তৌফিক আর হুসেন পাঠানের নাম হয়ত অনেকেই শোনেননি। না শোনারই কথা, যেমন কিছুদিন আগে অবধি আমরা আরও একটি নাম জানতাম না – মহম্মদ মানিক। এমনিতেই মানুষের স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী, তার উপর স্মার্টফোনের যুগে প্রতি মুহূর্তে এত খবর যে মনে রাখাই মুশকিল। তৌফিক আর হুসেন হচ্ছেন সেই দুজন মানুষ, যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুজরাটের মাচ্ছু নদীর ওপরে ঝুলন্ত মরবী সেতু ভেঙে পড়ার পর বেশ কয়েকজনের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। মানিকের কথা এতক্ষণে নিশ্চয়ই মনে পড়েছে পাঠকের। কিছুদিন আগে মালবাজারে মাল নদীর হড়পা বানে ভেসে যাওয়া থেকে অন্তত দশজন মানুষকে উদ্ধার করে তিনি নায়কের তকমা পেয়েছিলেন। এই তিনজন মানুষের এক জায়গাতেই মিল। তাঁরা বিকাশ বোঝেন না, উন্নয়ন বোঝেন না, রাজনীতিও বোঝেন না। তাঁরা বোঝেন মানুষ বিপদে পড়লে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, হিন্দু-মুসলমান দেখতে নেই।

কিন্তু তাঁরা না চাইলেও, রাজনীতি তো আছে। যে মরবী সেতু ভেঙে শিশুসহ প্রায় ১৫০ জন মানুষ মারা গিয়েছেন সে সেতু প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। শোনা যাচ্ছে, সাত মাস ধরে এই সেতু বন্ধ রেখে যাদের মেরামতির বরাত দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের নাকি এ কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। আমার আপনার বাড়িতে যে মশা মারার ব্যাট বা অজন্তা দেওয়াল ঘড়ি দেখা যায়, সেই সংস্থার মালিক অরেভাকে এই বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। কে বা কারা এই বরাত দিয়েছিল, তাতে কার লাভ হয়েছে তা নিয়ে এখন বিতর্ক শুরু হয়েছে। আরও শোনা যাচ্ছে, বরাত দেওয়া হয়েছিল দু কোটি টাকার। অথচ মাত্র ১২ লক্ষ টাকা খরচ করেই তারা জানিয়ে দিয়েছে কাজ হয়ে গেছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যথারীতি বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদীর অনুগত সংবাদমাধ্যম যে যারা ওই দুর্ঘটনার আগের মুহূর্তে মরবী সেতুতে উঠেছিলেন তাঁদের দিকেই আঙুল তোলা শুরু করেছে। যেন তাঁরাই সেতু ভেঙে পড়ার জন্য দায়ী। ওই সেতুতে উঠে ওরকম লাফালাফি করা কি উচিৎ হয়েছে – এ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে আসল প্রশ্নগুলো। যেমন কীভাবে যথেষ্ট পরীক্ষা না করে, ফিট সার্টিফিকেট ছাড়াই সেতুটিকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলো তড়িঘড়ি? যে প্রধানমন্ত্রী গুজরাট নির্বাচনের প্রাক্কালে রোজ মাইলের পর মাইল গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বিভিন্ন প্রকল্প উদ্ধোধন করছেন, তাঁর মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করতে এবং গুজরাট মডেলকে আরও উঁচুতে তুলে ধরতেই কি এ কাজ করা হল? সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, এই ঘটনা ঘটার পরমুহূর্তেও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী প্রচার বন্ধ করেননি। বলেছেন এই ঘটনায় তিনি দুঃখিত, ভারাক্রান্ত। কিন্তু ছুটে যাননি। গেছেন দুদিন পরে, সেই হাসপাতালে যেখানে আহতরা ভর্তি। কিন্তু সেখানেও কাজ করেছে তাঁর নিজস্ব ক্যামেরা এবং জনসংযোগ দেখানোর চেষ্টা। হাসপাতালটিকে রাতারাতি সারানো হয়েছে, রং করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আসবেন বলে কথা। ছবি যদি ওঠে, সেই ছবি বা ভিডিওতে যেন কোনো খুঁত না থাকে। বাইরে থেকে মানুষ যেন বুঝতে না পারে হাসপাতালটির ভগ্নদশা। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই কি তবে বিকাশ, এই কি তবে গুজরাট মডেল?

