আপনাদের উদ্দেশে যখন এই লেখা লিখছি, তখন আমার আপনার প্রিয় মাতৃভূমি ভারতবর্ষ এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে এক বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় কলকাঠিতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের পঁচাত্তরতম বর্ষপূর্তির সাজানো জৌলুস আর দেশের জনগণের চরমতম দুর্দিনের হাত ধরাধরি করে চলা, অন্যদিকে যাদের মরে যাওয়ার কথা, মার খেয়ে আবারও মারের অপেক্ষায় দিন গোনার চিরকালীন দায় রাষ্ট্র যাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে শান্তি পায় আর উন্নয়ন এবং সুদিনের প্রহর গোনায়, তারা নিয়ম মেনে মরে যাচ্ছে। তেমনই একজন দায়বদ্ধ সুনাগরিক – আমাদের পাঁজরের টুকরো – নয় বছরের ইন্দ্র মেঘওয়াল। কিন্তু ইন্দ্র তার পিতৃপুরুষের জন্মগত অপরাধের দায় পালন করল বড় তাড়াতাড়ি। হ্যাঁ, একথা ঠিক যে একদিন না একদিন তাকে মরে যেতেই হত। ছায়া থেকে তারাদলে তার গন্তব্য ঠিক করা ছিল রোহিত ভেমুলা দাদার মতই। আর ইন্দ্র যদি মেয়ে হত, তাহলে কীভাবে পূর্বপুরুষের ঋণ শোধ করতে হত তার উদাহরণ ডেল্টা মেঘওয়াল, যে ধর্ষিত এবং নিহত হয়েছিল তারই কলেজে তার মাস্টারমশাই এবং কলেজের শিক্ষাকর্মীদের হাতে। এখন রাজস্থানে কংগ্রেস সরকার, তখন ছিল বিজেপি সরকার।

মেঘের সন্তান, তাই ঝরে পড়লেই হল
মেঘওয়ালরা ছড়িয়ে আছেন ভারতের রাজস্থান, পঞ্জাব, দিল্লি ও হরিয়ানায়; পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে। মরুভুমি ও শুষ্ক অঞ্চলের বাসিন্দা তারা। কথিত আছে, তাদের জাতির নামকরণ হয়েছে মেঘ ঋষির নাম থেকে, যিনি প্রার্থনার জোরে ক্ষরাকবলিত জনারণ্যে বৃষ্টির উচ্ছ্বাস আনতে পারতেন। বৃষ্টিস্নাত সিক্ততায় প্রাণ পেত জনতা জনার্দন। অথচ রাজস্থানের জালোর জেলার সুরানা গ্রামের দেবরাম মেঘওয়ালের তিন সন্তানের কনিষ্ঠতম ইন্দ্রকে মরে যেতে হল সামান্য পানীয় জল চেয়ে। গত জুলাই মাসের কুড়ি তারিখে স্কুলে নির্মমভাবে আহত হওয়ার পর আটটি হাসপাতাল ঘুরে, বাড়ি থেকে ১,৩০০ কিলোমিটার দূরে আমেদাবাদে মৃত্যুর সাথে প্রায় একমাসের লড়াইয়ে হেরে গেল ইন্দ্র। শুধু একটু জল খেতে চেয়ে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯২৩ সালের অগাস্ট মাসের চার তারিখে বম্বে বিধান পরিষদ রায় দেয়, অচ্ছুত জাতিভুক্তদের সমস্ত উন্মুক্ত পানীয় জলাধার, যেমন নলকূপ, কুয়ো, পুষ্করিণী ও ধর্মশালায় এবং স্কুল কলেজসহ সমস্ত সরকারি জায়গায় বিনা বাধায় পানীয় জল পান করার অধিকার থাকবে। চার বছর পরে একই দাবিতে ১৯২৭ সালের ২০ মার্চ বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর হাজার হাজার জনতাকে সাথে নিয়ে মহারাষ্ট্রের মাহাড়ের চাওদার দীঘি অভিযান করেন। সেদিনও উচ্চবর্ণের লোকজন পানীয় জলের অধিকারের সেই অভিযানকে রক্তস্নাত আক্রমণের মাধ্যমে দমন করেছিল। উচ্চবর্ণের সপক্ষে সেদিন দাঁড়িয়েছিল আজকের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির রূপকার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের পূর্বজরা। আজও ইন্দ্রের রাষ্ট্রীয় খুনের বিপক্ষে উচ্চবর্ণের হয়ে সওয়াল করছে তারা। জালোরের বিজেপি বিধায়ক যোগেশ্বর গর্গ ইন্দ্রের মৃত্যুকে ঢাল করে সুযোগসন্ধানীরা মাঠে নেমে পড়েছে বলে অভিযোগ করছেন, সন্দেহ প্রকাশ করছেন মৃত্যুর কারণ নিয়ে। এমনকি জালোরের বিজেপি বিধায়ক এখন বলার চেষ্টা করছেন ইন্দ্রের খুনের সাথে তার দলিত হওয়ার কোনো সম্পর্কই নেই

