সকাল থেকেই বাড়িতে ফুল বেচাকেনা, তার সাথে চাষের জমি দেখাশোনার মুনিষদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, সব কাজ একহাতে সামলাতে হয় গোবিন্দরাওকে। ছেলের মতিগতি বোঝা দায়। চাষবাসে মন নেই, পড়তে খুব ভালবাসে ছেলেটা, তাই গ্রামের মোড়ল, আর নেতা লোকেদের বারণ না শুনেই ছেলেকে স্কটিশ মিশনারিদের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন গোবিন্দরাও। পরিবারে তো লেখাপড়ার অত চল নেই, ওরা যে মালি। শাস্ত্রে আছে ওদের লেখাপড়া করতে নেই, শাস্ত্র পড়ার অধিকার শুধু ব্রাহ্মণদেরই আছে। তবু ছেলের ইচ্ছের কাছে হার মানেন গোবিন্দরাও। তবে লেখাপড়ার সাথে, বিয়ের তো কোনো বিরোধ নেই বাপু, তাই ছেলের ওজর আপত্তিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে, তেরো পেরোতে না পেরোতেই, গোবিন্দরাও কাছের নাইগাঁও গ্রামের খান্দজি পাতিলের বড় মেয়ের সাথে, ছেলে জ্যোতিবারাওয়ের চার হাত এক করে দিলেন।

কবে সেই এক বছর বয়সে মা হারা হয়েছে ছেলেটা, বাড়িতে বউ এলে যদি বাউন্ডুলেপনা একটু ঘোচে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

হা হতোস্মি! গোবিন্দরাও অবাক চোখে একদিন রাতে কলে যাবার জন্য উঠে দেখলেন, ছেলে বউকে পড়াচ্ছে। বুক কাঁপতে লাগল গোবিন্দরাওয়ের। একথা জানতে পারলে গ্রামের মুরুব্বিদের হাতে কি যে হেনস্থা হবে, কে জানে! পরদিন সকালে ছেলে এক অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে এল তাঁর কাছে। সাবিত্রীকে সে পড়াবে মিসেস মিশেলের স্কুলে। এমন অবাক কোনোদিন হননি গোবিন্দরাও। ঢোঁক গিলে রাজি হলেন। সেই শুরু হল সাবিত্রীর জীবনে এক নতুন অধ্যায়। মিসেস মিশেলের স্কুলে প্রথাগত পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হলেন সাতারায় মিসেস ফারারের স্কুলে, শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য। সাবিত্রীর চোখে তখন নতুন স্বপ্ন। মেয়েদের স্কুল খুলতে হবে, শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হবে ঘরে ঘরে।

সেই স্বপ্নের উড়ানে সাবিত্রীবাঈ, জ্যোতিবারাও এবং তাঁর বন্ধুদের সহায়তায় পুনের ভিদেওয়ারায় আটজন বালবিধবাকে নিয়ে খুলে ফেললেন মেয়েদের স্কুল। সমাজের রোষে পড়তে হল। টিটকিরি, শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার শেষ ছিল না। প্রতিদিন সকালে একটা শাড়ি পরে, আরেকটা ব্যাগে পুরে স্কুলের দিকে রওনা হতেন সাবিত্রীবাঈ। রাস্তায় তাঁকে ছুঁড়ে মারা হত পচা ডিম, পাথর, পুরীষ, কাদা। চিৎকার করে বলা হত “ওই যে বেহায়া বেবুশ্যে মেয়েমানুষটা যাচ্ছে।” একটুও দমে যেতেন না তিনি। স্কুলে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে পড়াতে বসতেন ছাত্রীদের। ফেরার পথে আবার একই অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই হেনস্থা সহ্য করতে পারলেন না গোবিন্দরাও। তাই জ্যোতিবা আর সাবিত্রীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন। তাঁরা আশ্রয় পেলেন বন্ধু উসমান শেখের বাড়িতে। উসমান আর তাঁর স্ত্রী ফতিমা বিবি ছিলেন ফুলে দম্পতির সব কাজের সঙ্গী।

ব্রাহ্মণের ঘরের বালবিধবারাও তাদের আত্মীয় স্বজন, পরপুরুষদের দ্বারা গর্ভবতী হতেন। নিজেদের জীবন শেষ করে দেওয়া কিংবা ভ্রূণ নষ্ট করা ছাড়া কিছু করার থাকত না। ফুলেরা এরকম ৩৫ জন ধর্ষিতাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন, গড়ে তোলেন ভারতের প্রথম ভ্রূণহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা। ১৮৫২ সালে নারীর অধিকার ও সম্মান রক্ষার জন্য গড়ে তোলেন মহিলা সেবা মন্ডল।

জলচল তো দূরের কথা, খাবার জল সংগ্রহ করাও সেকালে দলিতদের পক্ষে খুবই কষ্টকর ছিল। গ্রামের নলকূপ থেকে, পুকুর থেকে তাদের জল নেওয়ার অধিকার ছিল না। ফুলেদের বাড়িতে নলকূপ তৈরি করে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হল।

