৬
পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঠিক কতজন রাজ্যের বাইরে গিয়ে কাজ খুঁজে নিতে হতে বাধ্য হয়েছেন? এমন তালিকা থেকে তাঁদের কথা বাদ দেওয়া চলে যাঁরা নিজেদের বিশেষ যোগ্যতার কারণে (প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন) স্বেচ্ছায় অন্যত্র চাকরি করতে গেছেন। তার বাইরেও বহু মানুষ থাকেন (এবং তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ), যাঁদের রোজগার দরকার অথচ পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত সুযোগের অভাব অনুভব করছেন। এক্ষেত্রে ‘পর্যাপ্ত’ কিংবা ‘উপযুক্ত’ – দুটো শব্দই বাড়তি কথা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত ইস্যু আসলে এগুলোই।
পর্যাপ্ত সুযোগ কী? এর অর্থ বিশেষ কোনো ধারায় উচ্চশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ না পেলেও একজন দক্ষ কিংবা অদক্ষ শ্রমিকের রোজগারের জন্য একাধিক বিকল্প থাকা। থাকলে শ্রমের বাজারে চাহিদা বজায় থাকবে, তার প্রভাবে দক্ষ কিংবা অদক্ষ দুই ক্ষেত্রেই মজুরি কিছুটা হলেও এমন হতে বাধ্য হবে যাতে মূল্যবৃদ্ধির প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। আজকাল মূল্যবৃদ্ধির মোকাবিলায় শুধুই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূমিকার (রেপো রেট, রিভার্স রেপো রেট ইত্যাদি) আলোচনা চলে। আসল কথাটা হল মানুষ নিত্যদিনের চাহিদা কমাতে বাধ্য হচ্ছেন কিনা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
উপযুক্ত সুযোগ বলতে তবে কী বোঝায়? এ হল পরিবারের ভরণপোষণ বাবদ খরচ করেও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার মত রোজগার। গোদা বাংলায়, বেঁচে থাকার দৈনিক ন্যূনতম খরচ যদি ১০০ টাকা হয়, তাহলে অন্তত ১৫০ টাকা আয় করার জায়গায় শ্রমজীবীরা রয়েছেন কিনা সেই হিসাব। এই খরচের কেবল মাথাপিছু হিসাব করলে চলে না, পরিবারের সদস্যদের কথা মাথায় রেখেই একটা গড় সূচক বিবেচনা করতে হয়। দুটোই এই মুহূর্তে আমাদের দেশ এবং রাজ্য সঙ্কটে রয়েছে।
আমাদের রাজ্য, এমনকি দেশেও, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের প্রধান সুযোগ কৃষিক্ষেত্রে। যতই অলাভজনক হোক না কেন, এখনো আমাদের দেশ চাষিদের কম লাভের বিনিময়েই খাদ্যে নির্ভরতা হারিয়ে ফেলেনি। কিছুদিন আগে কর্পোরেটরা সেই বন্দোবস্তটুকুও দখল করতে চেয়েছিল। কৃষক, খেতমজুররাই সেই অপচেষ্টা আটকে দিয়েছেন। ২০০৬ সালের সরকারি সার্ভে অনুযায়ী আমাদের রাজ্যের কৃষিব্যবস্থা একদিকে অলাভজনক, অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত শ্রমনিবিড়তা কমে যাওয়ার জন্য সঙ্কটাপন্ন। কৃষক পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম চাষের কাজে আগ্রহী নয় সেইজন্যই। তৃণমূল সরকার গলার শিরা ফুলিয়ে “জমি কেড়ে নেওয়া হবে না” ইত্যাদি বলে শেষে জমি থাকুক আর না-ই থাকুক, মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তে বাধ্য করেছে। রাজ্য সরকার ফসলের মান্ডি নির্মাণের কথা ভুলে যেতেই চেয়েছিল (কারণ ওটা কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থবিরোধী), ভুলে গেছেও। ফসলের দাম নেই, রাস্তা জুড়ে আলু–পেঁয়াজ ফেলে রেখে চাষিরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন কিছুদিন আগেই। গ্রামের পর গ্রামে মিডলম্যানদের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। গতবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে সর্বত্র সর্বস্ব লুঠ করার ঘটনা কেন ঘটেছিল তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আসলে গ্রামীণ লুটেরা গোষ্ঠীই একজোট হয়েছে তৃণমূলের ছাতার তলায়। পঞ্চায়েতের সবকটা আসনে নিজেদের লোক বসাতে না পারলে সেই লুঠের খবর ছড়িয়ে পড়বে, ভাগের টাকার নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে। তাই সবকটা আসনেই জয় চাই।
চাষের কাজে লাভ না হলে পরেরবার কৃষক (যিনি জমির মালিক) কী করবেন? চাষের কাজে নিজের তরফে গতর লাগাবেন বেশি। এর প্রভাবে খেতমজুররা কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হবেন, একটা বড় অংশের শ্রমজীবী কাজ পাবেন না। সেটাই ঘটছে।
এরপর গরীব মানুষের হাতে রোজগারের সুযোগ বলতে একশো দিনের কাজটুকুই ছিল। সেই খাতে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রক মজুরি খাতে টাকা আটকে দিয়েছে, যদিও সেই পদক্ষেপ আদতে রাজ্যে বিজেপির প্রচারের স্বার্থে। একদিকে দিনের পর দিন বকেয়া মজুরি না পেয়ে, অন্যদিকে নতুন কাজের সুযোগ না পেয়ে মানুষ কী করবেন? আমাদের রাজ্য থেকে বাইরে চলে যেতে বাধ্য হওয়া শ্রমজীবীদের প্রধান অংশ এঁরাই।
