দেবাশিস সেনগুপ্ত

বালি হিন্দু স্পোর্টিং ক্লাব থেকে বালি ওয়েলিংটন ক্লাব ছুঁয়ে ১৯৪৮ সালে একটি ছেলে পৌঁছে গিয়েছিল কলকাতা ময়দানে, বালি প্রতিভার হয়ে ফুটবল খেলতে। তারপর তিন বছর (১৯৪৯-১৯৫১) বিএনআরে খেলার পর বালির ছেলেটি তার প্রতিভার জোরে মোহনবাগানে খেলেছিল টানা আট বছর (১৯৫২-১৯৫৯)। এর মধ্যে ১৯৫৮ সালে হাতে আসে অধিনায়কের দায়িত্ব। এই ছেলেটির নাম সমর বন্দ্যোপাধ্যায়, ময়দানে যিনি পরিচিত বদ্রু ব্যানার্জী নামে।

তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৩০ সালের ৩০ জানুয়ারি বালিতে। তাঁর ফুটবল অনুরাগী বাড়ির বারান্দায় প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় ফুটবল নিয়ে আলোচনা হত আর তিনি সেই গল্প শুনতেন ছোটবেলা থেকেই। বদ্রুর বাবা ছিলেন কড়া মানুষ। পড়াশোনায় অবহেলা করার জন্য বকাবকি করতেন। কিন্তু বাবার বকুনি সত্ত্বেও ছোট্ট বদ্রু ফুটবল নিয়ে আলোচনা গোগ্রাসে গিলতেন। সেখান থেকেই ফুটবলার হওয়ার আগ্রহ জন্মায়। তাঁর বড় দাদার (রাধানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) মৃত্যু হয়েছিল মাঠেই, ফুটবল খেলতে গিয়ে আহত হয়ে। তাই ছোট ভাইয়ের ফুটবল খেলা নিয়ে পরিবারে প্রবল আপত্তি ছিল। স্কুলের ব্যাগে লুকিয়ে বল, বুট নিয়ে গিয়ে খেলতে হত তাঁকে। সেই খেলাই একদিন তাঁকে পৌঁছে দিল কলকাতায় তথা মোহনবাগানে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মোট ৭৮টি গোল করেছেন সবুজ মেরুন জার্সিতে, আর মোহনবাগানকে দিয়েছেন দশটি ট্রফি – চারবার কলকাতা লিগ (১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৬, ১৯৫৯), তিনবার আইএফএ শিল্ড (১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৬), দুবার ডুরান্ড কাপ (১৯৫৩, ১৯৫৯), একবার রোভার্স কাপ (১৯৫৫)। কলকাতা লিগ জয়ের হ্যাটট্রিক এবং ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে কলকাতা ফুটবল লিগ ও শিল্ড জিতে মোহনবাগানের হয়ে ‘ডাবল’ করার কৃতিত্বও আছে বদ্রুর ঝোলায়।

১৯৫৪ শিল্ড ফাইনালে হায়দরাবাদ পুলিশের বিরুদ্ধে একমাত্র গোলটি ছিল বদ্রুরই। ১৯৫৩ সালে মোহনবাগানের ডুরান্ড জয়ে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল করেন বদ্রু, বয়স তখন মাত্র ২৩। ১৯৫৫ সালে মোহনবাগান যখন প্রথমবার রোভার্স কাপ জেতে তখন ফাইনালে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে গোল করেছিলেন তিনি। অবসরের পর তিনি বড়িশা এসসি ক্লাবের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলার হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে খেলেছেন ১৯‌৫২ থেকে ‌১৯৫৬ অবধি (১৯৫৩ ও ১৯৫৫ সালে বাংলা চ্যাম্পিয়ন হয়)। খেলোয়াড় জীবনের সেরা মুহূর্ত আসে ২৬ বছর বয়সে, যখন তিনি ১৯৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হন। অস্ট্রেলিয়াকে ৪-‌২ গোলে হারিয়ে ভারত সেমিফাইনালে যুগোশ্লাভিয়ার কাছে ১-‌৪ গোলে হেরে যায়। শেষপর্যন্ত ভারত চতুর্থ হয় ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে বুলগেরিয়ার কাছে ০-‌৩ গোলে হেরে। চুনী-পিকে-বলরাম সমৃদ্ধ দলেও নিজেকে আলাদা করে চেনাতেন বদ্রু।

১৯৫৫ সালে টালিগঞ্জের নায়িকা তপতীর সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে সেকালে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পুরীতে আলাপ হওয়ার পর থেকে সে কালের নামী অভিনেত্রী তপতী ঘোষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। তপতীকে নিজের কালো রঙের রোভার গাড়িতে বসিয়ে মাঠে নিয়ে আসতেন বদ্রু। তাঁদের ৫৭ বছরের দাম্পত্য জীবন শেষ হয় ২০১২ সালে, তপতীর মৃত্যুতে। তার কয়েক বছর আগেই নিজেদের ছেলেকে হারিয়েছিলেন তাঁরা।

আরো পড়ুন সুভাষ ভৌমিক: গর্ব করার মত একজন বাঙালি ফুটবলারের প্রয়াণ

বহু স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন বদ্রু। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ২০০৯ সালে মোহনবাগান রত্ন। এছাড়া কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রকের তরফে অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী ফুটবলারদের দিল্লিতে ডেকে দেওয়া সংবর্ধনা। রাজ্য সরকারের থেকে পাওয়া জীবন কৃতী সম্মান। ভারতীয় ডাকবিভাগও তাঁর সম্মানে বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল।

কিন্তু তাঁর অর্জুন বা পদ্মশ্রী পুরস্কার না পাওয়া গভীর লজ্জা। তাঁর নয়, দেশের।

কোন সন্দেহ নেই, মোহনবাগান, কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবল যতদিন বেঁচে থাকবে, তার একটা বড় অংশ জুড়ে বদ্রু ব্যানার্জী ছিলেন, আছেন, থাকবেন।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী, খেলা সম্পর্কিত একাধিক বইয়ের লেখক। মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.