কবীর খান পরিচালিত ছবি ৮৩ আমার অসম্ভব ভাল লেগেছে। কারণটা শিরোনাম থেকে নিশ্চিতভাবে খানিকটা আন্দাজ করা যাচ্ছে, তবুও কিছুটা বিস্তারে লেখার ইচ্ছে থেকেই নাগরিক ডট নেটকে অনুরোধ করা। সম্পাদকমণ্ডলীকে ধন্যবাদ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

১৯৮৩-র ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের আড়াই বছর পরে আমার জন্ম। খেলা, ভারতবর্ষ, জাতীয় দল, ক্রিকেটে বিশ্বকাপ — এসব যতদিনে আমার বোধগম্যতার সীমানায় এসেছে, ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয় ততদিনে দূরের ইতিহাস হয়ে গেছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মাথার চুল খানিকটা পেকে যাওয়া প্রৌঢ় কপিলদেবকেই আমি আগে দেখেছি। পরে ছবিতে দেখেছি এই প্রৌঢ়ই তারুণ্যে বলীয়ান হাতে বিশ্বকাপটি (তৎকালীন প্রুডেনশিয়াল কাপ) নিয়ে ভুবন ভোলানো হাসি মুখে সদর্পে দাঁড়িয়ে আছেন লর্ডসের গ্যালারিতে।

যদিও ছবি দেখেই এ দেশের একজন কিশোর হিসাবে প্রথম বিশ্বজয়ের গৌরব ও আনন্দের ইতিহাস চিনে নিতে আমার অসুবিধে হয়নি।

তারপর ২০১১ সালে, বলাই বাহুল্য, ভারতের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ পূর্ণ আশ্লেষে শরীরে, মনে মেখে নেওয়ার সুযোগ এসেছিল আরেকবার। আহা! সে এক রাত ছিল বটে।

আমার কৈশোর আরও অসংখ্য ভারতীয় কিশোরের মত ক্রিকেট মগ্নতায় কেটেছে। শচীন তেন্ডুলকর তো ছিলেনই, তার সাথে বঙ্গসন্তান সৌরভ গাঙ্গুলি যোগ দেওয়াতে একেবারে সোনায় সোহাগা হল। আমার মফস্বলের মাঠই তখন লর্ডস বা ওয়াংখেড়ে বা ইডেন, স্কুলফেরত টিফিন সেরে আমরাই তখন শচীন, সৌরভের রেপ্লিকা। সে উইকেট পেয়ারা ডাল দিয়েই তৈরি হোক বা ইঁটের থাক সাজিয়ে। হাফ ইয়ার্লিতে পাওয়া অঙ্কের নম্বরের থেকে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ তখন ১০ ওভারে ৪৫ বা ৬৫ রান। মনে মনে নিজেদের জাতীয় খেলোয়াড়দের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে ফেললেও বিলক্ষণ জানতাম, ব্যাট যার পিচ তার। ব্যাটের মালিক আউট হয় না। এ-ও জানতাম, রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ যে কোনো মুহূর্তে পণ্ড হয়ে যেতে পারে, বল যদি একবার মাঠ লাগোয়া পাঁক ভর্তি বলখেকো নালায় গিয়ে ঢোকে। তারপর আবার আট আনা করে চাঁদা তুলে নতুন বল কেনার ঝক্কি, ম্যাচ চলে যেত পরের বিকেলে।

