পার্থ ঘোষ

বিজ্ঞানী আব্দুস সালামের এবছর জন্মশতবর্ষ। তাঁর প্রাথমিক পরিচয় – তিনি নোবেল পুরস্কার জয়ী পদার্থবিদ। তবে আমার কাছে তিনি তার চেয়েও কিছু বেশি। তিনি আমার অধ্যাপক, তাঁকে ঘিরে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি কম নয়।

কণা পদার্থবিদ্যার (particle physics) প্রামাণিক তত্ত্ব, অর্থাৎ স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকেই উঠে এসেছিল ডব্লিউ বোসন, জেড বোসন বা হিগস বোসনের ধারণা, পরবর্তীকালে সার্ন এবং পৃথিবীর অন্যান্য বড় বড় গবেষণাগারে যাদের উপস্থিতি প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের নির্মাণে সালামের বিরাট অবদান। মৌলিক বল (fundamental forces) চার রকমের— মহাকর্ষ বল (gravitational force), তড়িৎচুম্বকীয় বল (electromagnetic force) এবং দুই রকমের পারমাণবিক বল (nuclear force), শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া (strong interaction) ও দুর্বল মিথস্ক্রিয়া (weak interaction)। এই দুর্বল পারমাণবিক মিথস্ক্রিয়া থেকেই তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়ায়। আইনস্টাইন মহাকর্ষ ও তড়িৎচুম্বকীয় বলকে একত্র করার চেষ্টা করেছিলেন, সফল হননি। সালামরা একটু অন্যভাবে কাজ করলেন। তাঁরা মহাকর্ষ বল বাদ দিয়ে তড়িৎচুম্বকীয় বল ও দুর্বল পারমাণবিক বলকে একত্র করার চেষ্টা করলেন। ওঁরা দেখাতে চাইলেন— একটাই বল, কিন্তু তার দুটো চরিত্র থাকতে পারে। সফল হলেন। এটাকেই বলা হয় unified theory of weak and electromagnetic interactions। এই একত্রীকরণ তত্ত্ব থেকেই কণা পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল তৈরি হল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তিনজন বিজ্ঞানী মোটামুটি একই সময়ে এই বিষয়ে কাজ করেন, যদিও আলাদাভাবে। একজন অবশ্যই সালাম, আর দুজন হলেন স্টিভন ওয়েইনবার্গ এবং শেল্ডন গ্লাশো। সালাম এ কাজ করেছিলেন লন্ডনে, ওয়েইনবার্গ আর গ্লাশো করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সালাম কাজটা শুরু করেছিলেন অনেক আগেই। বহুবছর ধরে নানা ধাপ পেরোতে হয়েছে তাঁকে, শেষপর্যন্ত তা একটা পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বের রূপ পেয়েছে। সেখানে প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে গেজ থিওরি (Gauge Theory) ও রিনরম্যালাইজেবিলিটি (renormalizability)। গেজ থিওরির ব্যাপারটা এরকম— কোনো একটা সিস্টেমের কিছু গাণিতিক বৈশিষ্ট্যের স্থানীয় পরিবর্তন (গেজ পরিবর্তন) করলেও সেই সিস্টেমের কোনো পরিবর্তন হয় না। 

নিউট্রিনো গবেষণার ক্ষেত্রেও সালামের অবদান ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

