১৮৭০ সাধারণাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল আলালের ঘরের দুলাল। পৃষ্ঠাসংখ্যা ২১১। দাম ছিল ১২ আনা। ওই একই সালে প্রকাশিত হয় ২৫২ পৃষ্ঠার এক উপন্যাস। নাম কামিনী কলঙ্ক। বইয়ের লেখকের নাম নবীনকালী দেবী। দাম ছিল ১ টাকা ৪ আনা। এর আট বছর পর, ১৮৭৮ সাধারণাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস কপালকুণ্ডলার দাম ১ টাকা রাখা হয়, সমমূল্য ছিল কিরণমালা নামক উপন্যাসেরও। কিরণমালার লেখক সেই নবীনকালী দেবীই।

উনিশ শতকে, দেখাই যাচ্ছে, দামের দিক থেকে বিচার করলে, মেয়েদের লেখা বইকে হেলাছেদ্দা করা হচ্ছে, ব্যাপারটা এরকম নয়। অন্তত পৃষ্ঠাসংখ্যার হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের আলোচ্য বইয়ের লেখক তাঁর গবেষণায় দেখাচ্ছেন, কোনো কোনো সময়ে মহিলা লেখকদের বইয়ের দাম পুরুষ লেখকের চেয়ে বেশিই। কিন্তু তাতে উদ্বাহু হবার কিছু নেই। বয়ান পরিসর, যে কোনো পরিচয়জ্ঞাপক বয়ান পরিসর, অত সরল নয়, যতটা মনে (করা) হয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের আলোচ্য বইটি নিয়ে বাংলা ভাষায় খুব বেশি আলোচনা হয়নি। বইটির বিষয়বস্তু বাংলা ভাষায় উনিশ শতকের মেয়েদের লেখালেখি। তবে বইটি লিখিত হয়েছে ইংরেজি ভাষায়। রুশতী সেন আনন্দবাজার পত্রিকায় এ বইয়ের একটি আলোচনার মত করেছিলেন। বইটির নাম, ওয়ার্ডস অফ হার ওনউয়োমেন অথরস অফ নাইনটিনথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল, লেখক – মেরুনা মুর্মু। জানিয়ে রাখা যাক, যে এটি একটি গবেষণাগ্রন্থ। এবং একইসঙ্গে এ অভয়বাণীও লিখিত থাক স্পষ্টাক্ষরে, যে এ গবেষণাগ্রন্থটি কোঁত পাড়া জার্গনসমৃদ্ধ নয়। তা নয় বলেই, এই নিবেদক এ গ্রন্থটির পরিচয় করাতে আগ্রহী হয়েছেন। মেরুনা, এ বইতে ১৮৫০ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত সময়কালের এমন কিছু তথ্য একত্র করেছেন এবং সে তথ্যগুলিকে এমন আলোকে দেখেছেন ও এমন ছাঁকনিতে ফেলেছেন, যে সেখান থেকেই অনুসন্ধিৎসু পাঠক নানা তাপমাত্রার আঁচ পেতে থাকবেন, নানা রঙের শিখার সন্ধান পাবেন। তার জন্য মেরুনাকে থান ইটের মত স্টেটমেন্ট ছুড়ে ছুড়ে মারতে হয়নি।

এই বইয়ের ভূমিকাংশে মেরুনা লিখেছেন, “The recorded history demonstrates that the socio-economic and political restructuring of society by British colonizers led the growth of the socio-economic category of bhadrolok (a social group whose gentility was defined by their upper-caste status and abstention from manual labour, respectable people and culturally refined gentlemen) in the first four decades of the nineteenth century.” (পৃষ্ঠা ৪-৫) এবং তারও আগে, বইয়ের একদম গোড়াতেই তিনি বলেই দিয়েছেন, এ বই বাঙালি মধ্যশ্রেণির মহিলা লেখকদের সামাজিক ক্যাটিগরির বাড়বৃদ্ধির সন্ধানী। তাঁর বেছে নেওয়া সময়কাল ১৮৫০ থেকে ১৯০০।