যা-ই হোক, আমার কৈশোর ক্রিকেটযাপনের গল্প দিয়ে লেখা দীর্ঘ করব না। তারপর আরও অনেকের মতই আমিও মাঠছাড়া হয়ে গেলাম, অভিনেতা হওয়ার সাধ নিয়ে চলে এলাম কলকাতায়। তবু সম্পর্ক ছিল ক্রিকেটের সঙ্গে। বাড়ি ছাড়ার পর আর সর্বক্ষণ টিভির সঙ্গ পাইনি বটে, কিন্তু এদিক ওদিক ব্যবস্থা করে ঠিক দেখে ফেলতাম মোক্ষম ম্যাচগুলো। কলেজ পাস করার পর থিয়েটার নিয়ে আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, আমার চেয়ে তিন গুণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল ভারতীয় ক্রিকেটও, সময়ের গোটা অস্তিত্বকে শুষে নিয়ে খেলা শুরু হল। আর তাল রাখতে পারিনি। এখন দুটো টুর্নামেন্টই দেখি — ফুটবল বিশ্বকাপ আর ক্রিকেট বিশ্বকাপ। যদিও গুলিয়ে যায়, ঠিক কোনটা ক্রিকেট বিশ্বকাপ। অনেক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের মধ্যে থেকে, আইপিএলের মধ্যে থেকে, হলুদ মেরুন গোলাপি কমলা জার্সির মধ্যে থেকে কোনটা আমাদের জাতীয় দলের নীল জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মহারণে অবতীর্ণ হওয়া — সেটা ঠাহর করতে আমার মত দলছুট লোকেদের কিঞ্চিৎ অসুবিধে হয়। সে হোক, জাতীয় দলের বিশ্বকাপের খেলা বলে কথা, না দেখলে চলে! তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ওইটুকু জাতীয়তাবাদই আমার শরীরে মগজে অবশিষ্ট আছে। সেটুকু টিকিয়ে রাখাই শ্রেয়, নাহলে দাঁড়িপাল্লাটা ভেঙে যেতে পারে।

আমার ৮৩ ভাল লাগার মূল কারণ শুধু ক্রিকেট নয়। অবশ্যই ক্রিকেট, তার উত্তেজনা, মুহূর্ত, বাহারী শট, ক্যাচ, রান ইত্যাদি মিলিয়ে সে একপ্রকার চেনা ভাল লাগা, কিন্তু সর্বোপরি এই ছবি আমায় হঠাৎ অন্ধকার হলের মধ্যে মনে করিয়ে দেয়, আমি কোন দেশে জন্মেছিলাম। আনন্দে তখন চোখে জল এসে যায়, সেই জল আরও কিছুটা গড়িয়ে পড়ে এই ভেবেও, যে আজ, কোন দেশে বসে আমি এই ছবি দেখছি। এই লেখা যখন লিখছি, তখন হরিদ্বারে নিধন যজ্ঞের প্রতিজ্ঞা হয়ে গেছে, দেশের সুপ্রিম কোর্ট অনেক সাধ্যসাধনার পরে এই সংক্রান্ত জনস্বার্থ মামলা শুনতে রাজি হয়েছেন, অভিযুক্তরা এখনো বহাল তবিয়তে। বুল্লিবাই অ্যাপের মূল কান্ডারি স্বীকার করেছে তার অপরাধ, সঙ্গে এ-ও বলেছে, এই কাল্পনিক নিলাম প্রক্রিয়ার মূল চক্রী হিসাবে সে অনুতপ্ত নয়। এ তো গেল বড় বড় ঘটনার কথা। এসব সংবাদমাধ্যমে তবু ঠাঁই পায়, এছাড়াও বিভিন্ন বিচিত্র বিভাজনে আমার দেশ, সমাজ প্রতিদিন অন্তরে ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে এবং তার থেকে তৈরি রাগ ও অবসাদের উপর “সাম্রাজ্যমদমত্ততায়” প্রলয়নৃত্য করে চলেছে রাজনৈতিক নেতারা। ঘৃণা ও লোভের দোকানে পরিণত হওয়া দেশ, যেখানে কোনো না কোনো রূপে কেবল ক্ষমতাবান আর ক্ষমতাহীনেরাই থাকে, যেখানে শ্রোতা নেই, বক্তা নেই, দ্রষ্টা নেই, কেবল ক্রেতা বিক্রেতা আর কিছু সফল ও ব্যর্থ জোকার আস্ফালন করে চলেছে। টাকা এবং কেবলমাত্র টাকাকেই সর্বেসর্বা মেনে নেওয়া একটা জনপিণ্ডের মাঝে বসে এই ভয়াবহ প্রাণহীন নিষ্ঠুর একটা নাগরদোলার সওয়ারি হয়েও এই ছবি আমার ভেতরে এক নদী বাতাসের মত বয়ে গেছে। মনে পড়ে গেছে, ছোটবেলায় উনুনের সামনে বসে থাকা মায়ের ঘর্মাক্ত উজ্জ্বল মুখ। স্কুল থেকে ফিরে খেলতে যাওয়ার আগে মায়ের হাতের গরম দুটো রুটি, মনে পড়ে গেছে বাবা যেদিন প্রথম ব্যাট কিনে দিয়েছিল, সেই দিনটা। মনে পড়ে গেছে এরকম কত মাঠের কথা, যাদের মৃতদেহের উপর আজ সাততলা, আটতলা বহুতল দাঁড়িয়ে আছে। তাতে মানুষই থাকে, সেখানে থাকে তার সন্তানও। মানুষই, মানুষের নির্মল, ধুলোমাখা, উদার বেড়ে ওঠার জমি আগলে বসে আছে; ভাইরাস ছাড়া আমাদের আর গতি কী? মনে পড়ে নবারুণবাবু লিখেছিলেন “রাইফেলের ওপর বাড়ি উঠে গেছে…”। রাইফেল কিনা জানি না, শয়ে শয়ে মুক্ত শৈশবের কলতানকে শ্মশানের নীরবতায় পরিণত করে ফ্ল্যাটোৎসব যে কত দেখেছি গত এক দশক ধরে, তার ইয়ত্তা নেই। কলকাতায় নিজেও থাকি এক তেমনি মাঠ-খুনি ফ্ল্যাটবাড়িতে। কী-ই বা করা! থাকতে যে হবেই, হোক সে থাকা “গলিত স্থবির ব্যাঙ”-এর মত। তবু…

