৪
আমাদের দেশে অর্থনীতি চর্চায় যাঁরা এখনো গরীব মানুষের জীবনের সমস্যাকে প্রাসঙ্গিক মনে করেন, তাঁরা বলছেন বৈষম্যের জন্য দায়ী কারণগুলোর অন্যতম হল উপার্জন বা আয়ের ক্ষেত্রে বিরাট ফারাক। সেই ফারাকের শিকড় নিহিত রয়েছে উদ্বৃত্ত উৎপাদনের পরিমাণে। নয়া উদারবাদে প্রযুক্তিগত উন্নতিসাধন সহজ হয়েছে, দ্রুততর হয়েছে। এর প্রভাবে উৎপাদনের হার বেড়েছে, উদ্বৃত্তের পরিমাণও বেড়েছে সেই অনুপাতে। সকলেই জানি উদ্বৃত্তের উপর মালিকানা একমাত্র পুঁজিপতির, যদিও উৎপাদনের চরিত্র সামাজিক। সুতরাং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের হার যত বৃদ্ধি পায়, মুনাফার হার বা বৈষম্যের হারও সেই মত বেড়ে চলে। উদ্বৃত্ত সম্পদের উপরে একচেটিয়া ব্যক্তি মালিকানার বিষয়টাকে আলোচনার বাইরে রাখা হলে একমাত্র সঞ্চয়ের মাধ্যমেই সম্পত্তি বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে এমন যুক্তি মেনে নিতে কারো কারো আপত্তি থাকতে পারে। তাঁরা হয়ত বস্তুগত সম্পদে (ফিজিক্যাল অ্যাসেটস) বিনিয়োগকেই এমন সঞ্চয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রসঙ্গ বলে ধরে নেবেন। কিন্তু সেইসব বিনিয়োগ বাদেও সঞ্চয়ের আরেকটা কায়দার কথা মনে রাখতে হয়।
কোনো দেশের বাজারে যখন নতুন কোনো বিনিয়োগ থাকে না, তখনো সম্পদের বৃদ্ধি ঘটে সেই কায়দাতেই। এতে এক দেশের সঞ্চিত অর্থ অন্য দেশকে ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়, প্রাপ্য সুদসহ সেই অর্থই সম্পদ বৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। একটা দেশের মোট আয়ের পরিমাণে সেই দেশের অল্পসংখ্যক ধনীদের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি যে হারে হয়, তার চেয়েও দ্রুত হারে তাদের সঞ্চিত সম্পত্তির বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে দেশের মোট সম্পদ বৃদ্ধির হারের চাইতেও সেই দেশের পুঁজিপতিদের সম্পত্তি বৃদ্ধির হার বেশি হচ্ছে। অতএব উপার্জন বা আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য সম্পত্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দেয় এটা কল্পনা নয়, বাস্তবতা। (সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকনমিক্স অ্যাসোশিয়েট)
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০২২ সালে ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলী স্টেট অফ ইনইকুয়ালিটি ইন ইন্ডিয়া প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেশের অবস্থা বিবেচনা করে গরীব দেশবাসীদের জন্য রাজকোষ-নিরপেক্ষ সর্বজনীন ন্যূনতম রোজগার (ফিসকালি নিউট্রাল ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম) প্রকল্প চালু করার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ভারতে শ্রমজীবী মানুষের সবথেকে বড় অংশ (৪৫.৭৮%) স্বনিযুক্ত অথবা অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত। এদের ন্যূনতম রোজগার সংক্রান্ত কোনো আইন নেই, সমীক্ষায় উঠে এসেছে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরতদের গড় রোজগার মাসিক ১০,০০০ টাকাও নয়। এই একই সময়ে ১০% ধনীদের মোট সম্পত্তির পরিমাণ দেশের মোট সম্পদের তিন ভাগের এক ভাগ। শাস্ত্রীয় পরিভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় সম্পদ অর্থাৎ পুঁজির কেন্দ্রীভবন (কনসেনট্রেশন অফ ক্যাপিটাল)। এই লুঠ শুরু হয়েছে নয়া উদারবাদের শুরু থেকেই, আজকের ভারতে উৎকট অসাম্য সেই লুঠেরই ফল ভোগ করছে। দুর্দশা, বেকারি এবং মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ করতেই সর্বজনীন ন্যূনতম রোজগার প্রকল্পের সুপারিশ করা হয়েছে।
