দিনটা ছিল রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর। রাত তখন প্রায় নটা-দশটা হবে। চতুর্থ বেঙ্গালুরু বেঙ্গলি-কন্নড় ফিল্ম ফেস্টিভালের সমাপনী অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। পরিচালক গিরিশ কাসারাভাল্লি অনেকক্ষণ ধরেই অ্যাপ ক্যাব খুঁজেও পাচ্ছেন না। এম জি রোডের হোটেল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ক্যাব না পাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না। সম্মানীয় অতিথিকে তো বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে, তাই আমাদের ফেস্টিভাল ডিরেক্টর মধুশ্রী, নীলাদ্রি ও আমি গিরিশ স্যারকে নিয়ে চললাম তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে। এম জি রোড থেকে তাভারেকেরে পৌঁছাতে গুগল ম্যাপ যে রাস্তা দেখাচ্ছিল তা বেশ অবাক করার মতন। গিরিশ স্যারও বললেন যে ম্যাপ ঘোরাচ্ছে। তাঁর নির্দেশিত সঠিক পথে ঢুকতেই চক্ষু চড়কগাছ। বহুদিন পরে ব্যাঙ্গালোরের রাস্তায় খানাখন্দ দেখতে পেলাম না। রাস্তাই নেই তার আবার খানাখন্দ। চারিদিকে জল, মাঝে আমরা যেন নোয়ার নৌকায়। কোনোরকমে সেই সসাগরা রাস্তা থেকে ইউ-টার্ন নিয়ে চললাম অন্য আরেকটি রাস্তার উদ্দেশ্যে। না, ভাগ্য সেখানেও সহায় হলেন না, আবার নতুন রাস্তা। এইভাবে প্রায় অর্ধেক বেঙ্গালুরুর চক্কর কেটে আমরা শেষমেশ গিরিশ স্যারকে পৌঁছে দিতে পারলাম।

ফিরতে না ফিরতেই একগুচ্ছ কল। ক্যাব না পাওয়ার কারণে আমাদের বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবক বাড়ি পৌঁছতে পারছে না। আমাদের বেশকিছু লোক নিজেদের গাড়িতে বাড়ি চলে গিয়েছিল, তাদেরই আবার ফিরিয়ে আনা হল সহকর্মীদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এম জি রোডে কিন্তু তখনো জল জমেনি। এতসব কাণ্ড করে যখন শুতে যাওয়ার কথা ভাবছি, তখনই একের পর এক মেসেজ। আমাদের আবাসনের বেসমেন্ট জলে ভাসছে। সবাইকে আহ্বান করা হচ্ছে গাড়ি সরাতে। মনে মনে বললাম, খুব বাঁচা বেঁচে গেছি, ভাগ্যিস ফেস্টিভালের জন্য রাতটা হোটেলে কাটাতে হবে!

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই যথারীতি হোয়াটস্যাপ খুলে বসলাম। অনেকেই সময়মত বেসমেন্ট থেকে গাড়ি সরাতে পারেননি। গাড়িগুলোকে এখন ঠেলে বার করতে হচ্ছে। গ্যারেজে পাঠাতে হবে, কম পক্ষে লাখ দুয়েক খরচা। দমকলের গাড়ি এসে বেসমেন্টের জল বার করছে। আমাদের ইলেকট্রিক সার্কিট বোর্ড সব ডুবে গেছে, রাত থেকেই বিদ্যুৎ নেই। হোটেল থেকে চেক আউট করে আমাদেরও সেই অন্ধকারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে হল। এম জি রোড থেকে আমাদের বাড়ি আসতে শুরুতে কোথাও সেরকম ট্রাফিক জ্যাম পেলাম না। সমস্যা শুরু হল কাদুবিসনাহাল্লি পেরিয়ে। আমাদের বাড়ির পথের শেষ দুই কিলোমিটার অতিক্রম করতে সময় লাগল প্রায় দু ঘন্টা। এইখানে বলে রাখি, বেঙ্গালুরুর বন্যা বলে যার প্রচার চলছে তা কিন্তু আদতে পুরো বেঙ্গালুরু ভাসায়নি। বন্যার কবলে পড়েছিল শুধুমাত্র পূর্ব বেঙ্গালুরু, বাকি শহর তখনো অক্ষত।

পুরনো বেঙ্গালুরু অর্থাৎ মালেশ্বরম, জে পি নগর, জয়নগর বা অন্যান্য অঞ্চল এই বন্যার কবলে পড়েনি। গত কয়েক বছরে পূর্ব বেঙ্গালুরুর জনবসতি অতি দ্রুত ঘন হয়ে উঠেছে। কোরামঙ্গলা, এইচএসআর লে-আউট, ইন্দিরানগর যেমন বসবাসযোগ্য করার দায়িত্ব নিয়েছিল বিডিএ (ব্যাঙ্গালোর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি)। মারাথাল্লি, বেলান্দুর অঞ্চল কিন্তু পুরোপুরি বিডিএর দায়িত্বে ছিল না। কোরামঙ্গলা, বিটিএম লে-আউট – এইসব নতুন অঞ্চলে গেলেও ব্লকে ব্লকে দেখতে পাবেন খেলার মাঠ। বেলান্দুর, সারজাপুরের কিছু অংশে তা দেখা গেলেও বন্যাকবলিত বেশিরভাগ অঞ্চলেই তা বিরল। প্রাইভেট লে-আউটের নিকাশি ব্যবস্থা কতটা যথাযথ তা সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি?

