রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী, প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। পালটা উস্কানি দিচ্ছেন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। ধর্ম নিয়ে রাজনীতিতে মেতেছে সংসদীয় ব্যবস্থায় আসনসংখ্যার বিচারে রাজ্যের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানাধিকারী দুটি দল। অন্যদিকে দেউচা-পাঁচামিতে আদিবাসীদের জমি, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন থেকে স্লোগান উঠছে ‘লোকসভা না বিধানসভা, সবার ওপর গ্রামসভা।’ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ দেখালে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি ছাত্রকে নির্মমভাবে আহত করে চলে যাচ্ছে।
বিজেপি-তৃণমূলের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির পাশাপাশি গণতন্ত্র, বাঁচার অধিকার, পরিবেশ রক্ষার দাবিতে গড়ে উঠছে মানুষের জোট। আর জি কর, যাদবপুর, দেউচা-পাঁচামির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজ্যে দক্ষিণপন্থা বনাম বামপন্থার মেরুকরণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আন্দোলন মোকাবিলায় বিজেপি আর তৃণমূলের বোঝাপড়া আর গোপন থাকছে না। বলা ভাল, তৃণমূল আর বিজেপি আন্দোলনের বিরোধিতায় নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কুৎসা, অপপ্রচার দেখে ধাঁধা লাগছে – আমরা মমতা ব্যানার্জির অধীন পশ্চিমবঙ্গে আছি, নাকি আদিত্যনাথের অধীন উত্তরপ্রদেশে আছি। গোদি মিডিয়া ও দিদি মিডিয়ার মধ্যে বিভেদরেখাও মুছে যেতে বসেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন থেকে প্রথমে বিজেপি ফায়দা তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। বলা যেতে পারে, আন্দোলনকারীরা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিজেপি নেতারা গেলেই ‘গো ব্যাক’ স্লোগান উঠেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির নারী নির্যাতন, সেখানকার রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রচার বেড়েছে। এই আন্দোলন কাজের জায়গায় নারীর নিরাপত্তা, পুরুষতন্ত্র, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম দুর্নীতি, তাকে টিকিয়ে রাখতে হুমকি সংস্কৃতি, চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থায় সীমাহীন দুর্নীতি, মেডিকাল কাউন্সিল, ছাত্র সংসদ সহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার রাজনীতিকে সরাসরি প্রশ্ন করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। এই দাবিগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্যের বেসরকারিকরণ, কর্পোরেট দুনিয়ার ওষুধ, রোগনির্ণয় নিয়ে অনৈতিক ব্যবসার প্রশ্ন। গত লোকসভা ভোটের আগে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে ৩৫টি ওষুধ কোম্পানি মিলে নির্বাচনী বন্ডে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ ওঠে, করোনার ভ্যাক্সিন তৈরির বরাত পাওয়া সিরাম ইনস্টিটিউট বিজেপিকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা দিয়েছিল, যদিও তা নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে নয়। পাশাপাশি মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় দেখা গেছে যে রাজ্যজুড়ে সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিম্ন মানের, মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ নিয়ে দুর্নীতি কোন স্তরে।
