রোমা মালিক
গত ৯ নভেম্বরের ঘটনার কথা বলে এই লেখা শুরু করছি। দূষণমুক্ত বাতাসের দাবি জানাতে বহু দিল্লিবাসী ইন্ডিয়া গেটে জড়ো হয়েছিলেন। আমি নিজে সেখানে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও আমাদের বেশকিছু বন্ধু ছিলেন। তাঁরাই অনেকে মিলে এই প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে পরে জানতে পারি, কী ঘটেছে। থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া তো বটেই, এফআইআর অবধি দায়ের করেছে পুলিস।
এই মুহূর্তে দিল্লিতে বাতাসের অবস্থা ভীষণ খারাপ। গত কয়েক বছরে দূষণের মাত্রা কী ভয়ানক হারে বেড়েছে, সেকথা কমবেশি সকলেই জানেন। এখানকার সাধারণ বাসিন্দাদের কথাই যদি ধরি – তাঁরা নিজেদের দৈনন্দিন সচ্ছলতা নিয়েই মোটামুটি ব্যস্ত, দূষণ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কোনোরকম প্রতিবাদ-প্রতিরোধে খুব বেশি থাকেন না। আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, এই ধরনের ডাক দেওয়া হলে নাগরিক মহলে সেভাবে সাড়া পাওয়া যায় না, দূষণটাকে তাঁরা দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হিসাবেই ধরে নিয়েছেন। কিন্তু সেই মানুষগুলোও এখন এ বিষয়ে সরব হচ্ছেন। আমরা যারা দিল্লিতে থাকি, এই শীতের সময়ে আমাদের সুস্থ থাকাটাই নিদারুণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। জ্বর, সর্দিকাশি, মানসিক চাপ – সবরকমের অসুস্থতা দেখা যায়। যাঁদের ব্লাড সুগার বা হৃদরোগের সমস্যা আছে, তাঁদের বিপদ আরও বেশি। বছরের পর বছর এই সমস্যা চলে আসছে, এদিকে সমাধান কোন পথে হবে, তার কোন দিশা নেই। সরকারের তরফে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রতিবছর এই সময়ে দূষণের মাত্রা যে বাড়ে, তার পিছনে নাড়া (কেটে নেওয়া ফসলের অবশিষ্টাংশ) পোড়ানো আর দিওয়ালির দিন বাজি পোড়ানোর ভূমিকা তো আছেই। তবে সেগুলো তাৎক্ষণিক কারণ মাত্র। আসল সংকট আরও গভীরে। ভৌগোলিকভাবে, দিল্লির বিস্তীর্ণ অঞ্চল আরাবল্লী পর্বতশ্রেণির অংশ। ইতিহাসের দিকে যদি তাকানো যায়, তাহলে দেখা যাবে যে মোগল সম্রাটদের আমলে চারপাশে ঘন জঙ্গল ছিল। পুরনো দিল্লি ছিল উঁচু পাঁচিল ঘেরা শহর। মোগলরা এখানে লালকেল্লা বানিয়েছিলেন, শহরের চারিদিকে কাশ্মীরী দরওয়াজা, আজমের দরওয়াজা-সহ আরও বহু প্রবেশদ্বার বানিয়েছিলেন। সেই সময়ে ওগুলোই ছিল দিল্লিতে ঢোকার রাস্তা। পরে ব্রিটিশ জমানায় দিল্লির গুরুত্ব বেড়ে যায়। এখানে যখন রাজধানী সরিয়ে আনা হয়, তার জেরে আশপাশের বহু গ্রামের মানুষকে রাতারাতি উচ্ছেদ করা হয়েছিল, এমনকি কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি। তারপর থেকে নতুন দিল্লিতে নির্মাণকাজ ক্রমশ বেড়েছে, শহরের পরিধিও বাড়তে বাড়তে অনেকদূর চলে গিয়েছে। যেটা ঘটেছে, সেটা অপরিকল্পিত নগরায়ণ ছাড়া আর কিছু নয়। ফলে দিল্লির সামগ্রিক পরিবেশ যে সংকটের মুখে পড়েছে, একথা বলাই যায়। একসময় দিল্লিতে প্রাকৃতিক জলবণ্টনের সুন্দর ব্যবস্থা ছিল, সেটা আর নেই। নালাগুলো বুজে এসেছে, অত বড় যমুনা নদী দূষণের ফলে বাস্তুতন্ত্রের দিক থেকে পুরোপুরি মৃত।