নিউট্রিনো কণা তৈরি হয় নিউক্লিয়াসে। এগুলো প্রায় ভরশূন্য, পদার্থের মধ্যে দিয়ে অবিকৃতভাবে বয়ে চলে। প্রতি মুহূর্তে আমাদের মধ্যে দিয়ে কোটি কোটি নিউট্রিনো কণার স্রোত বয়ে চলেছে, এদের ধরা খুব শক্ত। এখন অবশ্য বড় বড় ডিটেক্টর মেশিন তৈরি হয়েছে যা দিয়ে অবশেষে ধরা গিয়েছে। এই নিউট্রিনোর উপস্থিতি টের পাওয়া গিয়েছিল কীভাবে? তেজস্ক্রিয় প্রক্রিয়ায় নিউক্লিয়াস থেকে সমানে যে তিন ধরনের কণা নির্গত হয়, এদের মধ্যে আলফা কণা হল হিলিয়াম নিউক্লিয়াস, বিটা কণা অর্থে ইলেকট্রন এবং গামা কণা আসলে ফোটন। ইলেকট্রন বা বিটা কণা যে নানা শক্তি নিয়ে বেরোচ্ছে, তা মাপতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে আরেকটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভরের কণাও নির্গত হচ্ছে যা সহজে ধরা পড়ছে না। এই কণা আছে বলেই ইলেকট্রন একই শক্তি নিয়ে বেরোচ্ছে না, এই ক্ষুদ্র কণাটির সঙ্গে শক্তি ভাগাভাগি হচ্ছে। ইলেকট্রনের শক্তি বেশি হলে ওই কণার শক্তি হবে কম, এমনকি উলটোটাও ঘটতে পারে। বর্জন নীতি বা exclusion principle-খ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পাউলি এটা প্রথম আবিষ্কার করেন। প্রশম বা ‘নিউট্রাল’ কণা, কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের বলে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নিউট্রিনো’।

নিউট্রিনো কণা থাকলে প্রকৃতিতে বাম ও ডানের সমতা (left-right symmetry) ভেঙে যায়। আমি কোনটাকে বাম হাত বলব আর কোনটাকে ডান হাত বলব, সেটা একটা কনভেনশন। এখন এই সমতা কি সবক্ষেত্রেই খাটে? আমরা যখন নিজেদের আয়নায় দেখছি, তখন আমাদের বাম হাত-ডান হাত উলটে যায়। এবার ধরা যাক, মানুষের বুকের মধ্যে যে হৃৎপিণ্ড, তার একটা প্রতিফলনের ছবি নেওয়া হচ্ছে। যদি হৃৎপিণ্ড বুকের মাঝখানে থাকে, তাহলে আয়নার প্রতিফলনেও তা বুকের মাঝখানেই থাকবে। কিন্তু হৃৎপিণ্ড যদি বুকের বাঁদিকে থাকে, তখন আয়নার প্রতিফলনে ওটা ডানদিকে দেখাবে। ধরা যাক, ৫০% মানুষের হৃৎপিণ্ড বাঁয়ে আর বাকি ৫০% মানুষের হৃৎপিণ্ড ডানে, সেক্ষেত্রে আয়নার প্রতিফলনেও একই ঘটনা ঘটবে। তেমন পরিস্থিতিতে নির্দ্বিধায় বলা যায়, সমতা সংরক্ষিত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ মানুষেরই হৃৎপিণ্ড থাকে বাঁদিকে, অর্থাৎ আয়নার প্রতিফলনে অধিকাংশ মানুষের হৃৎপিণ্ড ডানদিকে দেখাবে। তখনই ঘটে সমতা লঙ্ঘন বা parity violation। নিউট্রিনো থাকলে এই লঙ্ঘন ঘটবেই। কেবল হৃৎপিণ্ডের জায়গায় একটা নিউট্রিনোর ঘূর্ণন কল্পনা করে নেওয়া যায়। নিউট্রিনো একটি স্পিন হাফ কণা। তার ভর এতই নগণ্য যে তার গতি ঘূর্ণনের দিকেও হতে পারে, আবার উলটোদিকেও হতে পারে। এই দুইয়ের মধ্যে অসাম্য ঘটা অসম্ভব নয়, এবং তা যে ঘটে, তা বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। এই সমতা লঙ্ঘনের তাত্ত্বিক দিকটা নিয়ে সালাম প্রথম যুগে কাজ করেছিলেন।

আজ কণা পদার্থবিদ্যায় যে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ব্যবহার হয়, যার কথা একটু আগে বললাম, সেই মডেলের মধ্যে এই গেজ নীতি এবং সমতা লঙ্ঘন— দুই তত্ত্বকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এহেন যুগান্তকারী পদার্থবিদের জন্ম ১৯২৬ সালে, অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে। পরে তাঁর জন্মস্থানের অংশটা পাকিস্তানে চলে যায়, ফলে তিনিও পাকিস্তানের নাগরিক হন। সেই হিসাবে তিনি পাকিস্তানের প্রথম নোবেল প্রাপক। পড়াশোনা করেছিলেন লাহোরে, ছাত্র হিসাবে ভীষণ মেধাবী ছিলেন, বিশেষত অঙ্কে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিস গবেষণাগারে গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন। তখনই তিনি গেজ প্রিন্সিপলস, রিনরম্যালাইজেবিলিটি নিয়ে কাজ শুরু করে দেন। গবেষণা শেষে যে থিসিস লিখেছিলেন, সেটা অসামান্য। থিসিসের নাম ছিল ‘Developments in quantum theory of fields’।

গবেষণা শেষ করে সালাম পাকিস্তানে ফিরে যান। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় পরিকাঠামোর মধ্যেও তিনি চেষ্টা করেছিলেন, যদি ইউরোপীয় ধাঁচের গবেষণা ক্ষেত্র গড়ে তোলা যায়। কিন্তু তেমন সুযোগ পাননি। ইউরোপে যে ধরনের কাজ করে এসেছেন, সে ধরনের কাজ নিয়ে এখানে কারও সঙ্গে আলোচনা করারও পরিসর নেই। ভারতে তখন টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ তৈরি হয়ে গিয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানেও কাজ করার চেষ্টা করলেন। বাদ সাধল ভারত-পাকিস্তানের তৎকালীন কূটনৈতিক সম্পর্ক। প্রায় বীতশ্রদ্ধ হয়েই তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। কেমব্রিজের সেন্ট জনস কলেজে ছিলেন, পরে এম্পিরিয়াল কলেজে যোগ দেন।

ফিরে গেলেন বটে, তবে উপমহাদেশের বিজ্ঞান গবেষণা নিয়ে ভাবনাটা থেকেই গেল। ভারত বা পাকিস্তানের বিজ্ঞানীরাও যাতে উন্নত মানের সুযোগ পান, সে ভাবনা থেকেই অবশেষে ১৯৬৪ সালে ইতালির ত্রিয়েস্ত শহরে তাঁর পরিকল্পনায় তৈরি হল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বা আইসিটিপি (বর্তমান নাম দি আব্দুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স)। তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল ইতালি সরকার। প্রতিষ্ঠান গড়ার জমি দিয়েছিল, প্রয়োজনীয় পয়সাকড়িও দিয়েছিল। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপ চালু হয়েছিল আইসিটিপি-তে। ওখানে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা সান্নিধ্য পেতেন পৃথিবীবিখ্যাত পদার্থবিদদের। সালাম চাইতেন, এখানে কিছুদিন কাজ করে তাঁরা ফিরে যান নিজেদের দেশে, গড়ে তুলুন উন্নত গবেষণার পরিবেশ, কিন্তু আইসিটিপি-র সঙ্গে যোগাযোগ যেন ছিন্ন না হয়, বরং বিচ্ছিন্নতা সরে গিয়ে গড়ে উঠুক পারস্পরিক আদানপ্রদানের সংস্কৃতি। পদার্থবিদ্যায় তাঁর বিদ্যায়তনিক অবদানের পাশাপাশি এই মহৎ অবদানের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে।

