আজ রাজতন্ত্র দিবস। আধুনিককালে রাজা বা রানি একজন নন, একাধিক। প্যান্ডেল করে সকাল থেকে চলছে মোচ্ছব। রাজাদের ডাকে সাড়া দিয়ে দাবিদাওয়া ছেড়ে প্রজারা মোচ্ছবে যোগ দিয়েছেন। পুঁজি দেবতার বন্দনা গান দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা। এক ডজন পুরস্কারে ভূষিত এক খ্যাতনামা তন্ত্রসাধক উদ্বোধনী বক্তৃতায় বললেন, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র – এসব অতীত। উত্তর-মতাদর্শ এই যুগে তন্ত্রমন্ত্রই মুক্তির পথ, প্রজাদের যন্ত্রণার প্রতিষেধক। নামজাদা শিল্পীর উন্নয়নের পাঁচালি গাওয়া, আর হাজার কণ্ঠে বিকশিত ভারতের ম্যানিফেস্টো পাঠের পর শুরু হল রাজাদের সম্মিলিত ঘোষণা। যার মোদ্দাকথা, নগরীর ঈশান কোণের বিশাল জলাভূমি ভরাট করে এক শিল্পনগরী হবে। তার নাম হবে মৃত্যু উপত্যকা। একশো একর জায়গা জুড়ে হবে বিশাল গুদামঘর। নাম তার ধ্বংসঘর। সেখানে শ্রমিকরা থাকবেন। খেয়ালখুশি মত তাঁরা ঢুকতে বেরোতে পারবেন না। থাকবে নিরাপত্তারক্ষী। শ্রমিকদের নয়, মালিকের সম্পদ পাহারা দিতে। বাপেরও যেমন বাপ থাকে, তেমন নিরাপত্তারক্ষীদেরও রাতে তালাবন্দি রাখা হবে। জলাভূমির মৎস্যজীবী, ভেড়ি শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য কুড়ি কিলোমিটার দূরের এক গ্রামে একরের পর একর ধানের জমি বদলে ফেলে হবে ভেড়ি। আর রাজ্যের আরেক সীমানায় জঙ্গল, পাহাড় কেটে হবে চাষের জমি। গোটা প্রকল্পের নাম অপারেশন ডিকনস্ট্রাকশন। কত লক্ষ না কোটি কর্মসংস্থানের কথাও ঘোষিত হল। কিন্তু প্রজাদের সমবেত হাততালি আর জয়ধ্বনির আওয়াজে তা ভালোমত শোনা যায়নি।

আজকের এই সরকারি অনুষ্ঠানের লাইভ টেলিকাস্টের জন্য হামলে পড়েছে গোটা মিডিয়া দুনিয়া। কাল সব খবরের কাগজের ‘লিড’ হবে এটাই। শুধু এটা বলা হবে না যে এই অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল বানিয়েছিলেন যে শ্রমিকরা, তাঁরা গতকাল রাতে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত মোমো যাঁরা বানিয়েছিলেন, অগ্নিকাণ্ডে তাঁরাও মারা গেছেন। যে ডেলিভারি বয় ও গার্লের দল সেই মোমো দিতে এসেছিলেন, পথ দুর্ঘটনায় তাঁরাও বেঁচে নেই। এমনকি এই অনুষ্ঠানের জন্য বিদ্যুৎ এসেছিল যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে, সেই সংস্থার মালিকানাধীন কয়লাখনি শ্রমিকদেরও চাষনালা খনিতে মৃত্যু ঘটেছে বহুবছর আগে। শ্রমিকদের শবের উপরেই জমে উঠেছে উন্নয়নের উৎসব।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এসব নিছক কল্পগল্প, বা গুল্প। কারণ বাস্তবে আধুনিক রাজতন্ত্রকে বলা হয় প্রজাতন্ত্র। মহান গণতন্ত্রের নামে নির্দিষ্ট সময় অন্তর আমরা প্রজারা ভোট দিয়ে রাজা নির্বাচন করি। কিন্তু শ্রমিকের মৃত্যু সারসত্য। কল্পগল্প নয়, রূঢ় বাস্তব। তেমনই বাস্তব গোটা দেশটার মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হওয়া। পুঁজি যে আসলে ঘনীভূত মৃত শ্রম – সেকথা দেড় শতকেরও আগে শুনিয়েছিলেন একজন। তাতে মিশে থাকে শ্রমিকের ঘাম, রক্ত, কত স্বপ্ন। জীবন্ত শ্রমের রক্ত চুষে পুঁজি পরিমাণে বাড়ে, ক্রমশ কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। শ্রমিককে মজুরি কম দিয়ে মালিক যত বেশি খাটাতে পারবে, তত মালিকের মুনাফা বাড়বে। মুনাফার জন্য চাই সস্তা শ্রমের বাজার। শ্রমিকের নিরাপত্তার জন্য খরচ করলেও মুনাফা কমবে। শ্রমিকের জীবনের থেকে মুনাফার গুরুত্ব বেশি। গোটা পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়া জুড়ে রয়েছে শ্রমিক বঞ্চনা, নিধন। কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হলে নতুন শ্রমিক চলে আসে। যত বেকার বাড়ে, তত শ্রমিকের জোগান সুনিশ্চিত হয়। এই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক ক্রমশ নামহীন এক না-মানুষে পরিণত হন। সেই মানুষের মুক্তির স্বপ্নে বিভোর কার্ল মার্কস ছুটে বেড়িয়েছেন এক দেশ থেকে আরেক দেশে। রাষ্ট্র তাঁকে বারবার উদ্বাস্তু, বেনাগরিক করেছে। আরেক মানবতাবাদী, ‘ওরা কাজ করে’ কবিতার স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রক্তকরবী নাটকে দেখিয়েছেন মনুষ্যত্বের এই চরম অবমাননা। শ্রমিকরা নাম হারিয়ে যেখানে হয়ে যান, ৪৭ফ, ৬৯ঙ।

