বিরোধী দলনেত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী – নানা ভূমিকায় মমতা ব্যানার্জি যা যা করেছেন তার হাজার সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় আপনি মানতে বাধ্য যে মমতা রাজনীতি ও পরিশ্রমের দারুণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। বিরোধী দলনেত্রী থাকাকালীন তাঁর পরিশ্রম বাংলার রাজনীতিতে এক অন্য মাত্রা এনেছিল। এমনও হয়েছে, একই দিনে তিনি উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ – দুই প্রান্তে সভা করেছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনকে তিনি গৃহস্থের রান্নাঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আটপৌরে জীবনযাপন তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা দিয়েছে। মমতা যখন বিরোধী নেত্রী, সেই সময় সরকারপক্ষের বহু বামপন্থী নেতা মমতার এই প্রাণশক্তির মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করতেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে নিরাপত্তা বেষ্টনী ইত্যাদি কারণে আগের মমতাকে খুঁজে না পাওয়া গেলেও এখনো তিনি খুব সহজে সাধারণের মধ্যে মিশে যেতে পারেন। কিন্তু অভিষেক ব্যানার্জি অন্যরকম।
জনসংযোগে বেরিয়েছেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক। তুল্যমূল্য আলোচনায় উঠে এসেছে মমতার পরিশ্রম, আন্তরিক জনসংযোগ। অভিষেকের দৌলতে তৃণমূলে এখন খোলা হাওয়া, মমতার পরিশ্রমী রাজনীতির দিন ফুরিয়েছে কবেই। দল পরিচালনার জন্য এসেছিল আইপ্যাক নামক কর্পোরেট সংস্থা, হয়েছে ঝাঁ চকচকে কেন্দ্রীয় দপ্তর, দলীয় তহবিল প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার। পুরোপুরি কর্পোরেট রাজনীতির সংস্কৃতি। অভিষেক নবজোয়ার আরম্ভ করার আগে নব তৃণমূলের আয়োজন করেছিলেন। তাঁর তৃণমূলে মমতার তৃণমূল বড় বেমানান। অভিষেকের তৃণমূলে পরিশ্রমের জায়গা নেই। বাংলার রাজনীতিতে আগাগোড়া যে অনাড়ম্বর সংস্কৃতি ছিল, অভিষেকের তৃণমূল তা পুরোপুরি বাতিল করেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সামন্ততান্ত্রিক কায়দায় নিজের ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা করছেন নবজোয়ার যাত্রার মধ্য দিয়ে। পরিশ্রমবিমুখ অভিষেক ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাচ্ছেন। হুগলী জেলার আরামবাগে নবজোয়ারে হুকুম জারি করেছেন, কেউ যেন তার দিকে ফুল না ছোঁড়ে, কারণ ফুলে তাঁর অ্যালার্জি আছে। আরম্ভের সময়ে সাধারণ জনগণের কাছে নবজোয়ার ছিল এক অপার বিস্ময়। কয়েকশো কোটি টাকা, অত্যাধুনিক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত তাঁবু, রাজকীয় আয়োজন – সব মিলিয়ে অভূতপূর্ব দৃশ্যপট। পরবর্তীকালে নবজোয়ারের ভোটদান পর্বে তৃণমূলের অন্তর্কলহ নানারকম হাস্যকর মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। যেমন ভোটবাক্স লুঠ হয়ে যাওয়া, অভিষেকের সভায় বিধায়কের পকেটমারি হওয়া ইত্যাদি। কিন্তু দিন যত গেছে, ‘সামন্ত প্রভু’ অভিষেকের নবজোয়ার যাত্রা জনজীবন বিপর্যস্ত করেছে। চরম অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অভিষেকের নবজোয়ার যখন যে অঞ্চলের উপর দিয়ে গেছে, সেখানকার মানুষকেই ব্যতিব্যস্ত করেছে। অভিষেক সাংবিধানিক ক্ষমতাধারী কেউ নন, একজন সাধারণ সাংসদ। মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার সদস্যও নন, দলীয় পদাধিকারী মাত্র। অথচ তাঁর আরাম ও নিরাপত্তা নিয়ে পুলিসের অতিসক্রিয়তা লজ্জাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রশাসনের দৈনন্দিন কাজ, নাগরিক পরিষেবা বাদ দিয়ে পুলিস ব্যস্ত নবজোয়ার নির্বিঘ্ন করতে। কোথাও কোথাও প্রশাসন ঘন্টার পর ঘন্টা সড়ক, জাতীয় সড়ক পর্যন্ত অবরুদ্ধ রেখেছে অভিষেকের নিরাপত্তার কারণে। কলেজের পরীক্ষা পিছিয়ে দিয়ে পুলিস থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে কলেজর ঘরে। হাওড়া জেলায় রাস্তায়, কুকুর বিড়াল, গবাদি পশুদের পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। আরামবাগে ফুটপাথের অস্থায়ী দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, রাস্তার গর্ত ঢাকা পড়েছে। ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার মত ঝাঁটা দিয়ে রাস্তার ধুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। রাস্তার পাশে শুকনো গাছের ডাল কাটা হয়েছে। কামারপুকুরে দুদিন আগে থেকেই ছোট ছোট দোকানীদের রুটিরুজি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গরমে অভিষেকের কষ্ট লাঘবের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে কোথায় কত হাজার জমায়েত হবে। রাজার নিদ্রায় যেন ব্যাঘাত না ঘটে।
এত করেও কিন্তু রাজার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলই। ঝাড়গ্রামে কুড়মি অসন্তোষ আছড়ে পড়ল ক্যারাভ্যানে। মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা সমেত অনেকে আক্রান্ত হলেন। স্বয়ং অভিষেক প্রায় দুই কিলোমিটার পায়ে হাঁটলেন, বিলাসবহুল রথ ছেড়ে। বিদ্রোহ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ঝাড়গ্রাম তৃণমূল ব্লক অফিসে পুলিস পাহারা বসেছে। বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করার জন্য অভিষেক ৪৮ ঘন্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। মন্ত্রী অখিল গিরি পর্যন্ত পূর্ব মেদিনীপুরে নবজোয়ার যাত্রায় নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে আক্রান্ত হলেন। রাস্তায় অভিষেক দলীয় কর্মীর অভিযোগ শুনে মেজাজ হারালেন, তৎক্ষণাৎ সেখানেই আদালত বসিয়ে দলীয় প্রার্থীকে দল থেকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিলেন।
আরো পড়ুন জনসংযোগ যাত্রা নয়, জনগণের অধিকার হরণ
এখানেই শেষ নয়, ইডির নোটিসে চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও নবজোয়ার যাত্রায় বিরতি নিয়ে হাজিরা দিতে হল ইডি অফিসে। সুপ্রিম কোর্টে গিয়েও রক্ষাকবচ পাননি। এমনকি তাঁর স্ত্রী রুজিরাকেও এই সময়েই ইডি তলব করেছে। দলীয় সমীকরণ সামলাতে গিয়ে মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে নবজোয়ার যাত্রার বক্তা পর্যন্ত করেছেন। তবু কিছুতেই যেন মমতার মত হচ্ছে না। বিরোধীপক্ষকে অপ্রস্তুত করে হঠাৎ পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘোষণা হল, কিন্তু ইডি ঠিক সেদিনই জানাল, ১৩ জুন আবার হাজির দিতে হবে। মেজাজ হারিয়ে অভিষেক জানিয়েছেন তিনি কারো বাবার চাকর নন যে ডাকলেই যেতে হবে।
চরম ফ্যাসিস্ট মন্তব্য। এর অর্থ তিনি দেশের বিচারব্যবস্থাকেও মানতে চান না। বাংলার রাজনীতি অতীতে এমন পেশাদার পুঁজিনির্ভর নেতা দেখেনি। এত করে অভিষেকের কতটা লাভ হল সে তো সময় বলবে। কিন্তু বাংলার রাজনীতি যে ক্রমশ বিকৃত ধারায় বইতে আরম্ভ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কয়েকদিন আগে বারাসাতে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে দুপুর তিনটের সময়ে বামেদের সভায় উপচে পরা ভিড় হয়েছিল। নেতারা আর কর্মীরা একইভাবে ছায়াহীন ছিলেন। অথচ অভিষেকের সভায়, শুধু তাঁর আরামের কথা ভেবে মঞ্চে ছিল এয়ার কুলার। একেবারে রাজা-প্রজা সংস্কৃতি।
আসলে অভিষেক রাহুল গান্ধীর অক্ষম অনুকরণ করতে চাইছেন। কিন্তু রাহুল পায়ে হেঁটেছেন কয়েক হাজার মাইল পথ। তাঁর ভারত জোড়ো যাত্রায় নির্বাচনের কোনো প্রসঙ্গ ছিল না। কিন্তু অভিষেক পায়ে নয়, আধুনিক রথে যাত্রা করছেন। অভিষেকের নবজোয়ার যাত্রার রসদ নিয়ে মুর্শিদাবাদে পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে প্রথম দিনেই তৃণমূলের এক ব্লক সভাপতি ও বিধায়কের গোষ্ঠী প্রকাশ্যে একে অন্যকে আক্রমণ করেছে। অভিষেকের এমন খোলা হাওয়া বাংলার রাজনীতিকে কী দিচ্ছে?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