আমি যখন ১৯৬১ সালে এম্পিরিয়াল কলেজে পড়তে যাই, সালাম তখন সেখানে অধ্যাপনা করছেন। এছাড়াও পদার্থবিদ্যা বিভাগে ছিলেন নোবেলজয়ী লর্ড পিএমএস ব্ল্যাকেট। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করে ইংল্যান্ডের নানা জায়গায় আবেদন করেছিলাম, তার মধ্যে এম্পিরিয়াল কলেজে সুযোগ আসে। ওখানে যাওয়ার পর সেন্ট জনস কলেজ থেকে একটা চিঠি পেলাম— ওঁরাও আমাকে নিতে রাজি আছেন, কিন্তু একবছর পরে। সেন্ট জনস কলেজ মানে কেমব্রিজ, নামমাহাত্ম্যই আলাদা। আমারও মনে মনে সুপ্ত ইচ্ছা ছিল। কিন্তু একবছর অপেক্ষা করতে হবে। কী করব পরামর্শ নিতে একদিন সাহস করে সালাম সাহেবের কাছেই চলে গেলাম। বললাম আমার অবস্থা। তিনি স্পষ্ট বললেন ‘তোমার কাছে যদি কেমব্রিজে পড়া, ওখানকার ডিগ্রিটা গুরুত্বপূর্ণ হয়, ওখানে যাও। আর যদি পদার্থবিদ্যাটা শিখতে চাও, এখানে থাকো।’

আমি এম্পিরিয়াল কলেজেই থেকে গেলাম।

ওঁর পড়ানোর বিষয় ছিল অ্যাডভান্সড কোয়ান্টাম মেকানিক্স। আমি কিছু কিছু ক্লাসে গিয়েছিলাম। কিন্তু লক্ষ করে দেখেছি, তেমন ভাল পড়াতে পারতেন না। বোঝাই যেত, ঠিকমত প্রস্তুত হয়ে আসেননি। যা যা মনে পড়ছে, ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন, কখনো কখনো প্লাস-মাইনাস সাইনে ভুল হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই, ছাত্রদের পক্ষে ওঁর ক্লাস করা বড় কঠিন হত।

ক্লাস হয়ে গেলে অনেক সময়ে আমি ওঁর পাশে হাঁটতে হাঁটতে ফিরতাম। চট করে কথা বলার সাহস পেতাম না অমন উচ্চতার একজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। তখনই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলে তিনি বেশ বিখ্যাত। তবে আমার বেশ গর্বও হত, আমাদেরই উপমহাদেশের মানুষ এত বড় জায়গায় এসে পৌঁছেছেন। ওই সময়ে তাঁর চেহারাটিও বেশ সুন্দর। মুখটা দেখলেই মনে হত, কী অসম্ভব উজ্জ্বল! ওখানে কলেজ ক্যাম্পাসে সান্ধ্য বক্তৃতার একটা চল ছিল। ক্লাস পড়ানোর ব্যাপার নয়, অন্যরকম এক পরিবেশে বিজ্ঞানের আলোচনা হত। সেখানে আবার অন্য এক সালামকে দেখতাম— অসাধারণ বক্তা।

পরে আমি ভেবে দেখেছি, ওই নির্দিষ্ট সময়টায় তিনি গ্রুপ থিওরি (Group Theory) সম্পর্কিত একটা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এই যে কণাগুলোর জগত, এটা একটা চিড়িয়াখানার মত। চিড়িয়াখানায় যেমন একটা খাঁচায় বাঘেদের রাখা হয়, আরেকটা খাঁচায় সিংহদের, সেরকম গ্রুপ থিওরি ব্যবহার করে মৌলকণাদের মধ্যে একটা অর্ডার তৈরির কাজ চলছিল, বিশেষত SU(3) (Special Unitary) গ্রুপটি নিয়ে কাজ চলছিল। সেই ধারণা অনুযায়ী, মেসন, ব্যারিয়ন, এমন সবকটি কণাই অকটেট তৈরি করবে, অর্থাৎ এরা আটটা কণা মিলে একটা গোষ্ঠী তৈরি করবে। ঠিক তেমনটাই পাওয়া গিয়েছিল। সালাম ওই সময়ে সেই কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, ওঁর সঙ্গে কাজ করছিলেন ইজরায়েলের বিজ্ঞানী ইউভাল নিম্যান। নিম্যান পেশায় নৌবাহিনীর অফিসার ছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণায় আছে, যখন তিনি গণনার চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে সালাম সাহেবের কাছে যান, সালাম সাহেব ডেস্ক থেকে বার করে তাঁকে দেখান, গণনাগুলো তিনি আগে থেকেই করে রেখেছেন। যদিও গবেষণাপত্রে সালাম নিজের নাম দেননি। এমন গভীর গবেষণার কাজে মগ্ন থাকাকালে আমাদের মত অর্বাচীনদের পড়ানোর মেজাজ বোধহয় তাঁর ছিল না।

