অবিন চক্রবর্তী

Indeed, what happened to culture may well be one of the more important clues for tracking the postmodern: an immense dilation of its sphere (the sphere of commodities), an immense and historically original acculturation of the Real, a quantum leap in what Benjamin still called the ‘aestheticization’ of reality (he thought it meant fascism, but we know it’s only fun: a prodigious exhilaration with the new order of things, a commodity rush, our ‘representations’ of things tending to arouse an enthusiasm and a mood swing not necessarily inspired by the things themselves).

Fredric Jameson, Postmodernism and The Cultural Logic of Late Capitalism, ix-x.

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অনির্বাণ ভট্টাচার্যের ব্যান্ডের কিছু রাজনৈতিক টিপ্পনী নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় রীতিমত ঝড় চলছে। রুদ্রনীল ঘোষ বাদে বাংলা রাজনীতির তিন ঘোষকে একই সরণিতে ফেলে ঘষে দেওয়ার ব্যাপারটায় জনতার বিস্তর আহ্লাদ হয়েছে। মানুষ হেসেছে, নেচেছে, শেয়ার করেছে। শিল্পী থেকে কর্মকর্তা – সবাই আহ্লাদিত। আমরা বাঙালিরা এমনিতেই হুজুগে। তার মধ্যে পুজোর মাসে এসব পেলে আহ্লাদটা একটু বেশিই হয়। সেই আহ্লাদের জোয়ারে বিশ্লেষণী ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু আমার মত যেসব হতভাগা এ রসে বঞ্চিত, তাদের মাথায় এক ধরনের খটকার পোকা কামড়ায়। সবটা লিখে না ফেললে ঠিক ভেতরের উৎপাতটা থামে না।

আসল সমস্যাটা কী? সমস্যাটা এখানেই যে বাজারি কাগজ যতই হুল ফোটানো গানের স্তুতি করুক, আসলে ও গানে কোনো হুলই নেই। কুণাল ঘোষ সারাদিন ধরে সোশাল মিডিয়ায় যে পরিমাণ গালিগালাজ খেয়ে থাকেন, কারাবাসের যে অভিজ্ঞতা ওঁর রয়েছে, তাতে ‘রেগে যাবে কুণাল ঘোষ’ জাতীয় নির্বিষ বাক্যে প্রতিবাদের সামান্য খোঁচা লাগাও মুশকিল। তাই আর পাঁচজনের মত তিনিও মজা পেয়েছেন। এসআইআরের ঝাড়াই বাছাই, প্রধানমন্ত্রীর পেনশন, হিন্দুরাষ্ট্র, অচ্ছে দিন ইত্যাদি শব্দকে পাশাপাশি রেখে সজোরে বাজনা বাজিয়ে যেমন খুশি নাচলে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কিছু যায় আসে না তো বটেই, বরং এগুলো তাদের গণতান্ত্রিকতার মুখোশকে উজ্জ্বল করতে সহায়তা করে। একই ভাবে দিলীপ ঘোষ বর্তমান বঙ্গীয় রাজনীতিতে এক অপসৃয়মান শক্তি। কয়েক বছর আগে বলা অযৌক্তিক বক্তব্য নিয়ে বিস্তর মশকরা আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। তাতে ওঁর বা সাধারণভাবে অন্ধভক্তদের নতুন করে কিছু এসে যায় না। শতরূপ ঘোষের গাড়ি কেনা নিয়ে পুরনো দিনের অনাড়ম্বর জীবন কাটানো বিরল কমিউনিস্টদের আপত্তি থাকতেই পারে, কিন্তু তার বাবা তাকে কত টাকার গাড়ি কিনে দিল বা দিল না – তার সঙ্গে জনতার স্বার্থ, উন্নয়ন, তাদের প্রতি ঘটা অন্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। যে কুণাল ঘোষ সে প্রশ্ন তুলেছিলেন, অনির্বাণের গানে তাঁর মজা পাওয়ার এটাও একটা কারণ।

