দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষে তৈরি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেশপ্রেমের রাষ্ট্রীয় আস্ফালনে আমরা একথা ভুলতে বসেছি। দেশ কী, দেশপ্রেম কী, দেশদ্রোহিতা কাকে বলে সবই ঠিক করে দেবে রাষ্ট্র। জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান জানানো থেকে শুরু করে জাতীয় পতাকা উত্তোলন – সবই করতে হবে রাষ্ট্রীয় নির্দেশ অনুযায়ী। শক্তি প্রদর্শনের এই রাষ্ট্রনীতিতে নাগরিকরাই ব্রাত্য হয়ে যান। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরের আড়ম্বরে আড়ালে চলে যায় দেশের সম্পদ উৎপাদনকারী শ্রমজীবী মানুষের জীবন। যাদের শ্রমের বিনিময়ে জিডিপি বাড়ে, জাতীয় আয় বাড়ে — তাঁরাই দেশপ্রেমের এই হুজুগে কোণঠাসা হয়ে যান। পুঁজির শৃঙ্খলে পরাধীন শ্রমিকের জীবনে তাই স্বাধীনতার মানে একেবারেই অন্য।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দীর্ঘদিন লক আউটের পর সম্প্রতি খোলা এক জুটমিলের শ্রমিক হরি পাশোয়ান। তিনি বহু বছর সেই মিলে কাজ করছেন। মিল খোলার পর কাজও পেয়েছেন। কিন্তু ভাগাওয়ালা হিসাবে, স্থায়ী শ্রমিক হিসাবে নয়। কারণ তাঁর আধার কার্ডের তথ্যে কিছু ত্রুটি রয়েছে। তাই যাঁর নামে কাজ পেয়েছেন, তাঁকে মজুরি থেকে প্রতিদিন ৭০ টাকা করে দিতে হয়। রাষ্ট্রের নিয়মের জটিলতায় দীর্ঘকাল ধরে মিলে কাজ করা একজন ব্যক্তি এখন শ্রমিকের কাজ করেও খাতায় কলমে আর শ্রমিক রইলেন না। তাঁর শ্রেণি পরিচয় বেমালুম উবে গেল। এমন হেনস্থা কি স্বাধীন দেশের নাগরিকের প্রাপ্য? তাঁর এই পরিচয় সত্তার সংকটকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বন্ধ কারখানার বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের ডিজিটাল রেশন কার্ডের অদ্ভুতুড়ে খেলায় হঠাৎ করে রেশনে গম পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আসামে নিজের জেলা থেকে অন্য জেলায় কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক, প্রয়োজনীয় নথি না দেখাতে পারায় এনআরসির নিয়মে বিদেশি তকমা পেয়ে যান। এভাবেই দেশ চলছে। প্রতিনিয়ত এভাবেই রাষ্ট্র নিয়মের জটিলতায়, আস্ফালনে শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। দুঃখের কথা হল, এসব আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিতেও শিখে গেছি। রাষ্ট্রের বাধ্য থাকাই যে দেশে দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, সেই দেশ কি সত্যিই স্বাধীন?

শ্রমিকের প্রতি চরম অবজ্ঞা, দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের ন্যক্কারজনক চিত্র দেখা গিয়েছিল বছর দুয়েক আগে। অপরিকল্পিত লকডাউনে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকরা রাতারাতি যেন অনাগরিক হয়ে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্র কোনো দায় নেয়নি। শ্রমিকদের মৃতদেহের চিত্রকে ছাপিয়ে গিয়েছিল কখনো আলো জ্বালানো, কখনো শাঁখ, কাসর ঘন্টা বাজানোর নাগরিক উন্মাদনা। আমাদের যুক্তিবোধ, মানবিকতা সব অকেজো, অবশ হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রের সুরে সুর মেলানো, তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে নির্ঘন্ট অনুযায়ী ঘরে থাকা, বাইরে বার হওয়া, মুখোশ পরা – এসবই হয়ে উঠেছিল দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়। আমরা প্রায় সবাই যেন রাষ্ট্রবাদী হয়ে গিয়েছিলাম। সহনাগরিকদের প্রতি সন্দেহ, ভাইরাসে আক্রান্ত হলে চূড়ান্ত হেনস্থা করাই আমাদের কাছে পরম কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়েছিল। এমন অবস্থায় সেই শ্রমিকদের দূরবস্থা সহানুভূতিপূর্ণভাবে বিচার করার বোধই গিয়েছিল হারিয়ে। আজও কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে, শ্রমিক কাজ হারালে, সেই সহনাগরিকদের দুরবস্থার কথা অনেকের ভাবনাতেও আসে না।