ফিরে আসি আমাদের আবাসনে। রবিবার দুপুরে যখন এসে পৌঁছলাম তখনো বিদ্যুৎ নেই, জল নেই। খাওয়ার জলের ক্যান কিনে আনলেও উপরে পৌঁছে দেওয়ার কেউ নেই। লিফট বন্ধ। সবচেয়ে বড় কথা, আবাসনের পার্শ্ববর্তী রাস্তায় জলের কণামাত্র নেই। তাহলে জল বাইরে থেকে ভিতরে ঢোকেনি, আসলে ভিতরের জলই বাইরে যেতে পারেনি।

ছোটবেলায় খুব ‘ম্যান মেড’ বন্যার কথা শুনতাম আর হাসতাম। এবার চক্ষু সার্থক করে ম্যান মেড বন্যা দেখলাম। আমাদের আবাসন থেকে বড় নালায় (রাজকালভে) জল যাওয়ার যে নালা তার পুরোটাই ভরে ছিল প্লাস্টিক, পুরনো কাঠের প্যাকিং বাক্স, বস্তা, খাবার প্লেট ইত্যাদি জঞ্জালে। সেই নালা পরিষ্কার করতে আনা হল আর্থ মুভার। পুরো নালা পরিষ্কার করে খোঁড়া হল, তারপর দমকল ডেকে জল বার করা হল। আমরা শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা যদি আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতাম, তাহলে আমাদের আবাসন হয়ত ভাসত না। বেলান্দুরের ইকোস্পেস অঞ্চল কিন্তু বন্যার আগের সপ্তাহেও জলের নিচে ছিল। তখন এত বৃষ্টিও হয়নি। খবরে বলেছিল, বেলান্দুর লেক ভেসে নাকি জল জমেছে। আমি সেই সপ্তাহে লেক রোড দিয়েই বাড়ি ফিরলাম, কিছুই ভাসেনি। এমনকি ইকোস্পেসের যে দিকে লেক সেই দিকও ভাসেনি, ভেসেছে তার উল্টোদিক। এর মূলে জলনিকাশি ব্যবস্থায় গাফিলতি। এই অঞ্চলে এখন মেট্রোর কাজ চলছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই নিয়মিত প্রত্যেকটা উড়ালপুলের নিচে জল জমত, যানজটে রাস্তায় বেরোনো দায় হত। কিন্তু এতদিন এই ব্যাপারে প্রশাসনের টনক নড়েনি। এছাড়া যেসব নতুন রাস্তাঘাটের কাজ হচ্ছে সেগুলোর গুণমান নিয়ে যত কম বলা যায় ততই মঙ্গল। ভোগানাহাল্লি রোড কয়েকমাস হল পাকা হয়েছে, এরমধ্যেই বৃষ্টির জলে উপরের প্রলেপ খুলে যাচ্ছে।

চার তারিখের বন্যা প্রশাসনের এতদিন ঘুমিয়ে থাকার ফল। নিকাশি ব্যবস্থা জাহান্নামে, আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও শহরের লেকগুলোর কোনো সংস্কার করা হয়নি। বেলান্দুর, ভারথুর লেকের বুকে জমা পলি, পানার প্রাচুর্যে জল দেখাই যায় না। প্রশাসন থেকে এই জলাশয়গুলোর নাব্যতা বাড়ানোর কোনো চেষ্টা করা হয়েছে বলে শুনিনি। ফলস্বরূপ যেটুকু বৃষ্টির জল লেক পর্যন্ত পৌঁছেছে সেটুকুও ধরে রাখতে পারেনি। এবার সত্যিই লেক ভাসলো, ভেসে গেল ইয়ামলুর অঞ্চল। ট্রাকে করে বড় বড় বাংলো থেকে তাবড় সিইওদের বিভিন্ন হোটেলে পৌঁছে দেওয়া হল। বেশ কিছু কোম্পানির সার্ভার রুম চলে গেল জলের নিচে, ক্ষতির পরিমান ২০০ কোটির বেশি।

আরো পড়ুন রাজনীতি যদি গরম বাড়ায়, গরম বাড়লে রাজনীতি হবে না কেন?

এখন পর্যন্ত যাদের কথা বললাম, তারা সকলেই আর্থিকভাবে সক্ষম শ্রেণির। আমাদের আবাসন ডুবলেও ফোন করা মাত্র সমস্ত সাহায্য পেয়েছি, বড় বাংলোগুলোতে ট্রাক্টর গিয়ে মানুষকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রত্যেক লেকের পাশেই যে বস্তিগুলো ভেসে গেল, তারা কতটা সাহায্য পেল? যারা একবেলা না এলে আমাদের অফিসে খাওয়া জুটবে না তাদের খোঁজখবর এই কদিন আমরা কতটা রাখতে পেরেছি আর প্রশাসনের কাছে তাদের কথা কতটা তুলে ধরতে পেরেছি – এই প্রশ্ন সারাজীবন আমাদের কুরে কুরে খাবে।

এর সাথে আরও কিছু প্রশ্ন আমাদের তুলতে হবে। প্রশাসন এই ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নিল? আমরা কী শিক্ষা নিলাম? পরের বৃষ্টিতে আমরা কি আবার কুমিরডাঙা খেলব? আমাদের পরিকাঠামোগত উন্নতি কি আদৌ সম্ভব? পূর্ব বেঙ্গালুরু কি সত্যিই আবার অপূর্ব হয়ে উঠতে পারবে?

~ মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.