একজন দেখলাম লিখেছেন যে সিপিএমের শ্রেণিচরিত্র পালটে যাওয়াকে এখানে কটাক্ষ করা হয়েছে। এখন কেউ যদি সিপিএম ভাবতে গিয়ে বন্যা টুডুকে ভুলে শুধু শতরূপের কথা ভাবেন, তা একান্তই তাঁর ব্যাপার। সিপিএম কেন শূন্য – এই প্রশ্নের সঙ্গে কুকুর বেড়ালের নাম ও লিঙ্গ নির্ধারণের বিষয়কে মিলিয়ে দিয়ে হয়ত অনির্বাণ বামপন্থীদের অসারতা বোঝাতে চেয়েছেন। হতেই পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যারা দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং শিক্ষা ইত্যাদি সংক্রান্ত প্রশ্ন তুলছে তাদের এহেন ব্যঙ্গ করার ইচ্ছে হতেই পারে। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক। কিন্তু এর মধ্যে সাহসী প্রতিবাদের কী আছে, সেটাই বোঝা গেল না। মেক্সিকোর শিল্পী সেজার ক্রুজ একদা বলেছিলেন, শিল্পের কাজ হল দুঃস্থ মানুষকে আরাম দেওয়া এবং সমৃদ্ধদের বিব্রত করা। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের গানে অনেকে মজা পেয়েছেন, কিন্তু কেউই বিব্রত হননি। তাঁর মত মৌনী তারকা প্রতিবাদের কক্ষপথে থাকবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। অরিজিৎ সিং বা শ্রেয়া ঘোষাল শৈল্পিক প্রতিবাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা শুভেন্দু মাইতির মত মহান শিল্পীদের কথা ছেড়েই দিলাম। আরও অনেকে তাঁদের মত করে প্রতিবাদে থেকেছেন। সেইসময় নীরব থাকা অনির্বাণ হঠাৎ সাহসী প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন – এটা ওঁর ফ্যানদের ধারণা হতে পারে, বাস্তব নয়।

আসলে উনি নিজেকে সেই সমাজসচেতন প্রতিবাদী শিল্পী ঘরানার মানুষ মনে করেন না। তাই অভয়ার প্রাতিষ্ঠানিক খুন ও ধর্ষণের পর বাড়িতে বসে লাভ ক্ষতির অঙ্ক কষছিলেন। বেশিরভাগ বিনোদন জগতের খ্যাতনামা শিল্পী সেটাই করেন। নতুন কিছু নয়। সমস্যাটা তাঁদের, যাঁরা ওঁকে সফদর হাশমি বা হাবিব তনভীরের সমগোত্রীয় ভেবে ফেলেছিলেন। উনি সেই ঘরানার বুদ্ধিজীবি নন, শুধুই বিনোদন শিল্পী। নিজেদের মতে নিজেদের গান এক ধরনের পরিকল্পিত সৃজন, যা বাঙালির প্রতিষ্ঠানবিরোধী সত্তাকে সফলভাবে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছিল – এইটুকুই। আমরা অনেকে সেই গান ও তার চিত্রায়ন থেকে নিজেদের মত রসদ জোগাড় করেছি, কিন্তু একজন নির্দিষ্ট শিল্পীর বিশ্বাসের দলিল তা ছিল না।

আরো পড়ুন অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

গোলমালটা আরও এক জায়গায়। তিন ঘোষের একীকরণের মাধ্যমে অচ্ছে দিনের তেষ্টা, মসজিদের তলায় কী আছে ইত্যাদি বলে অনির্বাণ দলীয় রাজনীতিকে বিঁধেছেন বলে খবরে প্রকাশ। কিন্তু সমালোচনা করতে হলেও তো একটা নৈতিক ভিত্তি লাগে। অনির্বাণের নীতি যেহেতু শুধুই ব্যক্তিস্বার্থ, তাই উনি সকলকেই বিঁধতে পারেন, কিন্তু ভুলটা কোথায় আর ঠিকটা কী, তা বলার দায় ওঁর নেই। এটা ঠিক যে সব কিছুতেই খিল্লি হয়। কিন্তু খিল্লি করলেই প্রতিবাদ হয় না। এর জন্য সাহস, শিরদাঁড়া ইত্যাদি লাগে না। লাগে শুধু সুড়সুড়ির গিমিক, যা উনি রাজনীতিবিদদের মতই দক্ষতার সঙ্গে রপ্ত করেছেন। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীনদের এক সারিতে ফেলে মজা করার মধ্যে রয়েছে একপ্রকার উত্তর-আধুনিক পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গির ভড়ং, যা আসলে গা বাঁচানোর নামান্তর। উত্তর-আধুনিকতা সব রাজনৈতিক মতাদর্শকেই মনে করে স্বতন্ত্র কিছু ভাষ্য, যারা সত্যকে ধারণ করার দাবি জানায়। কিন্তু সব ভাষ্যই আসলে সমানভাবে পক্ষপাতদুষ্ট এবং সেই কারণে সবই পরিহার্য।

