আইআইটির ছাত্রের খুন এবং আত্মহত্যা বলে প্রমাণের চেষ্টায় আরএসএস, তৃণমূল – দুই পক্ষকেই দুষছেন রাজ্যের বামপন্থীরা

আইআইটি খড়্গপুরের ছাত্র ফয়জান আহমেদের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে মনে করেন পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা। তাঁদের দাবি, গোটা দেশজুড়েই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংঘ পরিবারের নিয়ন্ত্রণ কায়েমের যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তার বলি হতে হচ্ছে সংখ্যালঘু এবং দলিত ছাত্রছাত্রীদের। ফয়জানের মৃত্যুকে সেসব ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, গত কয়েক বছরে আত্মহত্যা করেছেন শতাধিক আইআইটি পড়ুয়া। ফয়জানের মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাক্রম, বিশেষ করে আদালতে রায় থেকে এই সংশয় জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়, যে এই শতাধিক ‘আত্মহত্যা’-র মধ্যে একাধিক খুনের ঘটনা থাকতে পারে। বাম ছাত্রনেতাদের অভিযোগ, ফয়জানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে আইআইটি। এ থেকে প্রমাণিত হয়, এর পিছনে একটি বড়সড় প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে।

২০২২ সালের ১৪ অক্টোবর খড়্গপুর আইআইটির মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র ফয়জানের আংশিকভাবে পচন ধরে যাওয়া দেহ ক্যাম্পাসের একটি হোস্টেল থেকে উদ্ধার হয়। আসামের তিনসুকিয়ার বাসিন্দা ফয়জান ২০২০ সালের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সারা ভারতে একাদশ স্থান অধিকার করেছিলেন, তিনি আসাম সরকারের স্কলারশিপও পাচ্ছিলেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ফয়জানের দেহ উদ্ধার হওয়ার পর থেকে আইআইটি কর্তৃপক্ষ দাবি করছিলেন সে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এই ২৩ বছর বয়সী ছাত্রের পরিবার তা মানতে চায়নি। তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন। মৃত পড়ুয়ার প্রথম ময়না তদন্তের রিপোর্ট মৃত্যুর কারণ নির্দিষ্ট করতে পারেনি। শেষপর্যন্ত ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ অজয় কুমার গুপ্তের পরামর্শ অনুযায়ী কলকাতা হাইকোর্ট দ্বিতীয় ময়না তদন্তের নির্দেশ দেয়। সেই রিপোর্ট পরীক্ষা করে বিচারপতি রাজশেখর মান্থা সিদ্ধান্ত করেন যে এই মৃত্যু ‘হোমিসাইড’। তিনি আইআইটিকে ময়না তদন্তের কপি দিতে নিষেধ করেন, কারণ তারা এই মামলায় অভিযুক্ত হতে পারে। শুনানি চলাকালীন একবার বিচারপতি বলেন “IIT Kharagpur has also tried to fudge the documents (আইআইটি খড়্গপুর কাগজপত্রে গরমিল করার চেষ্টাও করেছে)।”

সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই প্রসঙ্গে নাগরিক ডট নেটকে বলেন, “উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে এক ধরনের বিকৃত স্যানিটাইজেশন চলছে। মুসলিম, দলিতসহ প্রগতিশীলদের ছেঁটে ফেলার হিংস্র চেষ্টা চলছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজীব আহমেদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা এর প্রমাণ। বিজ্ঞানী অধ্যাপক ছাত্রসহ যাঁরাই আইআইটি সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রগতিশীল চেতনার পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁরাই আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিকল্পিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল পরিবেশকে ধ্বংস করা হচ্ছে।”

সেলিমের অভিযোগ, এই পরিকল্পনা আরএসএসের ছক অনুযায়ী বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। সেই কারণেই নিরামিষ, আমিষ খাবার নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে, ক্যাম্পাসে বেদ নিয়ে সেমিনার করা হচ্ছে। ফয়জানের মৃত্যুকে এই সামগ্রিকতার ভিত্তিতে দেখা জরুরি।

 

রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিন্দনীয়। তারা গুলিয়ে দিতে চাইছে। আমি তো বলব, হয় মমতা ব্যানার্জি আরএসএসের এজেন্ডা নিয়েই চলছেন, নয় তিনি পুলিশের উপরে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন – মহম্মদ সেলিম

 