এই ছবির আরও এক ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এই ছবি সচেতনভাবে ‘জিংগোইজম’-এর উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকে। উগ্র জাতীয়তাবাদ বরাবরই বলিউডি হিন্দি ছবির তুরুপের তাস। আমি যখন স্কুলে পড়ি, যখন গদর বা মা তুঝে সালাম-এর সানি দেওলকেই আমার দেশের একমাত্র রক্ষাকর্তা মনে হচ্ছে, যখন মনে হচ্ছে পরীক্ষার নম্বর নয়, প্রেমিকার চুম্বন নয়, বাবার পকেট কেটে খাওয়া সিগারেটের ধোঁয়া নয়; একমাত্র পাকিস্তানকে থেঁতলে, অপমান করে, ঠুসে পরাজিত করতে পারলেই আমার মোক্ষ লাভ, তবেই ভারতীয় যুবা হিসাবে আমার স্বীকৃতি — তখনো আমি ‘জিংগোইজম’ শব্দটার সাথে পরিচিত নই। এমনকি তখন এটাও খেয়াল করিনি যে এইসব ছবিগুলোতে মহুয়া সিনেমা হলে আমার সহ-দর্শকদের, বন্ধুদের নাম শেখ বুলবুল, শেখ কাঞ্চন, অ্যান্টনি ডিকোস্টা, রকি পাল, হর্ষ বায়েন, সাগ্নিক ভট্টাচার্য, সাগির মোহাম্মদ! কি অদ্ভুত! তখনো জানতাম না, আর মাত্র ১০-১৫ বছর পরেই আমাদের দেশ এমন এক অদ্ভুত আঁধারে ঢেকে যাবে, যার হিন্দু আকাশে ৪০০ বছর বয়সের ঔরঙ্গজেবের প্রেতাত্মা উড়ে বেড়াবে যাবতীয় দুর্ভাগ্য, ব্যর্থতা ও হতাশার দায়ভার নিয়ে। তখনো বুঝতে পারিনি, গদর বা মা তুঝে সালামের মত আরও শয়ে শয়ে ছবি ধেয়ে আসবে দর্শকদের উদ্দেশে, যা একইসঙ্গে কী এক অদ্ভুত রহস্যময়তায় মহানায়কদের কোটিপতি করে তোলার পাশাপাশি জনগণকে করে তুলবে ছায়াযুদ্ধের রাগী যোদ্ধা।