১৯৭১ সালে, ততদিনে আমার পিএইচডি হয়ে গিয়েছে, আমি বিশ্বভারতীতে পড়াচ্ছি। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘ইয়ঙ্গার সায়েন্টিস্ট এক্সচেঞ্জ স্কিম’ ফেলোশিপ নিয়ে আবার তিনমাসের জন্য ইংল্যান্ডে যাই। তখন বেশিরভাগ সময়টাই এম্পিরিয়াল কলেজে সালাম সাহেবের সান্নিধ্যে কেটেছে, নানা আলোচনা হয়েছে। এভাবে ওঁর সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক হয়। আইসিটিপি-র ডিরেক্টর হয়ে গেলেও এম্পিরিয়াল কলেজ ছেড়ে যাননি, অবসর নেন ওখান থেকেই। পরে ত্রিয়েস্তেও আমাকে মাঝেমধ্যেই নিমন্ত্রণ করতেন। জানতে চাইতেন, কী কাজ করছি। কখনো কখনো কোনো বিশেষ কাজের ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন, এভাবে না করে অন্যভাবেও করতে পারো।

ওঁর বিজ্ঞানসাধনার আরেকটা বিশেষত্ব ছিল, মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার ব্যাপারে বেশি করে জোর দিতেন। বারবার বলতেন, শুধুমাত্র ফলিত বিজ্ঞানের গবেষণা দিয়ে চলবে না।

১৯৭২ সালে একবার ত্রিয়েস্ত থেকে আমন্ত্রণ পেলাম। পল ডিরাকের ৭০ বছরের জন্মদিন উপলক্ষ্যে সালাম সাহেব একটা সিমপোজিয়ামের আয়োজন করলেন। সেখানে ডিরাক তো বটেই, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, ইউজিন উইগনার, জন হুইলার, জুলিয়ান শ্যুইঙ্গার, জন বেল, সুব্রমণ্যম চন্দ্রশেখর— এরকম একঝাঁক জ্যোতিষ্কের ভিড়। কিন্তু উদ্বোধনটা কোথায় হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। একবার শুনছি আইসিটিপি-তেই হবে, আরেকবার শুনছি ত্রিয়েস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে হবে। শেষ পর্যন্ত আইসিটিপি-র অডিটোরিয়ামেই শুরু হল। শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম, ছাত্রদের একটা প্রতিবাদ মিছিল এসে ঢুকে পড়ল। তখনই বুঝতে পারলাম আসল কারণটা।

তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছে, আর ওই অডিটোরিয়ামে উইগনার, হুইলারের মত অনেক বিজ্ঞানী রয়েছেন যাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেসন কমিটির সদস্য। এই জেসন কমিটির কাজ ছিল সামরিক অস্ত্র পরিকল্পনা। ফলে যুদ্ধে যাঁরা ভিয়েতনামের সমর্থক, তাঁরা এই বিজ্ঞানীদের মানবতার শত্রু বলে মনে করেন। প্রতিবাদটা সেই কারণেই। উইগনার সম্ভবত জানতেন, এরকম কিছু ঘটবে, তাই একটা স্ক্রোল খুলে তুলে ধরলেন, তাতে লেখা ‘Your insult is my honor.’ হুইলার আবার উঠে গিয়ে বোর্ডে লিখতে শুরু করলেন ‘Why is it not a crime for the Vietnamese to kill the Americans?’ তাতে আরও গণ্ডগোল শুরু হল। সালাম সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ওখান থেকে প্রায় পাঁজাকোলা করে সরিয়ে দিলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম এটা দেখে যে, এত বড় বিজ্ঞানীরা এরকম কথা বলছেন! তবে খুব বেশিক্ষণ ব্যাপারটা চলেনি। কিছুক্ষণ স্লোগান দিয়ে ছাত্ররা চলে গেল।

সালাম এমনিতে ব্যস্ত মানুষ হলেও সকলের সঙ্গেই দেখা করতেন, যোগাযোগ রাখতেন। একবার আইসিটিপি-তে রয়েছি, ওঁদের প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে যে কাউন্সিল তৈরি হয়েছিল, সেই প্রতিনিধিরা সকলে আসবেন। আমায় একজন এসে বললেন ‘সালাম সাহেব তোমায় ডাকছেন।’ ওঁর ঘরে গেলাম। বললেন ‘ওঁরা এলে তুমি একটু থেকো। ওঁদের কাছে আমাদের সেন্টারের বিষয়ে কিছু ইতিবাচক বক্তব্য রেখো।’

কথামত বিকেলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ভারত থেকে প্রতিনিধি হিসাবে এসেছেন টাটা ইনস্টিটিউটের বি এম উদগাঁওকর। ভীষণ অমায়িক মানুষ ছিলেন, আমার সঙ্গে দারুণ হৃদ্যতা ছিল। ঘটনাচক্রে সেই সময়ে ভারতের প্রায় ৪০ জন আইসিটিপি-তে রয়েছেন, আর পাকিস্তানের ৮-১০ জন। সালাম সেকথা মনে করিয়ে দিয়ে হঠাৎ উদগাঁওকরকে বললেন ‘দেখুন, এটাই কিন্তু এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভারতীয় বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান।’

উদগাঁওকরের মুখটা কালো হয়ে গেল। কী আর বলেন তিনি!

আব্দুস সালাম এমনই ছিলেন। নানা কারণে পাকিস্তান ছেড়ে চলে গেলেও শিকড়টা কখনও ভোলেননি। ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে বরাবর ভাবতেন। থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-ও তাঁরই তৈরি।

ওঁর মৃত্যুর কয়েকবছর আগে বাংলাদেশে একবার দেখা হল। ততদিনে তিনি হুইলচেয়ারে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী ওঁকে একটা সংবর্ধনা দেবে। ওখানকার বিশিষ্ট পদার্থবিদ শামসের আলীর আমন্ত্রণে আমি তখন সস্ত্রীক ঢাকাতেই ছিলাম। সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমরাও আমন্ত্রিত হলাম। সালাম সাহেবের তখন কথা বলতে বেশ কষ্ট হয়, তার মধ্যেও দর্শকাসনে আমাকে দেখতে পেয়ে দর্শকদের উদ্দেশে বললেন ‘ঘোষ এসেছে দেখতে পাচ্ছি, ও কিন্তু ফোটন নিয়ে খুব ভালো কাজ করেছে।’ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছাত্রের মুখটা আরেকটু উজ্জ্বল করে দিলেন আর কি!