স্বাভাবিকভাবেই আর জি কর আন্দোলনে উঠে আসা দাবিগুলি তৃণমূলের মত বিজেপির পক্ষেও অস্বস্তিকর। তাই একাধিকবার বিজেপি নেতারা ওই আন্দোলনকে কটাক্ষ করেছেন। সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার দরকার নেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিও বিজেপির পক্ষে কম অস্বস্তিকর নয়। তৃণমূল ও বিজেপির ঐকমত্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রকের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দেশদ্রোহী তকমা দিতে নেমেছে বিজেপি ও গোদি মিডিয়া। তৃণমূল আর বিজেপি – দুই দলই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে লোক খেপানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে মুক্ত চিন্তার দ্বার রুদ্ধ করতে আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছিল, সেই একই কায়দায় যাদবপুরের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তফাত শুধু এটুকুই যে জেএনইউ দখলের বিরুদ্ধে বামেদের পাশাপাশি দেশের প্রধান বিরোধী দলও সরব হয়েছিল। খোদ রাহুল গান্ধী ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু যাদবপুরের বেলায় ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে লোকসভার প্রধান বিরোধী দল নিশ্চুপ।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উপরে একের পর এক আক্রমণ নেমে আসছে। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নানা উঁচু পদে বসিয়ে দখলদারি সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা হয়েছে। প্রতিবাদী ছাত্রদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। মোদী সরকারের প্রথম দফায় ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু করোনা অতিমারীর কারণে দীর্ঘকাল ক্যাম্পাসগুলি বন্ধ থাকায় সেই আন্দোলনে ভাটা পড়ে। সেই সুযোগেই নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি গ্রহণ করা হয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত কোনো শিক্ষাঙ্গনে সরকারবিরোধী আন্দোলন হলেই তাকে দেশদ্রোহীদের আখড়া বলে প্রচার করা হচ্ছে। প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের ইউএপিএ সহ নানা অগণতান্ত্রিক আইনে কারারুদ্ধ করা হচ্ছে। সঙ্ঘের এই দখলদারির কদর্য রূপ আমরা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখতে পাচ্ছি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর সঙ্ঘের আক্রমণও নতুন নয়। একদা বিজেপি সরকারের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে তৃণমূলের রাজ্য সরকারে মন্ত্রী হওয়া বাবুল সুপ্রিয়র নেতৃত্বেও আক্রমণ হয়েছিল।
দেশজোড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উপর দখলদারির এই নয়া উদারনৈতিক পথটি তৃণমূল রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই গ্রহণ করেছে। ২০১১ সালের পরেই একের পর এক আইন সংশোধন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিচালন সমিতিতে সরকার তথা শাসকের আধিপত্য সুনিশ্চিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের মতই এই সরকারও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাতন্ত্র্য, স্বাধিকার ধ্বংস করেছে। নির্বাচনের বদলে মনোনয়ন প্রথায় শাসক ও আমলাতন্ত্রের সংমিশ্রণে শিক্ষাঙ্গনগুলিকে বদ্ধ কারাগারে পরিণত করার চেষ্টা চলেছে, যার অঙ্গ হল হুমকি সংস্কৃতি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন এই রাজ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ছাত্রছাত্রীদের মতামত প্রকাশ করার কোনো অধিকারই এখন এ রাজ্যে নেই। স্কুলগুলিতেও শাসকের দখলদারি নিশ্চিত করতে ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে অভিভাবকদের ভোটদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এখন শাসক দলের নেতা ও ঘনিষ্ঠদের দাদাগিরি, আর্থিক বখরা নেওয়ার উর্বর ক্ষেত্র।
ফলে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। নানা অজুহাতে ছুটি, শূন্য পদে নিয়োগ বন্ধ, পরিকাঠামোর জন্য অর্থ না দিয়ে পরিকল্পনামাফিক সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে সরকারই মেরে ফেলতে চাইছে। বিদ্যালয় ছুটের হার বৃদ্ধি, নাম নথিভুক্ত করেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বিশালসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর না বসা, কলেজগুলিতে স্নাতক স্তরে আসন সংখ্যা ফাঁকা থাকা – সবই একই দিকে ইঙ্গিত করছে। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। রাজ্যপাল-রাজ্য তরজায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ করা হচ্ছে না। ওই তরজা যে নাটক ছাড়া কিছুই নয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় তৃণমূল-বিজেপি ঐক্য তা প্রমাণ করে দিল।
