সুমিত ঘোষ
বলিউডি সিনেমার প্লট হিসাবে মারাঠাদের মুসলমান শাসনবিরোধী সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। তানহাজি (২০২০)-র পর এবার বড় পর্দায় এসেছে ছাওয়া। প্রসঙ্গ শিবাজীর পুত্র শম্ভুজি ও মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের যুদ্ধ। তাই দেখে নেওয়া যাক ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের গবেষণা থেকে শম্ভু রাজে সম্পর্কে কী জানা যায়।
যদুনাথ সরকার শম্ভুজির চরিত্র সম্পর্কে বলছেন, ‘শিবাজীর জ্যেষ্ঠ পুত্র শম্ভুজি ছিলেন তাঁর বৃদ্ধ বয়সের অভিশাপ। উনিশ বছরের এই যুবক ছিলেন হিংস্র, কৌতুকপ্রিয়, অস্থির, বুদ্ধিহীন এবং নৈতিকতার দিক থেকে কুখ্যাত। একজন বিবাহিত ব্রাহ্মণ মহিলার প্রতি তাঁর কুকীর্তির জন্য তাঁকে পানহালা দুর্গে আটকে রাখা হয়েছিল, কিন্তু দিলীর খানের সঙ্গে যোগ দিতে তিনি নিজ স্ত্রী ইয়েসুবাঈ এবং কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে পালিয়ে যান। শিবাজী ধাওয়া করার জন্য একটি বাহিনী পাঠান, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যায়। …শিবাজীর উত্তরাধিকারী তাঁর পক্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ায় দিলীর খান আনন্দের স্রোতে ভেসে যান…। তিনি এত খুশি হয়েছিলেন যেন সমগ্র দাক্ষিণাত্য জয় করেছেন!… তিনি আনন্দে ঢোল বাজিয়ে সম্রাটের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠান। শম্ভুকে ৭-হাজারী ও রাজা উপাধি দেওয়া হয়েছিল এবং একটি হাতি উপহার দেওয়া হয়েছিল। এটি ঘটেছিল ১৬৭৮ সালের নভেম্বরে।’ (দ্য হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজেব; ৪র্থ খণ্ড)
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অর্থাৎ নারী অবমাননা থেকে শুরু করে পিতার রাজ্য দখল করতে শত্রু (মোগল) শিবিরে যোগদান – সবই করেন শম্ভু। এমনকি মোগলদের কাছ থেকে রাজা উপাধিও পান। ছেলের এই দুষ্কর্ম সম্পর্কে শিবাজীর দুশ্চিন্তা প্রসঙ্গে যদুনাথ বলেছেন,‘শম্ভুজির সাম্প্রতিক বিদ্রোহ নবপ্রতিষ্ঠিত মারাঠা রাজ্যের গুরুতর বিপদের সম্ভাবনা প্রকাশ করে দিয়েছিল। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের চরিত্র শিবাকে ভবিষ্যতের ভাবনায় বিষণ্ণ করেছিল। …শিবাজী শম্ভুর সঙ্গে সমঝোতা এবং সন্ধি করার জন্য প্রচুর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি রাজপুত্রের সমস্ত মহৎ প্রবৃত্তির পাশাপাশি তার স্বার্থের প্রতিও আবেদন করেছিলেন, অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন, তাকে তাঁর কোষাগার, রাজস্ব আয়, দুর্গ এবং সংগ্রহের তালিকা দেখিয়েছিলেন এবং তাকে একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের যোগ্য হতে ও হিন্দু জগতে তার নিজের রাজত্বের সমস্ত উচ্চাশা পূরণ করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শিবাজীর মত একজন জন্মগতভাবে চরিত্রবান বিচারক অবশ্য শীঘ্রই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর ধর্মোপদেশগুলি বধিরের কানে যাচ্ছে, এবং তাই তাঁর শেষ দিনগুলি হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল’ (দ্য হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজেব; ৪র্থ খণ্ড)। যদুনাথের শম্ভু সম্পর্কে এই পর্যবেক্ষণের ঠিক বিপরীত চরিত্র অঙ্কন করা হয়েছে ছাওয়া ছবিতে।