কলকাতার আনন্দপুরের কাছে নাজিরাবাদে প্রজাতন্ত্র দিবসে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া শ্রমিকরা আজ শুধুই সংখ্যা। মৃতের সংখ্যা আড়াল করতে সরকারি খাতায় তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিখোঁজ বলে থেকে যাবেন, চিরকাল। ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যু ও ২৬ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর মিলেছে। ঘটনার তিনদিন পরেও মৃত ও নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। মোমো কোম্পানি, ডেকরেটার সংস্থা ও গুদামের মালিক – কেউ সেদিন গুদামে থাকা শ্রমিকদের হিসাব দিতে পারছে না। প্রজাতন্ত্র দিবসের আড়ম্বরে এই মৃত্যু কোনো আঁচ ফেলেনি। সব চলেছে নিয়ম মেনে। রাজ্যের মন্ত্রীরা প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান করেছেন। ঘটনা ঘটার অনেক পরে কিছু মন্ত্রী অকুস্থলে হাজির হয়েছেন। অভয়া বিচার না পাক, তাঁর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে থাকা সিবিআই আধিকারিক প্রজাতন্ত্র দিবসে রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছেন। দুদিন পরে মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুর থেকে ১৬৯৪ খানা ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করেছেন। কিন্তু এখনো ওই বীভৎস অগ্নিকাণ্ডের জায়গায় যাওয়ার সময় পাননি।

জলাভূমি বোজানো থেকে শুরু করে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ঠিকঠাক না রাখা, শ্রমিকদের গুদামবন্দি রাখা – দেখেশুনে মনে হবে এদেশে ও রাজ্যে আইন বলে কিছু নেই। শ্রমমন্ত্রী, পরিবেশমন্ত্রী, দমকলমন্ত্রী, তাঁদের পারিষদ দল – সবাই যেন অস্তিত্বহীন। ২০০২ সালে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ‘আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি’ বা রামসার অঞ্চলের স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ এই জলাভূমি দখল, ভরাট করে হয়ে চলেছে একের পর এক নির্মাণ কাজ। কলকাতা কর্পোরেশন ও রাজ্য সরকার এই ধ্বংসযজ্ঞকেই উন্নয়ন বলে প্রচার চালাচ্ছে। জলাভূমির পাড় কংক্রিটে বাঁধিয়ে চলছে মহানগরীকে সাজানো, যা জলাভূমির আরও সর্বনাশ করছে। নদী ও পরিবেশ কর্মীদের প্রতিবাদ, গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাস্তার জমা জলে ১৩ জন নাগরিকের মৃত্যু – কোনোকিছুতেই হুঁশ ফেরেনি। নাজিরাবাদের গুদামঘরও তৈরি হয়েছিল জলাভূমি বুজিয়ে। দাহ্যবস্তু থাকলেও অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। চুরি যাওয়ার ভয়ে শ্রমিকদের রাতে তালাবন্ধ রাখা হত। একেবারে আধুনিক ক্রীতদাস ব্যবস্থা। কর্পোরেশন, রাজ্য সরকার – কেউ কিছু জানত না, বিশ্বাস হয় না। যদি তাই হয়, তাহলে এমন অযোগ্য কর্পোরেশন আর সরকারের মাতব্বরদের ক্ষমতায় থাকার এতটুকু অধিকার নেই। ওয়াও মোমো কোম্পানির লিজে নেওয়া শেডের আশেপাশে জলাজমি বুজিয়ে হয়েছে ব্লিংকইট, ফ্লিপকার্ট ইত্যাদি কোম্পানির গুদামঘর। সেসব কোম্পানিতে কাজ করা গিগ কর্মীরাও হামেশাই পথ দুর্ঘটনায় মারা যান, আহত হন। কোম্পানি এঁদের কায়দা করে শ্রমিকের স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয় না।

