দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে, টুইটারে ছাঁটাই পর্ব উঠেছে চরমে। এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, প্রায় হাজার চারেক লোককে ইতিমধ্যেই ছাঁটাই করেছেন ইলন মাস্ক। চুয়াল্লিশ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনে নেওয়ার পর কর্মীদের ইমেল করে তিনি জানিয়েছেন টুইটারের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গেলে নাকি ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ, শুক্রবার তাঁর করা একটি টুইট থেকে জানা যাচ্ছে, টুইটার প্রতিদিন চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সান্ত্বনা দেওয়ার ঢঙে সেই টুইটে যোগ করেছেন, যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে তাদের তিন মাসের বিদায়ী ভাতা (severance) দেওয়া হচ্ছে। আইনত যা দেওয়ার কথা, সে ভাতা নাকি তার ৫০% বেশি। যে কোম্পানি দৈনিক চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতিতে চলে সে কোম্পানি কেনার জন্য ইলন এত লাফালাফি কেন করেছিলেন সে প্রশ্ন থাক। তিনি যে টুইট মডারেশনে যুক্ত আস্ত বিভাগগুলোকেই কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তুলে দিচ্ছেন, তার ভুয়ো খবর, হিংসাত্মক বাচনের উপর কী প্রভাব পড়বে এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী হবে – সে আলোচনাও অন্য দিনের জন্য তোলা থাক। বরং আরেকটি ছাঁটাইয়ের ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক।

শাহরুখ খানের ওকালতি এবং বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের জামায় জ্বলজ্বলে লোগোর কারণে বাইজু’স নামটি এখন কারোর জানতে বাকি নেই। অনলাইনে লেখাপড়া করিয়ে ছেলেমেয়েদের সব পরীক্ষায় দারুণ নম্বর পাইয়ে দেবে – এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাইজু রবীন্দ্রনের এই এডটেক স্টার্টআপ চালু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর হল। এরই মধ্যে এত উন্নতি করেছে যে ভারতীয় ক্রিকেট দলের শার্ট স্পনসর হয়েছে, চলতি ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির অ্যাসোশিয়েট স্পনসর হয়েছে। উপরন্তু, দিন দুয়েক হল নিজেদের এক ‘নন-প্রফিট’ উদ্যোগের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করেছে লায়োনেল মেসিকে। খেয়াল করুন, সুনীল ছেত্রীকে নয়, ক্রিকেট তারকাদের কাউকেও নয়, একেবারে মেসি। মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার যাকে বলে। অথচ এই বাইজু’সই সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করেছিল তারা আড়াই হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। কারণ গত চার বছরে কোম্পানির যে বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে তার ফলে কোম্পানির বৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে এছাড়া উপায় নেই। এই যুক্তি গত সোমবার (৩১ অক্টোবর) এক লিঙ্কডইন পোস্টে বাইজু’স দিয়েছিল। এই টেকসই করে তোলার অঙ্গ হিসাবেই তিরুবনন্তপুরমের টেকনোপার্কে বাইজু’সের অফিস তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে ১৪০ জন কর্মীর চাকরি যেত। কিন্তু কোম্পানির সংগঠিত কর্মীরা এবং কেরালা সরকার সে গুড়ে বালি দিয়ে দিয়েছেন। বুধবার (২ নভেম্বর) মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং রাজ্যের লেবার কমিশনার ডক্টর বাসুকির সাথে বাইজু রবীন্দ্রনের বৈঠকের পর ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। টেকনোপার্কের কর্মী সংগঠন প্রতিধ্বনি টেকনোপার্ক হপ্তাখানেক আগে কেরালার শ্রমমন্ত্রী ভি শিবনকুট্টির সঙ্গে নিজেদের পরিস্থিতি জানিয়ে সাক্ষাৎ করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতেনাতে ফল পাওয়া গেল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

