মাত্র কয়েক দিন আগের কথা। গলফগ্রিনের গাছে ছাওয়া সাততলা অফিসে পৌঁছে গিয়েছি বেলাবেলি। টিভির অফিসে ঘরে ঘরে টিভি চলাই নিয়ম। সেদিন যখন ঢুকেছি, তখন জলপাইগুড়ি কেন্দ্র থেকে সকালে সম্প্রচারিত সকাল সকাল অনুষ্ঠানের পুনঃসম্প্রচার চলছে। অনেকটা গান, অল্প আড্ডা আর কিছু অনুরোধে সাজানো এই আসরটি দূরদর্শনের পরিচিত এবং বেশ জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। জলপাইগুড়ি কেন্দ্রের এই অনুষ্ঠানটির সরাসরি সম্প্রচার হয়। আটপৌরে আবেশে আটপৌরে শিল্পী গাইছেন লালন সাঁই, ভবা পাগলার লোকসঙ্গীত, একসময় ধরলেন শাহ আব্দুল করিম – ‘গাঁওয়ের নওজওয়ান, হিন্দু-মুসলমান/মিলিয়া বাউল গান আর মুরশিদি গাইতাম।’ এতক্ষণ অনুষ্ঠানের নিয়ম মেনে গান আর কথার ফাঁকে ফাঁকে ফেসবুকের লাইভ থেকে মন্তব্য পড়ছিলেন, কখনও দর্শকের ফোন এলে কথা বলছিলেন হাসিমুখ সঞ্চালিকা। কিন্তু এ গান শেষ হতে না হতেই অবদমিত আবেগের বহিঃপ্রকাশের মত মনের ভাব উজাড় হল তাঁর। গানের রেশ ধরে তিনি সরাসরি চিহ্নিত করলেন ভারতের বর্তমান সাম্প্রদায়িকতাকে, তার সাম্রাজ্যবাদী উৎসকে, প্রশ্ন তুললেন – এই বহুত্বের দেশে কেন এত হানাহানি?

এখন, মোদ্দা বিষয় হচ্ছে, ব্যাপারটা তেমন অজানা কিছু নয় বা অনালোচিতও নয়। একসময়, যখন পশ্চিমবঙ্গে ভালরকমই পড়াশোনা হত, ও বিষয়ে ঢের ঢের বাংলা রচনা কিংবা ইতিহাসের দশ নম্বরি প্রশ্নের পাতা জোড়া উত্তর লিখে আমরা সকলেই আঙুল ফুলিয়েছি। বেশি ‘মার্ক্স’-এর আশায় উত্তরের শেষে ‘ভারততীর্থ’ কবিতার লাইনও জুড়ে দিয়েছি এঁচড়ে পাকা কেউ কেউ। তা কয়েক প্রজন্ম ধরে মোটামুটি একই উত্তর লিখে উতরে যাওয়ার পরও সরকারি চ্যানেলে এই পুরনো, স্বাভাবিক বিষয়খানার উত্থাপন দেখে তাৎক্ষণিক প্রশান্তি হচ্ছে যখন, তখনই বুঝতে হবে – গত এক দশকে কী ঘোরতর সংকটে পড়েছে দেশের জনমানস।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একথা সত্যি, ইউরোপিয় ঔপনিবেশিকতার কলকাঠিতে আধুনিক ভারত রাষ্ট্রের সামাজিক স্তরে সাম্প্রদায়িকতা কখনোই সমূলে উৎপাটিত হয়নি। মনে মনে ভেদাভেদের লালনপালন তো আবহমান। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত – বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, তাতে ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে কমবেশি। পুলিশি ধরপাকড় চলেছে, পরে আবার সব শান্ত হয়ে এসেছে। বিশিষ্ট গান্ধীবাদী চিন্তক শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাঙ্গার ইতিহাস এ সম্পর্কে একখানা প্রামাণ্য বই। কিন্তু গত এক দশক ধরে যা চোখে পড়ছে, দাঙ্গাকে হাতিয়ার করে ক্ষমতা দখল বা সরকারে থেকে দাঙ্গায় সরাসরি মদত দেওয়া – এ বস্তু সেই ব্রিটিশ আমলের পর ঘটেছে বলে মনে হয় না।