২০১৭ সালের ইকোনমিক সার্ভেতে প্রথমবার সর্বজনীন ন্যূনতম রোজগার প্রকল্পের কথা বলা হয়েছিল। তখন আইএমএফের তরফে প্রস্তাব দেওয়া হয় জনকল্যাণে (পেট্রোপণ্য এবং খাদ্যসামগ্রী) যাবতীয় ভর্তুকি খারিজ করে দিয়ে ন্যূনতম রোজগার প্রকল্প প্রণীত হোক। দেখা যাক ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন প্রকল্পের প্রভাব কেমন হতে পারে।
আমাদের দেশে গম একটি অন্যতম খাদ্যশস্য। ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়াকে সেইজন্যই উৎপাদিত গম সরকারি গুদামে মজুত রাখতে হয়, যাতে গণবন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে তা বিলি করা যায়। গত কয়েক বছর ধরেই কেন্দ্রীয় খাদ্য ভাণ্ডারে গমের পরিমাণ কমানো হচ্ছে। গত বছর মজুতের পরিমাণ ছিল ৪৩.৩৪ মিলিয়ন টন; এ বছর সেই লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে করা হয়েছে ১৯.৫ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ মোদী সরকার একদিকে সরাসরি নগদ টাকা হস্তান্তরের মাধ্যমে জনকল্যাণের কথা বলে। অন্যদিকে গরীব মানুষকেই ক্রমাগত সরকারি প্রকল্পের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থায় আইএমএফের সুপারিশ মেনে যাবতীয় ভর্তুকি বাতিল করে দিয়ে সর্বজনীন ন্যূনতম রোজগার প্রকল্পের অর্থ দেশের জনসাধারণের অর্জিত অধিকারগুলোকেই সরাসরি অস্বীকার করা। ১৯৯১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত গড় বেকারত্বের হার ৫ থেকে ৫.৫% বেড়েছে কমেছে। করোনা অতিমারীর প্রভাবে এবং তার মোকাবিলার নামে আকস্মিক লকডাউন ঘোষণায় ভারতের বেকারত্বের হার আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮.১০%। এই একই সময়কালে উৎপাদনে শ্রমশক্তির ভাগ কমেছে নিয়মিত। ২০২১ সালের হিসাবে সেই অংশগ্রহণ নেমে এসেছে ৪০ শতাংশে, ১৯৯১ সালে ছিল ৫৮ শতাংশেরও বেশি। বুনিয়াদি অর্থনীতিতে যাকে প্রোডাকশন পসিবিলিটি ফ্রন্টিয়ার বলে, সেই লেখচিত্র থেকে ছাত্রছাত্রীরা যা শেখে, সেসবই ভুল প্রমাণ করে দিচ্ছে আজকের ভারত।
দুটো বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, ভারতে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণ আর শুধু অশিক্ষা নয় (সংশ্লিষ্ট সময়কালে শিক্ষিত, কর্মক্ষম বেকার সম্পর্কে সরকারি প্রতিবেদনেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে)। এই কর্মহীনতার প্রধান কারণ ক্রমবর্ধমান মুনাফানির্ভর (সুপার প্রফিট) আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি নিয়ন্ত্রিত নয়া উদারবাদ, যা কাজের সুযোগ কিছুতেই বাড়ায় না (বিনিয়োগ এলেই কর্মসংস্থান বাড়বে বলে প্রচার করে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নির রাস্তা পরিষ্কার করে), বরং জনজীবনকে আরও দুর্দশার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। বর্ধিত বেকারত্ব বাজারে চাহিদার ঘাটতি তৈরি করে। এর জবাবে পুঁজিবাদ মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়। ফলে বেকারি ও মূল্যবৃদ্ধি একে অন্যকে চক্রাকার পথে বাড়িয়েই চলে। যোগান বাড়িয়ে চাহিদার ঘাটতিজনিত সমস্যার সমাধান হয় না। এমন চলতে থাকলে নৈরাজ্য তৈরি হয়, যার মোকাবিলায় একমাত্র সঠিক পদক্ষেপ পরিকাঠামো (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ইত্যাদি) খাতে সরকারি ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ যাবতীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দাম নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ ওগুলোকে সরকারি গণবন্টনের আওতায় আনা। প্রয়োজনে বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিলি করা।
