When humans struggle over territory
It always reeks of violence and bloodshed
Even if the conflict is over a location the size of one body
On a small boat
And only for a period of two days.
No friends but the mountains by Behrouz Boochani
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তবু ভূমিখণ্ড নিয়ে নিষ্ফলা মারামারির শেষ নেই। তারই জেরে একদল দুর্বল হয়ে যায় নেই দেশের নাগরিক। “যে দেশে বাপ, দাদো তার দাদো তার দাদো যুগ যুগ ধরে বাস করে মরে ভূত” হয়ে যায়, সেই দেশ থেকেও রাজনীতির চক্করে উচ্ছেদ হয় মানুষ। তখন তাদের বোধ জন্মায়, “পোকা-মাকড়েরও দেশ আছে রে মা, আমাদের যে তাও নেই”। সেই পোকামাকড়ের থেকেও হীন মানুষদের গল্প লিখেছেন সৌরভ হোসেন। উপন্যাস – নেই দেশের নাগরিক। উপন্যাসটি গত বছর আগস্ট মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করে বাংলাদেশের ঢাকা প্রকাশ-এ । এ বছর সেটি বই হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে দুই বাংলায় আলাদা করে। ওপার বাংলায় আগে, তার কিছুদিন পরে এই পারে।
এই গল্প রোহিঙ্গাদের। বড় অদ্ভুত ভাবে এই আখ্যানের শুরু। আরাকান পাহাড়ের থেকে বর্মি সেনার অত্যাচারে উৎখাত হয়ে এক নৌকা-সম্বল পরিবার নাফ নদীতে ভেসে চলছে। সেনা-হিংসায় বিধ্বস্ত পরিবার। চোখের সামনে পরিবারের ছোট ছেলে নুহুর একমাত্র বেটার মৃত্যু দেখেছে, হিংস্র জানোয়ারের মতো নুহুর বউটাকে ধর্ষণ করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতেও দেখেছে। তারপর আর পরিবারের বাকিদের নদীতে ভাসা ছাড়া গতি কী? দুই মাঝবয়সী ছেলে মতি আর নুহু, বড় বেটার বউ-ছেলে আরিফা আর সাকিব, আর তাদের মা হালেমা মৃতপ্রায় পিতা আলি জাফরকে নিয়ে নাফ নদীর বুকে ভেসেছে। আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষার ছায়া নৌকা জুড়ে। এদিকে তাদের বাবা স্বপ্নাদেশ পেয়েছেন, তাঁর মৃত লাশ যদি কবরের মাটি না পায়, তাহলে তাঁর বংশধররাও কোনোদিন বাস করার মাটি পাবে না। আজীবন ছিন্নমূল হয়েই থাকতে হবে। আর তিনি যদি কবরের মাটি পান তাহলে, তাঁর স্বজাতিরা এই মংডুতেই দেশ ফিরে পাবে। রাখাইনই হবে তাদের দেশ। কাজেই এক চিলতে ভিটেমাটি তাদের চাই। তারই খোঁজে ভাসছে তারা। সে নদীর “এপারে আগুনের ভস্ম ওপারে ত্রিপল-ছাউনির পৃথিবী। দিনরাত দুই পার থেকে ভেসে আসা মানুষের মরণ আর্তনাদ শুনে শুনে সে পাষাণ হয়ে উঠছে। এপারে জাহলিয়াত বার্মিজ সেনাদের রোহিঙ্গা কোতল করার আস্ফালন আর ওপারে শরণার্থীশিবিরের ‘নেইদেশ’ মানুষদের না খেতে পাওয়ার বুক ফাটা কান্না।”
কিন্তু ভিটে চাইলেই পাওয়া যদি অত সহজ হত! শরণার্থীদের প্রথমদিককার ঢেউ বাংলাদেশের কূলে এসে ভেড়ার পরে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের তৎপরতা বেড়েছে। তারা আর রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দিচ্ছে না। পাড়ে কড়া নজরদারি চলছে। সব নৌকা ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। তাই এক গন্তব্য থেকে আরেক গন্তব্যে ভেসে বেড়ানোই যেন আলি জাফর ও হালেমা বিবির পরিবারের ভবিতব্য।