ছাত্র সংসদের নির্বাচন বন্ধ করার স্বৈরাচার আসলে কর্পোরেটের নির্দেশে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্রের পরিসর ধ্বংস করার কর্মযজ্ঞের অঙ্গ। তাই মেডিকাল কলেজগুলিই হোক বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও সরকার ছাত্র সংসদের নির্বাচন চাইছে না। যাদবপুরের মত বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হলে শিক্ষা ব্যবসায়ীদের সুবিধা। কম বেতনের উচ্চ মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবসার পক্ষে বিপজ্জনক। কর্পোরেটকে শিক্ষা ব্যবসার সুযোগ করে দিতে এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের পক্ষে বিপজ্জনক বলে প্রচার করতে হবে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা, নিরাপত্তার নামে শিক্ষাঙ্গনের ভিতর পুলিস ফাঁড়ি বসানোর চেষ্টা – সবই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দখলদারির জন্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বড় অংশীদার যে ছাত্রছাত্রীরা, সরকার নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছে করলেই যে পুলিস ঢোকানো চলে না – সেটাই ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ১ মার্চ শাসক-ঘনিষ্ঠ অধ্যাপকদের সম্মেলনের নামে শাসক দলের দুর্বৃত্তদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপ্রবেশের ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।
তারই মধ্যে দেউচা-পাঁচামিতে কয়লা খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের প্রতিরোধ তৃণমূল-বিজেপির দ্বিমেরুকরণের ছককে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী পরদিন থেকেই দেউচা-পাঁচামিতে কয়লা খনির কাজ শুরু করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সরকারের দাবি ছিল, স্থানীয় অধিবাসীরা রাজি হয়ে গেছেন। সে দাবি যে মিথ্যা, তা চলতি আন্দোলনই প্রমাণ করছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরের দিনই কাজ শুরু করতে গেলে স্থানীয় আদিবাসী মহিলারা বাধা দেন। ৪ মার্চ কাজ আবার শুরু করতে গেলে আদিবাসী মহিলারা প্রতিরোধে নামেন। তারপর শুরু হয়েছে সন্ত্রাস। বাইক বাহিনি, জেলার উচ্চপদস্থ পুলিস আধিকারিকের হুমকি থেকে শুরু করে বাদ যাচ্ছে না কিছুই। জঙ্গল, বাসভূমি বাঁচাতে আদিবাসীরা কিন্তু অনড়। প্রথম থেকেই সেখানে অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল। বারবার গ্রামসভার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠলেও রাজ্য সরকার তা মানেনি।
বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রথা বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। এই অনুশীলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একসঙ্গে চলা, প্রাকৃতিক সম্ভারে সর্বজনীন অধিকারের ধারণা। যে অধিকার যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিক সম্ভার লুঠ করার বদলে পরিমিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তাকে রক্ষা করে এসেছে। সংবিধানের ১৩ নং ধারার বিভিন্ন উপধারা অনুসারে আদিবাসীদের প্রথাগত ধারা ও স্বশাসনের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে সরকার বাধ্য। কিন্তু দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় ব্যক্তি মালিকানাকে রক্ষা করতে। আদিবাসীদের প্রথাগত সভা বা ষোল আনা ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিলে সামাজিক তথা প্রাকৃতিক সম্ভারে ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে না। পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, বনাধিকার আইনে গ্রামসভা গুরুত্ব পেলেও, আদিবাসীদের প্রথাগত সভার সঙ্গে তা তুলনীয় নয়। সীমিত হলেও এইসব আইন অনুসারে কিছু অধিকার রয়েছে।