মেরুনা এ বইতে যে লেখকদের বই নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার অন্যতম স্বর্ণকুমারী দেবী। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যাসন্তানদের মধ্যে চতুর্থ স্বর্ণকুমারী। অর্থাৎ, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহোদরা। স্বর্ণকুমারীর যে উপন্যাসটি এ বইতে আলোচনায় উঠে এসেছে, তার নাম কাহাকেএটি স্বর্ণকুমারী দেবীর ৯ নম্বর উপন্যাস, এর পরে তিনি আরও চারটি উপন্যাস লিখেছেন। এ ছাড়াও তিনি নাটক, অপেরা, কবিতা, প্রবন্ধ লিখেছেন। স্বর্ণকুমারী নিয়ে, তাঁর কাহাকে? উপন্যাস নিয়ে কথাবার্তা আরেকটু চলবে এ নিবেদনে। আমরা মেরুনার বইয়ের একটা অংশ এখানে উদ্ধৃত করব।

 “Kahake? is a story of the search for a sovereign identity through an intellectual understanding of the concept of love. Love, for Mrinalini, is neither an ideal to be valorized nor an emotion larger than life but a this-worldly emotion that ensures personal gratification through reciprocity. She is not a passive recipient of love but actively claims from her loved ones, transferring her love from one person to another when betrayed.” (পৃষ্ঠা ২২৬)। স্বর্ণকুমারী দেবীর কাহাকেপ্রকাশিত হয়েছিল উনিশ শতকের একেবারে শেষপ্রান্তে, ১৮৯৮ সালে। সে সময়ে একজন মহিলা (আখ্যানের মূল চরিত্র মৃণালিনী) প্রেম নামক বিষয়টিকে বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চাইছেন, এবং প্রেমকে একপাক্ষিক এক মাধুকরীতে পর্যবসিত করতে চাইছেন না, এরকম একটা ব্যাপার কিঞ্চিৎ অবিশ্বাস্য লাগে। ফলত, তিনি যে তৎকালীন পুং-বুদ্ধিজীবী-মসীজীবীদের কাছে অস্বস্তিকর, সে নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। সে প্রসঙ্গে আসার আগে, আরেকটু উদ্ধৃতি, মেরুনার বই থেকে।

“… Kahake? almost an autobiographical narration. The authenticity of the narrator’s voice is established by the depiction of life’s journey through internal monologues, verbalized stream of consciousness, conversations, and letters. It creates an effect of realism, establishing both the genuineness of the narrator’s character and her rootedness in social milieu.” (পৃষ্ঠা ২২৭)

এই যে সামাজিক প্রতিবেশে শিকড় চারানো, তা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় উল্লিখিত উপন্যাসেও। আমরা এ নিবেদনকে উদ্ধৃতি কণ্টকিত করে ফেলছি। কিন্তু তা ছাড়া আর কোনো রাস্তাও নেই, এখন আর। আমরা কাহাকে? উপন্যাসের একাদশ পরিচ্ছেদে যাচ্ছি।

ভগিনীপতি বলিলেন,–“মক্কেলটাকে আর কিছুতেই তাড়াতে পারি নে! কি discussion চলছে হে—জর্জ্জ এলিয়ট? Oh! She is a great creator—we must admit that, I am sorry to say.”

ডাক্তার। What a reluctant admission! Does not your man’s nature take delight in glorifying such genius in a woman? What a grand intellect she had—combined with sympathetic heart and subtle instinct of a true woman! মানুষের সামান্য অসামান্য প্রত্যেক কার্য্যটি, তার অন্তর স্বভাবের কিরূপ নিগূঢ় উদ্দেশ্য কিরূপ সূক্ষ্মতম ভাব থেকে প্রসূত তিনি যেমন তা চুল চিরে দেখিয়েছেন এমন কোন পুরুষ নভেলিষ্ট পেরেছেন কি?”

ভগিনীপতি। There I quite disagree. Do you mean to say she is as great a genius as Shakespeare, or even modern—

ভগিনীপতির কথা শেষ করিতে না দিয়াই ডাক্তার খুব সতেজে বলিলেন— “Of course,–why not? Though at first I spoke of novelists only,–yet if you chose to bring Shakespeare’s name I have not the slightest hesitation in pronouncing her to be as great in her sphere, as Shakespeare, in his.”

এমনতর আস্পর্দ্ধাপূর্ণ মূর্খামির কথায় ভগিনীপতিকে নিতান্তই বিচলিত করিয়া তুলিল। তিনি ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেন, “What a monstrous proposition!—Quite blasphemous to my mind. I never heard of such a ridiculous comparison! She is no more a Shakespeare than you are my dear fellow—however cleverly she might have written her novels.”

