বুল্লি বাইয়ের কথা এখন এ দেশে কে না জানে? সুখের কথা, মহারাষ্ট্র পুলিশ এই জঘন্য অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে একাধিক তরুণ-তরুণীকে গ্রেপ্তারও করেছেন। এই অপরাধের শিকার এবং অভিযুক্ত, সকলের পরিচয়ই মিডিয়ার দৌলতে আজ জনসমক্ষে। এদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াও মিডিয়ার দৌলতে আমাদের অবিদিত নেই। বিশেষ করে একদিকে প্রধান অভিযুক্তের অনুশোচনা বর্জিত ঔদ্ধত্য আর অন্যদিকে আক্রান্তদের প্রতিক্রিয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া বা সেই প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ ও হতাশা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে? প্রশ্ন ওঠে এ দেশের সংবিধানস্বীকৃত সমানাধিকার, যা জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ নির্বিশেষে প্রযোজ্য, তার প্রকৃত তাৎপর্য আজ কী! রাজনীতির যূপকাষ্ঠে কি তাহলে সবই বলি দেওয়া হবে, সে সংখ্যালঘু মহিলাদের অধিকার হোক বা সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ?

বুল্লি বাই, আমরা জানি, আনকোরা কোনো সাইবার অপরাধ নয়। ২০২১ সালে যে জঘন্য সুল্লি ডীলস অ্যাপ্লিকেশন বাজারে এসেছিল, এটাকে তারই প্রতিচ্ছবি বলা চলে। সুল্লি বা বুল্লি অপ-শব্দগুলো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, এক্ষেত্রে মুসলিম মহিলাদের প্রতি, অপমানসূচক অর্থে সোশাল মিডিয়ায় প্রচলিত। আর সুল্লি ডীলস ২০২১ ও বুল্লি বাই ২০২১-২২ এ এই সোশাল মিডিয়াতেই সেইসব মুসলিম মহিলাদের নিশানা বানানো হয়েছে, যাঁরা এ দেশের নাগরিক সমাজের পরিচিত মুখ, পেশাগতভাবে সফল, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে অগ্রণী। যাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ। এই অপরাধের শিকার যেমন বর্ষীয়ান ফতিমা নাফীস, যিনি আজ পর্যন্ত তাঁর নিখোঁজ সন্তান নাজিবের সন্ধানরত এবং ক্রমে একাধিক নাগরিক আন্দোলনের প্রথম সারির মুখ হয়ে উঠেছেন, তেমনি শিকার অনেক বিখ্যাত সাংবাদিক, সফল মহিলা বিমানচালক, তরুণী মানবাধিকার কর্মী এবং বেশ কিছু নাবালিকাও। এই আক্রমণের শিকার প্রায় ১০০ জনের বেশি মহিলার মধ্যে প্রধান মিল ধর্মে এঁরা মুসলিম। দ্বিতীয় মিল এঁরা অধিকাংশই স্বাধীনচেতা এবং নিজস্ব রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধাহীন। আর সেটাই মনে হয় তাঁদের আক্রমণ করার মূল কারণ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এক কথায় এটি ধর্মীয় তথা লিঙ্গভিত্তিক কদর্য আক্রমণ। আক্রান্ত মহিলাদের ছবিকে বিকৃত করে সোশাল মিডিয়ায় নিলামে চড়ানো হয়েছে। এমন ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে মনে হতে পারে অপর ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে এই সাইট তৈরির পিছনে। অনেক নেটিজেন সেই সাইট দেখেছেন, লাইক করেছেন, কমেন্টও করেছেন। এর থেকেই বোঝা যায়, অপরাধী শুধু সেই কজন নয় যারা এই সাইট বানিয়েছে, এ অপরাধ দেশের এক শ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠের, এই ঘৃণা অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মজ্জাগত হয়ে গেছে। কিছু সোশাল মিডিয়া ওয়েবসাইট আবার এই জঘন্য অপরাধ নিয়েও হিন্দু-মুসলিম তুলনা শুরু করেছে। এমনই এক কুখ্যাত পোর্টাল হঠাৎ করেই কিন্ডলে রাখা কিছু পর্নোগ্রাফিক বইয়ের উল্লেখ করে প্রতিবেদন লিখেছে, যেখানে গল্পের প্রধান চরিত্রে হিন্দু মহিলা ও মুসলিম পুরুষ রয়েছেন। সোজা কথায় বাস্তবের এই কেলেংকারিকেও বৈধতা দেওয়ার বিকৃত প্রয়াস, বা হোয়াট্যাবাউটারির নির্লজ্জ প্রচেষ্টা জোর কদমে চলছে। আর সেই চেষ্টাতেও বহু নেটিজেনের সোৎসাহে যোগদান এটাই স্পষ্ট করে, ঘৃণার শিকড় কত গভীরে, দেশের বেশকিছু মানুষ মানসিকভাবে কতটা অসুস্থ এবং এই অসুস্থ মানুষ বানানোর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কতটা সক্রিয়।