মোমো কোম্পানির পাশের ডেকরেটর কোম্পানির শ্রমিকরাও মারা গেছেন। তাঁদের অনেকে ফুল সহ নানা সাজসজ্জার কাজ করতেন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া বা ‘নিখোঁজ’ শ্রমিকদের বেশিরভাগই পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বাসিন্দা। মূলত ঠিকাদারের অধীনে কাজ করতেন। এইসব শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। এমনকি অনেকের নামও কোম্পানির খাতায় থাকে না। কলকাতার ওয়াও মোমো কোম্পানি খাবার সরবরাহের ব্যবসাও করে। দেশের বিভিন্ন শহরে রয়েছে তাদের দোকান। কলকাতা মহানগরী ছাড়িয়ে শহরতলির আনাচে কানাচে তাদের দোকান মেলে। আগুনে পুড়ে যাওয়া গুদামে রান্না হত চটজলদি খাবার (‘ফাস্ট ফুড’)। সেসব পৌঁছে যেত শহর ও শহরতলিতে। শ্রমিক ঠকিয়ে, তাঁদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে বেড়ে চলেছে তাদের ব্যবসা। ব্র্যান্ডেড খাবারের দোকান, খাদ্য সরবরাহ পরিষেবা ভাত মারছে অসংখ্য ছোট ব্যবসায়ীর। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ওয়াও মোমো মাত্র তিনজন শ্রমিকের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় সেরেছে। কোম্পানির তরফে দাবি করা হয়েছে, আগুন নেভানোর সরঞ্জাম সহ সব নিয়মই নাকি তারা মানে।

আবার ডেকরেটর কোম্পানিও দায় ঠেলছে মোমো কোম্পানির উপর। সেই কোম্পানির মালিকই ওয়াও মোমোকে গুদামঘর ভাড়া দিয়েছিল। তারও প্রভাব কম নয়। সরকারি নানা অনুষ্ঠানে সেই কোম্পানির ফুল যেত। দিঘার জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের অনুষ্ঠানেও নাকি তাদের ফুল গিয়েছিল। শাসক ঘনিষ্ঠ সেই ডেকরেটর সংস্থার মালিক গ্রেপ্তার হলেও, যথাযথ শাস্তি হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। আর মোমো কোম্পানির মালিকের বিরুদ্ধে এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।

মন্ত্রীরাও অন্যদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে মত্ত। কলকাতার মেয়র বলেছেন, বাম আমলেই নাকি জলাভূমি বোজানো হয়েছিল। উপগ্রহ চিত্র সেকথা বলছে না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায়, অনিয়ম আগের সরকারের আমলে হয়েছিল, তাহলে গত ১৫ বছরেও বর্তমান সরকার ব্যবস্থা নিল না কেন? তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে জমি মাফিয়াদের দাপট, জলাভূমি, জমি লুঠের চিত্র সকলেরই জানা। শ্রম দফতর, দমকল দফতর, পরিবেশ দফতর, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ – কেউই দায় এড়াতে পারে না। নিছক দুর্ঘটনা বলেও একে এড়ানো যায় না। এটা কোম্পানি, সরকার, কর্পোরেশন, শাসক ঘনিষ্ঠ মাফিয়া বাহিনির সম্মিলিত শ্রমিক হত্যা।

এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে নাগরিক ক্ষোভ রাজপথে আছড়ে পড়েনি। আমাদের মধ্যে যারা কর্পোরেট সংস্থার উচ্চ বেতনের শ্রমিক, হয়ত বা কোনো সংগঠিত বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক বা ছাত্র – আমরা কেউই ক্ষোভে ফেটে পড়িনি। এই দুদিনে আমরা অনেকেই ওয়াও মোমো দিব্যি গিলেছি। ভুলে গেছি, তাতে মিশে আছে শ্রমিকের ছাই। কেউ কেউ আবার অপযুক্তি দিয়েছি – বয়কট কাজের কথা নয়। তাতে শ্রমিকরা নাকি কাজ হারাবেন। এমন যুক্তিতেই তো শ্রমিকদের প্রতিবাদ, ধর্মঘটের বিরোধিতা করে শ্রমিক হত্যাকারীর দল। এই মৃত্যু উপত্যকায় আমাদের চোখকান খোলা, কিন্তু মগজে কারফিউ। পুঁজির নিরাপত্তারক্ষী রাষ্ট্র ও প্রচারমাধ্যম যা বলে তাই শুনি, যা দেখায় তাই দেখি। তাই সব অন্যায় অবিচারকেই আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করি। শাসক সেটা ভালোই জানে। শ্রমিক হত্যা, কৃষক আত্মহত্যা, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান – কোনোকিছুতেই ভোট ব্যাংকে আঁচড় লাগবে না। বহু লড়াইয়ে আদায় হওয়া অধিকারগুলো একের পর এক কেড়ে নিলে, সরকার আইন ভঙ্গ করলেও আমরা উদাসীন।

আরো পড়ুন কেউ মনে রাখেনি জীব-তারা খসে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের

তাই এত বড় ঘটনার পরেও ওয়াও মোমোর কোনো দোকান বন্ধ হয়নি, কর্মচারীরাও বিক্ষোভ দেখাননি। প্রতিবাদে নেমেছে কিছু বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আর গণসংগঠন। ঠিকা প্রথায় নিযুক্ত হওয়া কর্মীদের বিক্ষোভ দেখানোর সুযোগই বা কতটুকু? গিগ কর্মী, ব্র্যান্ডেড দোকান বা মলের কর্মীদের কাজ হারানোর ভয় সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। ডেকরেটরের কর্মীদের তো কথাই নেই। শ্রমিককে এমনকি জীবনের নিরাপত্তাটুকুও না দিয়ে তরতরিয়ে এগোচ্ছে পুঁজির উন্নয়ন রথ। তবুও বহু লড়াই করে গিগ কর্মীরা কয়েক দিন আগে সামান্য হলেও অধিকার আদায় করতে পেরেছেন। দশ মিনিটের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রচার থেকে পিছু হটেছে ‘কুইক কমার্স’ কোম্পানিগুলো। সেই প্রচার গিগ কর্মীদের মৃত্যু পরোয়ানা ছিল। গিগ কোম্পানির পিছু হটা প্রমাণ করেছে, সংঘবদ্ধ লড়াই ছাড়া শ্রমিকদের টিকে থাকার অন্য কোনো পথ নেই।

২০২৬ সালেই কার্যকর হতে চলেছে কেন্দ্রের চারখানা শ্রম কোড। কাজের জায়গায় নিরাপত্তা, পরিবেশ সংক্রান্ত অধিকার ও প্রকল্পের সুযোগ পাওয়ার আওতা থেকে বিশালসংখ্যক শ্রমিককে ছেঁটে ফেলা হবে। ঠিকাদাররাও চলে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঠিকা শ্রমিকদের নিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁদের যখন তখন ছাঁটাই করার অবাধ অধিকার পাবে মালিকরা। শ্রমিকদের ধর্মঘট করা, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারেও কোপ পড়বে। এতদিন মালিকদের আইন ফাঁকি দিয়ে যে দুষ্কর্মগুলো করতে হত, সেগুলোকেই আইনসম্মত করা হচ্ছে। ফলে নাজিরাবাদের মত ঘটনা বাড়বে।

চাষনালার মৃত খনি শ্রমিকদের নিয়ে গান বেঁধেছিলেন অজিত পাণ্ডে। নাজিরাবাদের ঘটনা নিয়ে তেমন গান আজ আর কেউ রচনা করবেন না। দ্বিতীয় আর কেউ শ্রমিক জীবন নিয়ে সমরেশ বসুর মত বি টি রোডের ধারে লিখবেন না। বিদ্বজ্জনেরা আজ রাজ্য বা কেন্দ্রের প্রসাদ পেতে মেরুদণ্ড বিকিয়ে দিয়েছেন। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, গণসঙ্গীত, গণসাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে সাধারণ নাগরিকদেরই। একদিকে উন্নয়নের পাঁচালি গান, ‘মন কি বাত’, অন্যদিকে শ্রমিকের দগ্ধ মৃতদেহ। কোন দিক বেছে নেব তা আমাদেরই ঠিক করতে হবে। প্রজাতন্ত্র থেকে সাধারণতন্ত্রে উত্তরণ বড় সহজ নয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.