টুইটার আর বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের ঘটনা পরপর ঘটায় একটি সুবিধা হয়েছে। এ দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষ ছাঁটাইয়ের বিভীষিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন, অনবরত কথাবার্তা বলছেন সোশাল মিডিয়ায়। ফলে সচরাচর ছাঁটাইয়ের পক্ষে যেসব যুক্তি তাঁরা দিয়ে থাকেন সেগুলোর বৈধতা নিয়ে আলোচনা করার পরিসর তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণের যুগে সারা ভারতে (কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়) বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক কত শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন তার হিসাব কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমমন্ত্রকও দিতে পারবে বলে মনে হয় না। ঠিক কত মানুষ কৃষিকাজ অলাভজনক হয়ে যাওয়ায় প্রবাসী শ্রমিক (পরিযায়ী শ্রমিক কথাটা অশ্লীল। কলকাতাবাসী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বেঙ্গালুরুতে চাকরি করতে গেলে তাকে পরিযায়ী ইঞ্জিনিয়ার বলি কি?) হয়ে গেছেন তার হিসাবও যেমন দেশের সরকার রাখে না। ভাগ্যিস অতিমারী এল! নইলে তো আমরা মনে করতাম শ্রমিকদের জীবন মৃত্যুর হিসাব রাখে দেশের সরকার ঘটনা হল, ও হিসাব আমরাও রাখি না। ফলে ছাঁটাইয়ের হিসাব রাখারও প্রশ্ন ওঠে না। কারণ আমরা যারা গাঁটের কড়ি খরচ করে খবরের কাগজ পড়ি, টিভিতে খবর দেখি বা হাতের স্মার্টফোনে ফেসবুক টুইটার দেখি এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে খবর সংগ্রহ করি – তাদের বাড়ির লোকেরা সাধারণত কারখানার লে অফে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মহারাষ্ট্রে নির্মাণ শ্রমিক হয়েও তাদের যেতে হয় না। কিন্তু আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্কার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইত্যাদি হয়। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, টুইটার বা অ্যামাজনে চাকরি পেলে আমরা শতমুখে তা বলে বেড়াই। সুন্দর পিচাই, সত্য নাডেলা বা পরাগ আগরওয়ালকে দেখে আমাদের চোখ চকচক করে। মনে হয় আমার বাড়ির ছেলেটিও তো একদিন ওই উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ফলে যে লে অফ দেশের হাজার হাজার বন্ধ কারখানার শ্রমিকের দরজায় আতঙ্কের উপর্যুপরি ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়তে পড়তে অবশেষে গা সওয়া হয়ে গেছে গত ৩০ বছরে, সেই লে অফ ইলনের কল্যাণে অবশেষে হ্যাশট্যাগ হয়ে আমাদের ঘুম কেড়ে নিতে পেরেছে।

ছাঁটাই
কর্মীদের উদ্দেশে ইলন মাস্কের চিঠি। ছবি টুইটার থেকে

ঘুম ছুটে যাওয়া অনেকসময় ভাল, কারণ তাতে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠা যায়। আমরা সাদা কলারের শ্রমিকরা (হ্যাঁ, শ্রমিকই। সেটা ছাঁটাই হওয়া মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পান) সেই নয়ের দশক থেকে ছাঁটাই সম্বন্ধে যা জেনে এবং বিশ্বাস করে এসেছি, টুইটার ও বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের আঁধারে আসুন সেগুলিকে প্রশ্ন করি। প্রথমত, আমরা জানি যে ছাঁটাই কখনো এমনি এমনি করা হয় না। করা হয় ব্যবসার প্রয়োজনে। কীরকম প্রয়োজন? ইলন বলছেন কোম্পানি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন, বাইজু বলেছেন কোম্পানির বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন। দুজনেই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ধরে নিয়েই এগোনো যাক।