আজকের রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর মধ্যে যে গণতন্ত্রের পরিসর রয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই কম। প্রতিনিধিত্বমূলক এই গণতন্ত্রে ভোট দিয়ে আমাদের প্রতিনিধিকে আইনসভায় পাঠানো ছাড়া নাগরিকের বিশেষ ক্ষমতা নেই। ছাত্র সংসদ, গ্রামসভা ইত্যাদির মাধ্যমে যেটুকু অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল, তাও চলে যেতে বসেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান অংশীদার ছাত্রছাত্রী বা বিদ্যালয় স্তরে অভিভাবকরা। তাঁদের মত জানানোর অধিকারও থাকবে না। প্রাকৃতিক সম্ভারে সমৃদ্ধ জনপদের আদিবাসী-মূলবাসীদের মত জানানোর অধিকার থাকবে না। পুঁজির আগ্রাসনে লুণ্ঠিত হচ্ছে সেই অধিকার। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্পোরেট দালাল সরকার তাকেই উন্নয়ন বা বিকাশ বলে ঢাক পেটাচ্ছে। ছত্তিসগড়, মণিপুর বা এই রাজ্যের দেউচা-পাঁচামি – গোটা দেশে একই চিত্র। প্রতিবাদ করলেই দেশের নিরাপত্তার অজুহাতে তা দমন করা হচ্ছে। দেশের নিরাপত্তার নামে দেশবাসীর সর্বনাশ করে আসলে পুঁজিকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।
আরো পড়ুন দেউচা-পাঁচামি সরল উত্তর পাওয়ার জায়গা নয়
পুঁজিবাদ সবকিছুকেই পণ্যে পরিণত করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক সম্ভার। পুঁজির অবাধ আগ্রাসনের স্বার্থে আজ বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ধ্বংস করতে অতি দক্ষিণপন্থাকে মদত দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিকরণ, পরিবেশ ধ্বংস, বিদ্বেষের রাজনীতি প্রভৃতি যার সাধারণ বৈশিষ্ট্য। বিজেপি ও তৃণমূল একই পথের পথিক। বিজেপিকে হারাতে কেউ তৃণমূলকে যোগ্য মনে করতে পারেন। কিন্তু তাতে বিদ্বেষ, ঘৃণার রাজনীতিকে হারানো যায় না।
অতি দক্ষিণপন্থা, কর্পোরেটতন্ত্রের মোকাবিলায় ঐক্য গড়ে তুলতে বামেরা কি সক্ষম হবে? সংসদীয় রাজনীতিতে ঐক্য বলতে বোঝায় আসন সমঝোতা। নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই হলেও, শুধুমাত্র তাকে ঘিরেই কর্মসূচি গ্রহণ করলে এই আক্রমণের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিধানসভায়, এবং এ রাজ্য থেকে লোকসভায়, বামেদের কোনো প্রতিনিধি নেই। তাই আইনসভার ভিতরে লড়াই করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু রয়েছে সংগ্রামের রাজপথ। সেই পথের লড়াই কীভাবে দক্ষিণপন্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে তা রাজ্যের চলমান আন্দোলনগুলি দেখিয়ে দিচ্ছে। দলীয় পরিসরের বাইরে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার বড় দায়িত্ব বাম দলগুলিরই।
আশার কথা, সেই সম্ভাবনা দেখাও যাচ্ছে। আর জি কর কাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দলীয় পরিচয়কে সরিয়ে রেখে বিভিন্ন বাম সংগঠন এক হয়েছিল। আবার বামেদের একাংশ সেই ঐক্য থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্নও করেছে। কিন্তু তার জন্য বাম ঐক্যের সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়নি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় সেই ঐক্য আরও সংহত হয়েছে। যাদবপুরের ছাত্রদের ডাকা নাগরিক মিছিলে পা মিলিয়েছেন মেডিকাল কলেজের ছাত্রছাত্রী, অভয়া মঞ্চ, বিভিন্ন গণসংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনের সংগঠকরা। পারস্পরিক বিভেদ আপাতত সরিয়ে রেখে বাম দল ও ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংহতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
অধিকার আন্দোলন ও পরিবেশ আন্দোলন – দেউচা-পাঁচামির আন্দোলন এই দুইয়ের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলছে। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা পরিবেশ আন্দোলনও পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে। রাজনৈতিক নানা প্রশ্নে বিরোধ থাকুক, মতাদর্শগত লড়াই চলুক। কিন্তু দলীয় সঙ্কীর্ণতার বাইরে এসে আন্দোলনভিত্তিক এই ঐক্যকে সংহত করা বাম দলগুলির বড় কাজ। লড়াইয়ের পথে গড়ে ওঠা ঐক্যই পারবে অতি দক্ষিণপন্থাকে প্রতিহত করতে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