আজকের দিল্লিতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলও আর অবশিষ্ট নেই। সবুজ যেটুকু আছে, তা কয়েক জায়গায় কিছু বড় বড় পার্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দক্ষিণ দিল্লিতে আমি যেখানে থাকি, সেই অলকনন্দা অঞ্চলের কাছাকাছি রয়েছে তুঘলকাবাদ ফরেস্ট বা তুঘলকাবাদ বায়োডাইভার্সিটি পার্ক। পার্কের ভিতরে গেলে ‘ফরেস্ট ভিলেজ’ লেখা বোর্ড চোখে পড়বে, সেখানে আগে টঙিয়া পদ্ধতিতে চাষাবাদ হত। টঙিয়া শব্দটা বার্মিজ। ‘টঙ’ কথাটার অর্থ পাহাড়, আর ‘ইয়া’ মানে চাষ। এই পদ্ধতিটা তৎকালীন বার্মা থেকে ব্রিটিশরাই এদেশে নিয়ে এসেছিল। এটা এক ধরনের স্থানান্তর কৃষিপদ্ধতি। সারি সারি নতুন গাছ লাগাতে হয়, সেসব গাছের মধ্যবর্তী ফাঁকা জমিতে চাষ হয়। কৃষকরা জানতেন, কীরকম গাছ লাগানো উচিত। কিন্তু এখন সবটাই বন দফতরের হাতে। তারা ইউক্যালিপটাস লাগায়, ভালো কাঠ পাওয়া যায় এমন গাছ লাগায়। অক্সিজেন জোগান দেওয়া গাছের সংখ্যা কমে এসেছে।
মজার ব্যাপার, যে দিল্লিতে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলার জন্য এত বড় বড় মাথা রয়েছেন, সেই দিল্লিতেই আজ পরিবেশ সংকট এতখানি গভীরে পৌঁছেছে। গবেষণা খাতে টাকাও আসে দিল্লির মত বড় শহরগুলোতেই। কিন্তু বিশ্ব পরিবেশ বা অন্যান্য গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে যাঁরা এখানে এত কথা বলেন, তাঁদের সঙ্গে জঙ্গলের মানুষের কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁদের কাছে জঙ্গল বাঁচানোর অর্থ জঙ্গলের মানুষকে জঙ্গল থেকে সরিয়ে দেওয়া। অথচ ওই মানুষগুলোই পরিবেশ-প্রকৃতিকে বাঁচান।
৯ নভেম্বর দূষণবিরোধী প্রতিবাদী জমায়েতে পুলিসি দমনপীড়ন দেখে অনেকেরই হয়ত অবাক লেগেছে, আমরা যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করি, তারা খুব একটা অবাক হইনি। মোদী জমানায় তো এমনিতেও প্রতিবাদ করার অধিকার আর নেই। মহিলা কুস্তিগীরদের হেনস্থার প্রতিবাদই হোক, বছরব্যাপী কৃষক আন্দোলনই হোক কি মণিপুরের ঘটনার প্রতিবাদ, দিল্লিতে এ ধরনের কর্মসূচি সংগঠিত করা মানেই সেখানে পুলিশি গ্রেফতারি হবে, নানারকম হেনস্থা হবে। তবে আমার মতে, এখন অবধি দূষণবিরোধী প্রতিবাদ খুব বড় আকারে গড়ে উঠতে পারেনি। কীভাবে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। আমজনতা কী ভাবছে, তা নিয়ে আরও গভীরে কাজ করতে হবে। তাদের আরও বেশি করে এই কর্মসূচিতে সামিল করতে হবে।
আরো পড়ুন এত গরম কেন – কবে প্রশ্ন হয়ে উঠবে নির্বাচনী রাজনীতিতে?