এতকিছু কিন্তু তৌফিক আর হুসেন বোঝেন না, তাঁরা শুধু তাঁদের কাজ করেছেন। ২০০৯-১০ সাল থেকেই একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে – গুজরাট মডেল। কী সেই মডেল? যে ফানুস ওড়ানো হচ্ছিল ২০০৯ সাল থেকে, তাতে এমন কী ছিল যার রোশনাইয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মোদী? ছিল শিল্প, ঝাঁ চকচকে রাস্তাঘাট, প্রচুর কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি আরও কত কী? কিন্তু উন্নয়ন মানে কি শুধু এইসব? উন্নয়ন মানে তো মানুষের উন্নয়ন। এবার তাহলে দেখে নেওয়া যাক গুজরাট মডেলের সত্য। অর্থাৎ কতটা সত্য আর কতটা প্রচারের ঢক্কানিনাদ।

লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের অধ্যাপক মৈত্রীশ ঘটক লিখেছিলেন প্রদীপের নিচেই যে অন্ধকার থাকে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল গুজরাট। বৃদ্ধির সূচক যা-ই দেখাক, দারিদ্র্য, অসাম্য বা মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে গুজরাট কিন্তু দেশের মধ্যে বেশ নিচের দিকে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের উন্নতি হলেও দরিদ্র মানুষের কাছে কিন্তু এই উন্নয়ন চুঁইয়ে পড়েনি। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের অনুপাতে গুজরাট ত্রয়োদশ স্থানে। অন্যান্য সূচকের দিকে তাকালেও দৃশ্যটা প্রায় একইরকম। শিশুমৃত্যুর হারে গুজরাটের স্থান সপ্তদশ। জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের অনুপারে গুজরাট দেশের মধ্যে ২১ নম্বরে। পুরুষের তুলনায় মহিলার সংখ্যা নিম্নগামী। এই ধরনের সমস্ত সূচককে এক জায়গায় করলে গুজরাটের স্থান দশম। মোদী যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন সেই সময়ের হিসাব নিয়েই এই সূচক তৈরি হয়েছে এবং এগুলো সবই সরকারি তথ্য। তাহলে কিসের এত প্রচার? বিজেপি যে রাজ্যে রাজ্যে ক্ষমতায় এলে গুজরাট মডেল প্রতিষ্ঠা করে দেবে বলে, তাতেই বা কী লাভ হবে?

আরো পড়ুন প্রশাসনের দীর্ঘ ঘুমের ফলে ডুবল আমাদের পূর্ব বেঙ্গালুরু

তাহলে উন্নয়ন কি কেবল কিছু মানুষের জন্য? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবেন? বেশকিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং কেরালা বিভিন্ন সূচকে গুজরাটের থেকে এগিয়ে আছে। স্রেফ বৃদ্ধির কথাও যদি ধরা যায়, তাহলে দেখা যাবে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং তামিলনাড়ু গুজরাটের চেয়ে এগিয়ে। তাহলে গুজরাট মডেলের বদলে অন্য কোনো রাজ্যের মডেল কেন দেখা হবে না?

আজ গুজরাট মডেল নিয়ে এতগুলো কথা বলতে হচ্ছে কারণ এই মডেল যে ফাঁপা তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন গুজরাট তথা দেশের মানুষ। যতই চাপা দেওয়ার চেষ্টা হোক না কেন, এই বিকাশের মডেলে যে হাতেগোনা কিছু মানুষেরই উন্নতি হচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই কথাটাই বা আজ নতুন করে কেন বলতে হচ্ছে? কারণ এতজন মানুষ মারা গিয়েছেন। অনেকে কলকাতার পোস্তা ফ্লাইওভার ভেঙে যাওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী কী বলেছিলেন তা আবার ফিরিয়ে এনেছেন সোশাল মিডিয়ায়। বলছেন মোদীর কথা মত যদি পোস্তার ঘটনায় ভগবানের হাত থেকে থাকে, তাহলে মরবী সেতুর ঘটনায় কার হাত আছে? একদিকে প্রধানমন্ত্রী বলে চলেছেন তিনি দুর্নীতি একদম বরদাস্ত করেন না, অথচ তাঁর নিজের রাজ্যেই যে মরবী সেতু নিয়ে এতবড় দুর্নীতি হয়েছে, সে বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। অবাক করার কথা, যে মমতা ব্যানার্জি দুদিন আগে অবধি মোদীর নামে সকাল বিকেল গালমন্দ করতেন তিনিও ধরি মাছ, না ছুঁই পানি গোছের বক্তব্য রেখেছেন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যে দুর্নীতির হাত আছে, তা যে কেন বেশিরভাগ বিরোধী দল বুঝতে চাইছে না, বা বুঝলেও খোলাখুলি বলতে চাইছে না, সেটাই আশ্চর্যের।

দুর্ঘটনায় কার হাত আছে জানা নেই। কিন্তু আজও যে বহু মানুষ ওই সেতু ভেঙে পড়ে যাওয়ার পরেও বেঁচে আছেন, তাতে এমন দুজনের হাত আছে যাদের নাম শুনলেই সন্ত্রাসবাদী বলে মনে করা আজকাল দস্তুর। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীরও একবারও মনে হয়নি, তৌফিক আর হুসেন পাঠানের হাতই ঈশ্বরের হাত, ধন্যবাদ দিতে হলে তাঁদেরই দেওয়া উচিত। অনেক রাজনীতি হবে, অনেক তদন্ত কমিশন হবে, বড্ড বেশি মানুষ বানের জলে ভেসেও হয়ত যাবেন। কিন্তু তৌফিক আর হুসেনের হাতকে ধন্যবাদ জানানোর ফুরসত কি হবে আমাদের?

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.