শিবাজীর মৃত্যুর আগে শম্ভু মারাঠা শিবিরে ফেরত এসে নজরবন্দি হন। শিবাজীর মৃত্যুর পর মারাঠা সাম্রাজ্যের ছত্রপতি পদের জন্য তাঁর পরিবারের আভ্যন্তরীণ হিংসার উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে যদুনাথ বলছেন, ‘তাঁর হারেমের ভিতরে ষড়যন্ত্রের ফলে অশুভ পরিস্থিতির তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। সাতচল্লিশ বছর বয়সে তাঁর দুই বা তিনজন স্ত্রী এবং দুই পুত্র জীবিত থাকতেও তিনি তিনজন যুবতীকে বিয়ে করার ভুল করেছিলেন… অতএব শিবাজীর হারেম ছিল একটি গোপন যুদ্ধক্ষেত্র – রানিরা তাঁদের দাসী, ডাক্তার এবং জাদুকরদের মাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন। ১৬৮০ সালের শুরুর মাসগুলিতে ক্রমাগত আলোচিত হওয়া উত্তরাধিকারের প্রশ্নটি স্ত্রীদের এই দ্বন্দ্বকে তীব্রতর করে তোলে এবং ফলস্বরূপ হারেম ও মন্ত্রিসভায় চক্রান্ত ও পাল্টা ষড়যন্ত্র চলতে থাকে’। এই পারিবারিক হিংসা শেষ হয় শিবাজীর দ্বিতীয় পত্নী সোয়ারাবাঈ ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের হত্যার মধ্যে দিয়ে। শম্ভুজি সিংহাসনে বসেন।
কিন্তু সিনেমায় দেখানো হয়েছে যে রোগাক্রান্ত ও মৃত্যুশয্যায় শায়িত সোয়ারাবাঈয়ের পা ধরে শম্ভু কাঁদছেন। পিতার মৃত্যুর পর বহু মারাঠা সর্দার শম্ভুর সৎভাই রাজারামকে সমর্থন করেন। তা শম্ভুর মনের উপর গভীর ছাপ ফেলে। তিনি আর কোনোদিন নিজের সভাসদদের বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। যদুনাথ বলছেন যে কবি কুলেশের মত কনৌজের ব্রাহ্মণের পরামর্শ শম্ভুর রাজত্বকে বিপদের মুখে ফেলে দেয়। শম্ভু এঁর পরামর্শ অন্ধের মত মানতে থাকেন এবং মদ্যপান, গণিকা সংসর্গ ও যুদ্ধোন্মাদনায় কাটাতে থাকেন।
শম্ভুর নিষ্ঠুরতা, নির্দয় মনোভাব ও মোগলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ভেঙে পড়া অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে প্রজাপালক দেশমুখরা শিবির পরিবর্তন করে মোগলদের সঙ্গে হাত মেলান। অথচ সিনেমায় শম্ভুর পতনের কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে কেবল কিছু মারাঠা সর্দারের বিশ্বাসঘাতকতা। সিনেমায় খল চরিত্র হিসেবে দেখানো গনোজি ও কানোজি শির্কের বর্তমান বংশধর লক্ষ্মীকান্ত রাজে শির্কে, ফ্রান্সিস মার্টিন নামে একজন ফরাসী অফিসারের ডায়রি দেখিয়ে বলেছেন যে শম্ভুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাঁরই কিছু সভাসদ। তাই ছাওয়া ছবির নির্মাতাদের বিরুদ্ধে তিনি ১০০ কোটি টাকার মানহানির মামলাও করেছিলেন। ছবির পরিচালক লক্ষ্মণ উতেকর পত্রপাঠ ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন।