দেশবাসীর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, অসহিষ্ণুতা আজ দেশপ্রেমের প্রধান মাপকাঠি। তাই শ্রমিকের সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য লুঠ করে শিল্পপতিদের ধনকুবের হওয়া আমাদের বিচলিত করে না। এক ক্ষেত্রের শ্রমিক অপর ক্ষেত্রের শ্রমিকের কথা ভাবেন না। অধিকাংশই রাষ্ট্র নির্দেশিত ‘উন্নয়ন’ পরিকল্পনার মোহে আবিষ্ট হয়ে গেছি। যে উন্নয়ন অতিমারীকে কাজে লাগিয়ে অবাধে শ্রমিক ছাঁটাই করে, কারখানা বন্ধ করে, কাজের সময় বাড়িয়ে মজুরি কমিয়ে দেয়। যে উন্নয়ন আসলে পুঁজির দাসত্ব করে। পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্বে খোলাখুলি পুঁজির পক্ষ নেয়।

দেশের সংবিধান রচনার সময় নেতাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভারতের বহুত্ববাদকে রক্ষা করা। রাজ্যগুলির পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত গড়ার কাজ খুব সহজ ছিল না। তারই সঙ্গে ছিল দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার সমস্যা। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারতের সংবিধানে সমানাধিকারের কথা বলা হয়। সকল নাগরিকের সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবস্থায় বাস্তবে কি সমানাধিকার সম্ভব? এই সংবিধান ব্যক্তিগত সম্পত্তির ‘পবিত্র’ অধিকারকে রক্ষার অঙ্গীকারও করেছে। শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য লুঠ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়ানোর অধিকার আর হুজুর-মজুরের সমানাধিকার সোনার পাথরবাটির মতোই অলীক কল্পনা।

রাষ্ট্রনেতারা তা জানতেন না এমন নয়। একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গণতন্ত্রের যতটুকু প্রলেপ দরকার  ছিল, ততটুকুই দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীন ভারত প্রথম থেকেই চলেছিল উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পর সংকট থেকে বাঁচতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রনীতি বদলাল। পুঁজির বিকাশের স্বার্থেই রাষ্ট্র ‘জনকল্যাণমূলক’ আর্থিক নীতি গ্রহণে বাধ্য হল। স্বাধীন ভারতও সেই পথেই এগিয়ে চলে। অতি প্রচারিত ‘মিশ্র অর্থনীতি’ আসলে ছিল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। সদ্য স্বাধীন ভারতে পুঁজিবাদের বিকাশের জন্য রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। গড়ে তোলা হয় একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থা। বিদেশি আর্থিক অনুদান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় স্বাধীন ভারতে দেশীয় শিল্পপতিরাই দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হয়েছিলেন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী, সাংসদ ডঃ মেঘনাদ সাহা ১৯৫৪ সালে লোকসভায় রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সেই নগ্ন রূপ তুলে ধরেছিলেন। তিনি সেদিন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কর্পোরেশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনসাধারণের অর্থ শিল্পপতিদের পকেটে চলে যায়। মিশ্র অর্থনীতিতে এভাবেই শিল্পপতিরা মূলধন যোগাড় করে। ১৯৬৫ সালে একচেটিয়া অনুসন্ধান কমিশনের রিপোর্ট জানিয়েছিল, ৭৫টি একচেটিয়া শিল্পগোষ্ঠীর হাতে দেশের ১৫৩৬টি শিল্প সংস্থা রয়েছে। যত বছর গেছে, তত এই কেন্দ্রীভবন ও মনোপলি বেড়েছে।

শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা বুঝতে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এই চরিত্র বিচার করা প্রয়োজন। পুঁজি-শ্রমের দ্বন্দ্ব বিচার না করে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা বোঝা যায় না। ‘কল্যাণমূলক’ রাষ্ট্র সেদিন শ্রমিকশ্রেণিকে অনেক রক্ষাকবচ দিয়েছিল।  শ্রমিকরা আইনি অধিকার পেয়েছিলেন। কাজের নিরাপত্তা, অবসরের পর নানা সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শ্রমিকের ক্রয় ক্ষমতা বাড়িয়ে চাহিদা বাড়ানো এবং শ্রমের বাজারকে স্থিতিশীল করার প্রয়োজন ছিল। সবই করা হয়েছিল পুঁজিবাদের স্বার্থে। পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মধ্য দিয়েও শ্রমিকশ্রেণি অনেক অধিকার অর্জন করেছিল। বলা ভাল, রাষ্ট্র সেইসব অধিকার দিতে বাধ্য হয়েছিল। তার মধ্যে কোনো সমাজতান্ত্রিক উপাদান ছিল না। শ্রেণি আন্দোলন, গণআন্দোলনের পথে স্বাধীন ভারতের নাগরিকদের অনেক অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছে। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই, সেদিন ভারতের শাসকরা শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে বা অন্তত শ্রেণি নিরপেক্ষ ছিল। রাষ্ট্র থাকলে, তার শ্রেণিচরিত্রও থাকবে। শ্রেণি নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না। স্বাধীন ভারতে তাই শ্রমিকদের আন্দোলনও রাষ্ট্রের আক্রমণের মুখে পড়েছে। সরকার বারবার মালিকের পক্ষ নিয়েছে। শ্রমিক অবাধে ছাঁটাই হয়েছে, কারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকারত্বও থেকেছে। কিন্তু কিছুটা হলেও আইনি লড়াইয়ের সুযোগ ছিল। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও আর্থিক দাবির পাশাপাশি শ্রেণি আন্দোলনের প্রশ্নে রাজনৈতিক লড়াই ছিল।

বর্তমানে সেই পরিসর ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। অনেককাল আগেই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাকে ব্রাত্য করে, পুঁজিবাদ নয়া উদারনীতির পথ গ্রহণ করেছে। যার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার কেড়ে নেওয়া। শ্রমের বাজার শস্তা করতে শ্রমিকের অর্জিত অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া। রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের কল্যাণে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা শিল্পগোষ্ঠীগুলো লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে কিনে নিচ্ছে। কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই নয়, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদেও তারা একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করতে চায়। উদারিকরণ-বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়নের এই পথে শ্রমিকের কাজের নিরাপত্তা নেই। আর্থিক-সামাজিক সুরক্ষা থাকছে না। কাজের সময় থেকে শুরু করে মজুরি – সবই ঠিক করে দেবে মালিক। শ্রম বিধি চালু করে রাষ্ট্র কর্পোরেট তোষণে কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। খেয়ে পরে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সংবিধান প্রদত্ত অধিকার শ্রমিকশ্রেণির কাছে আজ প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়। পঁচাত্তর বছর ধরে স্বাধীন আমাদের দেশ। সেখানে শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার, প্রতিবাদ করার অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

শ্রমিকদের সিংহভাগ অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত। তাঁদের জন্য কোনো আইনি রক্ষাকবচ কার্যত থাকছে না। প্রতিটি ক্ষেত্রে অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে, স্থায়ী চাকরি অতীত হতে চলেছে। হায়ার এন্ড ফায়ার নীতিতে শ্রমিকের ন্যূনতম অধিকার থাকছে না। কেন্দ্রের শ্রম বিধিতে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের আইনি অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। অসংগঠিত শ্রমিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আবার বাংলায় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের নামে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের সুযোগ দেওয়া একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ সরাসরি চলে যাচ্ছে সরকারের তহবিলে।