এই দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যেমন মহাত্মা গান্ধী ও অ্যাডলফ হিটলারকে একাসনে বসাতে পারে, তেমনি অভয়ার বাবা-মা এবং সন্দীপ ঘোষের বক্তব্যকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য বা বর্জনীয় বলে দাবি করতে পারে। এইভাবে যদি সবটা গুলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে নির্বাচনে বা দৈনন্দিন জীবনে সুযোগ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সার্বিক হিতসাধনার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানবিক দায়টাকেও লুকিয়ে ফেলা যায়। ‘যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ’ জাতীয় দায় ঝেড়ে ফেলা নিরাসক্ত ভাবটাই তখন মোক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এই নির্লিপ্ততার রাজনীতির এক ঝলমলে উত্তেজক উপস্থাপনা হল হুলিগানইজমের ‘গান’, যা কিনা ফ্রেডরিক জেমসন কথিত ‘blank parody’ বা ফাঁপা তামাশার আসন গ্রহণ করে। অনেককাল আগে দান্তে লিখেছিলেন যে নরকের সবচেয়ে তপ্ত কোণগুলো তাদের জন্যই সংরক্ষিত থাকে, যারা নৈতিক সংকটের সময়ে নিরপেক্ষ থাকে। হুলিগানইজমের গানের বয়ান নরকের কোন জায়গার যোগ্য, সে আলোচনা ছেড়ে দিয়েও এটুকু বলা যায় যে এই খিল্লির মধ্যে আসলে আছে সেই ‘waning of affect’ বা আবেগের সংকোচন যা উত্তর-আধুনিক শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আবেগ থাকে না বলেই ব্যান্ডের গায়করা প্রকৃত প্রতিবাদের পরিবর্তে টম স্টপার্ডের নাটকের রস আর গিলের মত তারকাটা সংয়ের কারসাজি করেই ক্ষান্ত হয়েছেন। আধুনিক ধনতন্ত্র এই সংস্কৃতিই চায়। সৌভাগ্যের বিষয়, এই শস্তা ফুটেজ কেনার জন্য প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলাটা জনতার অনেকেই ধরে ফেলেছেন। সোশাল মিডিয়ায় ঠাট্টা, তামাশা, মিম ইত্যাদি কম হচ্ছে না। মহানায়কের ভাষায় ‘মাল ক্যাচ হয়ে গেছে।’ স্বাভাবিক। সব লোক কে কি আর সবসময় বোকা বানানো যায়?

কিন্তু যে উত্তর-আধুনিকতা এই ‘মজা’ করার ভাষ্য নির্মাণ করে, তার বিস্তৃতি আমাদের সারা সমাজ জুড়ে অন্য নানা পদ্ধতিতে ঘটে থাকে। যেমন ইনস্টাগ্রাম থেকে ফেসবুক – সর্বত্র কিছু মানুষ আন্তরিকভাবে বলে থাকে যে আমরা যেন ‘জাজ’ না করি, বাছবিচার না করি। এই বাছবিচার না করে কী করে যে বাঁচা যায় সেটাই বুঝি না। সবটা না জেনে মানুষের সম্পর্কে খারাপ ভাবব না অবশ্যই। নিজেকে অন্যের থেকে উৎকৃষ্ট মনে করে কাউকে অসম্মানও করব না। আমার সাথে দ্বিমত হচ্ছে মানেই অপরজন ভুল, সেটা না-ই হতে পারে।।একই পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। কিন্তু মানুষকে নৈতিক অপরাধে যুক্ত থাকতে দেখে যদি ভাবি অপরাধ করাটাও সঙ্গত, তাহলে আমি হয় নির্বোধ, নয় কাপুরুষ, নয় সুবিধাবাদী। প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি গা বাঁচাতে চুপ করে থাকি, তাহলে মেনে নিতে হবে আমি ভীতু, অসহায়। মেনে নিতে হবে রবীন্দ্রনাথের তৃণসম দহনের অভিশাপ আমার উপরেও প্রযোজ্য। এই বিচারের বোধ তৈরি করতে না পারলে বোধের জগতে একটা নৈরাজ্য তৈরি হবে, যা অপরাধ ও সারল্যের ফারাকটাই মিটিয়ে দেবে। এই তফাতের বোধ না থাকলে সভ্যতা, আইন, শালীনতা কোন কিছুই থাকে না। আমরা অনেকাংশে এইসব ভুলেছি বলেই মমতাশঙ্করের মধু চাখা থেকে মাংকো ভাত – সবই ভাইরাল হয়। সেই একই প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদ ও খিল্লির ফারাক মুছে গিয়ে অনির্বাণের গানে প্রতিবাদের হুল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই জ্ঞানদীপ্তির সময় থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত স্বাধীন, যৌক্তিক বিচারের ক্ষমতাকে পারতপক্ষে বর্জন করার অপরাধটা না করে নিজের বিচারবুদ্ধিকে অনবরত শানিয়ে নিন। মগজাস্ত্রের বারুদ প্রস্তুত রাখুন। হুল আর হুল্লোড়ের ফারাক আপনি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.