অন্যদিকে শম্ভুর পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং মারাঠা সৈনিকদের দ্বারা মহিলাদের গণধর্ষণ চিত্রনাট্য থেকে বাদ পড়েছে। যদুনাথ বলছেন যে ১৬৮৩ সালে শম্ভুজি পর্তুগিজ ঘাঁটি গোয়া আক্রমণ করে মোগল ফৌজের হস্তক্ষেপের দরুন অসফল হয়ে আবার মদ্যপান ও গণিকা সংসর্গে ফিরে যায়। ঔরঙ্গজেব যখন বিজাপুর ও গোলকুন্ডা আক্রমণ করেন, তখনো শম্ভুজির টনক নড়েনি। শেষে খেলনা দুর্গে এসে শির্কেদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে সঙ্গমেশ্বরে ফুর্তি করতে গিয়ে শম্ভু মোগলদের হাতে ধরা পড়েন। ১৬৮৯ সালে তিনি ধরা পড়েন আর বুরহানপুরের বাসিন্দাদের উপর অত্যাচার চালানো ও হত্যার অপরাধে বধ হন (মারাঠা ইনসার্জেন্সি অ্যান্ড মুঘল কনকোয়েস্ট ইন দ্য ডেকান; জন রিচার্ডস, ১৯৯৩)। রাজারামকে মারাঠা সর্দাররা সিংহাসনে বসান, কিন্তু মোগল সেনা মারাঠা রাজধানীতে প্রবেশ করলে রাজারাম যোগীর বেশে পালিয়ে যান। শিবাজী ও শম্ভুজির স্ত্রী, সন্তানদের মোগলরা কোরেগাঁওতে রাজকীয় মর্যাদায় আটক করে। তারা শম্ভুর পুত্র সাহুকে ৭ হাজারী এবং রাজা উপাধি প্রদান করে (দ্য হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজেব; ৪র্থ খণ্ড)। অন্যদিকে রাজারাম মোগল সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকেন। রাজারাম ও ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ছত্রপতি সাহুর আমলে মারাঠা সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি ও ব্যাপ্তি শুরু হয়।
দেশে সহিষ্ণুতা হ্রাস সম্পর্কে আমির খানের মন্তব্যের শাস্তি হিসাবে লাল সিং চাড্ডা (২০২২) ছবির উপর গেরুয়া শিবিরের পরিকল্পিত আক্রমণ এবং সোশাল মিডিয়ার প্রচারের মাধ্যমে ছবিটা ফ্লপ করানোর সাফল্য, পদ্মাবত (২০১৮) ছবিতে পদ্মাবতীর দেবীত্ব রক্ষার্থে কর্ণিসেনার হাঙ্গামার ফলে অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোনের পোশাক পরিবর্তন, কবীর সিং (২০১৯) থেকে শুরু করে অ্যানিমাল (২০২৩) – একের পর এক বিষাক্ত পৌরুষকে গৌরবান্বিত করা ছবি – এসবের ধারাবাহিকতাতেই ছাওয়া ছবিটার আগমন। গত শতকের নয়ের দশকের ছবির মত অতিরঞ্জিত মারামারির দৃশ্য, নায়ক মুখ খুললেই বাঘের আওয়াজ, অতিরিক্ত ফোলানো পেশির প্রদর্শন, নিজেদের ইচ্ছামত ঘটনার বিকৃতি, বারংবার মোগল-মারাঠা দ্বন্দ্বের সময়কালকে চাঁদমারি করে তৈরি হওয়া চিত্রনাট্য – সবই চলছে আরএসএস-বিজেপির বিভাজনমূলক আদর্শের ভিত্তিতে। অথচ ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে গেরুয়া চিত্রনাট্যের একপেশে কাহিনি নস্যাৎ হয়ে যায়। সেই ইতিহাস যদুনাথের মত জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকেরই লেখা, যাঁর বিভিন্ন বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায় বিজেপির ওয়েবসাইটে, সেই যদুনাথ যাঁর সম্পর্কে বিজেপির ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারগীতিতে ছিল ‘তোমার ইতিহাস লেখে রোমিলা থাপার, যদুনাথ তুমি পড়ো না/তুমি তাই সত্যিটি মানো না, তুমি তাই সত্যিটি মানো না’। এই গানের কলি বিরোধীদের উদ্দেশে হলেও শম্ভু প্রসঙ্গে আরএসএস শিবির ও যদুনাথের অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে, আদতে গানের কথাগুলো ওদের নিজেদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