জেনে রাখা ভাল, গয়না, মহিলাদের পোশাক, বাড়ি তৈরির কৌশল ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে মেঘওয়ালরা একাধিক শাখায় বিভক্ত হলেও তারা সবাই ভারত সরকারের শিডিউলড কাস্টস অ্যান্ড শিডিউলড ট্রাইবস অর্ডারস (অ্যামেন্ডমেন্ট) ১৯৫৬ বা আইনি ধারা নং ৬৩ অফ ১৯৫৬ ও পরবর্তী আইনের বলে তফসিলি জাতিভুক্ত।

ইন্দ্র পড়তেন সুরানার সরস্বতী বিদ্যামন্দিরে। পাঠক জানেন এই স্কুলগুলি সম্পর্কে। আরএসএসের হিন্দু মৌলবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা এম এস গোলওয়ালকর ১৯৪৬ সালে হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রে প্রথম গীতা স্কুল নামে এই ধরনের প্রোপাগান্ডা প্রচারক স্কুল চালু করেন। অতঃপর ১৯৫২ নাগাদ নানাজি দেশমুখ গোরখপুরে চালু করেন সরস্বতী শিশু মন্দির, যা আজ সারা দেশে নানা নামে ও নানা ঢঙে শিশু কিশোরদের মধ্যে হিন্দু ছাড়া অন্য সব ধর্মের মানুষের প্রতি রগরগে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা প্রচার করে চলেছে। পাল্লা দিয়ে এরাই আবার বনবাসী কল্যাণ পরিষদের আওতায় একলব্য আবাসিক বিদ্যালয় নামের একাধিক স্কুলে আদিবাসী ও দলিতদের জাতি পরিচয় ভুলিয়ে একমাত্রিক হিন্দুত্বের দাসে পরিণত করে চলেছে।

আরো পড়ুন সাবিত্রীবাঈ ফুলে: ইতিহাসে উপেক্ষিতা

আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও ইদানীং এই ধরনের স্কুলের বাড়বাড়ন্ত, যা আগে দেখা যায়নি। এখন এ রাজ্যে যাদের পরিচয় প্রকাশ পাচ্ছে তারাও নাকি দু-তিন দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে কাজ করছে। ২০১৮ সাল নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ সরকার এক লপ্তে এই ধরণের বেশ কিছু স্কুলের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে। কিন্তু তখনও রাজ্যের পূর্বতন শাসক দলটির এ বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা চোখে পড়েনি। এখনও সঙ্গত কারণে তৃণমূল বিরোধিতা করলেও বিজেপি ও আরএসএসের প্রোপাগান্ডা এবং রাজনীতির প্রতি তাদের বিরোধিতা সাধারণ মানুষের কাছে ফুটনোটের মত ঠেকে। তারা শুধু ক্ষমতায় থাকাকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের “দাঙ্গা করলে মাথা ভেঙে দেব” উক্তির নস্ট্যালজিয়ায় মগ্ন থাকতে পছন্দ করে।

অতঃকিম
ইন্দ্রের পূর্বসূরী ডেল্টা মেঘওয়ালের স্মৃতি এখনও দগদগে। ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ বিকানের জেলার নোখায় জৈন আদর্শ টিচার ট্রেনিং ইনস্টিটউটের ছাত্রী ডেল্টার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয় কলেজের ভিতরেই। ডেল্টার বাবা মহেন্দ্ররাম একজন শিক্ষক ছিলেন, ডেল্টাও শিক্ষিকা হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জাতিগত ভবিতব্য অনুসারেই তাঁকে এই খুনে দুনিয়া থেকে চলে যেতে হয়েছিল, যেমনটা হল ইন্দ্রের বেলাতেও। শিক্ষক হওয়া কি এতই সহজ?

আমি আর আমার দলিত সহপাঠীরা দেখছি, আমরা যাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শ শিক্ষক হিসাবে পেয়েছি, যাঁদের মত হতে চেয়েছি, তাঁদের কাছে আছে সহস্র বছরের অর্জিত জাতিগত পুঁজি। বিদ্যায়তনিক শিক্ষায় তাঁদের পারিবারিক গৌরব কত পুরুষ আগে থেকেই তাঁদের দুনিয়ার উজ্জ্বলতম ক্ষেত্রগুলিতে ভ্রমণ করাচ্ছে। আমরা কেউ প্রথম, কেউ দ্বিতীয় প্রজন্মের ছাত্র হয়ে সেই রাজত্বে ভাগ বসাতে পারব কি কখনও? তাই স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরের অমৃত মহোৎসব অন্য সবার জন্য হলেও আমাদের ভাগে পড়ে থাকে চিরকালীন অবহেলার বিষ।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.