ফয়জানের বাবা-মায়ের পক্ষের উকিল রণজিৎ চ্যাটার্জি, অতীশ বিশ্বাস, নীলাদ্রি সেনগুপ্ত ও অনিরুদ্ধ মিত্র ফয়জানের মৃত্যু যে আসলে হত্যা তা প্রতিষ্ঠা করার দিকে হাইকোর্টের অবস্থানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। সে প্রসঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বলেন, “ফয়জানের মৃত্যুর বিষয়টা নিয়ে ক্যাম্পাসের ভিতরে রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। সেটা হয়নি। ক্যাম্পাসের ভিতরে কিছু করতে দেয়নি, বাইরে লড়াই হয়েছে। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে বাম-প্রগতিশীল ছাত্ররা লড়েছে। বিক্ষোভ করেছে। পরিবার এক অসাধারণ আইনি লড়াই লড়েছে। পরিবারকে অভিনন্দন তাঁদের নাছোড় সংগ্রামের জন্য।”

এই ঘটনায় রাজ্য পুলিশেরও সমালোচনা করেছেন সেলিম। তাঁর কথায়, “রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিন্দনীয়। তারা গুলিয়ে দিতে চাইছে। আমি তো বলব, হয় মমতা ব্যানার্জি আরএসএসের এজেন্ডা নিয়েই চলছেন, নয় তিনি পুলিশের উপরে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।”

ফয়জানের মৃত্যু নিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ভারতের ছাত্র ফেডারেশন (এসএফআই) এবং ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনও (ডিএসও) সরব। এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাসের কথায় “আইআইটিগুলিতে কোথাও প্রত্যক্ষ, কোথাও পরোক্ষভাবে আরএসএসের প্রশিক্ষণ চলছে। শিক্ষক এবং কর্মীদের বড় অংশ এদের সঙ্গে যুক্ত। গত কয়েক বছরে আইআইটিগুলিতে শতাধিক ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। এদের একটা বড় অংশ, প্রায় ৬৪%, দলিত ও মুসলিম। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে।” বাম ছাত্রনেতার দাবি, এই আত্মহত্যাগুলির পিছনে বহুবিধ কারণ থাকতে পারে। খড়্গপুরের ঘটনাটি সামনে এসেছে, কে বলতে পারে তদন্ত হলে অন্য ঘটনাগুলিতেও অন্য কিছু বেরোত না? ময়ূখের কথায়, “আইআইটিগুলিতে একেই ভয়াবহ ফি কাঠামো। সাধারণ ঘরের ছাত্ররা পড়তে পারে না। কথা বলার অধিকার নেই। তার উপর এই ধরনের ঘটনা সার্বিকভাবে পরিস্থিতি শোচনীয় করে তুলেছে।”

আরো পড়ুন জাকারিয়া স্ট্রিটের প্রতি অনলাইন ঘৃণার নেপথ্যে

ডিএসও রাজ্য কমিটির সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় এই ঘটনায় বিজেপির পাশাপাশি বিঁধেছেন রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলকেও। তাঁর বক্তব্য, “ফয়জানের খুনের ঘটনাকে যেভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, তা থেকে স্পষ্ট, যে এর পেছনে একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ করেছে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে গোটা দেশজুড়ে, বিশেষত কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অপরাধপ্রবণতার প্রসার ঘটেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে গুমখুনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। খড়গপুর আইআইটির অভ্যন্তরেও এই পরিবেশ যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।”

তাঁর কথায় “জাতীয় শিক্ষানীতির মধ্যে শিক্ষার গৈরিকীকরণের বিভিন্ন এজেন্ডা খুবই তৎপরতার সঙ্গে রূপায়ণ করা হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের সংখ্যালঘুপ্রীতিও স্রেফ ভোটের জন্য। যথার্থ বামপন্থী আন্দোলন ও তার পরিপূরক সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ছাড়া ফয়জানদের মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকবে।”

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সভাপতি নীলাশিস বসুও ফয়জান হত্যাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখতে রাজি নন। তিনি বললেন “দলিত, মুসলিম পড়ুয়াদের ধারাবাহিক আত্মহত্যা চলছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে।”

“অধিকাংশ তথাকথিত আত্মহত্যাই আসলে প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা৷ শুধুমাত্র আইআইটি নয়, আমাদের রাজ্যের প্রেসিডেন্সি বা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গাতেও দলিত, মুসলিমদের কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে৷ ব্রাহ্মণ্যবাদী, মনুবাদীদের আখড়া হয়ে উঠছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি।”

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.