প্রথম জন স্বেচ্ছায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি কোম্পানিকে কবজা করলেন, তারপর আবিষ্কার করলেন সে কোম্পানি লাভজনক নয়। তাই তিনি লে অফ করবেন। দ্বিতীয় জনের বয়ান অনুযায়ী, ব্যবসা প্রত্যাশার চেয়ে বড় হয়ে গেছে, তাই মুনাফা করতে হলে ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। ইলনের ইচ্ছে হয়েছিল বলে টুইটার কিনেছিলেন, এখন দেখছেন সামলাতে পারবেন না। তার খেসারত দিতে হবে হাজার চারেক কর্মচারীকে। বাইজুর ইচ্ছে হয়েছিল বলে গত বছর আকাশ ইনস্টিটিউট কিনে নিয়েছিলেন। তার মার্কেটিং এবং ক্যাম্পেনের জন্য ৭.৫% হারে ৩০০ কোটি টাকা ধারও নিয়েছেন গত মাসে। তার আগে বর্তমান লগ্নিকারীদের থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থও সংগ্রহ করেছেন। এদিকে রাজস্ব আদায় নাকি আগের বছরের ১,৯১৮.২৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২১ আর্থিক বর্ষে ১,৩৭৮.৫১ কোটি টাকা হয়ে গেছে। অথচ মেসির পারিশ্রমিক দেওয়া যাচ্ছে, কর্মীদের চাকরি না খেলে চলছে না। অর্থাৎ দুই ধনকুবের কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গানের মত “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে/বিরাট শিশু আনমনে”। তাঁরা কেবল নিজের টাকা নিয়ে নয়, হাজার হাজার কর্মচারীর বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও খেলবেন। খেলতে খেলতে যখন মনে হবে যথেষ্ট মজা (অর্থাৎ মুনাফা) হচ্ছে না, তখনই ছাঁটাই করবেন। যুক্তিটা নিজের মত করে বানিয়ে নেবেন আর আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন ছাঁটাই বিনা কারণে হয় না, তাই আপনি নিজে লেড অফ হলেও মাথা নেড়ে বলবেন “সত্যিই তো। ব্যবসার স্বার্থে তো এটা করতেই হবে।”

কর্মী ছাঁটাই করে বা ‘পে কাট’ করে বৃহৎ পুঁজির ব্যবসার কতখানি স্বার্থরক্ষা হয় সে সম্পর্কে আরেকটি উদাহরণ দিই। এই উদাহরণ অতীতেও দিয়েছি, কিন্তু বধিরদের শোনাতে বিস্ফোরণের প্রয়োজন হয়। এক বিস্ফোরণে কাজ না হলে বারবার বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতের অন্যতম বৃহৎ মিডিয়া হাউসের মালিকানাধীন একটি খবরের কাগজ সম্পাদকীয় পাতায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিল, সংবাদপত্র শিল্প বিপন্ন এবং তাকে বাঁচাতে হলে সরকারি সাহায্য প্রয়োজন এবং কর্মী সংকোচন ছাড়া উপায় নেই। কারণ কর্মচারীদের মাইনে দিতে বিপুল খরচ হচ্ছে। ২১ তারিখে দিল্লির সাংবাদিকদের সংগঠন দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টসের সভাপতি এস কে পাণ্ডে এবং সাধারণ সম্পাদক সুজাতা মাধোক এক লিখিত বিবৃতিতে জানান, ভারত সরকারের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রককে কোম্পানিগুলি যে হিসাবপত্র জমা দেয় তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই মিডিয়া হাউসের বাৎসরিক আয় আনুমানিক ৪৮০০ কোটি টাকা আর বেতন বাবদ খরচ করে প্রায় ৫৫১ কোটি টাকা, অর্থাৎ আয়ের মাত্র ১১%। উপরন্তু ওই ৫৫১ কোটির ১০২ কোটি খরচ হয় মাত্র ৪০ জনকে মাইনে দিতে। এই মিডিয়া হাউসটি পরে অতিমারীর সময়ে এক বড় অংশের সাংবাদিক এবং অসাংবাদিক কর্মীদের ছাঁটাই করে এবং যাদের ছাঁটাই করা হয়নি তাদেরও মাইনে কমিয়ে দেয়।

