কৃষি আইন প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী একটা বিপদের সম্ভাবনা তৈরি করছে। শেষ দুই বছরে বেকারি এবং মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা ক্রমশ ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে, সঙ্গে বাড়ছে মুনাফার পরিমাণ। গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি সম্পর্কিত প্রতিবেদন বলছে, আমাদের দেশে নিম্নতম আয়ের মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। যদি অর্ধেকও ধরে নেওয়া হয়, তাহলে তাঁদের অবস্থা কেমন? পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি হল এমনই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এক আন্তর্জাতিক সূচক। সহজ কথায়, কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় অভিন্ন সামগ্রীর একটা গাঁটরি (যেমনটা কোভিডের সময় রেড ভলান্টিয়ারদের উদ্যোগে বাড়িতে বাড়িতে বিলি করা হয়েছিল) কোন দেশে কত টাকায় বিকোয়। এতে যেমন বোঝা যায় কোন একটা দেশে জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান বজায় রাখতে জনসাধারণকে কত খরচ করতে হচ্ছে, তেমনই একাধিক দেশের মুদ্রার তুলনামূলক মূল্যও এর দ্বারা নির্ধারিত হয় (যেমন ডলারের সঙ্গে ভারতীয় টাকার মূল্যের অনুপাত)। সেই সূচক অনুসারে আমাদের দেশে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের এক বছরের প্রয়োজন ৫৩,৬১০ টাকা। অর্থাৎ দুজন কর্মক্ষম ব্যক্তিসহ দুটো বাচ্চা অথবা কমবয়সী সদস্য রয়েছে এমন একটা পরিবারের ন্যূনতম মাসকাবারি ব্যয় ৮,৯৩৫ টাকা। লকডাউন শুরুর দিন থেকে বামপন্থী এবং বিভিন্ন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনেরা সেই কারণেই ন্যূনতম ৭,৫০০ টাকা মাসিক নগদ টাকা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিলেন।
২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় পে কমিশনের সুপারিশ ছিল ন্যূনতম মজুরির পরিমাণ হতে হবে মাসিক ১৮,০০০ টাকা, যার সঙ্গে যুক্ত হবে সময়োপযোগী ডিয়ারনেস অ্যালাউয়েন্স (ডিএ), যা মূল্যবৃদ্ধিজনিত সঙ্কটের মোকাবিলা করবে (প্রাপ্য ডিএ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বনাম রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মামলা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক)। এটুকু জানলেই স্পষ্ট হয়, দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ কী অবস্থায় দিন গুজরান করছেন। এমন অবস্থাতেও মোদী সরকার ভর্তুকি তুলে দিতে চায়, নিয়ন্ত্রণহীন করতে চায় খাদ্যসামগ্রীর দাম। এরই নাম মোদীনমিক্স। আগের অনুচ্ছেদে উল্লিখিত বিপদ এরই নিশ্চিত ফলাফল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, কোভিড এবং লকডাউনের জন্য উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের অবস্থা যখন বেহাল, সেই অবস্থায় কর্পোরেট সংস্থাগুলো বিপুল মুনাফা করছে কী করে? এই প্রসঙ্গেই কর্পোরেট কর ছাড়ের বিষয়টা চলে আসে। উৎপাদন বন্ধ থাকার (আসলে বন্ধ রাখার) অজুহাতে কর্পোরেটদের ১.৪৫ লক্ষ কোটি টাকার কর ছাড় দিয়েছে মোদী সরকার। একইসঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি এবং কাজ হারানোর হিসাবকে যুক্ত করলে বিপুল মুনাফার উৎস সন্ধানে সময় লাগে না। সাধারণভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে উৎপাদনকে দুটো ক্ষেত্রে ভাগ করা যায়। একটা শ্রমনিবিড়, আরেকটা অপেক্ষাকৃত কম শ্রমনির্ভর। আমরা জানি, উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করে উৎপাদন খরচের পরিবর্তনশীল অংশটা, অর্থাৎ মূলত মজুরি। তাহলে উৎপাদন বন্ধ থেকেও মুনাফার নামে হচ্ছেটা কী? এহেন বন্দোবস্তের জরেই ভারতে শেষ দু বছরেই নতুন বিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে।
