“আজাদি কা অমৃত মহোৎসব” নামাঙ্কিত দিনটি কেটে যাবার পর সকলেই নিজ নিজ প্রাত্যহিকতায় ফিরে আসেন। অধ্যাপিকা তাঁর ক্লাসে ফেরেন এবং ক্লাস শেষ করে ফেরার পথে রোজকার মতই কিছু প্রশ্ন নিয়ে খানিকটা পথ সাথে হাঁটে ছাত্রছাত্রীর দল, যারা আরও জানতে চায় ভিক্টোরিয় যুগে নারীর সামাজিক অবস্থান ও দুর্দশা বিষয়ে। সেই ছোট্ট জটলা থেকে রুকসানা (নাম পরিবর্তিত, ধর্ম পরিচয় নয়) আলোচনাকে প্রায় ২০০ বছর এগিয়ে এনে জিজ্ঞেস করে বসে “আচ্ছা ম্যাম, স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও এ দেশের মেয়েদের অবস্থা নিয়ে আপনার কী মতামত? মেয়েদের জীবনে কি পনেরোই অগাস্ট সত্যিই এসেছে?” এ প্রশ্নের জবাব স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক হয় না, এমনকি একমুখীও হতে পারে না। জবাব দেবার চেষ্টায় প্রশ্নটাকে খানিক এগিয়ে নিয়ে গিয়ে অধ্যাপিকা এ-ও বলে ফেলেন যে মেয়েদের অবস্থা তো বটেই, এমনকি মুসলিম মেয়েদের অবস্থা এ দেশে বেশি অপরিবর্তনশীল, শোচনীয়। জিজ্ঞাসা করেন, একজন প্রতিনিধি বা ভুক্তভোগী হিসাবে তোমার কী মতামত? রুকসানা গুটিয়ে যায়, সংখ্যাগুরু বন্ধুদের দিকে অপ্রতিভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সজোরে মুখস্থের মত বলে “না না ম্যাম, আলাদা করে মুসলিমদের অবস্থা খারাপ বলছি না। ধর্মের বিষয় তুলতেই চাই না। হিন্দু, মুসলমান আমরা সবাই এ দেশে এক। মেয়েদের অবস্থা এমনিই খারাপ, ধর্মের জন্য কিছু না।” তার সহপাঠীরা এক বাক্যে “সেই তো সেই তো” বলে এই অদ্ভুত অসত্য ঘোষণায় সায় দেয়, রুকসানা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। হতবাক অধ্যাপিকা খানিক বোঝানোর চেষ্টা করে, করুণ আর্তনাদের মতই বলে ওঠেন, রুকসানা, বিলকিস বানোর কথা জানো তুমি? শুনেছ তার অপরাধীরা মুক্তি পেয়েছে? এবার শোরগোল হয় উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। “অন্যায়”, “ছি ছি”, “হরিবল” – এসব টুকরো শব্দ ভেসে এলেও রুকসানা “আমার ট্রেন আছে ম্যাম” বলে বিদায় নেয়। আসলে পালায়।

বিলকিস বানো। তিনিও পালিয়েছিলেন ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, কিন্তু গুজরাটের হিন্দুরাষ্ট্র তাঁকে পালাতে দেয়নি। সে এক উত্তাল সময়। গোধরায় ট্রেনে অগ্নি সংযোগের পরবর্তীকালে গুজরাটে নির্বিচারে চলছে পরিকল্পিত এবং শাসক অনুমোদিত সংখ্যালঘু নিধন। সেই ভয়াবহতার গল্প সকলের জানা, তবু তা বারংবার লেখা, পড়া, শোনা, এবং স্মরণ করা দরকার। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস বানো ও তার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন ছপ্পরওয়াড় জেলায়। সাথে আড়াই বছরের শিশুকন্যা, পরিবার পরিজন মিলিয়ে ১৫ জন। ৩ মার্চ সহসা হাজির হয় একদল সশস্ত্র দানব। ‘শত্রুপক্ষের’ নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধর্ষিত হলেন বিলকিসের মা, গলা চিরে দেওয়া হল তাঁর। ধর্ষিত এবং নিহত হলেন তাঁর বোন, যার সন্তান জন্মেছিল ঠিক আগের দিন। পরিবারের অন্য মহিলারাও ধর্ষিত হলেন। গণধর্ষিত হলেন বিলকিস নিজে। একে একে ১২ জন সংখ্যাগুরুর রাজনৈতিক আগ্রাসন তথা ধর্মযুদ্ধের বেদিতে উৎসর্গীকৃত হলেন বিলকিস। তাঁর আড়াই বছরের সন্তানকে ছুঁড়ে মারা হল পাথরে, মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। নিহত হলেন পরিবারের অনেক পুরুষ সদস্যও। জ্ঞান হারিয়ে বিলকিস তখন প্রায় লাশ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রুকসানা, তুমি কি শুনেছ মেয়েরা আসলে ‘গনিমতের মাল’? তুমি ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বোঝ? ‘পোগরম’ কী জিনিস শুনবে? এসব ইংরেজি ভারি শব্দের তাত্ত্বিক সংজ্ঞা তোমার অধ্যাপিকা জানলেও, বাস্তবিকতা থেকে তিনি সহস্র যোজন দূরে, সংখ্যাগুরু পদবির ঘেরাটোপে। রুকসানা, তুমি পালালে শুধু তুমিই পালাও না। স্বাধীনতা পালায় নগ্ন, রক্তাক্ত শরীরে।