যে কোনো কর্পোরেট, তার ব্যবসা যা-ই হোক, এরকম বেতন কাঠামোতেই চলে। তাহলেই বুঝুন, কর্মী ছাঁটাই করলে ব্যবসার কতটুকু স্বার্থরক্ষা হয়।

এবার ছাঁটাই সম্বন্ধে দ্বিতীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা যাক – ছাঁটাই হয় উদ্বৃত্ত, অযোগ্য লোকেরা।

আগেই বলেছি, লে অফ খেলা ছাড়া কিছুই নয়। বুঝে নেওয়া দরকার, যে এ খেলার গোলপোস্ট বসায় মালিক পক্ষ, ইচ্ছা অনুযায়ী বড় ছোটও করে মালিক পক্ষই। সুতরাং কে প্রয়োজনীয় আর কে উদ্বৃত্ত, কে যোগ্য আর কে অযোগ্য – তা-ও ঠিক হয় মালিক পক্ষের ইচ্ছানুযায়ী। সে ইচ্ছা যে নিতান্ত যুক্তিহীন, তা অবশ্য নয়। যুক্তিটা কী? যুক্তি হল মালিক সে বছর কতটা মুনাফা করতে চাইছেন। যদি চাহিদা খুব বেশি হয়, তাহলে প্রমাণ করা হবে উঁচু পদের বিরাট অঙ্কের বেতন পাওয়া কর্মচারীরা উদ্বৃত্ত। নইলে প্রমাণ করা হবে নিচুতলার এবং মাঝের সারির কর্মীরা উদ্বৃত্ত। এই কারণেই ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক মন্দার সময়ে ভারতের বহু তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিতে উচ্চপদস্থদেরই চাকরি গিয়েছিল। আবার ২০১৯-২১ সময়কালে ভারতের সংবাদমাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ছাঁটাই হয় সেখানে কোনো মিডিয়া হাউস বিদায় করেছিল মাসে কয়েক লক্ষ টাকা মাইনে পাওয়া সম্পাদকদের, কোনো হাউস আবার ওসব বাছবিচার না করে কাগজের আস্ত সংস্করণ, আস্ত চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছিল।

এ তো গেল উদ্বৃত্তের কথা। আর যোগ্যতা? আমাদের অনেকেরই ধারণা, ছাঁটাই হয় কেবল অযোগ্য কর্মীরা। কখনো ভেবে দেখেছেন, যে অযোগ্য তাকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছিল কেন? অতীতে ভারতে যখন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমস্ত শিল্পেই জোরদার ছিল, তখন বলা হত ট্রেড ইউনিয়নের চাপে নাকি দরকারের চেয়ে বেশি লোক নিতে হয়েছিল, অযোগ্য লোক নিতে হয়েছিল। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তো সরাসরি অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক কারণে বহু উদ্বৃত্ত কর্মচারী নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে সাদা কলারের চাকরিতে ইউনিয়ন তো কার্যত উঠে গেছে। সমস্ত কর্পোরেট অফিসে বাহারি এইচ আর ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। তারা প্রায় সেকালের পাত্রী দেখার মত “চুল খুলে দেখাও তো মা”, “হেঁটে দেখাও তো মা” পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ করে। এতৎসত্ত্বেও এত অযোগ্য কর্মী আসে কোথা থেকে? তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, তারা ইন্টারভিউয়ে চালাকি করে ঢুকে পড়ে। যদি বা পড়ে, তারা যে অযোগ্য সে কথা কোম্পানির মুনাফার ক্ষিদে বেড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কারোর খেয়াল হয় না কেন? অনেকসময় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সর্বশেষ আভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে যে কর্মচারী ভাল রেটিং পেয়েছে সে-ও ছাঁটাই হয়ে গেল। কী করে এমন ঘটে?

আসলে যোগ্যতার গোলপোস্টও মালিক পক্ষের মর্জিমাফিক সরিয়ে ফেলা হয়। নইলে পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়া যে ইঞ্জিনিয়াররা এত বছর ধরে টুইটার চালাচ্ছিলেন তাঁরা রাতারাতি এই শুক্রবার অযোগ্য হয়ে গেলেন কী করে?