আরও একটা ব্যাপার আছে। অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় এমন উৎপাদন খরচের প্রাথমিক চাপটা থাকে মূলত স্থির পুঁজিতে (কাঁচামাল, মেশিন ইত্যাদি সহ পরিকাঠামো)। অপেক্ষাকৃত কম বিনিয়োগ লাগে এমন উৎপাদনে শ্রমশক্তির অংশগ্রহণই বেশি হয়। বাজারে যাবতীয় পণ্যেরই দাম নির্ধারিত হয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে গড় মুনাফা যুক্ত হয়ে। এই অবস্থায় উচ্চ মূল্যের বিনিয়োগ প্রয়োজন এমন শিল্পক্ষেত্রের তুলনায় শ্রমনিবিড় উৎপাদনে উদ্বৃত্ত সম্পদ তৈরি হয় অনেক বেশি, কিন্তু গড় মুনাফা পণ্য নিরপেক্ষ বলে উৎপাদন খরচের তারতম্যের জন্য দ্বিতীয় ধরনের পণ্যের (শ্রমনিবিড় উৎপাদন) বিক্রয়মূল্য হয়ে পড়ে কম। একদিকে উৎপাদনের স্বাভাবিক সময়ে (লকডাউন পূর্ব) চুরি করা বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত মূল্য (অ্যাবসলিউট সারপ্লাস) দখলে রইল, পরে লকডাউনের কারণে উৎপাদন বন্ধ রেখে মজুরির খরচ বাঁচিয়ে চড়া দামে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লুটে নেওয়া হল।
ছোটখাটো সংস্থাগুলো (স্বনিযুক্তি এবং অসংগঠিত ক্ষেত্র), যেখানে পাঁচজনের বেশি কর্মচারি নেই, মালিক নিজেই শ্রমিক হিসাবে কর্মরত, তারা বাজারের নিয়মের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। তাদের গিলে খেয়ে নেয় বড় কর্পোরেটরা। সুতরাং বাজারি গণতন্ত্রে যতই সমান সুযোগ বলে গলা ফাটিয়ে ফেলা হোক না কেন, আখেরে এই ব্যবস্থায় ক্রমাগত পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটে, বাজার দখল করে কতিপয় সংস্থা, যারা ‘আলপিন টু এলিফ্যান্ট’ সবকিছুই ‘সাপ্লাই’ করে। যখন দেশের প্রায় ৯৪% শ্রমজীবী জনসাধারণ অসংগঠিত ক্ষেত্রে মাসিক ১০ হাজার টাকারও কম রোজগারে বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, ঠিক তখনই বিকেন্দ্রিত উৎপাদন কৌশলের (থার্ড পার্টি সাপ্লায়ার, কন্ট্র্যাক্ট বেসড প্রোডাকশন এবং হালফ্যাশনের ওয়ার্ক ফ্রম হোম) মাধ্যমে সারা দেশের যাবতীয় ক্ষুদ্র উৎপাদনকে নিজেদের দখলে নিয়ে আসছে কর্পোরেটরা। অর্থাৎ সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো মালিকের ছাতার তলায় কাজ না করেও শ্রেণি হিসাবে ভারতের শ্রমিকরা চরম শোষিত হচ্ছেন কর্পোরেট পুঁজির জাঁতাকলে।
এই সত্যই ছাপা হয়েছিল ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত একটা বইয়ের প্রথম খণ্ডে, যার নাম দাস কাপিটাল। লেখকের নাম কার্ল মার্কস। এখনো সেই বইতে বর্ণিত শোষণের কায়দাগুলোর চেয়ে নতুন কিছু করে উঠতে পারেনি পুঁজিবাদ। নাম বদলে লুঠকে লুঠ বলে চিনতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে ‘গিগ ইকোনমি’। আসলে এটা লুটেরা পুঁজিবাদ।
৫
তাহলে কী দাঁড়াল? এক এক করে জরুরি প্রসঙ্গগুলো আলোচনা করা যাক।
আমাদের রাজ্যে উৎপাদিত হয় এমন ফসলগুলোর মধ্যে চাল, ডাল, আলু, ভুট্টা, তৈলবীজ ও বিভিন্ন শাকসবজিই প্রধান। তা সত্ত্বেও আমাদের রাজ্যে আলুর দাম ৫০ টাকায় পোঁছে গেছে, ভোজ্য তেল, ডাল সহ রোজকার খাদ্য হিসাবে শাকসবজির দামও আকাশছোঁয়া। এটাই পশ্চিমবঙ্গে আজকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনার প্রেক্ষিত। তাহলে সহজ যুক্তিতে যা উঠে আসে তা হল রাজ্যে উৎপাদনের ঘাটতি হয়েছে, বাইরের রাজ্য থেকে আমদানি করে চালাতে হচ্ছে তাই বাড়তি দর। উৎপাদন কম হল কেন? এখানেই আসে অর্থনীতির প্রসঙ্গ। কেউ মন্তব্য করতে পারেন কৃষিকাজ লাভজনক না থাকায় কৃষিজীবীরা অন্য পেশায় নিযুক্ত হচ্ছেন, বিরাট পরিমাণ চাষের জমি অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে তাই উৎপাদন কম হয়েছে। ফসলের দাম না পেয়ে অন্তত ২২০ জন চাষির আত্মহত্যার ঘটনার কথা জানিয়েছে রাজ্য কৃষক সভা (২০১৯ সাল পর্যন্ত, সূত্র: দ্য হিন্দু)। করোনা অতিমারীর সময়ে টেলিভিশনে বাইরের রাজ্যগুলি থেকে আমরা যাদের পায়ে হেঁটে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় নিজেদের বাড়ি ফিরতে দেখেছিলাম তারাও মূলত এ ধরনের কাজের সঙ্গেই যুক্ত শ্রমজীবী মানুষ।