তাঁর কলকাতায় আসার পর্বটার সঙ্গেও যে শিকড়ের টানটা জড়িয়ে ছিল, সেটা বলে শেষ করব।

১৯৭৯ সালে ওয়েইনবার্গ আরে গ্লাশোর সঙ্গে সালাম নোবেল পুরস্কার পেলেন। তার দুবছরের মাথায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে আমন্ত্রণ জানাল। আমন্ত্রণ পেয়ে সালাম শর্ত দেন, লাহোরে যে বাঙালি অধ্যাপকের কাছে তিনি পড়েছিলেন, সেই অনিলেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীকেও খুঁজে বার করে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। অনিলেন্দ্রনাথ অঙ্কের অধ্যাপক ছিলেন, যদিও ততদিনে তিনি বয়সের ভারে শয্যাশায়ী। কলকাতা বিমানবন্দরে অলোক সেন (কলকাতা দূরদর্শনের বিজ্ঞান অনুষ্ঠানের প্রযোজক) আর আমি সালাম সাহেবকে আনতে গিয়েছি, সালাম আমাকে দেখে আমার ফ্রেঞ্চকাট দাড়িটা ধরে বললেন ‘আরে, দাড়ি সফেদ বনা লি!’

ওই একবারই আমার সঙ্গে তিনি হিন্দিতে কথা বলেছিলেন। নয়ত মূলত ইংরিজিতেই কথা হত।

কলকাতায় এসে অবশেষে তিনি তাঁর সেই প্রাক-দেশভাগ পর্বের অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। এই ঘটনার মাত্র কিছুদিন পরেই, তখন আমি ত্রিয়েস্তে, আবার একবার অনিলেন্দ্রবাবুর প্রসঙ্গ উঠল। সালাম বললেন ‘প্রফেসর গাঙ্গুলী কী অসাধারণ পড়াতেন, জানো? উনিই আমার অনুপ্রেরণা। লোনির স্ট্যাটিক্স অ্যান্ড ডায়নামিক্সের অঙ্ক আমাদের দিয়ে কষিয়েছিলেন।’ তারপর কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন ‘আমি ওঁর জন্য কিছু উপহার পাঠাতে চাই, তুমি সেগুলো পৌঁছে দিতে পারবে?’ আমি বললাম ‘আপনি উপহার পাঠাবেন, আমি নিশ্চয় পৌঁছে দেব।’

আরো পড়ুন লড়াই আসলে মৌলবাদী আর মুক্তমনার, হিন্দু-মুসলমানের নয়

সেটা ১৯৮২ সাল। হাই এনার্জি ফিজিক্সের আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে প্যারিসে। সালাম বললেন ‘তুমি তো প্যারিসে আসছ, ওখানে প্রথমদিন ফার্স্ট টি ব্রেক যখন হবে, তখন আমি দেখা করে দিয়ে দেব।’

প্যারিসে কনফারেন্সে গিয়েছি। যেমনটা সালাম সাহেব বলেছিলেন, চায়ের বিরতির সময়ে দেখছি, আমাকে খুঁজতে খুঁজতে তিনি এগিয়ে আসছেন। একটা প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বললেন ‘এতে কিছু সেন্ট রয়েছে। উনি তো আর এগুলো ব্যবহার করবেন না, ওঁর পরিবারের সদস্যরাই করবে, তবু আমার তরফ থেকে এটুকু থাকল।’

কলকাতায় ফিরে আমি ওঁর বাড়ি খুঁজে বার করলাম। ভবানীপুরের ওদিকে তিনি থাকতেন। উপহারটা পেয়ে অনিলেন্দ্রবাবু একেবারে অভিভূত। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরছে, আমার হাতটা ধরে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর মাস্টারমশাই আমায় বললেন ‘জানেন, ও যে এত বড় হবে, আমি কিন্তু বুঝতে পারিনি!’

নিবন্ধকার বিশিষ্ট পদার্থবিদ ও সঙ্গীতশিল্পী। আটের দশকে দীর্ঘদিন কলকাতা দূরদর্শনের জনপ্রিয় বিজ্ঞান ক্যুইজ ‘কোয়েস্ট’ সঞ্চালনা করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত

অনুলিখন: সোহম দাস

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.