ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর মহকুমার অন্তর্গত চন্দনা নদীর তীরে ছোট্ট গ্রাম জাবরখোল। পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রামের ঘরে ঘরে খুশির রেশ ছড়িয়ে পড়ত। ফসলের উৎসবকে কেন্দ্র করে ধান্যলক্ষ্মীকে আহ্বান করা হত। গ্রামের বাড়িগুলোর নিকানো উঠোনে ধানের ছড়া, লক্ষ্মীর ঝাঁপি, কুনকে, কুঁড়েঘরের সামনে হাতি বাঁধা, লক্ষ্মীর পা খুব যত্ন করে আঁকা হত। বাড়িতে নারকেল গাছের অভাব ছিল না। পৌষ মাস পড়তে না পড়তেই পিঠের আয়োজন শুরু হয়ে যেত। খাঁটি গরুর দুধ, বাড়ির গাছের নারকেল আর নতুন গুড়ের প্রাচুর্যে ভরা ছিল সেসব দিন।
সারাদিন ধরে তৈরি হত সরা পিঠে, ক্ষীরের গোকুল পিঠে, মুগ সামালি, পাটিসাপটা আর দুধপুলি। মাটির উনুনে তাই দুধ ফুটিয়ে ঘন করা হত। কেউ ব্যস্ত নারকেল কোরানোয়, কেউ আবার কোরানো নারকেল আর দানাদার মরিচা গুড় মিশিয়ে নিচ্ছে। আগের দিন রাতে ভেজানো নতুন চাল পাটায় পিষে গুঁড়ো করত কেউ। সন্ধেবেলা পাড়াপড়শি একে অন্যের বাড়িতে পিঠে নিয়ে যেত। পাপু, অর্থাৎ আমার মেজমাসির কাছে শুনেছি, পৌষপার্বণের নেমন্তন্ন বলে কিছু ছিল না। বাড়িতে অতিথি এলে তার পাতে পিঠে পড়বেই।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বাংলার পিঠে নিয়ে লিখতে বসলে আস্ত একখানা বই লেখা হয়ে যাবে। অঞ্চল বিশেষে পিঠের রকমফের আছে, নামও আলাদা আলাদা। একেকটা পিঠে গড়ার কৌশল একেকরকম। পৌষ সংক্রান্তিতে পিঠে বানাতে যে উপাদানটি অপরিহার্য তা হল নতুন গুড়। বলা ভাল খেজুর গুড়।
অঘ্রাণ মাসে ইতুপুজোর মধ্যে দিয়ে গ্রামবাংলায় লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। পুববাংলার গ্রামীণ জীবন ছেড়ে আসার পর নাকতলার কলোনির বাড়িতে বুম্মা, অর্থাৎ আমার দিদিমা, এক চিলতে বাগানে তাঁর ছেলেমেয়েদের অমুনা ঝমুনার গল্প শোনাতেন। এখনো প্রতিবছর দোলুই পিঠে বানিয়ে আমার মেজমাসি এই ব্রত পালন করে। গৃহস্থের যে কোনো পুজোপার্বণেই বাজারে ওঠা নতুন আনাজ বা মরশুমের খাবার দেওয়ার চল বহুদিনের। ইতু ব্রতও তার ব্যতিক্রম নয়। দোলুই পিঠে বানাতে নতুন গুড়ের প্রয়োজন হয়। ইতুপুজোর বিশেষ খুচড়িতেও নতুন গুড় পড়ে।
সেই সময়ে ফিরে যাচ্ছি যখন বিশ্ব উষ্ণায়নের চোখরাঙানি ছিল না। শীত আসত যথাসময়ে, অঘ্রাণ মাস থেকেই। এখন সেই অবকাশ প্রায় ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তবু প্রতি শীতে নদিয়া, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া থেকে শিউলি বা গাছিরা আসে খেজুরগাছের সন্ধানে। ভোররাতে উঠে মাটির হাঁড়ি করে রস সংগ্রহ করে। সেই রস দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় ঝোলা গুড়, মরিচা গুড়, পাটালি।
হাতে গড়া পিঠের ইতিহাসের মতই গুড়ের ইতিহাসও প্রাচীন। সেই ইতিহাস মঙ্গলকাব্য, ধর্মপালের শিলালিপির সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছে। তাই গুড়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ পিঠে বা মিষ্টি তৈরির সঙ্গে মিলেমিশে আছে।
যশোহর খুলনার ইতিহাস বইতে সতীশচন্দ্র মিত্র খেজুর গুড় তৈরির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