কিন্তু রাজ্য সরকার নিজেই কৃষকসভার দেওয়া সেই তথ্যকে অস্বীকার করেছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে মোট ১,২৮৪ জন আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনও কৃষক নন। অর্থাৎ রাজ্য সরকারের বয়ান অনুযায়ী আমাদের রাজ্যে কৃষকদের এমন কোন সঙ্কট নেই যাতে তাদের আত্মহত্যা করতে বাধ্য হতে হয়। তাহলে উৎপাদনে ঘাটতি হবে কেন? ফসলের লাভজনক দাম না হোক, অন্তত ন্যায্য দামটুকু পেলে কৃষক চাষ করতে অনীহা বোধ করবেন কেন?
যদি ঘাটতির সম্ভাবনা মেনে নিতে হয় তাহলে সরকারের অপদার্থতা প্রমাণ করতে আর কিছুই লাগে না। উৎপাদনে ঘাটতি অস্বীকার করা হলে যে সম্ভাবনা পড়ে থাকে তাতেও রাজ্য সরকারের মুখরক্ষা হয় না। অর্থনীতি সত্যিই বোঝেন এমন কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী জনকল্যাণের নামে মমতা ব্যানার্জি অনুপ্রাণিত যাবতীয় শ্রী প্রকল্প। অর্থাৎ রাজ্য সরকার যেভাবে সর্বজনীন ‘ডোল’ দিতে শুরু করেছে, তাতে পরিকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয়বরাদ্দের আর সংস্থান নেই এবং এরই ফলে আভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্কট ক্রমশ চেপে বসছে। মূল্যবৃদ্ধির অনুবন্ধী সংকট হিসাবেই বাড়ছে বেকারির সমস্যা, মনে রাখতে হবে এরা সবসময় একে অন্যকে বাড়িয়ে দেয়। চাকরি চেয়ে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে বসে থাকা শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের ভিড় সেই কারণেই অর্থনীতি আলোচনার বাইরের প্রসঙ্গ নয়।
আরো পড়ুন ভর্তুকি উন্নয়নের পরিপন্থী: বাজার মৌলবাদীদের কুসংস্কার
বর্তমান প্রবন্ধকার মনে করে সঙ্কটের মূল কারণ ও তজ্জনিত ফলাফল একে অন্যের পরিপূরক। ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে (এমজিএনআরইজিএ) নিযুক্তির জব কার্ড এবং মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতিসহ স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের নিয়ন্ত্রণে ফড়েদের কারসাজির শিকার হয়ে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে উদ্ভূত ক্ষোভকে চাপা দিতে বিভিন্ন শ্রী প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ। পরে আবার সেইসব প্রকল্পের সুবিধা “ও পেলে আমিও পাব না কেন” জাতীয় মনোভাবকে সামলাতে না পেরে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মোট খরচের হিসাব ২.৬১ লক্ষ কোটি টাকা, সরকারি আয় বাবদ প্রাপ্তি মাত্র ১.৯৮ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ আয় ব্যয়ের ঘাটতির পরিমাণ ৬২,৩৯৭ কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার চড়া সুদে বাজার থেকে ঋণ নিচ্ছে, আবার পেট্রোপণ্যে বাড়তি সেসও চাপাচ্ছে। সম্প্রতি আয় বাড়াতে ট্রাফিক আইন ভাঙার ঘটনায় অভূতপূর্ব জরিমানাও হয়েছে। কিন্তু সেইসব অর্থও সরকারি বয়ান অনুসারে যাবতীয় শ্রী প্রকল্পেই খরচ হয়ে যাচ্ছে, অন্য কোনো বরাদ্দ করা যাচ্ছে না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য সরকারের দূরদৃষ্টির অভাবকেও দায়ী করা যায়, আবার সরাসরি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক যোগ্যতার প্রশ্নেও সন্দিহান হওয়া যায়।