অপরাধ সংগঠিত হলে, যদি প্রশাসন দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়, তবে ভবিষ্যতের অপরাধীরা কিছুটা সংযত হয়। কিন্তু সুল্লি ডীলসের পরে, একাধিক আক্রান্ত মহিলার অভিযোগ সত্ত্বেও দিল্লি পুলিস অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সুল্লি ডীলসের সময় কাউকেই গ্রেফতার করা হয় নি। এক সাংবাদিক মহিলা, যিনি এই নিয়ে দুবার একই অপরাধের শিকার হলেন, তাঁর টুইটার হ্যাণ্ডেলের থ্রেডে লিখেছেন, সুল্লি ডীলসের সময় অভিযোগ দায়ের করতে গিয়ে তাঁকে দিল্লি পুলিসের বিচিত্র সব প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। যেমন “আপনি কেন সোশাল মিডিয়ায় নিজের ছবি দিয়েছেন?” সোশাল মিডিয়ায় নির্দোষ ছবি দেওয়াই যেন অপরাধ! এর কিছু পরে সোশাল মিডিয়া থেকে অবশ্য সুল্লি ডীলস সাইট সরিয়ে নেওয়া হয়, কিন্তু তাতে আর কী? কিছুদিন পরেই বুল্লি বাই হয়ে এরা ফিরে এসেছে। অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে, অপরাধীর মনোবল তো বাড়বেই। আর তার সাথে যদি ফল্গুধারার মত বইতে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের একাংশের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় এবং বিভেদের রাজনীতি করা দলগুলোর পরোক্ষ মদত, তাহলে ঘৃণার চারা যে বিষবৃক্ষ হয়ে উঠবে, তাতে আর সন্দেহ কী? কাজেই প্রশ্ন থেকেই যায় দিল্লি পুলিসের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপট নিয়ে। প্রশ্ন থেকেই যায় আমাদের দেশের উচ্চাসনে বসা নেতা নেত্রীদের নীরবতা নিয়ে, প্রশ্ন থেকেই যায় সংখ্যালঘু মহিলা তথা সব মহিলাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শাসক দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে। দেশের ১০০ জন মেয়ে আজ যখন বীভৎস সাইবার আক্রমণের শিকার, তখন ‘বেটি পড়াও, বেটি বাঁচাও’ স্লোগান কি সম্পূর্ণ অন্তঃসারশূন্য লাগে না? এই প্রশ্ন তো উঠবেই।

সাইবার বুলিইং বিষয়টি নিয়ে যখন আমি আক্রান্ত কিছু মহিলার সাথে কথা বলেছি, তাঁরা প্রত্যেকে জানিয়েছেন এই আক্রমণের তীব্রতা ও সংশ্লিষ্ট মানসিক যন্ত্রণা কোনো অংশে মুখোমুখি আক্রমণের থেকে কম নয়। এর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, সমাজজীবনেও সুদূরপ্রসারী। আইনের হাত ধরে যে আক্রান্তরা লড়াই চালিয়ে যেতে চান, তাঁদের জন্যেও প্রক্রিয়াটি খুবই কঠিন ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফলাফলহীন। কাজেই প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধীদের মনোবল বেড়েই চলে, মৌলবাদ শিকড় ছড়ায় গভীরে।

আজকের ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সমস্ত ইস্যুতেই সহজ টার্গেট। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারি ব্যর্থতা চাপা দিতে ধর্মের তাস খেলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, এখন এক পরীক্ষিত ও সফল কৌশল। এই সর্বনাশা সাম্প্রদায়িকতার বীজ তো আমাদের দেশের অতীত ইতিহাসে সুপ্ত ছিলই। কিন্তু স্বাধীনোত্তর ভারতে কোনো রাজনৈতিক দলই এই বিষ নির্মূল করতে যথেষ্ট সচেষ্ট হয়নি বা ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটব্যাংকের রাজনীতি কমবেশি প্রায় সব দলই করেছে। ফলে পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হয়েছে। এরপর বিগত ৭-৮ বছরের জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক স্তরের অনুকূল জলহাওয়ায় সাম্প্রদায়িক বিষের চারাগাছ, মহীরুহের আকার ধারণ করেছে। ইসলামোফোবিয়া নামক মানসিক ব্যাধিতে আজ বহু মানুষ আক্রান্ত। আর সর্বনাশা সত্য হল এদের অনেকেই তরুণ-তরুণী, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ দেশ তথা বিশ্বের সম্ভাব্য কাণ্ডারী।