তখন বুঝতে পারিনি। এখন বুঝতেও পারছি, দেখতেও পারছি।

এ ছবির বিরতি দৃশ্য অমোঘ। বহু দেশের পতাকা, উল্লাস, নাচানাচির ভেতর থেকে একটি শিশুর নিজের হাতে রং করা জাতীয় পতাকা দেখা দিয়েই আবার মিলিয়ে যায়, একসময় শিশুটির বাবা তাকে কাঁধে তুলে ধরে, টিম বাসের ভেতর থেকে সকলের স্পষ্ট দেখতে পায় সেই দৃশ্য, চোখ ভিজে আসে সকলের, কপিলদেবের চরিত্রাভিনেতা রণবীর সিংয়ের চোখ থেকে মোক্ষম টাইমিংয়ে, সুনিপুণ পরিমিতিতে নেমে আসে একটি জলের ধারা। প্রেক্ষাগৃহে বসে আমিও অশ্রুসজল চোখে, ভেজা মনের হাহাকার নিয়ে ভাবতে থাকি, ওই তো আমার দেশ। নিজের হাতে আঁকা পতাকায় ঘরোয়া দেশ আমার, ওই শিশুর হাসির মতই নির্মল, সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ, আপাত অবদমিত, কিন্তু এক বুক স্বপ্ন স্রোত হয়ে বেরিয়ে আসবে দিনে দিনে, শ্রমে শ্রমে, যত্নে, আলিঙ্গনে, প্রেমে, ভালবাসায়। প্রতিটি চরিত্রের চোখের জলে ও চাহনিতে সেই অঙ্গীকার দেখা যায় স্পষ্ট।

মূলধারার চলচ্চিত্র খুবই শক্তিশালী মাধ্যম। এখনো তাই। ভারতীয় জনগণের সঙ্গে সিনেমার সম্পর্কের ইতিহাস অনেকটাই আনুগত্যের ইতিহাস, যদিও অনেক ছবিকেই দর্শক নেয়নি, প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু যাকে নিয়েছে, প্রায় ঈশ্বর রূপেই নিয়েছে। আজকের এই খিচুড়ি মার্কা বিনোদন বাজারে হিসাব খানিক গুলিয়ে গেলেও, দেড় বা এক দশক আগে পর্যন্তও সিনেমা মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যেত। এত মানুষের মনে যে মাধ্যমের এই পরিমাণ শাসন বা দখল, বলাই বাহুল্য সংখ্যা বা মানুষের কারবারিরা, অর্থাৎ রাজনৈতিক দল বা সরকার, তা নিয়ে চিন্তিত থাকবেই। সেই কারণে কেন্দ্র হোক বা রাজ্য — যে কোনো সরকার ক্ষমতা পেয়েই গোড়া থেকেই বিশেষ মন দেয় এই মাধ্যমটিতে। প্রথমটায় সজাগ থাকেন তাঁদের অবধারিত অপদার্থতা, অপারগতা, শয়তানি, দুর্নীতি মূলধারার সিনেমায় প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে। হলে দ্রুত ব্যবস্থা এবং ধীরে ধীরে নিজেদের এজেন্ডা, দেশ, সমাজ নিয়ে একতরফা, আকাট সংকীর্ণ ভাবনার প্রতিরূপ সিনেমায় গুঁজে দেওয়ার চেষ্টায় ব্রতী হন। ভারতবর্ষ এখন এই ধরনের ছবিতে সারা পৃথিবীর অগ্রজ।

এই ধারার বিপরীত অবস্থানে ৮৩

এমন অনেক জায়গা ছিল, যেখানে সিনেম্যাটিক লাইসেন্সে গুঁজে দেওয়া যেত এমন অনেক কথা, যা রক্ত গরম করে দিত, নিজেদের সর্বাধিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে কাউকে বা কিছুকে ভিলেন প্রতিপন্ন করে খুব গায়ের ঝাল মেটানো যেত। কিন্তু না, প্রতিটি জায়গায় চরিত্রের সারল্য, বাস্তবতা অবলম্বন করে দৃশ্যগুলো এক উদার, সরল মানুষিক পরিণতিতে পৌঁছে যায়। এই ছবি যেখানে যেখানে সম্প্রীতির সুর বুনে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, উদাত্ত হাতে দিয়েছে। তা সীমান্তে সৈনিকদের মধ্যে দিয়ে হোক আর দাঙ্গা কবলিত পাড়ায় মুসলমান বৃদ্ধ ও টহলরত সেনার মধ্যে দিয়েই হোক। আমাদের দেশ শুধু নয়, সারা পৃথিবীর ইতিহাসে বিভেদ, বিভাজন, রাগ, প্রতিশোধস্পৃহার আগুন, রক্তের দাগ যথেচ্ছ লেগে আছে। আধুনিক রাষ্ট্রের বা আধুনিক শিল্পের দায়িত্বই হল সেই রোষানলের ভেতর থেকে ভালবাসা, সহমর্মিতা খুঁজে নেওয়া; যদি খুঁজে না পাওয়া যায়, দরকারে তার কাল্পনিক নির্মাণে ক্ষতে মলম দেওয়া, ঐতিহাসিক ঘা-কে পরিশ্রম ও শুশ্রূষা দিয়ে সারিয়ে তোলা, আঘাতের যন্ত্রণার উপশম করা। ৮৩ অত্যন্ত দায়িত্বের সঙ্গে সে কাজ করে চলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

