বঙ্গবাসী কলেজের সামনে বৈঠকখানা বাজার বসে। অনিন্দিতাদি যখন কলেজ থেকে বেরোয় তখন বাজারে কত যে রংয়ের বাহার! নানা রঙের ফল আর সবজির বিকিকিনি। নিজের পছন্দমত সবজি আর ফল কিনে বাড়ি ফেরে। অনিন্দিতাদি বঙ্গবাসী কলেজের দর্শনের অধ্যাপিকা। পনেরো বছর বয়সী মেয়ে মাহিকার একক মা।
আমার পিসির কাছে শুনেছি, পুজোপার্বণে সকাল থেকে আমার ঠাকুমাদের রান্নাঘরেই সময় কাটত। যৌথ পরিবারে পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের সমাগম লেগেই থাকত। অষ্টমীর দিন রান্না সেরে কোনোরকমে নতুন কাপড় পরে বাড়ির বড় বউ আর মেজো বউ একসঙ্গে পাড়ার প্যান্ডেলে অঞ্জলি দিতে যেত। আমি হলফ করে বলতে পারি, অনেকের বাড়িতেই প্রায় একইরকম ছবি দেখা যেত।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘গৃহকর্মে নিপুণা’ কথাটা শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আজ নারী, পুরুষ উভয়েরই রান্না এবং ঘরের কাজ জানা আবশ্যিক। আগের প্রজন্মের তুলনায় আমরা অনেক প্রাচুর্যের মধ্যে জীবন কাটালেও একথা অনস্বীকার্য যে এখন জীবন ও সম্পর্কের জটিলতা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। সমানুপাতিক হারে বেড়ে চলেছে মানসিক চাপ।
বিবাহবিচ্ছেদের পর একজন কর্মরত একক মায়ের রান্না এবং খাওয়াদাওয়ার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কতটা পরিবর্তন হয়েছে? আগে যেখানে দুজনের রোজগারে সংসার চলত, সেখানে একজনের রোজগার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় কতটা প্রভাব ফেলেছে? অথবা বিপুল কর্মব্যস্ততার মধ্যে এই একক মায়েরা কি তাদের শৈশব, কৈশোরের ফেলে আসা স্বাদগুলোর কাছে ফিরে যেতে পারেন? সেই স্বাদ তাঁদের সন্তানদের কাছে কতটাই বা পৌঁছে দিতে পেরেছেন?
আমার ইস্কুলতুতো দিদি সুদর্শনা বলল ‘আমার মা-ও চাকরি করতেন। আমি ঠাকুমার কাছেই মানুষ।’
ছোটবেলায় ঠাকুমার হাতের যে রান্না সুদর্শনাদির সবচেয়ে প্রিয় ছিল তা হল ধোঁকার ডালনা। ডাল ভিজিয়ে বেটে মিশ্রণটা পাক দিয়ে শুকিয়ে, কাঁধা উঁচু থালায় মিশ্রণটাকে বসিয়ে বরফির আকারে কেটে নিয়ে ছাঁকা তেলে ভাজা। ডুমো ডুমো করে কাটা আলু, সঙ্গে নিরামিষ মশলার মিশেলে ওর ঠাকুমা অপূর্ব ধোঁকার ডালনা রাঁধতেন। আজকাল বাজারে তৈরি ধোঁকা পাওয়া গেলেও সুদর্শনাদি মোটেও সেই ধোঁকা দিয়ে ডালনা রাঁধে না। ‘রাঁধলে ঠাকুমার মতন করেই রাঁধব।’ কর্মব্যস্ত জীবনে ঠাকুমার হাতের স্পর্শ মাখানো ধোঁকার ডালনা রাঁধার অবকাশ এখন নেই বললেই চলে। ধোঁকার ডালনার এই অকৃত্রিম স্বাদ থেকে সুদর্শনাদির দুই সন্তান কৃতি আর সৃজিত বঞ্চিত।
ছোটবেলায় অনিন্দিতাদির সন্ধেবেলার প্রিয় খাবার ছিল দুধ মুড়ি। আমের মরশুমে দুধ মুড়ির সঙ্গে থাকত আঁটিসুদ্ধু আম। মাহিকা সেই স্বাদ কোনোদিন উপভোগ করতে পারেনি বলে দুধ মুড়ি আম কিম্বা কলা অন্দিদিতাদির সান্ধ্যকালীন আহার থেকে বাদ পড়েছে।
অনিন্দিতাদি আর সুদর্শনাদি – এই দুজন মায়ের কাছেই প্রতিদিনের খাওয়াদাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। দিনের শেষে ওদের একটাই চাওয়া – এক পদ হলেও দিয়ে যেন তৃপ্তি করে ভাত খাওয়া যায়। ব্যস্ত জীবনের মধ্যে দৈনন্দিন রান্নার জন্য তাই রান্নার দিদি ভারতীদি বা দীপার উপর ওদের অনেকটা নির্ভর করতে হয়। সময়ের অভাব মানেই চটজলদি সুস্বাদু রান্নার পথ ধরতে হয়। সুদর্শনাদির বাড়িতে যেমন সর্ষে, পোস্ত আর কাঁচালঙ্কা বেটে টিফিন বাক্সের মধ্যে ভরে ভাপা চিংড়ি তৈরি হয়ে যায়। এই রান্না ওদের বাড়ির সকলের খুব প্রিয়।