বোঝাই যাচ্ছে, ছাওয়া ছবির উদ্দেশ্য দুটি। এক, হিন্দুত্ববাদী উন্মাদনা সৃষ্টি। এমন উন্মাদনা যে দক্ষিণী খাবার সাম্বরের নামও শম্ভুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, যদিও দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজে পূজা পিল্লাই লিখেছেন, বহু তামিল ইতিহাসবিদের মতে মারাঠা শাসনের বহু আগের ইতিহাসেই সাম্বরের মত খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো। তাই শিবাজী-ঔরঙ্গজেব দ্বন্দ্বকে সহজপাচ্য করে তোলা হয়েছে। এমনিতেই ঔরঙ্গজেবের শাসনকাল বিতর্কিত। তিনি যেমন জিজিয়া কর ফের চালু করেন, আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে মন্দির ধ্বংস ও মসজিদ নির্মাণ করান, তেমন মন্দির সংরক্ষণ ও মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জমি দানও করেছিলেন। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্য ক্রমশ খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়। সাম্রাজ্য ততদিনে এত বড় হয়ে গিয়েছিল যে এক জায়গা থেকে একজন শাসকের দ্বারা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। জায়গিরদারী নিয়েও সংকট দেখা দেয়। যদুনাথ লিখেছেন, মোগল রাজকোষ খালি হতে থাকে, বিদ্রোহীদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সেনাবাহিনীর মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে, নৈতিকতার অবনতি ঘটে, সভাসদদের দুর্নীতি লাগামছাড়া পর্যায় পৌঁছয় এবং শাসককে মান্য করার মানসিকতা লুপ্ত হতে শুরু করে (মোগল ভারত)। তাই যদুনাথ ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালের শেষ ১৮ বছরকে ট্র্যাজেডি হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
ভারতীয় সমাজতত্ত্ববিদ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন, ভারত ভূখণ্ডের ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায় শাসকশ্রেণির স্বেচ্ছাচারিতা, রাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোহিত শ্রেণির জোট এবং সেই জোটের দ্বারা জনসাধারণের নিপীড়ন। পরবর্তীকালে উত্তর ভারতে মুসলমান শাসকদের বিজয় হিন্দুদের মধ্যে সামাজিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। হিন্দু অভিজাতদের একাংশ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার উদ্দেশ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে কিংবা নিজ ধর্ম বজায় রেখেই মুসলমান শাসকদের বিশ্বস্ত দরবারী হয়ে ওঠে। সেইসময় হিন্দু অভিজাতদের মধ্যে নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ বজায় রাখা ছাড়া অন্য কোনোদিকের নজর দেওয়ার প্রমাণ নেই। এমনকি রাজপুতদের মধ্যেও বিশ্বস্ততার প্রসঙ্গ ওঠে কেবল সেই প্রভুর প্রতিই, যিনি টাকা দিতেন। পরবর্তীকালে ভক্তি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে হিন্দু পুনর্জাগরণের ভিত্তি তৈরি হয়। বিভিন্ন বিদেশি পরিব্রাজকের লেখা অনুযায়ী, মধ্যযুগে সমগ্র উত্তর ভারতে বাংলা ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে খরা ও দুর্ভিক্ষ হয়। অভিজাতরা সেইসময় ছিল খুবই ধনী, আমজনতা ততোধিক গরিব (ভারতীয় সমাজ পদ্ধতি; ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত)। অর্থাৎ হিন্দু, মুসলমান সব শাসকই সাধারণ মানুষের উপর নিপীড়ন চালাত। হিন্দু শাসনকালে বর্ণব্যবস্থার নাগপাশ আর মুসলমান শাসনকালে বিবর্তিত সামন্ততন্ত্র শোষণ চালু রেখেছিল। সুতরাং প্রশ্ন ওঠে, ইতিহাসের পাতায় উল্লিখিত কোনো রাজা বা সম্রাটকে আজকের দিনে আমরা কীভাবে বিচার করব?