ছাঁটাই সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন – এই মর্মে এত দীর্ঘ আলোচনা ফেঁদেছি কেন? কারণ এর পরিবর্তন না ঘটালে যাঁরা এখনো ছাঁটাই হননি তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন অদূর ভবিষ্যতে। অতিমারীর সময়ে যখন চারদিকে বিভিন্ন শিল্পে লে অফ আর পে কাট চলছে, আমার এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রতিবেশী সগর্বে বলেছিলেন “আমার চিন্তা নেই। আমি জানি আমার যোগ্যতা আছে। একটা গেলে আরেকটা ঠিক পেয়ে যাব।” কেবল অযোগ্য লোকেরা ছাঁটাই হয় – এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে গেলে ওরকম অকারণ নিরাপত্তায় ভোগা অসম্ভব নয়। টুইটার, গুগল, মেটা ইত্যাদি হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানি। তারা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করে তা-ই বিশ্বের সর্বত্র অনুসরণ করে থাকে ছোট, বড়, মাঝারি কোম্পানিগুলি। সুতরাং কোনো কর্পোরেটের কোনো কর্মচারীই যে নিরাপদ নন তা বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে। অনুসিদ্ধান্ত হিসাবেই বুঝতে পারা উচিত যে লে অফের আসল কারণ, কোনো শিল্পেই, ব্যবসা বাঁচানো নয়। দীর্ঘকাল বলা হত শ্রমিক আন্দোলনের জন্য, ধর্মঘট, পেন ডাউন ইত্যাদির জন্য ব্যবসার ক্ষতি হয়। ফলে ছাঁটাই করতে হয়, শিল্প তুলে দিতে হয়। তা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বা সংবাদমাধ্যমে তো ওসব বালাই নেই। ধর্মঘটই বা কোথায়? তবু কেন শিল্প নড়বড়ে? কেন ছাঁটাই করতে হচ্ছে?

সুতরাং ছাঁটাইয়ের আসল কারণ হল মুনাফা বাড়ানো। কত বাড়ানো? এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, কারণ মালিকের লোভের কোনো শেষ নেই। যে কোনো স্তরের কর্পোরেট কর্মচারীই জানেন, আজকাল পরের আর্থিক বর্ষের ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয় আগের বছরের মুনাফা অনুযায়ী। আগেরবারের চেয়ে বেশি মুনাফা না করা গেলেই হিসাবে ক্ষতি লেখা হয়। অর্থাৎ লাভ-ক্ষতির সংজ্ঞাই বদলে ফেলা হয়েছে পুঁজির হাঙরের ক্ষিদে মেটানোর জন্য। এই ক্ষিদে যে কোনোদিন আপনাকেও গিলে নেবে। আপনার যোগ্যতা আপনার বর্ম নয়।

আরো পড়ুন দেশ চলছে গিগ অর্থনীতিতে: কাজ আছে, চাকরি নেই

লোক কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর আরও উৎকৃষ্ট পন্থা মালিকদের নজরে পড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্বয়ংক্রিয়তা (automation)। সেই ধারাবাহিকতাতেই এসে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটারের আগমনে কিছু মানুষের কাজ গিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলেও যাবে। সবাইকে তৈরি থাকতে হবে। যে প্রশ্নের উত্তর নেই সে প্রশ্ন তোলা চলবে না – এরকম গা জোয়ারি চিন্তায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। সে অভ্যাস থেকে বেরোতে আমাদের বাধ্য করবে অদূর ভবিষ্যৎ। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, কোথাও কি থামা উচিত? প্রযুক্তি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ প্রযুক্তির জন্য? স্বয়ংক্রিয়তা তো আবিষ্কৃত হয়েছিল মানুষের ভার লাঘব করার জন্য? মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া কি স্বয়ংক্রিয়তার কাজ? এসব প্রশ্ন তখন তুলে কোনো লাভ হবে না, কারণ অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা আমরা অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছি।