মতি-নূহের ছোট ভাই আতিফ কিন্তু এত সহজে ভবিতব্য মেনে নেয়নি। সে মেধাবী, রাজধানী নেপিদে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিল। সেনা অত্যাচারের থেকে সে কোনোমতে পালিয়ে বেঁচেছে। ক্রোধে-দ্রোহে সে যোগ দিয়েছে রোহিঙ্গা জেহাদিদের আরজেএফ দলে। আইএসআই আর আইএসের ছত্রছায়ায় চলে সে দল। সে ছিল অহিংস, নিরীহ, সংবিধানে ভরসা রাখা নাগরিক। আবার যদি বেহরাজ বুকানিকে স্মরণ করি, তিনি বলেছেন
When we are faced with death or fear
When we struggle against death or fear
We acquire deep insights and discover a rich understanding of these concepts
পরিস্থিতির ফেরে নিরীহ আতিফও তেতে ওঠে। সে “ভাবল, মরতে তো হবেই, স্বাধীনতার জন্যেই মরব। রাখাইনকে স্বাধীন করেই ছাড়ব। মরব, মেরেই মরব। এ জীবন আল্লাহর পথে উৎসর্গ করব।”
তারপর কী হল? পুরো কাহিনী বলে দিলে তো পাঠের মজাই নষ্ট। তাই গল্পের কথা এখানেই থাক। বরং বইটা নিয়ে দু-চার কথা বলা যাক। যতটুকু জানা আছে, উদ্বাস্তু সাহিত্য উপনিবেশোত্তর সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারা। উদ্বাস্তু পরিযান (migration) বিষয়ক সৃষ্টি নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এই বিষয়ের উপর ডকুমেন্টারি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বোল্টানস্কি বলেছেন, “that manipulates audience expectations of authenticity and ‘truth’”। কল্পনা-আধারিত উপন্যাসের ক্ষেত্রেও সে কথা খাটে বৈকি। বিশেষত যেখানে হাবিবুর রহমানের First, They Erased Our Name: A Rohingya Speaks আগেই প্রকাশিত। বাস্তবিকই, নির্মম সত্যের স্বরূপ জানার তাগিদ থাকলে স্মৃতিকথাতেই ভরসা রাখতে পছন্দ করার কথা, কাল্পনিক কাহিনীতে নয়। উপন্যাস তো ইতিহাস নয়, ইতিহাসের খণ্ড-ছায়া মাত্র।
কিন্তু তবু মনে হয়েছে সৌরভের এই লেখা মনে রাখার মত লেখা। কাহিনি-অংশের জন্য যতটা না, তার থেকে বেশি এর ভাষা-প্রবাহের দরুন। এত বলিষ্ঠ এর গদ্যরীতি যে পাতার পর পাতা উদ্ধৃতি দিলেও আশ মিটবে না। শুধু সেই কারণেই এই বই পড়া যায়, বারবার পড়া যায়। চিরাচরিত উপন্যাসের স্থান-কাল-চরিত্রের ব্যাপ্তি যেন বরং এখানে কিছুটা থেকেও অনুপস্থিত। বলা যায়, গড়নের দিক দিয়ে এটা অনেকটা যেন বিশাল বড় আকারের ছোটগল্প। শুধু তফাত এই যে এখানে দুটো আলাদা ঘটনাপ্রবাহ জড়ানো রয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত পাঠে মনে হয়েছে, আলাদা করে একটা একটা করে চরিত্রের তুলনায় যেন কালপ্রবাহের এক টুকরো ক্ষণ ধরে রাখাই লেখকের উদ্দেশ্য ছিল। তাতে বিস্তৃত ক্যানভাস হয়ত কিছুটা সঙ্কুচিত হয়েছে। তবু চরিত্রগুলির বিপন্নতা, অসহায়তার যে ছবি ফুটে উঠেছে তা অসামান্য। বাংলার গ্রামজীবনের বাকরীতিতে অভিজ্ঞ কলম লেখাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তবু এই উপন্যাসের মূল টান হয়ত অন্যত্র। এ যেন একটি রাজনৈতিক বোমা বিশেষ। দ্বেষের রাজনীতির প্রতিটি বিশ্লেষণ পড়তে পড়তে মনে হয়েছে কত সহজে এই বইয়ের জায়গায় জায়গায় আরাকানকে বদলে ভারত করে দেওয়া যায়।