তারপর বিলকিস উঠে দাঁড়ালেন, রুকসানা। উঠে দাঁড়ালেন পরিজনদের লাশের মাঝে। তখন তিনিও নগ্ন, রক্তাক্ত। শরীরে একছটাক ছেঁড়া কাপড় জড়িয়ে আবার পালালেন আশ্রয়ের খোঁজে। অবশেষে একদিন বিলকিস আর পালাতে রাজি হলেন না। শুরু হল তাঁর অদম্য, অনন্য ১৭ বছরব্যাপী লড়াই। একটি গরীব, অশিক্ষিত, প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ের অকল্পনীয় লড়াই। এবার তিনি দৃপ্ত পায়ে গেলেন বিচার আদায় করতে। পদে পদে পেলেন প্রত্যাশিত বাধা। পুলিশ অফিসার থেকে ডাক্তার, সেখান থেকে রাজনৈতিক নেতা – পুরুষতান্ত্রিক শাসনকাঠামোর প্রতিটি অলিগলিতে তাঁকে ভুল পথে চালিত করার, প্রমাণ লোপাট করার, মিথ্যুক প্রমাণিত করার, দমিয়ে রাখার চেষ্টা হল। তবুও সমাজকর্মীদের সহায়তায় তিনি পৌঁছে গেলেন মানবাধিকার কমিশনের দোরে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের কড়া নাড়লেন। ২০০৮ সালে আসে প্রথম সাফল্য। সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত গণধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত ১১ জনকে দেয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তারপর ২০১৭ সালে মুম্বাই হাইকোর্ট বহাল রাখে সেই রায়, এমনকি দোষী সাব্যস্ত করে কর্তব্যে চরম গাফিলতি করা পুলিশকর্মী ও ডাক্তারদের, যারা লোপাট করতে চেয়েছিল দাঙ্গাকালীন অগুনতি অপরাধের প্রমাণ। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট গুজরাট সরকারকে নির্দেশ দেয় বিলকিসকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেবার। ইতিমধ্যে বিলকিস পালিয়েছেন বহুবার। এই অসম লড়াই জারি রাখার তাগিদে বিভিন্ন বাসা বদলে পালাতে হয়েছে তাঁকে। আদালত রায় দেয় স্থায়ী ঘর দিতে হবে মেয়েটিকে, দিতে হবে চাকরি।

গুজরাট সরকার তাচ্ছিল্যের সঙ্গে পাঁচ লক্ষ টাকায় কিনতে চেয়েছিল বিলকিসের আত্মসম্মান আর জেদকে। তিনি প্রত্যাখ্যান করেন সদর্পে। মুসলিম মেয়ের সম্মান সরকারিভাবে নিলামের ধারা অব্যাহত রেখে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার নানাবিধ অ্যাপ সাম্রাজ্যে নতুন পালক সংযোজিত হয় সুল্লি ডিলস ও বুল্লি বাই অ্যাপের মাধ্যমে। কয়েক মাস আগেই এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমে সোশাল মিডিয়া থেকে ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করে বাজারে নিলামে তোলা হয়েছিল প্রতিবাদী মুসলিম মহিলাদের, যারা রোজ লড়েন গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিতে। এই মহিলারা নাগরিক সমাজের কণ্ঠ, মানবাধিকার রক্ষার লড়াকু নেত্রী, রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশে ভীত নন। সেই কদর্য অপরাধই প্রমাণ করেছিল ঘৃণার চাষে হিন্দুত্ববাদীরা সোনা ফলিয়ে চলেছে আজও। পুলিশের থেকে সহযোগিতা না পাবার প্রথা অটুট, অপরাধের শিকারকে সহ্য করতে হয়েছে অবমাননাকর প্রশ্ন, নিরাসক্ত থেকেছেন বিরাট সংখ্যক নাগরিক, বিকৃত মজা পেয়েছেন বহু সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ।