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কাজের অধিকার মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি পায়নি। একশো দিনের কাজের প্রকল্পে শ্রমিকের আইনি অধিকারগুলি কার্যক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হচ্ছে। কেন্দ্রের অর্থ বরাদ্দ কমছে। রাজ্য সরকারও দলবাজি, দুর্নীতির মাধ্যমে আইনি অধিকারকে ভিক্ষায় পরিণত করতে চাইছে। জব কার্ড, কাজের আবেদন করার সুযোগ পেতে শাসক দল এবং জনপ্রতিনিধিদের অনুগত হতে হবে। আবেদন করার, কাজ না পেলে ভাতা পাওয়ার আইনি অধিকার থেকে শ্রমিক বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি মাসের পর মাস সরকারি এই প্রকল্পের মজুরিও বকেয়া থাকছে।

একই অবস্থা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বা দপ্তরে কাজ করা চুক্তি বা ঠিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের। সরকারি দপ্তরগুলিতেও অস্থায়ী ভিত্তিতে এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে। তাঁদের মজুরি, বেতন বা সাম্মানিক – যে নামেই অর্থ দেওয়া হোক, তা স্থায়ী কর্মীদের থেকে অনেক কম। নেই কাজের নিশ্চয়তা, নেই অবসরকালীন সুযোগসুবিধা। অনেক ঠিকে শ্রমিক সরকারি কাজে নিয়মিত বেতনটুকুও পাচ্ছেন না। অঙ্গনওয়াড়ি, আশা, পৌর স্বাস্থ্য, মিড ডে মিল সহ বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মীদের বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের নীতি আজ পুলিশ থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী – সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে। সরকার কখনো আইন লঙ্ঘন করে, কখনো আইন বদলে দিয়ে নয়া উদারনীতি অনুসারী শ্রম বিধি কায়েম করছে।

আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই

নতুন করে বলবার দরকার নেই, যে বেসরকারি সংস্থাগুলি এই অবস্থায় কী করছে। সরকারের নীতিতে শ্রমিকের সর্বনাশে তাদেরই পৌষ মাস। কাজের বাজারে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা, কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে। বেকারত্ব যত বাড়বে, তত শ্রমের বাজার শস্তা হবে। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের আজ নির্দিষ্ট জীবিকা নেই। নানা কাজের মাধ্যমে কোনোমতে দিন গুজরান করছেন, অসংগঠিত ক্ষেত্রে ভিড় বাড়াচ্ছেন। জীবিকার মতো তাঁদের বাসস্থানও অনিশ্চিত। বিভিন্ন স্থানে ঘুরে শ্রমশক্তি বিক্রি করার জন্য তাঁরা কার্যত ভেসে বেড়াচ্ছেন।

দেশ চলছে গিগ অর্থনীতিতে। এই অর্থনীতির ধারা অনুযায়ী ডেলিভারি বয় থেকে শুরু করে নানারকম নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, কর্মসংস্থান হচ্ছে, উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের না আছে নির্দিষ্ট মজুরি, না কাজের স্থায়িত্ব। পরিষেবা ক্ষেত্রে নিযুক্ত বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের ন্যূনতম অধিকার, মর্যাদা কিছুই নেই। তাঁদের কাজ আছে, কিন্তু চাকরি নেই। ভারত আজ শস্তা শ্রমের বাজারের জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজির লোভনীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। আবার মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলে ভারতের শিল্পগোষ্ঠীগুলির পুঁজিও বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। পঁচাত্তর বছরের স্বাধীন দেশের জন্য একথা গর্বের নয়, লজ্জার। যে দেশ সিংহভাগ মানুষকে বঞ্চিত করে, তাঁদের মনুষ্যেতর জীবন কাটাতে বাধ্য করে সে দেশ স্বাধীনতার গৌরবে গৌরবান্বিত হতে পারে না। জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে আমাদের সেই কথাও আজ ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকের শ্রেণি পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে জাতি, ধর্ম, ভাষা ইত্যাদির পরিচয়কেই সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। একমাত্র শ্রেণি আন্দোলনের পথেই শ্রমিকের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.