“না ঘর কা, না ঘাট কা” কথাটা শুধু জনপ্রিয় হিন্দি প্রবচন এমন নয়, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের ধারার প্রায় সারসংক্ষেপ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের আর্থিক কাঠামো চুরমার করে দিয়েছিল, কিন্তু নতুন কোনো কাঠামো নির্মাণ করেনি। কারণ তারা বুঝেছিল, এদেশ থেকে দেদার সম্পদ লুঠ করার ব্যবস্থা পাকা করতে গেলে নিজেদের দেশের মত বন্দোবস্ত চলবে না। কারণ পুঁজিবাদ যেমন লুটেরা ব্যবস্থা, তেমনই তার প্রভাবে জনগণের চেতনায় আধুনিকতার অভিঘাতও প্রবল। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার শোষিতদের মত আধুনিক যুগে শ্রমিকশ্রেণি শুধুই ফ্যালফ্যালে চোখে তাকিয়ে থাকে না। উন্নত পুঁজিবাদী দেশে চাকরি হারিয়ে ঘরে ফেরা শ্রমিক কার্ল মার্কসের লেখা বই কিনে উত্তর খোঁজে, কেন এমনটা হল। সময় এলে উপযুক্ত উপায়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, কাজের জায়গায় ইউনিয়ন গড়ে (যেমনটা ইদানীং আমেরিকায় হচ্ছে) অধিকার আদায় করে নেয়। উনবিংশ শতাব্দীর ভারতে এসব হলে আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে করে খেতে হত না। তাই আমাদের দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায়।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই জোট-নিরপেক্ষ নীতি ছিল আমাদের দেশের জন্য যথাযথ। স্বাধীন ভারতের গর্ব হিসাবে প্রমাণিত বহু জিনিসের মত নরেন্দ্র মোদী সেই নীতিটাও বিসর্জন দিয়েছেন। লাভের হার কমতে থাকায় একবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদ যখন ফের নিজের লুটেরা (পড়ুন আদিম) চেহারা সামনে আনছে, তখন শুধু শিকারী হলে তো চলবে না, উপযুক্ত মৃগয়াক্ষেত্রও তো চাই। আজকের ভারত হল সেই মৃগয়াক্ষেত্র। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পোৎপাদন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, সংস্কৃতি – সবকিছুতে উন্নত দেশগুলোতে যা কিছু বাতিল হচ্ছে, তা আমাদের দেশে নতুন যুগ বলে চালিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছে। তাই ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন সহ পরিষেবা ক্ষেত্রের দানবরা যখন খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে, সেইসময় ভারতের সংসদে পাস হয় নয়া শ্রম কোড, যার উদ্দেশ্য শ্রমিকের সমস্ত অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া। ইউরোপে যখন সরকারগুলো কোভিড প্যাকেজ ঘোষণা করছিল, তখন নয়া কৃষি আইনের অজুহাতে গরীব জনতার কোমর ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল। রেশনব্যবস্থা সংকুচিত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা ক্রমশ তুলে দেওয়া হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করছে না এমন নয়। করলে দেশদ্রোহী তকমা জুটছে, কারাবাস করতে হচ্ছে, এমনকি সেই অবস্থায় মৃত্যুও ঘটছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসাবে ফাদার স্ট্যান স্বামী।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সুতরাং আন্তর্জাতিক ফিনান্স ক্যাপিটাল নির্ভর আধুনিক পুঁজিবাদ যদি একটা কামান হয়, তাহলে সেই কামানের গোলা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছেন দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষ। আবার সেই গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হচ্ছেন তাঁরা নিজেরাই। সেই কামান চুরমার করে না দেওয়া অবধি মুক্তি নেই – এটুকুই সত্যি। এর বাইরে যে যা উন্নয়নের গল্প শোনাতে চাইছে সবই আসলে মিথ্যাচার। খুব বেশি হলে মাথায় সাপের কামড়ে মৃত্যুমুখে পতিত মানুষের পায়ে ব্যথার মলম লাগানোর মত ব্যবস্থা।