“এই আরাকানে বহু বছর ধরে নানান ভাষা, নানান ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন। একসময় সৌভ্রাতৃত্ব আর সম্প্রীতির পীঠস্থান ছিল এই আরাকান। পদ্মাবতী মহাকাব্যে মহাকবি আলাওল বলেছেন, ‘নানা দেশি নানা লোক শুনিয়া রোসাং ভোগ আইসন্ত নৃপ ছায়াতলে। আরবি, মিশরি, সামি, তুর্কি, হাবসি ও রুমি, খোরসানি, উজবেগি সব। লাহোরি, মুলতানি, সিন্ধি, কাশ্মিরী, দক্ষিণী, হিন্দি, কামরূপী আর বঙ্গদেশি। বহু শেখ, সৈয়দজাদা, মোগল, পাঠান যুদ্ধা, রাজপুত হিন্দু নানাজাতি।’ এটাই ছিল আরাকানের ভিত। আজ বর্বররা এসে এসব ধারণাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে!”
মায়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনে রোহিঙ্গাদের ভূমিকার কথা লেখক মনে করিয়ে দেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জেনারেল আং সানের প্রধান রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এমএ রাশিদ আর উ নু-র ইতিহাস খুঁড়ে মনে করিয়ে দেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সব ধর্মের মানুষের হাতে হাত মিলিয়ে লড়াইয়ের কথা। মনে করিয়ে দেন ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শান স্টেইটের পাংলংয়ে ঐতিহাসিক জাতি সম্মেলনে বলা আং সানের কথা, “বার্মা হবে সব জাতির একটি ইউনিয়ন, যেখানে বর্মণরা এক কায়েত পেলে অন্যরাও এক কায়েত পাবে।”
এই ইতিহাস তো আমাদের দেশেরও ইতিহাস। লেখক আরও প্রশ্ন তোলেন, “১৯৪৮ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদ, আবুল বাশার, আব্দুল গাফফার, জোহরা বেগম প্রমুখ আরাকানের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলো থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে দেশের পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বছরের পর বছর, মন্ত্রীও হয়েছেন, সেটা কী করে সম্ভব হলো? এঁরা যদি বহিরাগতই হবেন, এঁরা যদি এদেশের নাগরিক নাই-ই হবেন, তাহলে মন্ত্রী-এমপি হলেন কীভাবে?” জিজ্ঞাসা করেন, আইন অনুযায়ী দেশের নির্বাচনে ‘বিদেশি’ ছাড়া সবাইকেই ভোট দিতে দেওয়া হলে বুথিডং আর মংডুর রোহিঙ্গা এমপিরা কাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন? যাদের ভোটে হয়েছেন তারা কী করে হুট করে ভিনদেশি হয়ে গেল?” এই প্রশ্ন কি এনআরসি-সিএএর ঘোলা রাজনীতির সময়ে আমাদেরও অনেকের প্রশ্ন নয়? আর যে প্রশ্নটা গমগম করে নিরুচ্চারে ঘুরে মরে তা হল এই বঞ্চনার রাজনীতি যদি আতিফের মত একজনকেও সন্ত্রাসের পথে গড়িয়ে দেয়, তার দায় কতখানি ব্যক্তির আর কতখানি রাষ্ট্রের?