দ্বিতীয়ত, পুঁজির সঙ্গে শ্রমশক্তির বাড়তে থাকা দ্বন্দ্ব। ব্যবস্থা যখন বাজার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং নীতি হল নয়া উদারবাদ, তখন পুঁজি বিনিয়োগের একমাত্র উদ্দেশ্য মুনাফা, উৎপাদন নয়। এরই কারণেই লকডাউনের সময়ে উৎপাদন না করেও (যখন কাজ হারানোর জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন) বিরাট মুনাফা করেছে দেশের কর্পোরেটরা। শেয়ার বাজার কোনো দেশেরই অর্থনীতির হকিকত দেখাবে না, যা দেখায় তা কণামাত্র উৎপাদন না করেও বিপুল মুনাফা করে নেওয়ার খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বিপুল মুনাফা নিশ্চিত করতেই সরকারি নীতিতে এমন সব পরিবর্তন করা হয় যাতে জনসাধারণ নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য ব্যাঙ্কে টাকা জমা না রেখে বাজারের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই বিনিয়োগ করতে বাধ্য হন। সেই বিপুল বিনিয়োগে বাজার ফুলে ওঠে, প্রচার চলে সুদিন সমাগত। যথাসময়ে স্বাভাবিক কারণেই এহেন উন্নয়নের বুদবুদ ফেটে গেলে জনসাধারণ রক্ত জল করা পয়সা কোথায় গেল তা খুঁজতে থাকেন এবং পুঁজি নিজের ডিভিডেন্ড পকেটে পুরে উধাও হয়ে যায়।
আরো পড়ুন আদানির ব্যাপারে হিন্ডেনবার্গের খোঁজ: অশনি সংকেত
আমাদের দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরকারি ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের অবস্থানে কিছুটা দৃঢ় রয়েছে বলেই শ্রীলঙ্কার মত এদেশের মানুষকে ২৫০ টাকায় পাঁউরুটি কিনতে হয়নি। ব্যাঙ্কের সুদ, পেনশন, গ্র্যাচুইটি, এলআইসি সমেত সংবিধানসম্মত শ্রম আইন অবধি যাবতীয় সুরক্ষা কবচ তুলে দিতে মোদী সরকারের ব্যগ্রতার কারণ বুঝতে বোধহয় খুব একটা পণ্ডিত হতে হয় না।
আজকের মূল্যবৃদ্ধির কারণ বুঝতে কারোর অসুবিধা হলে অতীতের কিছু তথ্যে মনোনিবেশ করা জরুরি। ২০০১ পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশে কৃষিকাজে লাভ ক্রমাগত কমতে থাকে। ঐ একই সময়ে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলো কৃষিক্ষেত্রে বাণিজ্য বিস্তার করতে শুরু করে। কৃষিকাজে জরুরি জিনিসগুলোর (চাষের বীজ, সার, বিদ্যুৎ, জল এবং সবশেষে ফসলের ন্যায্য বিক্রয়মূল্য) দামে সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা থেকে সেই চক্রান্ত শুরু হয়েছে। ভারতে শ্রমজীবী জনগণের বেশিরভাগই কৃষিকাজে যুক্ত ছিল। চাষের কাজ ক্রমাগত লোকসানে চলতে থাকলে এরাই দল বেঁধে কাজের খোঁজে শহরে চলে আসতে থাকে। প্রয়োজন ছিল সরকারি মান্ডি ব্যবস্থার যথার্থ সম্প্রসারণ (স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ), প্রয়োজন ছিল ফসলের ন্যায্য দাম নির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির প্রয়োগ (C2+50%) এবং একইসঙ্গে দেশজুড়ে গণবন্টন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। আয়কর সীমার বাইরে থাকা পরিবারগুলোর হাতে ন্যূনতম নগদ টাকা হস্তান্তর করার দরকার ছিল। গ্রামাঞ্চলে রোজগার প্রকল্প (এমএনআরইজিএ) আরও বাড়ানো (দুশো দিনের কাজের দাবি রয়েছে) এবং শহরাঞ্চলেও উপযুক্ত কর্মসংস্থান প্রকল্প প্রণয়ন প্রয়োজন ছিল। এসব না করে গ্রামীণ শ্রমজীবী জনতার শহর অভিমুখে অভিবাসন আটকানো যায় না, চাহিদার সঙ্কট মোকাবিলা করা যায় না, মূল্যবৃদ্ধি রোখা যায় না।
মোদী সরকার এসবের একটাও করেনি, কারণ এসব নয়া উদারবাদের স্বার্থের পরিপন্থী পদক্ষেপ। যাদের পয়সায় ভোটে লড়ে এরা ক্ষমতায় এসেছে তাদের মুনাফা লুটে নেওয়ার সুযোগ দেওয়াই কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনীতি। সেই উদ্দেশ্যেই সরকারি খাদ্যভাণ্ডারে মজুত সামগ্রী ক্রমশ কমে আর ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইনের নাম করে নির্দিষ্ট কয়েকটা কর্পোরেট সংস্থাকেই দেশের যাবতীয় সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই প্রেক্ষিতেই নয়া কৃষি আইনকে বিবেচনা করতে হয়, যদিও তার বেলায় প্রথমবার কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাপক গণপ্রতিরোধের মুখে পড়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