আমাদের সংগঠন জঙ্গলের মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করে। আমাদের একার পক্ষে নাগরিক পরিসরে এই ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। গ্রাম বা জঙ্গলবাসী মানুষ কিন্তু বিশুদ্ধ বাতাসের দাবি করবে না, এটা প্রকৃতপক্ষে শহরবাসী মানুষেরই দাবি। কারণ শহরের মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছে কর্পোরেটের হাতে। কোভিড অতিমারীর সময়ে আমরা দেখেছি, কোভিডে মৃত্যু বেশি হয়েছে শহরে। যেসব অঞ্চলে আমরা আদিবাসী বা অন্যান্য জঙ্গলবাসী মানুষদের নিয়ে কাজ করি, সেসব অঞ্চলে কোভিডে মৃত্যু অতটা হয়নি। বরং ক্যান্সার, হৃদরোগ বা অন্যান্য অসুখে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাওয়ার সংখ্যা বেশি। যদিও এখন যে হারে জঙ্গল ধ্বংস করে শিল্পায়ন শুরু হয়েছে, কদিন পরে ওইসব এলাকাতেও যে বিশুদ্ধ বাতাসের দাবি উঠবে না – তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু তারপরেও, এখন অবধি দুই অঞ্চলের চিত্র কিন্তু আলাদা। সমস্যার সমাধানে সরকারের কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা বা নীতি নেই। সমাধান হিসাবে যা দেখানো হচ্ছে, তা পুরোপুরি পুঁজিনিয়ন্ত্রিত। ‘কার্বন ক্রেডিট’ তো পুরোপুরি ব্যবসায়িক স্বার্থে তৈরি, এর দ্বারা সুষ্ঠু সমাধান হওয়া সম্ভব নয়।
দিল্লির এই পরিবেশগত সংকটকে বুঝতে গেলে ইতিহাস ধরেই বুঝতে হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি দুই শতাব্দী ধরে আমাদের জঙ্গলের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শানিয়েছে, নিজেদের সুবিধার জন্য বানিয়েছে বন দফতর। তারা দেশ ছেড়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু তাদেরই তৈরি করে দিয়ে যাওয়া ঔপনিবেশিক পরিকাঠামো অনুসরণ করেছে স্বাধীন দেশের সরকার। ১৯২৭ সালে যে অরণ্য আইন পাশ হয়েছিল, সেই আইন আজও লাগু। অরণ্যবাসী মানুষ প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হয়েছেন তাঁদের অধিকার থেকে। পরিবেশ বাঁচানোর লড়াই তাই বুঝতে হবে তিলকা মাঝির সংগ্রাম দিয়ে, আদিবাসীদের বিদ্রোহ দিয়ে। আজ ছত্তিসগড় ও মধ্যভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নকশাল-দমনের আড়ালে অরণ্য দখল করে তা তুলে দেওয়া হচ্ছে কর্পোরেটের হাতে, অরণ্যবাসী মানুষকে অপরাধী বানানো হচ্ছে। আমাদের সংগঠনের কর্মীদের বিরুদ্ধেই কত যে মামলা হয়েছে, গুনতে গেলে তার লম্বা তালিকা হয়ে যাবে। এই ধারাবাহিকতা যে রাষ্ট্রের ইতিহাসের অংশ, সে রাষ্ট্রে দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে যে পুলিসি বর্বরতার মুখে পড়তে হবে তা বলাই বাহুল্য।
এর মধ্যেও আশার আলো বলতে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০০৬ সালে পাশ হওয়া বন অধিকার আইন। এই আইনের বলে বনের যাবতীয় দায়িত্বভার থাকে গ্রামসভার হাতে, সেখানে বন দফতরের ভূমিকা নগণ্য। পরিবেশ সংক্রান্ত অন্যান্য যেসব আইন রয়েছে, যেমন পরিবেশ রক্ষা আইন বা বণ্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইন, সেসবের সঙ্গে এই আইনের পার্থক্য হল, এই আইন সর্বপ্রথম অরণ্যবাসী মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। যদিও, পাশ হওয়ার এতবছর পরেও পরিস্থিতির পরিবর্তন বিশেষ হয়নি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সে আইন কেবল আইন হয়েই থেকে গিয়েছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা অবশ্য বাড়ছে। কারণ এর সঙ্গে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। তবে সে বৃদ্ধির গতিও ধীর। ফলে লড়াইটা এই মুহূর্তে দীর্ঘ।
নিবন্ধকার অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অফ ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপল-এর সাধারণ সম্পাদক। মতামত ব্যক্তিগত
অনুলিখন: সোহম দাস
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