আরো পড়ুন মিঞা মিউজিয়াম বন্ধ: কোথায় শুরু, কোথায় শেষ?
কাহিনীর দিক দিয়ে আতিফের মায়ানমারের সংসদ ভবন আক্রমণের ঘটনা বা জুনাইদ মাস্টারকে খতম করাটা বড্ড সিনেমাটিক গল্পের প্রয়োজনে টেনে আনা বলে কারো কারো মনে হতে পারে। জেহাদ-পর্বটি হয়ত এই কাহিনীর দুর্বলতর দিক। তবু তারই মধ্যে আতিফ বা নবীর মত যারা ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে জেহাদি ততটা হয়নি, যতটা স্বাধীন দেশখণ্ডের টানে হয়েছে, জুন্টা সরকারের অত্যাচারের উত্তরে, প্রতিহিংসায় এই পথ বেছে নিয়েছে – তাদের নিজেদের আলাপচারিতার মানবিক সাধারণত্ব বড্ড মন খারাপ করিয়ে দেয়। জেহাদি মানেই যে গোঁড়া যন্ত্রমানব নয়, সবাই তেমন হতে পারে না – একথা স্বস্তির তো বটেই। পরিবারের খবরের জন্য আতিফ উতলা হয়, প্রশিক্ষণ শিবির থেকে সাময়িকভাবে পালিয়ে গিয়ে তাঁদের আঁতিপাতি করে খুঁজে বেড়ায় নদীতে, অথচ কিছুতেই সন্ধান পায় না। পাঠকও যেন আতিফের উদ্বেগের অংশীদার হয়ে যান।
বইয়ের পাতা ফুরোলেও রেশ থেকে যায়। মাথায় ঘোরে হাবিবুর রহমানের একটা কথা – “A tyrant leant over my cradle and traced a destiny for me that will be hard to avoid: I will either be a fugitive or I won’t exist at all.”
এই অস্তিত্বহীনতার সঙ্কটই এই উপন্যাসের মূল সুর।
যে কখনও সবলের অত্যাচারে বাস্তুহীন হয়নি সে কি উদ্বাস্তুর যন্ত্রণা বোঝে? এই আলোচকের ধারণা, নিজের শিরা-উপশিরায় এই বিপন্নতা চারিয়ে না গেলে, খুঁটিহীন জীবনের সঙ্কট খুঁটি-পোঁতা জীবনের মানুষের সম্পূর্ণ অনুধাবনে আসে না। তাই ব্যক্তিগতভাবে উদ্ধৃতি-কন্টকিত লেখা ঘোর অপছন্দের হলেও এই লেখায় বারবার সত্যিকারের উদ্বাস্তুদের লেখার শরণ নিতে হয়েছে। আশা রাখি, পাঠক আলোচকের অপারগতা বুঝবেন।
শেষ করি আরও একটা উদ্ধৃতি দিয়ে। “সে আপন খেয়ালে গায়ে-মুখে-হাতে-পায়ে মাটি মেখেই যেতে লাগল। যেন সে রক্তমাংসের শরীর থেকে মাটি হয়ে যেতে চায়। তার রুহু আত্মা জান সন মাটি হয়ে উঠুক। যার যা ইচ্ছে, সেই মাটির উপর ঘর বাঁধুক। দেশ গড়ুক। সে মাটির উপর কোনও কাঁটাতার থাকবে না। কোনও মানুষ যেন বলতে না পারে, আমার কোনও দেশ নেই।” সৌরভ হোসেনের এই প্রার্থনার সঙ্গে গলা মেলাবেন অনেক মানুষ।
নেই দেশের নাগরিক
সৌরভ হোসেন
প্রকাশক: কেতাব-ই
প্রচ্ছদ: সুপ্রসন্ন কুণ্ডু
দাম: ছাপা বই – ৫২৫ টাকা; ই-বই – ২০০ টাকা
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