সাবিত্রীবাঈ বুঝেছিলেন, পিছিয়ে পড়া মানুষের আগে দরকার শিক্ষা। তবে সচেতনতা আসবে; মনুবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের তাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া নিয়মকানুনের অসারতা তারা বুঝতে পারবে। মাঙ্গ, মাহার সম্প্রদায়ের জন্য তৈরি করলেন দুটো স্কুল। তাঁর স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারি স্কুলের ছাত্রদের তুলনায় ভাল ফল করতে লাগল। আঠেরোটা বালিকা বিদ্যালয়ও স্থাপন করলেন সাবিত্রীবাঈ। ছাত্রীদের স্কুলমুখী করার জন্য তাদের বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁর স্কুলগুলোকে অনুদান দেওয়া শুরু করল। ১৮৫২ সালে ব্রিটিশ সরকার সাবিত্রীবাঈকে সেরা শিক্ষকের শিরোপা দেয়।

বিধবা হলেই জীবন শেষ, সকলের চোখের আড়ালে কেঁদে কেঁদে মনোকষ্টে জীবন কাটানো ছাড়া কিছু করার নেই, এমনটা বিশ্বাস করতেন না সাবিত্রীবাঈ। বিধবা হলেই চুল কেটে ফেলতে হবে কেন? পুনে শহরের সব নাপিত তাঁরই উদ্যোগে একদিন কোনো বিধবার চুল কাটবে না বলে হরতাল করে। অর্থাৎ বালবিধবাদের জন্য তাঁর লড়াই শিক্ষাক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, তাদের সামাজিক অবস্থান বদলানোর লড়াইও করেছেন।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে সরকার তাঁর স্কুলগুলোর অনুদান বন্ধ করে দিলেন। তাতেও পিছপা না হয়ে সাবিত্রীবাঈ বাড়ি বাড়ি ঘুরে বালবিধবাদের পড়াতেন, সাহিত্য রচনা ও ছবি আঁকায় উৎসাহ দিতেন। ১৮৭৩ সালে অস্পৃশ্যতা ও শোষণের হাত থেকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে রক্ষা করার জন্য জ্যোতিবারাও গড়ে তোলেন সত্য শোধক সমাজ।

১৮৭৬ সালে ভারত জুড়ে শুরু হয় খরা, ফলস্বরূপ দুর্ভিক্ষ। গোটা মহারাষ্ট্রে না খেতে পাওয়া মানুষের হাহাকার। এই সময়ে তিনি মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় বাহান্নটি লঙ্গরখানা খোলেন শুধুমাত্র প্রান্তিক, নিরন্ন মানুষগুলোর কাছে বিনামূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিতেন স্বামী এবং চিকিৎসক পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে।

১৮৯০ সালের ২৮ নভেম্বর যখন সমাজসংস্কারক, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, সমাজকর্মী, তাঁর স্বামী মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলে প্রয়াত হন, তখন তাঁর শবযাত্রায় অস্থিকলস মাথায় নেতৃত্ব দেন সাবিত্রীবাঈ। জ্যোতিবা তো শুধু তাঁর স্বামী ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর শিক্ষক, মার্গ নির্দেশক, বন্ধু, জীবনের ধ্রুবতারা। সাবিত্রীবাঈয়ের এই পদক্ষেপ রক্ষণশীল সমাজের রীতি বহির্ভূত হলেও সমাজ তাঁকে রুখতে পারেনি। অবশ্য সাবিত্রীবাঈয়ের আধুনিকতা এখানেই শেষ নয়। পুত্র যশবন্তের বিয়ের আগে পাত্রীকে নিজের বাড়িতে এনে তাদের মেলামেশা করার সুযোগও করে দিয়েছিলেন।

১৮৯৭ সালে পুনেতে শুরু হয় প্লেগ, মহারাষ্ট্র তখন উত্তাল। একদিকে চলছে প্লেগের ত্রাণের নামে মানুষের উপর ব্রিটিশ সরকারের অকথ্য অত্যাচার। এর প্রতিবাদে বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কের উদ্যোগে সংগঠিত হচ্ছেন বিপ্লবীরা, পুত্র যশবন্তকে নিয়ে সাবিত্রীবাঈ খুলে ফেলেছেন চিকিৎসাকেন্দ্র, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে প্লেগ আক্রান্ত মানুষদের নিয়ে এসে চলছে চিকিৎসা। এই দুঃসময়ে একটা দশ বছরের ছেলেকে কাঁধে করে উদ্ধার করে নিয়ে এসে নিজের হাতে তার সেবা শুশ্রূষা র ভার তুলে নেন সাবিত্রীবাঈ এবং আক্রান্ত হন এই মারণ রোগে। সেই রোগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

মনুবাদী সমাজব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রান্তিক মানুষের অন্ধকার জীবনে আলো আনাই সাবিত্রীবাঈ এবং জ্যোতিবা ফুলের সারাজীবনের কাজ। কিন্তু ইতিহাসে তাঁদের যোগ্য স্থান দেওয়া হয়নি।

আমাদের পিতৃতান্ত্রিক উচ্চবর্গীয় সমাজে প্রচলিত ইতিহাস বইয়ের পাতায় “দক্ষিণ ভারতের বিদ্যাসাগর” জ্যোতিবারাও ফুলের কথা থাকলেও সাবিত্রীবাঈ উপেক্ষিতা।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply