্মিত হয়েছে সাঁওতাল ও কুড়মি-মাহাতদের বিশিষ্ট মিশ্রণে গড়ে ওঠা এক রাজনৈতিক-সামাজিক নেতৃত্ব ও কর্ম-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। কোনো শাসকের কাছেই এটি স্বস্তির নয়, যেমন ছিল না ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের কালে ততকালীন শাসক সিপিএমের কাছেও।

সুতরাং বিষ ছড়ানোর শাসকীয় ষড়যন্ত্র চলবে এবং যেভাবে মণিপুরে, আসামে, ওড়িশায় প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশীকে লড়িয়ে দিয়ে শাসক তার শাসনের নিশ্চয়তা অর্জন করে, বর্তমান জঙ্গলমহল এলাকা, বিশেষত ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে সেই চেষ্টা রীতিমত জারি আছে। একমাত্র ভরসা এই অঞ্চলের ইতিহাস। সাঁওতাল ও কুড়মি-মাহাতদের মধ্যেকার এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য বসবাসীদের অগ্রগামী নেতৃত্ব যদি সেই ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ঘটনাবলী সামনে তুলে ধরে প্রতিবেশী-সম্প্রীতির উদ্যোগ করেন, তা শাসকীয় ষড়যন্ত্রকে পর্যুদস্ত করতে পারে বলে বিশ্বাস করা যায়।

– মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.