‘প্রত্যুষ হইতে গাছের রস পাড়িয়া গাছিরা রসের ভাঁড়গুলি কারখানায় বা বাইনশালে লইয়া যায়। যে উনুনে রস জ্বাল দিয়া গুড় হয় তাহার নাম বান বা বাইন। ঐ চুল্লিতে দুইটি হইতে আট দশটি পর্যন্ত মুখ থাকে। তাহাতে নাদা বা জালুয়া নামক মাটিয়া কড়া চড়াইয়া রস পূর্ণ করা হয় এবং চার পাঁচ ঘণ্টা ধরিয়া যথেষ্ট জ্বালানি কাঠ বা শুষ্ক পত্রের সদ্ব্যবহার করিলে রসের রঙ সরিষা ফুলের মত হইয়া, পরে উহা হইতে হরিদ্রাভ লাল গুড় হয়। সময় মত জালুয়াগুলি নামাইয়া কাঠি বা তাড়ুয়া দিয়া গুড়ের পার্শ্বে ঘষিয়া ‘বীজ মারিতে’ হয়; যখন ঘন ঘর্ষণে গুড় হইতে শুষ্ক শ্বেতবর্ণ গুড়া ঝরিয়া পড়িতে থাকে, তখন গুড়ের দানা বাধাইবার জন্য ঐ গুড়া বীজ গুড়ের সঙ্গে মিশাইয়া তাহা হইতে পাটালি প্রস্তুত হয়। গুড় কতক গৃহস্থের সংসার খরচে লাগে। কতক হইতে চিনি প্রস্তুত হয়। পূর্বে যাহারা গুড় হইতে চিনি প্রস্তুত করিত তাহাদের নাম কুরি।’
আরো পড়ুন মগজের কারফিউ ভেঙে ঢিল ছুড়ল জুইগাটো
আজকাল খেজুরগাছের অস্তিত্বও সংকটের মুখে। কখনো রাস্তা তৈরির কাজে খেজুরগাছের উপর কোপ পড়ছে, কখনো অন্য কোনো নগরকেন্দ্রিক উন্নয়নের বলি হচ্ছে। সেদিন ভোর ভোর ট্রেন ধরে বজবজের আছিপুরে গেছিলাম। আছিপুরের ছোট বটতলায় প্রতিবছর একজন শিউলি এসে গুড় তৈরি করে। গাছি ভাই আর তার স্ত্রীর থেকে খেজুরগাছ বিপন্ন হওয়া এবং শিউলিদের দুরবস্থার কথা শুনেছিলাম।
একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা না পাওয়া গেলে খেজুরের রস ভাল হয় না। মাটির উপর খেজুর রসের মিষ্টত্ব নির্ভর করে। লবণাক্ত মাটির গাছে রসের স্বাদ ভাল হয় না। সুমিষ্ট রসের জন্য ভাল করে শীত পড়া প্রয়োজন। কম ঠান্ডায় রসের স্বাদ অনেক সময় টক টক হয়। খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় খেজুর রসের পরিমাণও ক্রমশ কমে আসছে। অতএব বাজারে নলেন গুড়ের চাহিদা মেটাতে এখন ভেজাল মেশান গুড় ব্যবসায়ীরা। চিনি মিশিয়ে পরিমাণ বাড়ান বা নলেন গুড়ের গন্ধওলা এসেন্স ব্যবহার করেন। সর্বোপরি খাঁটি খেজুরের রস থেকে খাঁটি গুড় উৎপাদন করা অনেকখানি ব্যয়সাপেক্ষ। অত খরচ করে যে খাঁটি গুড় তৈরি হবে সেই গুড়ের যা দাম হবে তা দিতে অনেক ক্রেতাই রাজি হবে না। ফলে আজকাল বহু মিষ্টির দোকানে ক্রেতাদের চোখে ধুলো দিয়ে গুড়ের বদলে শুধু মাত্র নলেন গুড়ের এসেন্স ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাধারণ ক্রেতার পক্ষে তফাত করা মুশকিল, সে গুড় খাচ্ছে না গুড়ের গন্ধযুক্ত মিষ্টি খাচ্ছে।
ফিরে আসি পিঠের কথায়। ঠাকুরমার ঝুলির কাঁকনমালা আর কাঞ্চনমালার গল্প মনে পড়ে? সেই যে রানির ছদ্মবেশে বাঁদী আস্কে পিঠা, চাস্কে পিঠা, ঘাস্কে পিঠা বানিয়েছিল। রাজসভায় ধরা পড়ে গিয়েছিল যে সে নকল রানি। কারণ আসল রানি খুব যত্ন করে ক্ষীরমুরালি, মোহনবাঁশি, চন্দনপাতা আর চন্দ্রপুলি বানিয়েছিল। পিঠে খুব শ্রেণিভিত্তিক ঘরোয়া মিষ্টি। সেই কারণেই পিঠে বানানোর কৌশল দুজনকে আলাদা করে সনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ক্ষীরমুরালি, চন্দনপাতা, মোহনবাঁশির মত অনেক পিঠেই হারিয়ে গেছে। আবার অনেক পিঠেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ আগলে রেখেছে।
বাংলায় খেজুর গুড় ছাড়া পিঠে তৈরির কথা ভাবাই যায় না। এখন নলেন গুড় টিউবের মধ্যে অন্য দেশে বা বাংলার বাইরে অন্য রাজ্যেও পাওয়া যায়। তবে আমার দাদু দিদিমার ফেলে আসা ভিটার মরিচা গুড়ের গন্ধ আর সেই গুড় দিয়ে মুগ সামালি পিঠের স্বাদ অজানাই থেকে গেল। সেসব গল্প মা, মাসিদের কাছে কেবল শুনি। গল্পগুলোর মাধ্যমেই মরিচা গুড়ের সেই গন্ধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার শপথ নিই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