ডাক্তার হাসিয়া বলিলেন— “Of course she is not! How could she possibly be Shakespeare! Did I say such a foolish thing? What I meant to say and would go on repeating till the end of my life is this—that the genius shown in the works of George Elliot is no way inferior to that of any renowned poet or novelists of England, dead or alive.”

 

স্মরণে রাখতে হবে, জর্জ এলিয়ট অর্থাৎ মারি আন ইভান্সের সময়কাল ছিল ১৮১৯ থেকে ১৮৮০, এবং কাহাকেআমরা আগেই বলেছি, প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯৮ সালে। সন-তারিখের হিসেবটা একটু জরুরি হয়ে পড়ছে। কাহাকেইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয় ১৯১৩ সালে। স্বর্ণকুমারী নিজেই অনুবাদ করেছিলেন, ইংরেজি উপন্যাসটির নাম ছিল অ্যান আনফিনিশড সং। তার ঠিক আগের বছর আরেকটি বাংলা বই ইংরেজিতে অনূদিত হয়, সে ক্ষেত্রেও লেখক নিজেই অনুবাদক ছিলেন। বইটির নাম গীতাঞ্জলি, লেখকের নাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মেরুনা তাঁর বইতে একটা মোক্ষম অংশ তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, স্বর্ণকুমারীর লেখার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের অব্যবহিত পরে উইলিয়ম রথেনস্টাইনের কাছে একটি চিঠি পৌঁছয়। চিঠির খণ্ডাংশ উদ্ধৃত করেছেন মেরুনা।

“She is one of those unfortunate beings who has more ambition than has ability… just enough talent to keep her alive for a short period. Her weakness has been taken advantage of by some unscrupulous literary agents in London and she has had stories translated and published. I had given her no encouragement but have not been successful in making her see things in proper light.”

স্বর্ণকুমারী দেবীর সক্ষমতার তুলনায় অধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লোভের বশে অসৎ লোকের ফাঁদে পড়া ও তাঁকে নিরুৎসাহ করার চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার এ আক্ষেপ, চিঠিতে যিনি ব্যক্ত করেছিলেন, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বাংলা লেখালেখির জগৎ যে সময়কালে নির্মিত হচ্ছে, সে সময়ে একটিমাত্রই বয়ান স্বীকৃত। সে বয়ান পুরুষের। লিঙ্গজনিত কারণেই মেয়েদের যে কোনো নিজস্ব এজেন্সি থাকতে পারে, থাকতে পারে কোনো স্বকীয় বয়ান, তা তখনো ভাবনাজগতে অনুপস্থিত। বয়ানের সে স্বীকৃতি শুধু লেখককুলে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, তা চারিয়ে যায় পাঠক-মননেও। যে কারণে, রবীন্দ্রনাথের চিঠির একটা অংশ সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে, স্বর্ণকুমারীর লেখকজীবন ক্ষণস্থায়ী হয়েছিল। বারংবার স্বর্ণকুমারী আলোচ্য হয়েছেন বিশেষজ্ঞদের বিবৃতিতে, বা আলাদা করে মেয়েদের লেখালেখির ভুবনে।

কিন্তু এ বাস্তবতা কি পাল্টিয়েছে, পাল্টাতে থেকেছে? এখানে একটা প্রতর্কের সমাবেশ ঘটতে পারে, যে, তা পাল্টানো আদৌ জরুরি কিনা। জরুরি, যখন কোনো লেখক নিজেকে লিঙ্গপরিচিতির মধ্যে সীমায়িত রাখতে অনাকাঙ্ক্ষী। একটা ছোট উদাহরণ, ফের উদ্ধৃতি সহযোগে। বলে রাখা ভাল, এ উদ্ধৃতির মধ্যে খুব উচ্চকিত ভাব নেই, ক এবং না-ক-এর মাধ্যমে দ্বিত্বের পৃথিবী নির্মাণের চিৎকৃত পিতৃতান্ত্রিক সন্দর্ভ নেই।