সর্বোপরি, ৮৩ খুবই উঁচু মানের চলচ্চিত্র। যান্ত্রিক কারিকুরি, নান্দনিক উচ্চতায় তো বটেই, ইতিহাস নির্ভর হওয়ায় এই ছবির ডিটেইলিং এক অন্য মাত্রা স্পর্শ করে। প্রতিটি চরিত্রের মুখাবয়ব, শরীর শুধু মিলিয়ে দেওয়া নয়, অভিনেতাদের দক্ষতায় মানুষগুলোর হৃদয়ের ভেতর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। এ ছবিতে সকলেই আসল চরিত্রদের নকল করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের শরীর, মন থেকে উঠে আসা একটা ইন্টারপ্রিটেশনও যোগ করে দেন। আর সেই জাদুকাঠির স্পর্শেই সেগুলো আর অনুকরণ থাকে না, হয়ে ওঠে উঁচু দরের অভিনয়শিল্প। কপিলদেবের চরিত্রে রণবীর এতই ভাল যে তা নিয়ে বেশি কথা বলা যায় না। দুরন্ত অভিনয়ের এই এক সুবিধা ও অসুবিধার দিক — তা নিয়ে বেশি আলোচনা করা যায় না। অন্তত আমি তা করতে অপারগ।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন ঘোষণা হয়ে গেছে, ৮৩ ব্যবসায়িক দিক থেকে ব্যর্থ ছবি। টাকা জিনিসটা অনেকদিন আগে থেকেই জিতে বসে আছে, ধনতন্ত্রের নিয়মই তাই। তবু জনসমাজে সেটা নিয়ে এর আগে এতটা চিৎকৃত উল্লাস ছিল না। ফ্লপ হয়েছে তো হয়েছে। কিন্তু আজকাল এই যে কোনোরকম ব্যর্থতাকে ঘিরে একটা পৈশাচিক নৃত্য শুরু হয়েছে, যার ফলে একটা ছবি দেখার, বিচার করার, ভাল লাগার বা না লাগার বৈশিষ্ট্য, বোধ অনেকাংশে গুলিয়ে যাচ্ছে, তাতে বুঝতে পারি না, গল্প বলা এই মাধ্যমটার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অদূর ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! যেখানেই দাঁড়াক, সময়ের দান হিসাবে সেটাকেই মেনে নিতে হবে।

টাকার দাসত্ব করা এই কিম্ভূত সময়ের ইতিহাসে ৮৩-র নাম নিশ্চিতভাবেই বক্স অফিসে অসফল ছবি হিসাবে লেখা থাকবে। কিন্তু আমার মাথায়, হৃদয়ে, স্মৃতিতে এই ছবি চিরকাল থেকে যাবে দেশ, তার সারল্য, তার সম্প্রীতি, তার জয় ও তার ঘৃণাহীন ভালবাসতে পারার শক্তির আখ্যান হিসাবে।

1 মন্তব্য

  1. সচরাচর তথাকথিত প্রতিষ্ঠার জায়াগায় চলে যাওয়া,বা সেলেব হয়ে পড়া শিল্পীর সাধারণ্যের থেকে একটা চেষ্টাকৃত আড়াল তৈরি করা থাকে।সমসাময়িক সমস্যা বা বিতর্কিত রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা নিয়ে থাকে হিরন্ময় নীরবতা।অনির্বাণ ব্যতিক্রম এই জায়গাটিতে।ভালো অভিনেতা, ভালো মানুষ কেবল নয়,এমন সোচ্চার মানুষ ও শিল্পীকে সময়ের খুব প্রয়োজন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.