মধ্যপ্রদেশের কুনো ন্যাশনাল পার্কে আফ্রিকান চিতাদের রহস্যজনক মৃত্যু সাম্প্রতিককালে অস্বস্তিতে ফেলেছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। গত ২৭ মার্চ থেকে শুরু করে ১৪ জুলাই পর্যন্ত চার মাসেরও কম সময়ে আটটি চিতার মৃত্যু হয়েছে কুনোতে। বিশেষত গত সপ্তাহে পরপর দুটি চিতার মৃত্যুতে বিচলিত হয়ে তড়িঘড়ি নানা পদক্ষেপ নিতে বসেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক। প্রথমে ১৬ জুলাইয়ের বিবৃতিতে চিতা-মৃত্যুর পিছনে অব্যবস্থার অভিযোগ এবং চিতাদের গলার রেডিও কলার থেকে সম্ভাব্য সেপ্টিসেমিয়ার জল্পনা ঝেড়ে ফেলে জানানো হয় যে আটটি চিতারই মৃত্যু হয়েছে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণে। অথচ তার পরদিন, অর্থাৎ ১৭ জুলাই, মধ্যপ্রদেশের মুখ্য বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ অধিকর্তা জসবীর সিং চৌহানকে তাঁর পদ থেকে আচমকা সরিয়ে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও গতকাল আরও তিনটি চিতা সংকটে – এমন আভাস পাওয়া গেছে, যা ১৬ জুলাইয়ের বিবৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমতাবস্থায় বিষয়টিকে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান ও কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে, পাঁচ সদস্যের বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে তদন্তের জন্য এবং চিতা প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবেন আজ।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নামিবিয়া থেকে আনা আটটি পূর্ণবয়স্ক চিতাকে কুনো ন্যাশনাল পার্কের ভিতর একটি নির্দিষ্ট ঘেরা অঞ্চলে ছাড়া হয়। একমাসের মধ্যেই তারা শিকার করতেও শুরু করে। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসে আরও ১২টি চিতা। ২৭ মার্চ কিডনি বিকল হয়ে মারা যায় সাশা নামের একটি মেয়ে চিতা। তার দুদিন পরেই জোয়ালা নামের নামিবিয়ান চিতা চারটি সন্তানের জন্ম দেয়। কিন্তু ২৩ এপ্রিল মারা যায় উদয় নামের একটি পুরুষ চিতা। এবার কারণ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়া। একটি পুরুষ চিতার সঙ্গে মারপিট করে পরের মাসেই মারা যায় আরেকটি মেয়ে চিতা। এমনকি সদ্যোজাত চিতাগুলির মধ্যেও তিনটি মারা যায়, সম্ভবত প্রবল গরমে জলাভাব এবং অপুষ্টির কারণে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু গত সপ্তাহে যে দুটি চিতার মৃত্যু হয়েছে, তাদের মৃত্যুর কারণ তুলনায় একটু অদ্ভুত। ময়না তদন্তের রিপোর্ট বলছে মধ্যপ্রদেশের প্রচণ্ড গরম এবং আর্দ্রতায় গলার রেডিও কলার থেকে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হয়েই তেজস ও সূর্য নামের পুরুষ চিতাদুটির মৃত্যু হয়েছে। শুধু তাই নয়, পবন, গৌরব, এবং শৌর্য নামের আরও তিনটি চিতার গলায় একইরকম সংক্রমণের লক্ষণ দেখা গিয়েছে। এ ধরনের সংক্রমণ কেন শুধু পুরুষ চিতাদের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে তা এখনো রহস্য। তবে চিতাদের পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য রেডিও কলার জরুরি এবং গত দেড় দশকে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্পের সাফল্যের হার বৃদ্ধির পিছনেও অন্যতম কারণ এই রেডিও কলারের ব্যবহার। প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে লাগানো যন্ত্রই যদি প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা চিন্তার বৈকি।
আরো পড়ুন পরিবেশ রক্ষার নাম করেও শোষণ চালাচ্ছে প্রথম বিশ্ব