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বারবার রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ কেন্দ্র মঞ্জুর করছে না বলে অভিযোগ করেছেন। প্রাপ্য অর্থের একটা বিরাট পরিমাণ জিএসটি বাবদ নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের ব্যালান্স অ্যামাউন্ট। একথা সত্যি যে বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকার জিএসটির ক্ষতিপূরণ বাবদ রাজ্যগুলোর প্রাপ্য দিতে অহেতুক ঢিলেমি করেছে। কিন্তু সেইসব প্রাপ্য যে শুধু পশ্চিমবঙ্গই পাচ্ছে না তা নয়, কেরালার এলডিএফ সরকার আর যাই হোক বিজেপির ‘স্বাভাবিক মিত্র’ নয় একথা সবাই জানে।
এই কারণেই একেক রাজ্যে মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি একেক রকম। প্রত্যেকটা রাজ্যেই রাজ্য সরকারকে নিজস্ব উদ্যোগে কিছু কাজ করতে হয়। তার কিছুটা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা (যেমন জ্ঞানবাপী সংক্রান্ত ব্যাপক প্রচার আসলে বিজেপির ‘মাস লাইন’) আর বাকিটা দক্ষতা। সেই দক্ষতার প্রশ্নেই অর্থনীতি কাজ করে। একটা সরকার তাদের নিজেদের রাজ্যে ফসল উৎপাদনের ঘাটতি হবে কিনা আন্দাজ করতে পারে, বাজারে কোন জিনিস কতটা বাড়তি দামে বিকোতে পারে তা অনুধাবন করতে পারে এবং সেইসব ক্ষেত্রে জরুরি আগাম সতর্কতামূলক বন্দোবস্তও করা যায় – যদি সরকার সত্যিই এমন কিছু করতে চায়।
আমরা ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা আলোচনা করেছি। আমাদের রাজ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বতন্ত্র। কোনো কাজ করা হলে তার ঠিক ভুল বিচার করার বিভিন্ন স্বীকৃত পদ্ধতি রয়েছে। যখন বাড়তি কর এবং বাজার থেকে বাড়তি ঋণ আদায় করা ছাড়া একটা সরকার আর কিছুই করেনি, তখন তাকে সমালোচনার ভিত একটাই – রাজনীতি।
আজকের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি টাস্ক ফোর্স অকেজো, কারণ টাস্ক ফোর্স পরিস্থিতির মোকাবিলায় যা কিছু বলবে তার কিছুই করবে না এই সরকার। রাজ্যের উন্নয়নে পরিকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয়বরাদ্দ বাড়ানোর মত হিম্মত মমতার নেই। এমন কাজ করতে বলার মত অর্থনৈতিক দর্শনে তাঁর দলে কিংবা তাঁর সরকারের নির্বাচনী কৌশলীরা কেউই বিশ্বাস রাখেন না।
পরিকাঠামো খাতে যাতে কোন উন্নয়নমূলক, জনকল্যাণমূলক ব্যয়বরাদ্দ না হয় তা মনিটর করার জন্য প্রতি বছর আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি লক্ষ লক্ষ কোটি ডলার খরচ করে। ভারতে তাদের প্রতিনিধিরা বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার এবং তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকার – উভয়ের কাজেই খুব খুশি। কারণ উভয়েই নিজেদের জায়গায় আসলে যার বা যাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখছে তাদের ফাটকাবাজ, মুনাফাখোর ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
‘পপুলিজম’ বলুন বা অন্য কোনো নামই দিন – এসবের পিছনে আসলে যা চলছে, বিচার করতে হয় তাতে কাদের লাভ?
এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া কঠিন নয়। আজকের পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে একথা বোঝাও শক্ত নয় যে রাজ্য সরকার আসলে নিজের সাধ্য অনুযায়ী ফাটকাবাজির সুযোগ নির্মাণ করে চলেছে। সেই ফাটকাবাজি হল আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির প্রেসক্রিপশন। জনগণের জীবনযন্ত্রণা বাড়িয়ে চলা নয়া উদারবাদ নামের নরখাদক ব্যবস্থাটাকে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী রসদ জুগিয়ে চলেছে – এটাই বর্তমান অর্থনীতির আসল কথা।
ক্রমশ
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