একা একা মৌলিক প্রশ্ন তুলে অবশ্য কোনোদিনই কোনো লাভ হয়নি। তিরুবনন্তপুরমের বাইজু’স কর্মীরা ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাতে পেরেছেন একজোট হয়েছেন বলে। সম্প্রতি আমাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় অ্যামাজনের কর্মীরাও লড়াই করে ইউনিয়ন করার অধিকার আদায় করেছেন। কিন্তু ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়। ইউনিয়ন করবে চটকলের শ্রমিকরা; বড়জোর সুইগি, জোম্যাটো, ফ্লিপকার্টের ডেলিভারি বয়রা; উবের, ওলার ড্রাইভাররা। সাদা কলারের সম্ভ্রান্তবংশীয়রা হাড়িকাঠে গলা দিয়ে বেচারা জল্লাদের বাঁচার প্রয়োজন বিবেচনা করে সসম্মানে বলি হবেন।

5 মন্তব্য

  1. বাইজুস বা টুইটারের মতন কোম্পানি বা এম এন সি রা প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশনের জন্যই যে ব্যবসা করে এটা তো কারোর অজানা নয়। আমরা যখন সেই সব চাকরির জন্য লালায়িত হই, তখন তো আমরাও জানি যে বড়লোকের হাত ঝাড়লেই পর্বত আর সেই পর্বতের খুঁদকুড়োর অংশ নিতেই তো সেই চাকরি নেই। ভারতে তেন্ডুলকার পভার্টি লাইনের হিসেব অনুসারে ২০১১-১২ সালে শহরাঞ্চলে মাথা পিছু প্রতি মাসে খরচ ছিল ১০০০ টাকা, আজকের হিসেবে চারজনের সংসারে , ইনফ্লেশন ধরে আর সমপরিমাণ টাকা সঞ্চয়ের বাবদ ধরলে তাহলে মোট দরকার বছরে তিন লাখ টাকা। আরও বাড়িয়ে ধরা যাক পাঁচ লাখ টাকা। এই টাকাতেই অনেক ভারতীয়র আজও হেসে খেলে দিন কাটে। অথচ আমরা যখন প্রবাসী ইঞ্জিনীয়রের চাকরি খুঁজি আমরা কজন ওই বছরে পাঁচ লাখ টাকার প্যাকেজে সন্তুষ্ট হই? আমরা টাকা দিয়েই যোগ্যতা মাপতেই অভ্যস্ত। অথচ তথাকথিত যোগ্যতা যে আদতে একটা সুযোগ-সুবিধার সাম টোটাল সেটাও সুবিধামত ভুলে যেতে ভালবাসি। আজকের বাজারে যে ছেলেটা তিরিশ লাখ টাকার স্টার্টিং স্যালারিতে কলেজ থেকে সদ্য বেরিয়ে কোন কোম্পানিতে জয়েন করছে, (অন্য রকম জীবন বেছে নেওয়ার চয়েজ তারও ছিল, তার বদলে সে এটাই বেছে নিয়েছে ), একটু চোখ কান খোলা থাকলেই তার কিন্তু জানার কথা যে সে আসলে তার নিজের পোটেনশিয়ালকে নিলামে চড়াচ্ছে কোম্পানির নিজস্ব শর্তানুসারে। আর সেই শর্তাবলীর মধ্যে হায়ার এন্ড ফায়ারও আছে। সুযোগ নেওয়ার সময় নিজেকে যোগ্যতর ধরে নিয়ে নিলামে অংশ নেব, সামান্যতম সুযোগে হায়ার পে প্যাকেজের টানে ( বা বেটার রোল / কাজ যেটা আখেরে পে প্যাকেজকেই পুষ্ট করবে ) অন্য কোম্পানিতে জয়েন করব, অথচ শুধু হায়ার এন্ড ফায়ার এর বেলাতেই ইউনিয়ন বদ্ধ হব, এই বা কেমন কথা? বছর দশেক আগেই কলকাতারই বড় আইটি কোম্পানিগুলোতে এক দেড় বছরের অভিজ্ঞতায় ছয়-সাত লাখ টাকা পাওয়াটা কোন ব্যাপার ছিল না। কলকাতার বাইরে আরও বেশি। আর মিড রেঞ্জে পৌঁছে সেটা দর কষাকষির খেলায় দশ থেকে শুরু হয়ে আকাশ সীমা। আর সবটাই ইন্ডিভিড্যুয়াল অ্যাচিভমেন্ট বলেই দেখা হয়। কাজের বেলায় যতই দলগত কাজ হোক, মাইনের বেলায় টিমের সবার এক স্যালারি তো দূর স্থান, এক ইনক্রিমেন্টও গ্রহণ যোগ্য নয়। এই উড়ন্ত টাকার বাজারের র‍্যাট রেসে যে স্বেচ্ছায় নাম লেখায় তার লে অফ এর বিরুদ্ধে ক্যাপিট্যালিস্ট মালিকের পুঁজিবাদী চেতনার প্রতিবাদ করার নৈতিক অধিকার থাকে কি? সে নিজেও কি যথেষ্ট পুঁজিবাদী নয়? সব হোয়াইট কলার চাকরি এক হয় না। যে চাকরি তে মানুষ ওই নূন্যতম মাইনে পান তার চাকরি যাওয়া নিয়ে সরব হওয়া যাক। কিন্তু যারা স্বেচ্ছায় এই চক্রে ঢুকেছেন, আর সেই সঙ্গে নূন্যতম মানের অনেক উপরে মাইনে পাচ্ছেন তাঁদের নিয়ে মাথা না ঘামানই ভাল।