আরো পড়ুন বুল্লি বাই — শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগুরু মানুষেরও অপমান

ওদিকে বিলকিসের জীবনের কুড়িটা বছর কেটে গেছে, রুকসানা। তাঁর মেয়ে আজ তোমার মতই কলেজে। তারপর এসেছে আজাদি কা অমৃত মহোৎসবের সেই ১৫ অগাস্ট। লালকেল্লায় তিরঙ্গা ভূষিত পাগড়ি পরিহিত প্রধানমন্ত্রীর জ্ঞানগর্ভ ভাষণ টিভিতে শুনেছিলে, রুকসানা? মাননীয় যা বলেছেন হিন্দীতে, তার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় “আমাদের স্বভাব, আমাদের বিভিন্ন সংস্কার এবং দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তার মধ্যে নারীদের প্রতি অসম্মানমূলক সব বাক্যকে বাদ দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। দেশের নারীদের সম্মান প্রদর্শন, আগামী দিনের উজ্জ্বল ভারত গঠনের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা পূরণের শ্রেষ্ঠ পুঁজি হতে চলেছে।” প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণ যে মুহূর্তে নারীর সম্মান ও সুরক্ষার ফাঁপা বুলিতে মুখরিত করে লালকেল্লার আকাশ, অন্য প্রান্তে তখন গুজরাটের জেলের গেট দিয়ে একে একে খোলা আকাশের নীচে বেরিয়ে আসে বিলকিস বানোর গণধর্ষণকারীরা। গোটা দেশ কিছু সময়ের মধ্যে টিভির পর্দায় অপলক দৃষ্টিতে দেখে জেলের বাইরে তাদের বরণ করা হচ্ছে কপালে তিলক কেটে, আরতি করে, ফুল, মালা, মিষ্টি সহযোগে। যেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা মুক্তি পেলেন।

ধন্দ থেকে যায় কোন আইনের ফাঁক দিয়ে মুক্তি পেল এই গণধর্ষণকারীরা? ২০১৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকার মুক্তি দিয়েছিলেন ৬০০ বন্দিকে। কিন্তু খেয়াল রাখা হয়েছিল যাতে ধর্ষণ, খুন, নারী পাচার, শিশু নিগ্রহসহ আরও কিছু গুরুতর অপরাধে বন্দি লোকেরা মুক্তি না পায়। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো দ্বারা প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়েছিল

“Special remission will not be given to prisoners who have been convicted for an offence for which the sentence is a sentence of death or where the death sentence has been commuted to life imprisonment: cases of convicts involved in serious and heinous crimes like dowry death, rape, human trafficking, and convicted under POTA, UAPA, TADA, FICN, POCSO Act, money laundering, FEMA, NDPS, Prevention of Corruption Act, etc.”

এক্ষেত্রে বলা হয়, ১৯৯২ সালের রেমিশন পলিসি প্রযোজ্য হবে এই বন্দিদের মুক্তির সিদ্ধান্তে কারণ তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল ২০০৮ সালে, যখন পূর্ববর্তী সেই নীতি কার্যকর ছিল। জানা গেছে বিলকিসের ধর্ষকদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে একটি কমিটি, যার সদস্য ছিলেন দুই বিজেপি বিধায়ক সিকে রাওয়ালজি এবং সুমন চৌহান। ছিলেন গোধরার জেলাশাসক, এক প্রাক্তন বিচারপতি, আর জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট। অন্য দুই সদস্য হলেন মুরলি মুলচন্দানি এবং বিজেপিরই মহিলা শাখার সদস্যা স্নেহাবেন ভাটিয়া। উল্লেখ্য, মুরলি মুলচন্দানি একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন গোধরা অগ্নিকান্ডের মামলায়, যার জেরে শুরু হয় কুখ্যাত গুজরাট দাঙ্গা। বিজেপিময় এই গেরুয়া কমিটিকে কতখানি নিরপেক্ষ বলা যায় তা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থাকবে। এই কমিটি সর্বসম্মতভাবে মত দেয় বিলকিস বানোর গণধর্ষণকারীদের মুক্তির পক্ষে। যুক্তি দেওয়া হয়, তারা ১৪ বছর ধরে যথেষ্ট সাজা পেয়েছে, অতএব মুক্তি দেওয়া হোক। এই অ্যাডভাইসরি কমিটির সুপারিশ মেনে নিয়ে গুজরাট সরকার অপরাধীদের মুক্তি দেয় এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ জেলের বাইরে তাদের বরণ করে বীরের মর্যাদায়।