কোভিডের সময় জীবনদায়ী ভেন্টিলেটরের উপরে জিএসটি বসিয়েছিল মোদী সরকার। পিপিই কিট, যাবতীয় ওষুধপত্র, এমনকি সাধারণ ঘরোয়া জিনিসেও (যেমন শ্যাম্পু, সাবান থেকে শুরু করে উৎপাদনের মেশিনারিতে কাজে লাগে এমন জিনিস) ১৮% জিএসটি রয়েছে। অথচ ডিজিটাল লার্নিংকে মজবুত ও সহজলভ্য করতে কম্পিউটারসহ ইলেকট্রনিক জিনিসে করের সেই হার ১২%, প্রসেসড ফুডেও তাই। এর অর্থ বুঝতে দাস কাপিটাল পড়তে হয় না, সহজেই উপলব্ধি করা যায় মোদী সরকার আসলে কাদের কথা ভেবে পরিচালিত হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাজারে প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে, পেট্রোল-ডিজেলে লোকদেখানো কর ছাড় দিয়ে সরকার দেশোদ্ধার করে ফেলছে। অথচ সবকিছুর দাম বাড়লে যে শ্রমজীবী মানুষের দৈনিক ন্যূনতম মজুরিও বাড়াতে হয় সেকথা কেউ মনে রাখে না। বাজার দর বেশি বলেই ‘ঘরে-বাইরে’ নানা প্রয়োজনে যাঁরা ঠিকে কাজ করেন (ঘরবাড়ি বানানো, রংয়ের কাজ, রান্নার কাজ কিংবা ঘরদোর পরিষ্কার করার কাজ), তাঁদের বর্তমান মজুরি শুনে মাথায় হাত পড়ছে আপনার, আমার সবারই। সেটুকু বাড়তি টাকা গুনতে মধ্যবিত্তের বেজায় বিরক্তি। অথচ সেই টাকাটুকু বাড়তি রোজগার না করলে ওই যে “ওরা কাজ করে”, ওদের কিছুতেই চলে না। অর্থাৎ বাজার বলতে যা বোঝায় তার সার্বিক অবনমন ঘটেছে। পণ্যের চলাচল, পুঁজির ঘোরাফেরা ছাড়াও আরেকটা বিষয় থাকে যাকে বাদ দিয়ে বাজার চলে না – তাকেই শ্রমশক্তি বলে। অর্থশাস্ত্রে ব্যাপারটা নিছক একটা মানদণ্ড হয়ে পড়ে থাকলেও আসলে ওটাই সব, কারণ ওতেই মানুষের কথা যুক্ত থাকে।

আর সেই মানুষ যখন দুবেলা খাওয়ার মত কিছু জোটাতে পারছে না, তখন সরকারি ব্যয়বরাদ্দ থেকে মাসিক ৭,৫০০ টাকা দিতেও অস্বীকার করেছে মোদী সরকার। অজুহাত ছিল সরকারের তহবিলে নাকি যথেষ্ট অর্থ নেই। অথচ সেই একই সরকার গত দশ বছরে কর্পোরেটদের ছাড় দিয়েছে ১৩.২২ লক্ষ কোটি টাকা। ছাড় সবটাই দেওয়া হয়েছে অনাদায়ী ঋণ মকুব করে। অথচ দেশে যখন আর্থিক সঙ্কট ক্রমশ বাড়ছে, অতিমারীর প্রকোপে কাজ হারিয়ে মানুষ মরছে, তখন মাসে ৭,৫০০ টাকা দিয়ে সহায়তা করার মুরোদটুকুও ছিল না এদের।

আরো পড়ুন বাজার অর্থনীতি ও ফাটকাবাজির চাপে আলু চাষি বিপন্ন

অর্ধপণ্ডিতকুল (সোশাল মিডিয়ায় যাঁদের রমরমা) বলতে পারেন, কর্পোরেটদের ছাড় না দিলে চলবে কেন? তারাই তো কলকারখানা চালু রাখবে, সেখানে সকলে কাজ করবে, আরও লোকজন কাজ পাবে, বাজার ফের তেজি হবে। মজার কথা, আজ অবধি বেল আউট (যাতে সরাসরি কর্পোরেটদের হাতে সরকারি অর্থ তুলে দেওয়া হয়) বা বেইল ইন (যাতে বেসরকারি ঋণকে সরকারি বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়) প্যাকেজের সুবিধা নিয়ে একটাও বন্ধ কলকারখানা খোলেনি, একটা কোম্পানিও (উৎপাদনমুখী কিংবা পরিষেবাকেন্দ্রিক) ফের চালু হয়নি। যদিও দানের অর্থে শেয়ার হোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়েছে (অর্ধপণ্ডিতদের জন্য মেরিল লিঞ্চ, লেমান ব্রাদার্স দ্রষ্টব্য)। বাজারে মন্দা যখন প্রায় স্থায়ী রূপ নিচ্ছে, তখন সরকারি দানে পাওয়া টাকা নিয়ে কোনো পুঁজিপতিই উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে না। পুঁজিবাদী অর্থশাস্ত্র অত শিশুসুলভ নয়। সেই টাকা গুটিকয়েক লোকের পকেটেই ঢুকবে।

আমাদের দেশের পুঁজিপতিরা বড় বেশি ধান্দাবাজ। তারা সুযোগ খোঁজে কীভাবে নিজেদের যাবতীয় দায় সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে টুক করে কেটে পড়া যায়। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কর্পোরেটদের জন্য বড় দরদ ছিল। মোদী যতই নেহরুর বিরোধী সাজুন না কেন, আসলে তিনিও তাঁকেই অনুসরণ করছেন, কিছুটা অতিক্রমও করেছেন। ওই একই দরদ নিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চাইছেন, কর্পোরেটরা দেশের জন্য অনেক কিছু করছে, তাই সরকারি আর্থিক নীতিতে কর্পোরেটদেরই সর্বাধিক কর ছাড় দেওয়া চলছে। আন্তর্জাতিক ফিনান্স ক্যাপিটালের শব্দকোষে চোখের চামড়া বলে কোনও শব্দ নেই যে।

ক্রমশ

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.