আরো পড়ুন ৮৩: এই দ্বেষের মাঝে বসে ওই দেশের গল্প
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ইতিহাসের একপেশে ধারণার বিপ্রতীপে ভারতীয় সমাজের বিবর্তনের ধারা অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। ভূপেন্দ্রনাথের মতে, ভারত ভূখণ্ডে প্রথম কেন্দ্রীভূত শাসন হল মৌর্য সাম্রাজ্য। তারপর হর্ষবর্ধনের শাসন। মোগল যুগেও কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সম্রাট আকবরের আমলে ভারত ভূখণ্ডে দিন-ই-ইলাহীর নামে একজাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলে, কিন্তু ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে তাঁর বিভিন্ন নীতির পরিণতিতে আঞ্চলিক স্বাধীনতা বা স্বরাজের ধারণার উদয় হয়। একদিকে পাঞ্জাবে আত্মপ্রকাশ করে শিখরা, মধ্য ভারতে শক্তি সঞ্চয় করেন রাজা দুর্জন সালের মত ব্যক্তিরা, রাজপুতানায় মাথা তোলেন চিতোরের রাজসিংহ, মাড়বারে দুর্গা দাস ও অজিত সিংহ আর মহারাষ্ট্রে স্বাধীন সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন শিবাজী। শিবাজী প্রাথমিকভাবে মাওলেদের একত্রিত করে সেনাবাহিনি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মারাঠা সাম্রাজ্য স্থাপন করতে উদ্যত হন। কিন্তু শিবাজী হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন, নাকি আদতে নিজের বংশের স্বাধীন শাসন স্থাপন করতে চাইছিলেন, তা বিতর্কের বিষয় বলে মনে করেছেন ভূপেন্দ্রনাথ। তাঁর মতে, বহু বিশিষ্ট মারাঠা অভিজাত শিবাজীর হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার আহ্বানকে নিজ রাজবংশ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হিসাবেই দেখেছিলেন। শিবাজীর আমলে মারাঠা সেনাবাহিনিতে পাঠান সেপাইদের দল ছিল। মারাঠাদের বহু হিন্দু রাজার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল, অন্যান্য হিন্দু শাসকদের একত্রিত করার পরিবর্তে চৌথ বা কর নীতি সম্পর্কিত দাদাগিরি, নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে মুসলমান শাসকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব মারাঠা শাসনকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের বদলে মহারাষ্ট্রীয় হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় পরিণত করে। মারাঠা সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলোও আমাদের এই আলোচনায় আসা উচিত। যদুনাথ ছটা কারণ দেখিয়েছেন।
প্রথম কারণ, মারাঠাদের বর্ণভেদ প্রথা। বিজাতীয় শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বিভিন্ন বর্ণের মানুষ একত্রিত হলেও লুণ্ঠনের মাধ্যমে একাংশ ধনবান হয়ে উঠে অন্যদের সঙ্গে বর্ণভিত্তিক ভেদাভেদ বজায় রাখে। নিম্নবর্ণের মহারাষ্ট্রবাসীদের উপর ব্রাহ্মণদের অত্যাচার বজায় থাকে। শিক্ষিত কায়স্থদের অন্ত্যজ হিসাবে চিহ্নিত করে ব্রাহ্মণরা। এমনকি রাজ্যাভিষেকের সময়ে স্বয়ং শিবাজীর ক্ষত্রিয়ত্ব অস্বীকার করে তারা। শিবাজী ব্রাহ্মণদের শায়েস্তা করতে দরবারী কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেও ধর্ম সংস্কারের পথে হাঁটেননি। পরবর্তীকালে ছত্রপতিদের ক্ষমতা হ্রাস এবং পেশোয়াদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি হলেও এই কোঙ্কনবাসী চিৎপবন বংশীয়দের ব্রাহ্মণত্ব মেনে নেয়নি পুণার ব্রাহ্মণ সমাজ।
দ্বিতীয় কারণ, ‘নেশন গঠনের চেষ্টার অভাব’।
তৃতীয় কারণ, স্থায়ী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা।
চতুর্থ কারণ, মারাঠা সর্দারদের স্বদেশের তুলনায় ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া।
পঞ্চম কারণ, ‘মুলুকগিরি’ অর্থাৎ নিজ স্বার্থে পররাজ্য লুঠ করা। এর ফলে কৃষি ও বাণিজ্যের অবনতি হতে শুরু করে। হিন্দু, মুসলমান, রাজপুত, জাঠ, বাঙালি, কন্নড় নির্বিশেষ মারাঠা শাসনের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। ষষ্ঠ কারণ, কূটনীতিকে অবজ্ঞা করে বার্ষিক যুদ্ধের মাধ্যমে লুণ্ঠন প্রক্রিয়া বজায় রাখতে গিয়ে সৈন্য ক্ষয় এবং শত্রু বৃদ্ধি। মারাঠা শাসনের সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে অবহেলা ও ঋণগ্রস্ততা। যদুনাথ আক্ষেপ করে বলেছেন, ইংরেজদের মত কর্মদক্ষতা, দূরদর্শিতা ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ক্ষমতা যদি মারাঠাদের থাকত, তাহলে ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হত (শিবাজী, প্রথম সংস্করণ)।
পরবর্তী অংশ আগামীকাল
নিবন্ধকার বামপন্থী আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