প্রশ্ন বিবেকের, নীতির, সুবিচারের, মানবাধিকারের। স্বাধীনতা দিবসে একদিকে প্রধানমন্ত্রী অন্তঃসারশূন্য প্রতিশ্রুতি ছুঁড়ে দিলেন দেশের নারীদের দিকে, অন্যদিকে গণধর্ষণকারীরা পেল স্বাধীনতা। বিলকিস বানোর জীবনে আবার আতঙ্কের দিন ফিরে এল। এই অভাবনীয় ঘটনার অভিঘাতে বিলকিস সাময়িকভাবে চুপ ছিলেন। তাঁর স্বামী ও সহযোদ্ধা ইয়াকুব রসুল সংবাদসংস্থা পিটিআইকে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় জানান, তাঁরা কিছুই জানতেন না অপরাধীদের মুক্তির ব্যাপারে। তাঁরা আর কিছু বলতে চাননা। শান্তি বজায় রাখার প্রার্থনা করছেন।

তাঁর কিছু বলতে না চাওয়ার কারণ তুমি তো জানো, রুকসানা। ঠিক যেমন তুমি বলতে চাও না দেশে মুসলিম মেয়েদের অবস্থা নিয়ে তোমার কী মতামত। সংখ্যাগুরুর আস্ফালনের, আগ্রাসনের ভূমিতে শান্তি বজায় রাখার সমস্ত দায় অত্যাচারিত, বঞ্চিত, নিগৃহীত সংখ্যালঘুর। ঠিক যেমন ছাত্র শাহবাজ তার অধ্যাপিকা দিদিকে বাবরি মসজিদ ও রামমন্দির সংক্রান্ত মামলার রায় বেরোবার আগে বারবার বলেছিল “না না, আমাদের মসজিদ চাই না দিদি। ওই জমিতে হাসপাতাল হোক বা ইস্কুল হোক।” ভাঙা মসজিদের জমিতে মসজিদ গড়ার দাবি থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিজভূমে প্রতিদিন “পাকিস্তান চলে যা” শোনে যে শাহবাজ, তার পক্ষে সে দাবি জানানো অসম্ভব।

সেদিন ক্লাসের শেষে অধ্যাপিকা যখন ট্রেনে বাড়ি ফিরছেন, অপিরিচিত নম্বর থেকে হ্যোয়াটসঅ্যাপে একটি মেসেজ আসে কোনো ভূমিকা বা প্রসঙ্গ ছাড়াই। শুধু একটি বাক্য “গুজরাটে ভোট কবে ম্যাম?” ট্রুকলারের সৌজন্যে দেখে নেওয়া যায় বার্তা প্রেরকের নাম। সংখ্যাগুরু দ্বারা পরিবেষ্টিত ক্লাসরুমে, সংখ্যাগুরু শিক্ষকের সামনে এবং সর্বস্তরে সংখ্যাগুরুদের দ্বারা শাসিত দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে (সেখানেও তো সরকার প্রশ্নচিহ্ন বসিয়েছে) বাস করে রুকসানার সংখ্যাগুরু শাসকের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার স্পর্ধা হয় না। তাই সজোরে বলতে হয়, “না না, ধর্মের জন্য আলাদাভাবে না। মেয়েরা এমনিই অত্যাচারিত, মুসলমান বলে আলাদা ভাবে বলছি না।” কিন্তু ধর্মের জন্যই যে বিলকিস বানোকে ধর্ষিত হতে হয় তা তো তুমি জানো, রুকসানা। শুধু মেয়ে বলে নয়, মুসলমান মেয়ে বলেই তিনি ধর্ষিত। ঠিক যেমনি ধর্ষিত হয়েছিল আসিফা।