শহরের মত গ্রামেও সিন্ডিকেট রয়েছে। সেসব তৃণমূল জমানারই ফসল। অর্ধপণ্ডিতরা বলতে পারেন, সিন্ডিকেট দুরবস্থায় লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংরক্ষিত রাখে। এসব ছেলে ভোলানো তত্ত্ব শুনতে ভালো লাগে ঠিকই, বাস্তব হল কাজের সুযোগ পেতে মরিয়া মানুষের সংখ্যা একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকলে তবেই এমন বন্দোবস্ত কিছুটা কার্যকরী হয়। সার্বিক সঙ্কটে সিন্ডিকেট আদৌ কার্যকরী নয়, কারণ সিন্ডিকেট কোনো সমবায় নয়। এতে মুনাফার বেশিরভাগটাই কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত থাকে। তারাই আজকের গ্রামবাংলায় নব্য ধনিক। এরা সবাই তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে বখরার বন্দোবস্তে চলে। ভোটের সময় শাসক দলের ঝটিকা বাহিনীর জোগানদারও এরাই। কো-অপারেটিভ ব্যবসা না হয়েও মিউচুয়াল ব্যবসা হলে যেমন হয়, সিন্ডিকেট সেরকমই।
ইদানীং রাজ্যে জোর ডামাডোল চলছে। চাকরি পেতে এবং দিতে কোটি কোটি টাকা তোলার এক সার্বিক ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই মৌচাকে ঢিল পড়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত শুরু হয়েছে। একের পরে এক মন্ত্রী, নেতা, আমলারা জেলে যাচ্ছেন। শাসক দলের দু নম্বর নেতা যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েই নবজোয়ারের নামে আসলে দল বাঁচাতে জেলা সফরে বেরিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে তৃণমূলকে আসলে তারাই ‘টাইট’ দিচ্ছে বলে বিজেপি নিজেকে বিরোধী বলে প্রমাণ করতে চাইছে। মুশকিল হল মুকুল রায়কে নিয়ে। তিনি অনেকদিন আগেই সত্যি কথাটা বলে ফেলেছেন “ভারতীয় জনতা পার্টি মানেই তৃণমূল”।
আরো পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা
রইল পড়ে গরীব মানুষের যন্ত্রণা, দুর্দশা বনাম “এসব বললেই বিজেপি চলে আসবে” গোছের রাজনীতি। এই রাজ্যে বামেদের লড়াই এই দুয়ের মাঝে, এই দুয়ের বিরুদ্ধেও। সম্প্রতি সাগরদীঘির উপনির্বাচনে জয়ী বিরোধী প্রার্থীকে ‘ঘর ওয়াপসি’ করিয়ে তৃণমূল বুঝিয়ে দিয়েছে মানুষের রায়কে তারা ভয় পাচ্ছে। আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে সেই রায় আর যা-ই হোক তৃণমূলের দিকে নেই একথা প্রায় সবাই বুঝে ফেলেছে। প্রশ্ন হল, এই পরিস্থিতিতে কে কোন ভুমিকা পালন করবে। তৃণমূল চাইবেই যেনতেনপ্রকারেণ ভোটে জিততে। রাজ্য বিজেপি জানে, গুটিকয়েক জেলা বাদ দিলে তারা কার্যত আরএসএসের সাংগঠনিক দক্ষতার উপরেই নির্ভরশীল। বামেরা জানিয়েছে মানুষের অধিকারের লড়াইকে মজবুত করতে তারা শেষ অবধি যাবে। বোঝাই যাচ্ছে তাদের অনেককিছুর মোকাবিলা করতে হবে। অবশ্য বামেরাই একমাত্র, যারা নির্বাচনকে সবসময়েই কঠিন লড়াই বলেছে। কারণ নির্বাচনে জিততে অন্যান্য দল যা যা খুব সহজে করে তারা সেসব করে না, করতে পারে না। তবুও তারা লড়বে, লড়বেন মানুষও। সেই দুই লড়াই মিলে গেলে আপদ বিদায় হতে দেরি নেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









Wow,”সিন্ডিকেট tmc জামানার ফসল!!!!” ….ভালোই মিথ্যে কথা বলতে পারেন সৌভিক বাবু। আমরা সবাই জানি , 30 + বছরের ” dictatorship of proletariat ” র রূপ। denialism যেন কমিউনিস্টদের মূল পন্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে । indian specially bengal কমিউনিস্টরা আরো এককাঠি উপরে। নিজেদের দোষ তো তারা জীবনে স্বীকার করবে না। কে ওদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে…পশ্চিমবঙ্গের গুন্ডারাজ তাদের cadre-based পলিটিক্সের ফসল।।
Denialism is so high …that they deny…স্তালিনের গণহত্যা, চিনের বর্তমান উইঘুর গণহত্যা…আর নিজেদের “গর্বের” মরিচঝাঁপি ….they will do whataboutry while asked of their own genocides…
বললাম না, নিজেদের দোষ স্বীকার তারা কোনোদিন করবে না। নিজেদের তো কোনো economic আদর্শ নেই…communist metaphysics..Lelinist praxis…এই দিয়ে যে দেশের বিশ্বের কোনো সমস্যার সমাধান করা যাবে না..তা তারা কোনোদিন বুঝবে না। সবাইকে এমনকি অমর্ত্য সেন কেও এরা শোধনবাদী বলে!!!??
Hey comrade… please stop dogmatic purity……Embrace Social-Democrat creed, Social-Contracy metaphysics, take empirical cue from South asian studies…and make praxis based on Developmental economics….