অবশেষে হাতুড়ির বাড়িটা পড়ল। তথাগত মুখার্জি তাঁর ভটভটি দিয়ে বাংলার সিনেমার অচলায়তনে ভালই আঘাত করেছেন। তবে ভুল করবেন না, এ ছবি পথের পাঁচালী নয়। কারণ এই বাংলা রামমোহন রায়-সত্যজিৎ রায়ের বাংলা নয়। এই বাংলা রোদ্দুর রায়ের বাংলা। এখানে একটা ভটভটিই আমাদের উচ্ছ্বসিত করার জন্য যথেষ্ট।

এই উচ্ছ্বাসের কারণ কী? কারণ তথাগত ছবিটা যত্ন নিয়ে বানিয়েছেন। সিনেমার কিছু বিভাগে ভাল কাজ করতে শিল্প সেভাবে লাগে না, শুধু নৈপুণ্য দিয়েই উঁচু দরের কাজ করা যায়। সেটুকুও বাংলা ছবিতে এতই বিরল যে প্রতীপ মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরা আর গয়াধর নায়েক, অনিন্দিত রায়ের শব্দ নিয়ে কাজ চোখ বড় বড় করে দেয়। কালার গ্রেডিং দেখেও বাংলা সিনেমা দেখছি বলে ভাবতে কষ্ট হয়। কোভিড আসার অনেক আগে থেকেই, মানে গত ১০-১১ বছর ধরেই বাংলার সিনেমা নির্মাতারা বাধ্য প্রজার মত সিনেমায় রাজনীতি থেকে ছ ফুটের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছিলেন। তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পরিচালক অন্তত বিষয়ের দিক থেকে তাঁর ছবিতে একটা আপাত প্রগতিশীল বক্তব্য রাখার চেষ্টা করেছেন – এটাই কুর্নিশযোগ্য। মনে করার চেষ্টা করুন তো, শেষ কবে আপনি মূলধারার বাংলা ছবিতে সৌন্দর্যায়নের নামে বস্তি উচ্ছেদ কিংবা সশস্ত্র বিপ্লবের উল্লেখ পেয়েছেন?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ছবির আত্মা হল সারল্য আর আগলে রাখা বিশ্বাস। এ দুটো ঘিরেই অসংখ্য চরিত্রের আনাগোনা এবং অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্টের অবস্থা। মূল চরিত্রে ঋষভ বসুর অভিনয় মাঝেমধ্যে ভ্রূ কোঁচকাতে বাধ্য করলেও এরিয়েলের চরিত্রে বিবৃতি চ্যাটার্জি খুবই ভাল। কিন্তু পার্শ্বচরিত্রগুলো প্রাণ পায় না। অমিত সাহার মত অভিনেতাকে তেমন সময়ই দেওয়া হয়নি। রজতাভ দত্তের অসম্ভব কৌতূহলোদ্দীপক চরিত্রটাও তার প্রাপ্য সমাপ্তি খুঁজে পায় না। দীপঙ্কর দে আর মমতাশঙ্করের চরিত্রের কথা আর না-ই বা বললাম।

তবে এই ছবির আসল সমস্যা অন্যত্র। লেখক-পরিচালক একইসঙ্গে ফ্যান্টাসি ও রাজনীতির যে খেলা খেলতে চেয়েছেন, তা কখনোই পরিষ্কার হয় না। এই জঁরের ঠাকুর্দা প্যান’স ল্যাবিরিন্থ ছোট্টো ওফেলিয়ার কল্পনা ও ফ্র‍্যাঙ্কোর ফ্যাসিস্ট শাসনের এক অদ্ভুত সহাবস্থান দেখিয়েছিল আমাদের। এই ছবি সেদিক থেকে চরম ব্যর্থ। ভটভটির রাজনীতি অপরিণত, খাপছাড়া। পরিচালক অনেক কথা বললেও সেগুলো মিলে একটা জমাট বক্তব্য গড়ে ওঠে না। তাই ভটভটি বারংবার গঙ্গায় ঝাঁপ দিলেও গভীরতা অর্জন করতে পারে না। দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি আর সিজিআই চোখ ধাঁধালেও ছবির দর্শনের নিবিড়তার অভাবে তা হৃদয়ে নেমে আসতে পারে না।

তবে কি জানেন, ইংরেজিতে একটা কথা আছে – দ্য বার ইজ টু লো। অর্থাৎ মাপকাঠিটাই খুব নীচু। এপার বাংলার সিনেমার ঠিক সেই অবস্থা। তাই কেউ লেক রোড-যোধপুর পার্ক বৃত্তের বাইরে গিয়ে গঙ্গাপারের বস্তির গল্প বলতে পেরেছেন দেখেই ভালো লাগে। ইন্ডাস্ট্রির তোলাবাজির কার্টেল এবং একটা ফ্ল্যাট, দুটো ক্যামেরায় গ্যাঁজানো গোয়েন্দা গল্প বা প্যাতপেতে ফ্যামিলি ড্রামার টোপের হাতছানি এড়ানো খুব মুশকিল। সেটাও ভটভটি পরিচালক করতে পেরেছেন। তাই অনেকদিন পরে ২০-২১ বছরের ছেলেমেয়েরা বাংলা সিনেমা নিয়ে কথা বলছে। অর্থাৎ হাতুড়িটা ঠিক জায়গায় পড়েছে।

আরো পড়ুন ইব আলে উউ: চাকরির সন্ধানে কয়েকটি চরিত্র

তবে একটা হাতুড়িতে হবে না। যদি লুম্পেন রাজনীতির ব্ল্যাকহোল নতুন সম্ভাবনাগুলোকে গিলে না খায়, তাহলে এই হাতুড়ির পাশে আরও কয়েকটা ছেনি, কাস্তে আর হাতুড়ি যোগ হতে পারে। আশা করা যায় তখন আঘাতগুলো আরও পরিণত হবে। বাংলা সিনেমার মধ্যমেধার মনোলিথে চিড় ধরবে, প্রাচীর কাঁপবে, অচলায়তন ভাঙবে।

~ মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.