ভারতের কথাই ভেবে দেখুন, বিগত ৬-৭ বছরে এ দেশের সংখ্যালঘু মানুষদের উপর যে পরিমাণ আক্রমণ নেমে এসেছে, স্বাধীন ভারতে তা প্রায় নজিরবিহীন। এই আক্রমণের মধ্যে একটা নকশা খেয়াল করা যায়, সেটা হল অপরাধীরা অনেকেই কমবয়সী। যেমনটি বুল্লি বাই কেসের গ্রেফতারিতে থেকে আবারও দেখা গেল। অপর বৈশিষ্ট্য হল এই অপরাধগুলোর ধারাবাহিকতা। একটা দাঙ্গা বা বিচ্ছিন্ন দু-একটা আক্রমণ নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যেরকম ধারাবাহিকভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আক্রমণ ঘটে চলেছে তাতে বারবার হিটলারের জার্মানির মানবাধিকার দলনের কথা মনে আসে। দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকাশ্যে গণহত্যার হুমকি, সর্বক্ষণ নানাভাবে সংখ্যালঘুদের বুঝিয়ে দেওয়া যে তারা আসলে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, তাদের নিয়ে আপাত নির্দোষ হাস্য-পরিহাস থেকে শুরু করে গুরুতর গণপিটুনিতে হত্যা — সবই কেমন যেন সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সক্রিয় প্রতিবাদ করলেও বিপদ। সোশাল মিডিয়ায় সংগঠিত আক্রমণের শিকার হতে হবে।

যারা আজ এই অসহিষ্ণুতার পতাকাবাহী তারা বিশেষ কিছু কট্টর হিন্দু মৌলবাদী দলের সমর্থক। দেশে আজ সেই দলগুলোর প্রভাব ও ক্ষমতাই বেশি। তাই সংখ্যালঘুদের সাথে ঘটে চলা অন্যায়ের প্রায়শই কোনো সঠিক তদন্ত হয় না, আদালতের নির্দেশ থাকলেও তাঁরা ন্যায় পান না। এই কারণেই আজও নাজিবের খোঁজ মেলে না, জুনায়েদের খুনিরা শাস্তি পায় না, কাঠুয়াতে ধর্ষকের সমর্থনে তেরঙ্গা নিয়ে মিছিল বের হয়, জনসমক্ষে খুন ও দাঙ্গার প্ররোচনা দেওয়া ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে আসীন হন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় এমন কিছু কুখ্যাত হ্যান্ডেলকে ফলো করেন, যারা নিয়মিত ঘৃণা ছড়ানো, মহিলাদের ধর্ষণ ও খুনের হুমকি দেওয়ার জন্য পরিচিত। এই হলো ঘৃণার রাজনীতির ইকোসিস্টেম। এর প্রেক্ষিতেই বুল্লি বাই ও এ ধরনের আক্রমণের আলোচনা হওয়া উচিত। বুল্লি বাই বা সুল্লি ডীলসকে কী করে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলবেন, যখন কয়েক বছর আগে, এক নির্বাচনী প্রচারে খোলাখুলিভাবে মুসলিম মহিলাদের কবর থেকে তুলে ধর্ষণের কথা বলা হয়েছিল? সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন আজকের এক অন্যতম প্রভাবশালী মুখ্যমন্ত্রী।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, নিশানায় মহিলারাই কেন? উত্তরটা কিন্তু সহজ। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে যে কোনো গণআন্দোলনের প্রথম সারিতে চিরকালই মহিলাদের দেখা গেছে। সারা বিশ্বে শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে কিশোরী থেকে বৃদ্ধারাই দিয়েছেন নেতৃত্ব, শাসকদের অন্যায় চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে সমস্তরকম অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁরা আওয়াজ তুলে চলেছেন নিরন্তর। সাইবার অপরাধীরা ও তাদের পিছনে থাকা বৃহত্তর রাজনীতির কুশীলবেরা তাই আজ ভয় পেয়েছে। সেইজন্যই জঘন্য আক্রমণের মাধ্যমে কণ্ঠরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক বিকৃত মানসিকতা, যা যে কোনো ধর্মীয় মৌলবাদের অন্যতম মূল চরিত্র। মহিলাদের দেহসর্বস্ব ভাবা ও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আক্রমণ করা, ছবি নিলাম করা বা ধর্ষণের হুমকি দেওয়া, এসবই তো সেই মৌলবাদের লক্ষণ।

কাজেই সুল্লি ডীলস বা বুল্লি বাই আমাদের আর অবাক করে না, কিন্তু চিন্তিত করে। চিন্তা শুধু আক্রান্তদের জন্য নয়, যারা আক্রমণকারী তাদের জন্যেও। তাদের মনুষ্যত্বের এ হেন অবক্ষয়ের দায়ভার কে নেবে – পরিবার, সমাজ না রাষ্ট্র?

পরিশেষে বলতেই হয়, বিভেদকামী শক্তি ইতিহাস থেকে কোনোদিনই শিক্ষা নেয় না। নিলে তারা দেখতে পেত কোনো যুগেই অন্যায়ের চিরস্থায়ী জয় হয় না। দেখতে পেত সব যুগেই ন্যায়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে মাতঙ্গিনী হাজরার মত মহিলারা মানুষকে পথ দেখান। ভারতের মত বৈচিত্র্যময় ও গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী দেশের সামনে সেটাই আশার আলো।

Leave a Reply