কলেজে পড়ানো, খাতা দেখা, আরও নানা কাজের মধ্যেও অনিন্দিতাদি তার মেয়েকে মরশুমের সব খাবার আর বাঙালি বাড়ির চিরকালীন রান্নাগুলো খাওয়া অভ্যাস করিয়েছে। প্রথম পাতে তেতো খাওয়া কিম্বা ছোট মাছ খাওয়ার গুরুত্ব মাহিকা খুব অল্প বয়সেই বুঝে গেছে। গরম পড়লে আগের দিন রাতে দই পেতে রাখতে ওর ভুল হয় না। পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়েই দই ওদের খাওয়াদাওয়ার নিরন্তর সঙ্গী। দই চিঁড়ে, ঘোল, দই ভাত তখন খাবারের তালিকায় জুড়ে যায়।
বিজয়া দশমীর দিন ১০৮ বার ‘শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়’ লেখার পর ঠাকুমার হাতে গড়া চিনির নাড়ু খেতে হত। সঙ্গে থাকত নারকোল দেওয়া ঘুগনি আর কুচো নিমকি। সেইসব দিন এখন কেবলই সুদর্শনাদির স্মৃতির পাতায়। সারা সপ্তাহ অফিসের প্রবল ব্যস্ততা থাকলেও, ছুটির দিনে লুচি আর সাদা আলুর তরকারি বাড়িতে হবেই। লুচি হবে আকারে ছোট আর ধবধবে সাদা, এক গরাসেই কালো জিরে আর কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দেওয়া সাদা তরকারির সঙ্গে যেন মুখে পুরে নেওয়া যায়।
একটা স্টিলের টিফিন বাক্সের মধ্যে চুপসানো লুচি রাখা, পাশে আর একটা ছোট্ট স্টিলের বাক্সে হলদে আলু ভাজা। টিফিন বাক্সসুদ্ধু পলিথিনের ব্যাগে মোড়ানো। বেঞ্চের উপর টিফিন বাক্স খোলামাত্রই নিমেষের মধ্যে লুচিগুলো শেষ হয়ে যেত। এ আমাদের প্রজন্মে মধ্যবিত্তের টিফিনবেলার খুব পরিচিত ছবি। সুদর্শনাদি আর অনিন্দিতাদি দুজনের থেকেই জেনেছিলাম আজকাল লুচি তরকারি, পরোটা আলুভাজা বা রুটি তরকারি টিফিনে মোটেও দেওয়া চলে না।
একক মায়েদের ক্ষেত্রে কাজে বেরোবার আগে ছেলেমেয়েদের টিফিন গুছিয়ে দেওয়াও একটা চ্যালেঞ্জ। সুদর্শনাদি সৃজিতের টিফিন বাক্সে সযত্নে স্যান্ডউইচ ভরে দেয় আর অনিন্দিতাদি রুটির ভিতর তরকারির সঙ্গে সস আর অন্যান্য জিনিস দিয়ে রোলের আকারে মুড়ে দেয়।
সুদর্শনাদির বাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর তিনকোনা পরোটা সহযোগে আমসত্ত্ব, খেজুরের চাটনির স্বাদ সৃজিত আর ওর বন্ধুদের হয়ত এখনো অজানা।
কর্মরত একক মায়েদের বাজেট এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। বিশ্বায়নের যুগে বাজার থেকে খাবার – সবই হাতের মুঠোয়। মোবাইল ফোনের সুবাদে খুব তাড়াতাড়ি নিজের পছন্দের খাবার বাড়ির দোরগোড়ায় চলে আসে। আজকের দিনে বিভিন্ন অ্যাপ বাজার করার বিশেষ সুবিধা দিয়ে চলেছে। সুদর্শনাদি আর অনিন্দিতাদির জীবনেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। তার মধ্যেও ওরা বাইরের খাবারের প্রলোভন থেকে সন্তানদের বিরত রাখতে চেষ্টা করে। শরীরের উপর অতিরিক্ত বাইরের খাবার খাওয়ার কুপ্রভাব পড়ে এবং ব্যাপারটা যে খরচসাপেক্ষও, তা ওরা ওদের বুঝতে শেখায়।
আরো পড়ুন অতুলের আত্মহত্যা পিতৃতন্ত্রেরই ফল, নারীবাদের দোষ নয়
মা, ঠাকুমা বা তাঁদের আগের প্রজন্মের মহিলাদের অন্দরমহলে রান্নাঘর অনেকটা জায়গা দখল করে ছিল। এখনকার কর্মরত মায়েদের চ্যালেঞ্জটা আলাদা। তাদের শৈশবের পরিচিত স্বাদগুলো নিজের রান্নার মধ্যে দিয়ে ফিরে তারা ফিরে পেতে চায়। সেই স্বাদের রূপ-রস-গন্ধ সন্তানদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়। শহুরে ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে ঘর আর বাইরের জীবন সামলে সুদর্শনাদি আর অনিন্দিতাদির মত অনেক কর্মরত একক মা তাদের নিজেদের মত করে এই লড়াইয়ে সামিল। এই মার্চে, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের মাসে, তাদের সেই লড়াইকে কুর্নিশ জানাই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