…আমার এক কথাশিল্পী বন্ধু বললেন এভাবে হবে না, একটু প্রকাশকদের দরজায় ঘোরো, যাতায়াত করো। আমি বললাম, কী দরকার, আমার না শুনতে যথেষ্ট খারাপ লাগে, তাছাড়া আমি তো বই-এর রয়ালটি দিয়ে পেট চালাবো না, চাকরি করি, তাতেই পেট চলে। সে খুব দুঃখ পেল। বলল, এভাবে ভেবো না, তোমার লেখা বের হওয়া দরকার। আমি বললাম লিখলে ছাপা হবে এমন জায়গার তো অভাব আমার নেই। যারা চায় তাদের সবাইকে লেখা দিতে পারি না এত কম লিখি। বই না হয় না-ই হল—ছাপা তো হয়, তাই যথেষ্ট। বন্ধুটি খুব আন্তরিকভাবে আমাকে সাহায্য করতে চাইছিলেন বোধহয়, আমার বই বের হচ্ছে না দেখে খুব মায়া হচ্ছিল মনে হয়—তাই মুখের ওপর বললাম না, মনে মনে ভাবলাম, মেয়েদের লেখালেখি নিয়ে এখন যে রকম একটু আবিষ্কার আবিষ্কার ভাব, কথাবার্তা চলছে, তাতে বেঁচে থাকতে প্রকাশক না জুটলেও, তাড়াতাড়ি মারা গেলে কালো মলাটে একটি রচনা সমগ্র প্রকাশ করার প্রকাশক ঠিক জুটে যাবে। (লেখকের কথা, মীনাক্ষী সেন-এর ছোটগল্প, সেতু প্রকাশনী: অক্টোবর, ২০০৪)।

আমাদের আলোচ্য বইটির দুটি মূল বৈশিষ্ট্য এই নিবেদকের নজরে পড়েছে। তার একটি হল, এ বইয়ের ভাষা। মেরুনা যে বিষয়ে, যতটা গভীরতার সঙ্গে, যে সময়কালে এই গবেষণাটি করেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই কাজটি ভাষাগতভাবেই অনন্য। কথায় কথায় বিভিন্ন জার্গন ব্যবহার করে, জটিলতম বয়ান লেখাই এ সময়কালের গবেষণার সাধারণ বৈশিষ্ট্য। গোটা বই জুড়ে, মেরুনা সেই সাধারণ অভ্যাসটিকে বর্জন করেছেন। বা, বলা যায়, প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রত্যাখ্যানের ভাষা হিসেবেও, বা প্রত্যাখ্যানের ভাষা হিসেবেই, এ নিয়ে তাঁর কোনো চিৎকৃত ঘোষণা নেই। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যও, ওই চিৎকার নিয়েই। এ বইটা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, তাঁর চিন্তাভুবন, দ্বিত্বে খণ্ডিত নয়। ক এবং না-কয়ের যে ভুবন, মেরুনার বই আমাদের সে একমাত্রিক ভুবনের মধ্যে রেখে দেয় না। তেমন একমাত্রিকতা তো পিতৃতান্ত্রিক বলেই আমরা জেনেছিলাম।

পাঠক ও সম্পাদকদের কাছে এবং বইয়ের লেখকের কাছে নিবেদকের মার্জনা চাইবার রয়েছে। একাধিক কারণে। তার প্রথমতম কারণ, এ বইয়ে ওই সময়কালের আরও বেশ কয়েকটি জঁরের আরও বেশ কয়েকটি লেখা আলোচিত হয়েছে। সেগুলি সম্পূর্ণ অনুল্লেখিত থেকে গেল, এই লেখায়। কিন্তু তেমন অনুল্লেখের একটা ভাল দিকও আছে। অন্য কোনও সময়ে, অন্য কোনও পরিসরে, তেমন উল্লেখের সুযোগ মিলতে পারে, কোনও সম্পাদকের আহ্লাদী প্রশ্রয়ে। মার্জনাভিক্ষার দ্বিতীয় কারণ, এই নিবেদকের অযোগ্যতা। সম্পূর্ণত (পে)ডিগ্রিবিহীন হয়েও এমন স্পর্ধা প্রদর্শন একটু বাড়াবাড়িই হয়ত। সে জন্যই এই লেখাটিতে বারংবার নিবেদন শব্দটি ব্যবহার করেছি। বিনয় একটি বর্ম। বর্ম, ব্যবহারকারী জানেন, আয়ুধও বটে।

Words of Her Own: Women Authors in Nineteenth Century Bengal

Maroona Murmu

Oxford University Press

INR 1,183

Kindle edition INR 947

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.