তীর্থ দাশগুপ্ত
প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ দারোন আজেমোলু ও সাইমন জনসন তাঁদের পাওয়ার অ্যান্ড প্রোগ্রেস বইতে দেখিয়েছেন যে প্রত্যেকটা বড় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল একটা মহান ও পুনরাবৃত্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে – এই প্রযুক্তির স্পর্শে প্রত্যেকটা মানুষের জীবন বদলে যাবে। সেই প্রযুক্তিকে সফল করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো বৃহত্তর কল্যাণের গল্প শুনিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিপুল সামাজিক ও আর্থিক সম্পদ সেখানে বিনিয়োগ করেছে।
যেমন ১৭৯০ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কাপড় তৈরির কল তৈরি হল, চারিদিকে হইচই পড়ে গেল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাংশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তুলাবস্ত্র রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হল। ফলে জমিদার ও বস্ত্র উৎপাদকরা দ্রুত ধনী হয়ে উঠল, তাদের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এল। কিন্তু একই সঙ্গে দাসব্যবসা আরও বেড়ে গেল এবং দাসদের জীবন আরও অসহনীয় হয়ে উঠল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বইটার মূল উপপাদ্য এই যে, প্রযুক্তির বিবর্তন ও বিকাশ কোনো অনিবার্য ব্যাপার নয়। সমাজের এক ক্ষুদ্র অংশের হাতে সঞ্চিত অকল্পনীয় ক্ষমতা ও সম্পদই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও তার বিকাশকে পরিচালিত করে। প্রযুক্তির সুফল প্রধানত সেই অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; জনমানুষের বড় অংশ এর অংশীদার হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এই তথাকথিত মহান প্রযুক্তিগত অগ্রগতির তারা বলি হয়। প্রযুক্তির সুফল বন্টন নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, রাজনীতি চলতে পারে। কিন্তু একটা কথা অস্বীকার করা কঠিন – প্রযুক্তির বিকাশের আসল লাভ শেষ পর্যন্ত কাদের হাতে জমা হয়।
কেন এত কথা বলা? কারণ সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রণী সংস্থা (frontier firm) অ্যানথ্রোপিক একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। তাতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে ‘গ্লোবাল নর্থ’ বা ধনী দেশগুলোতে যেভাবে সামাজিক, ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক পরিসরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, তাতে দরিদ্র দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবধান ও জীবনযাত্রার মানের ব্যবধান অচিরেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
অ্যানথ্রোপিক রোয়ান্ডা সরকারের সঙ্গে এক যৌথ উদ্যোগমূলক প্রকল্পে তাদের শিক্ষাক্ষেত্রে Claude Pro মডেলটা বিনা পয়সায় ছাত্রদের ব্যবহার করতে দিয়েছে। কারণ ওই দেশের জনতার বড় অংশ বা বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ব্যয়বহুল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়মিত ব্যবহার করার আর্থিক সক্ষমতা নেই। অ্যানথ্রোপিকের অর্থনৈতিক গবেষণার প্রধান পিটার ম্যাকক্রোরি বলছেন ‘The broadly valuable benefit of this technology, if left only to market forces, might not generate sufficiently high adoption’। অর্থাৎ বাজারের স্বাভাবিক ক্রয়ক্ষমতার উপর ছেড়ে দিলে দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে কোনোভাবেই এই প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়; তারা এই নতুন প্রযুক্তির বৈপ্লবিক সুফল থেকে বঞ্চিতই থাকবে।
অথচ ওপেনএআই, যারা চ্যাটজিপিটি তৈরি করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তাদের তথ্য ঝাড়াই বাছাই (data filtration) করার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল আফ্রিকার গরিব দেশ কেনিয়া। সাংবাদিক ও লেখিকা ক্যারেন হাও তাঁর এম্পায়ার অফ এআই বইতে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে কেনিয়ার কয়েকটা সংস্থার মাধ্যমে সেখানকার শ্রমিকরা সস্তায় এই তথ্য ঝাড়াই বাছাইয়ের অত্যন্ত কষ্টকর ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর কাজ করে গেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি যে মডেলগুলো – যেগুলো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বহু বিষয়ে দক্ষ – প্রথমে একটা প্রি-ট্রেনিং পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। এই পর্যায়ে ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত বিপুল তথ্য দিয়ে মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু ইন্টারনেটের এই তথ্যভাণ্ডারে রয়েছে অসংখ্য যৌন উপাদান, নৃশংস ব্যাপারস্যাপার, নির্যাতন ও হত্যার বিবরণ। কেনিয়ার শ্রমিকরা দিনের পর দিন নামমাত্র পারিশ্রমিকে (প্রায় ১.৪৬ থেকে ৩.৭৪ মার্কিন ডলার) এই বিষয়গুলোকে শ্রেণিবদ্ধ বা লেবেল করতেন, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথনের সময়ে এসব বাদ দেয়।
শুধু কেনিয়াই নয়, ভেনেজুয়েলার বিপুলসংখ্যক শরণার্থীও এই ধরনের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এই সময়ে নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে, যারা সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে সস্তা শ্রমিকের যোগান দিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরবরাহ শৃঙ্খলের এটা ছিল অপরিহার্য অংশ। এসবই নাকি মানবতার কল্যাণের স্বার্থে।
আরো পড়ুন ডিপসিক: চিপ নিয়ে গভীর রাজনীতি আর এআই যুদ্ধ
মজার কথা হল, ওপেনএআই নামক অলাভজনক সংস্থার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, সভ্যতার যে সমস্ত সমস্যার এখনো মানুষ সমাধান করতে পারেনি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেসবের সমাধান করা। এই ‘সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ’ মার্কা প্রকল্পের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্রীযুক্ত ইলন মাস্ক মহাশয়, যিনি গুগলকে টেক্কা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্যাম অল্টম্যানদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। কিন্তু চ্যাটজিপিটি যখন অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে, তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এই প্রযুক্তিকে আর ওপেন সোর্স রাখা হবে না। যুক্তি হিসাবে খাড়া করা হয় জাতীয় নিরাপত্তা, গণতন্ত্র এবং মুক্ত বিশ্বের স্বার্থরক্ষাকে।
জ্ঞান কুক্ষিগত করে রাখার এই প্রকল্পে প্রথম বড় ধাক্কা আসে গত বছরের জানুয়ারি মাসে, যখন চীনের এক সংস্থা একই মানের একটা মডেল (DeepSeek-R1) বাজারে আনে। এর ফলে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ধস নামে। মার্কিন মডেলগুলোর তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাজেটে নির্মিত ডিপসিক মূল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাণিজ্যে বড় আঘাত হানে। এরপর আরও একাধিক চীনা মডেল বাজারে আসে, যার অনেকগুলোই চীন সরকারের ভর্তুকিপ্রাপ্ত হওয়ায় আরও সস্তা।
খেলা এভাবে ঘুরে যাওয়ায় অস্বস্তি বাড়ছে মার্কিন সংস্থাগুলোর। সম্প্রতি মাইক্রোসফট চেতাবনি দিয়েছে যে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গরিব দেশগুলোতে চীনা মডেলগুলোর চাহিদা অত্যন্ত বেশি, এবং ওপেন সোর্স হওয়ায় ডেভেলপাররা নিজেদের প্রয়োজন মত করে নিয়ে সেগুলো ব্যবহার করতে পারছে। ফলে মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির চাহিদা কমে যাচ্ছে।
অথচ এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে মানুষের জীবনে যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যেতে পারে – প্রযুক্তির বিকাশের যুক্তি হিসাবে তাঁদেরই দেওয়া সেই অমোঘ বাণী আজ মার্কিন কর্তাব্যক্তিরা ভুলে যেতে বসেছেন। বরং তাঁরা এখন এই প্রবণতার মধ্যে গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিপদ দেখতে পাচ্ছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের পডকাস্ট
মাইক্রোসফটের প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ তাই বলছেন ‘If American tech companies or western governments were to close their eyes to the future in Africa, they would be closing their eyes to the future of the world more broadly, and I think that would be a grave mistake.’ অর্থাৎ যদি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বা পশ্চিমের সরকারগুলো আফ্রিকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চোখ বন্ধ করে রাখে, তাহলে সেটা হবে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কেই অন্ধ হয়ে থাকা। তা হবে এক বিরাট ভুল।
নিবন্ধকার এডিনবরা নিবাসী তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি এবং আলোকচিত্রী নিমাই ঘোষ সম্পর্কে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








