ভবতারণ কুমার
শীতের আমেজ শেষ হতেই রুখা মাটির দেশ পুরুলিয়ার বনবাদাড়, খেতখামার, পাহাড়-নদী, টাঁড় টিকর সেজে উঠেছে সবুজ শাড়ির লাল আঁচলের মায়াবী খেলায়।
লালে লাল পলাশ বন মন হল আজ উচাটন
মন মেতেছে মহুয়া ফুলের বাসে গো।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রকৃতির তুলির টান এমনি অমোঘ যে, পিকনিকের দিন শেষ হতে না হতেই পলাশের টানে পুরুলিয়ার কালো পিচ থেকে পাথুরে মেঠো পথ, জেলা শহর থেকে পাহাড়তলি পর্যটকদের ভিড় উপচে পড়ছে। গলায় পলাশফুলের মালা, খোঁপায় পলাশের পাপড়ি, হাতে পলাশের ডাল নিয়ে চলছে দেদার সেলফি। যেদিকে চোখ যায় থোকায় থোকায় লাল পলাশ। যেন শিল্পীর অন্য রং ফুরিয়ে গিয়েছে, তাই চিত্রপটে লাল রং দিয়ে এঁকে চলেছেন অযোধ্যা পাহাড়, মুরগুমা ড্যাম, বাঁন্দু নদীর পাড়, দেউলঘাটা, জয়চণ্ডি, পাঞ্চেত, ফুলঝর্না, কাঁসাই,আড়ষা, বাঘমুন্ডি, ঝালদা, বলরামপুর, বান্দোয়ান একেকটা জায়গা যেন শিল্পীর তুলি।
পলাশগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ণ, কচি মুখগুলো রং লাগাতে পারে না। আজও তাদের দুটি ভাতের জন্য বাবুদের কাছে যেতে হয়, বলতে হয় ‘লে ন বাবু একটা মালা, টাটকা পলাশফুল দিয়ে গাঁথা বটে, না না ভুঁয়ে পড়া ফুলের মালা লয়।’
বনের কাঠ, কেন্দুপাতা, শালপাতা, মহুল, কচড়া, লাক্ষা বিক্রি করে যাদের দিন চলত। তারা জানে পলাশফুল যত সুন্দরই হোক না কেন, তাতে পেট ভরে না।।
পলাশ এক প্রাচীন ফুল, সংস্কৃতে বলে কিংশুক। আয়ুর্বেদেও এর উল্লেখ আছে। শোনা যায় পলাশগাছের ছাল, ফুল ইত্যাদি দিয়ে বহু ধরনের রোগে উপকার পাওয়া যায়। যেমন চামড়ার রোগ, পেটের সমস্যা, ডায়বেটিস, ডায়রিয়া, জ্বর, কফ, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি। ফুল থেঁতলে লাল রং পাওয়া যায়। যা-ই হোক, পলাশ একটা মাঝারি মাপের আর্দ্র পর্ণমোচী বৃক্ষ। বৈজ্ঞানিক নাম Butea Monosperoma, যা fabaceae পরিবারের সদস্য। উচ্চতা ২০-২৫ ফুট। ধূসর রংয়ের আঁকাবাঁকা শাখা প্রশাখা। শীতের শেষে পাতা ঝরে রেশমের মত সূক্ষ্ম সবুজ গাঢ় পাতা হয়। পাতা সবসময়ই তিনখানা। এর ফুল ২-৪ সেন্টিমিটার, থোকা থোকা।
ফলও হয় – সীমের মত লম্বা। পলাশের বীজ ছোট গোল লাল মাথায় কালো টিপের মত। শুধু পুরুলিয়া নয়, রাজ্য তথা দেশের বাইরেও পাওয়া যায়। যেমন বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়ায়। কিন্তু রুখা মাটির দেশের পলাশফুলের বাহার চোখধাঁধানো। লাল হুদুদ, সাদা পলাশের ভূমি এই পাথুরে পাহাড়ের দেশ।
পলাশফুল কোন কবি, গীতিকারকে না মুগ্ধ করেছে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন
রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে,
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত আকাশে।
বা
কুঞ্জবনের অঞ্জলি যে ছাপিয়ে পড়ে
পলাশকানন ধৈর্য হারায় রঙের ঝড়ে,
বেণুর শাখা তালে মাতাল পাতার নাচে।
কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন
হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল
এনে দে এনে দে নৈলে বাঁধব না, বাঁধব না চুল।
বাংলাদেশের এক বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গানেও পলাশের উল্লেখ আছে। এছাড়াও আধুনিক বাংলা গান,মানভূমের লোকগান, ঝুমুর গানে তো আছেই। এখনো নতুন নতুন গান রচিত হচ্ছে পলাশকে নিয়ে।
পুরুলিয়া জেলায় সারি সারি শাল, মহুল, কুসুম, পিয়াল, সেগুন, সাতসর, গামার, আম, জাম, কাঁঠাল, শিরীষ, অশ্বত্থ, অর্জুন, বট, ডুমুর, ভেলা, কেন্দু, ডহু, আমড়া, ডোকা, নিম, তেঁতুল, চিটচিটি, কদম, কুড়চি, ভুড়কুম সহ বাবলা, কুল, সিন্দুয়ার ভরভরি, ফুটুস, ভেঁররা, সাহারঝুড়ি, পলাশের দুর্ভেদ্য জঙ্গলে অজস্র বন্য পশুপাখির বাস।
আরো পড়ুন উন্নয়নের চাপে বিপর্যয়: কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে?
গোটা বছর ধরে রং বেরং ফুলে সেজে ওঠে সুন্দরী পুরুলিয়া।
এলাকার মানুষ বলে ‘হামদের বৃষ্টি ডাকা জঙ্গল আছে, বাঘ, ভাল্লুক, হরিণ, হাতি লুকাঁয় রাখা বন আছে, হামাদের বসন্ত রামধনু সাঁতরঙে রাঙা।’ কিন্তু লোভ আর লাভে চলা সভ্যতার করাল গ্রাস জঙ্গল ধ্বংস করে কখনো রাস্তার অজুহাতে, কখনো সৌন্দর্যায়নের ফাঁকা বুকনি আউড়ে, কখনো বা জলবিদ্যুৎ করার নামে। দামি কাঠ চালান হয় দেশে বিদেশে। তার বদলে সোনাঝুরি, ইউক্যালিপটাস লাগানো হচ্ছে, পলাশের প্রচার হচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে হেক্টরের পর হেক্টর ঘন জঙ্গলের মাঝে চাষের জমি ও মানুষের বসতি, কাঁচা লালমাটি ও কাঁকরে মেঠো পথ। পথের দুধারের গাছ, গাছের পিছনে পাহাড় ও ঘন জঙ্গল, তার আড়ালে সূর্যের আলো, জ্যোৎস্নার মায়াবী ছটার পুরুলিয়া।
বড় বড় গাছের বনের ফাঁক ফোকরে এতদিনের অবহেলা আর অনাদরে বড় হওয়া পলাশকে সম্বল করে রিক্ত হাতে জঙ্গলমহল দাঁড়িয়ে আছে আজ। যে পথ বেয়ে শেষ হতে চলেছে শাল, মহুল, পিয়াল, কুসুম; সেই পথ ধরেই আজ পলাশের বাড়বাড়ন্ত। এ রুগ্ন শরীরের রক্তবমি নয় তো?
নিবন্ধকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