    • গণ্ডগোল তো হায়ার অ্যান্ড ফায়ার নীতিতেই। প্রতিবাদের অভিমুখও সেদিকেই হওয়া উচিত বলে লেখকের অভিমত। একবিংশ শতাব্দীর ভোগবাদ সকলকেই স্বার্থপর করে তুলছে, কজন আর ব্যতিক্রম হতে পারে। সকলকে টপকে সকলের মাথায় পা দিয়েই যে উন্নতি করতে হবে এ শিক্ষা তো স্কুলজীবন থেকে শুরু হয়। নইলে ট্রেড ইউনিয়ন অপ্রয়োজনীয়, এমনকি ক্ষতিকর, একথা সাদা কলারের কর্মীদের মাথায় ঢোকানো তো সম্ভবই হত না। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যে বেছে নেওয়ার সুযোগ ছাত্রজীবন থেকেই কমে আসে। আমরা যাকে বেছে নেওয়ার সুযোগ বলে ভাবি, তা কি সত্যিই বেছে নেওয়ার সুযোগ? নাকি মানুষকে তার অজান্তে নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢালাই করা? সবমিলিয়েই তো আজকের অবস্থা। বেছে বেছে প্রতিবাদ করলে কোনো প্রতিবাদেরই কোনো ফল হবে বলে মনে হবে না।

  2. একটা ছোট অনুরোধ, নাগরিকের টেকনিকাল টিমকে। লেখার মধ্যে যখন হাইপারলিঙ্ক দিচ্ছেন, নজর রাখুন, সেই হাইপারলিঙ্কে ক্লিক করলে নতুন পাতাটি যেন ব্রাউজারের নতুন ট্যাবে খোলে। এই মুহূর্তে কী হচ্ছে, নতুন লিঙ্কের পাতাটি ব্রাউজারের এই ট্যাবেই খুলছে, ফলে এই লেখাটা মাঝপথে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার “ব্যাক” করে এই লেখায় ফিরতে হচ্ছে এবং খুঁজে বের করতে হচ্ছে কোন প্যারাগ্রাফে আমি ছিলাম।

    খুব সহজ পদ্ধতি। যিনি লেখাগুলোকে আপলোড করছেন, তিনি অবশ্যই জানবেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.