কাশ্মীরের আসিফাকে মনে আছে তো, রুকসানা? একটি আট বছরের ছোট্ট মেয়েকে কাঠুয়ার এক মন্দিরে রেখে দিনের পর দিন ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে গণধর্ষণ উৎসব চলেছিল। অবশেষে একদিন তাকে শেষ করে দেওয়া হয়। আলোচনায় উঠে এসেছিল কাশ্মীরের বাখেরওয়াল সুন্নি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ভয় দখিয়ে কাঠুয়া থেকে চিরতরে তাড়ানোর রাজনৈতিক প্রকল্প। যখন পুলিশ কোর্টে চার্জশিট দাখিল করতে যায়, একদল হিন্দু আইনজীবী “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি সহযোগে প্রবল বাধা দেয়। আসিফার ঘটনায় হিন্দু একতা মঞ্চ থেকে বিজেপি মন্ত্রীদের প্রশ্রয়ে অভিযুক্তদের পক্ষে উঠে আসে জ্বালাময়ী বক্তব্য। সেই পরম্পরা অটুট রেখে সিকে রাউলজি, গুজরাতের সেই বিজেপি বিধায়ক যিনি বন্দিমুক্তি কমিটির সদস্য, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন বিলকিস বানোর সমস্ত ধর্ষক ও তাঁর পরিবারের গণহত্যাকারীদের মুক্তি পাওয়াই ন্যায্য, কারণ তারা জাতে ব্রাহ্মণ। সুতরাং সচ্চরিত্র। তাই তাদের বন্দি রেখে শাস্তি দেওয়া অনুচিত।

বিলকিস অবশ্য শেষপর্যন্ত চুপ থাকেননি। বুধবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এই অপরাধীদের মুক্তি ভারতীয় বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁর অটুট বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। বিলকিস একাত্ম হয়ে যান দেশের প্রতিটি নিপীড়িত মহিলার সাথে। তিনি বলেন, এ দুঃখ শুধু ব্যক্তিগত নয়। বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে দেশের সমস্ত মহিলার, যারা আইন-আদালতের দ্বারস্থ হয়ে ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করছে রোজ।

রুকসানা, ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শিক্ষকের কর্তব্য। গুজরাতে ভোট কবে? এ প্রশ্নের সরল উত্তর হল, বিধানসভা নির্বাচন এ বছরের শেষদিকে। যে প্রশ্ন তুমি করতে চাওনি, তার উত্তর হতে পারে বহুস্তরীয়। ভোটের আগে হিন্দুত্ববাদের ঘড়া এমনিতেই উপচে পড়ে। সেখানে আরও কয়েক ঘটি সংখ্যাগুরু আবেগ ঢেলে দিয়ে হিন্দু তুষ্টিকরণের চেষ্টা নিতান্তই “স্বাভাবিক”। আরও গভীরে যেতে হলে এ সম্ভাবনাও ভেবে দেখতে হবে বৈকি, যে গুজরাটে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদীরা হয়ত কোনদিনই মনে করেনি, সংখ্যালঘুকে দমনের হাতিয়ার হিসাবে ধর্ষণ নামক ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করা অন্যায় বা শাস্তিযোগ্য। তাই যারা জেলে ছিল তারা একাধারে আইনের শিকার এবং ধর্মযুদ্ধের আত্মত্যাগী বীর। তাদের মুক্তির পথ করে দেওয়া হিন্দুত্ববাদী সরকারের কর্তব্য। ঠিক যেভাবে মুক্তি পেয়েছে গুজরাট নরমেধ যজ্ঞের কুখ্যাত পুরোহিত বাবু বজরঙ্গি।

রুকসানা, তুমি আরেক বিলকিসের নাম শুনেছ তো সিএএ-বিরোধী লড়াইয়ের ময়দানে? শাহীনবাগের দাদি বিলকিস। অশীতিপর বৃদ্ধা, যিনি রাষ্ট্রের চোখে দেশদ্রোহী। বিলকিস দাদি রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে বলেছেন, মানব না, ভিটে ছাড়ব না। বিলকিসরা পালান না। তাঁরা পুরুষতান্ত্রিক, ধর্ষক, নিপীড়ক হিন্দুরাষ্ট্রের বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে জানকবুল অসম লড়াই লড়েন। তুমি আর তোমার শিক্ষিকাও পিছনের সারিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে পারো।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.