বাচ্চাগুলিকে বাদ দিলে আফ্রিকা থেকে স্থানান্তরিত চিতাদের ২৫% এখন অবধি মারা গিয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুপাত খুব উদ্বেগের কারণ নয়। বরং ঘেরা জায়গার বাইরে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এলাকা দখল বা মেয়েদের দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারিতে কিম্বা কুনোর আশেপাশের লেপার্ড এবং বাঘগুলির মোকাবিলা করতে গিয়ে মারা যেতে পারে আরও কিছু চিতা। এই প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্যও প্রথম বছরে অন্তত ৫০% চিতাকে বাঁচানো। বিশেষজ্ঞদের মতে এই লক্ষ্য বাস্তবানুগ। আফ্রিকা থেকে আনা ২০টি চিতার মধ্যে ১৫টি এখন জীবিত, তাদের মধ্যে ১১টি মুক্তাঞ্চলে ও বাকি চারটি সংরক্ষিত এলাকায় আছে। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র (Evaluating the performance of conservation translocations in large carnivores across the world; Biological Conservation 279, 2023, 109909) অনুযায়ী যে সমস্ত স্থানান্তরিত মাংসাশী প্রজাতিকে প্রথমে সংরক্ষিত জায়গায় ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে পারিপার্শ্বের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলা সম্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে বেঁচে থাকার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ওই গবেষণাপত্রেই দেখানো হয়েছে, যে ২০০৭ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত চিতাদের বেঁচে থাকার হার ৫৩ শতাংশের কাছাকাছি। সেদিক দিয়ে দেখলে আটটি চিতার মৃত্যুকে চিতা প্রকল্পের ব্যর্থতা হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া চলে না। কিন্তু মাত্র চার মাসের মধ্যে আটটি মৃত্যু এবং বিশেষত ভারতের মাটিতেই সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে জন্মানো চারটি বাচ্চার মধ্যে তিনটির মৃত্যু অবশ্যই উদ্বেগজনক।
মানুষের কার্যকলাপের ফলে জঙ্গল নষ্ট হয়ে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধেই ভারতে চিতার সংখ্যা এত কমে গিয়েছিল যে রাজা-মহারাজাদের শিকারের জন্য আফ্রিকা থেকে চিতা আমদানি করতে হত। ১৯৪৭ সালে জনৈক মহারাজার গুলিতে মারা যাওয়া তিনটি চিতাই ভারতে দেখতে পাওয়া শেষ চিতা। এরপর ভারতের মাটিতে প্রজাতিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। প্রায় ৫০ কোটি টাকার এই চিতা প্রকল্প শুধু ৭৫ বছর আগে ভারতের মাটি থেকে হারিয়ে যাওয়া এক বন্য প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাই নয়, প্রথম আন্তর্জাতিক চিতা স্থানান্তরও বটে। কাজেই এই প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতার উপর নির্ভর করবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টাও। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর আট থেকে ১৪টি চিতাকে আফ্রিকা থেকে ভারতে আনা হবে। এই প্রকল্পের শুরুতেও কুনো ন্যাশনাল পার্কে ২০টি আফ্রিকান চিতার জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্ৰাধিকরণের (National Tiger Conservation Authority) তরফে যথারীতি সেই মতামতকে পাত্তা দেওয়া হয়নি। ওই সংস্থার ওয়েব পেজে গেলে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি এবং তারপরে বাঘের ছবি দেখতে পাওয়া যায়। চিতা প্রকল্পের শুরুতে চিতাদের ভারতীয় নাম রাখার জন্য যে প্রতিযোগিতার ডাক দেওয়া হয়, তাতে ৩২,৫০০ নাম জমা পড়েছিল। কাজেই সরকারি তরফে তৎপরতার অভাবের অভিযোগ তোলা নিছক নিন্দুকের কাজ হবে। তবে এই আটটি মৃত্যু প্রমাণ করে যে সেই তৎপরতার দিশাকে আরেকটু বিজ্ঞানসম্মত করতে পারলে এই প্রকল্পের সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়বে। ইতিমধ্যেই চিতা গবেষণা কেন্দ্র, সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বাড়তি জঙ্গল নিয়ে আসা, দক্ষ বনকর্মী নিয়োগ এবং কিছু চিতাকে গান্ধী সাগর সংরক্ষিত এলাকায় স্থানান্তরিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায় একবার হারিয়ে ফেলা প্রাণীটিকে আমরা দ্বিতীয়বার হারিয়ে ফেলব না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