অবশ্য সাম্প্রদায়িকতাই শুধু নয়, এ যাবৎ এই বিপুল, সার্বিক কুকর্মযজ্ঞে ক্ষমতাসীন দলের হয়ে বেআব্রু প্রচারের কাজটা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে দেশের একগুচ্ছ হৃষ্টপুষ্ট সংবাদমাধ্যম এবং বেসরকারি চ্যানেলের নিকৃষ্ট মানের, সুচারু হিন্দুত্ববাদ প্রচারের মেগা ধারাবাহিক। আপাতত, যেহেতু সদ্য কলকাতা দূরদর্শন ৫০ পেরোল, সেহেতু বাকি ভারতের দিকে না তাকিয়ে বরং বাংলার সংবাদমাধ্যম আর টেলিভিশনকে পরিস্থিতির নিরিখে বিচার করা ভাল। বাংলার সে চিত্রও যে আশাব্যঞ্জক তা একেবারেই নয়, বরং ‘বাংলার বুকে ভেদ-রাজনীতি চলবে না’ বলে কদিন আগেও যেসব প্রগতিশীলরা বুক ফোলাতেন, তাঁদেরও ইদানীং সুর বদলাতে শোনা যাচ্ছে।

সংবাদের দিকটাই যদি আগে ধরি। মাত্র কয়েক মাস আগে সেই কোন পহলগামে একদল মুসলমান জঙ্গি এসে এক ধার সে লোক মেরে উধাও হল, আর হাজার আড়াই কিলোমিটার দূরের কলকাতায় বাঙালি ‘সাংবাদিক’ তাঁর সার্কাস, থুড়ি চ্যানেলের, স্টুডিওতে বসে বাংলার যত ‘সেকুলার’ আছেন, তাঁদের প্রথমে বাংলা ছাড়ার, তারপর দেশ ছাড়ার নিদেন দিয়ে দিলেন। দক্ষিণপন্থী শক্তির ঘোর চক্ষুশূল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ঘটনা ঘটলে তো চমৎকার জোট রাজনীতি শুরু হয়। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতাকে চ্যানেলের স্টুডিওতে নিয়ে এসে উগ্রচণ্ডা সঞ্চালিকা দক্ষিণ গোলার্ধের ‘চিৎকারী ষাটী’ হাওয়ার মত চিৎকার করতে থাকেন।

এসব দেখে একটা কথা স্পষ্ট – হে দূরদর্শন, তোমার শালীনতার দিন গিয়াছে।

আর বিনোদন? তার কথা আরও কম বলাই ভাল। এই শতাব্দীর শুরুতে তবু একাধিক বেসরকারি চ্যানেলের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণেই কিছু নতুন ভাবনার আমদানি হয়েছিল। পাড়াকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান, ভ্রমণকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান, ইনডোর-আউটডোর ক্যুইজ শো, মনোজ্ঞ সাক্ষাৎকার। পুরস্কার মূল্যও থাকত নামমাত্র। ধারাবাহিক বা টেলিফিল্মের নির্মাণ হোক বা গল্প, ইতিবাচকতার ছাপ থাকত সর্বত্র। এখন সেখানে একাধিক বেসরকারি চ্যানেলের প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে গিয়ে সাকুল্যে চ্যানেল রয়েছে দুটো কি তিনটে। বাকিগুলো টিমটিমে, আর বিনোদনের প্রায় পুরোটাই বন্দি হয়েছে রবার-লম্বা ধারাবাহিকের অসহ্য ‘ধুম-তা-না-না’-য়।

আটের দশকের মাঝামাঝি বামপন্থী নাট্য-দম্পতি জোছন দস্তিদার ও চন্দ্রা দস্তিদারের প্রযোজনা সংস্থা সোনেক্স-নির্মিত তেরো পার্বণ-এর দৌলতে মধ্যবিত্ত পেয়েছিল তার ড্রয়িংরুম হিরোকে। ফেলুদা হয়ে ওঠার অনেক আগেই গোরা হয়ে রাতারাতি জনপ্রিয়তা পেয়ে গিয়েছিলেন কখনো অভিনেতা না-হতে চাওয়া সব্যসাচী চক্রবর্তী (পরে দিল্লি দূরদর্শন গোরা নামেই সেই ধারাবাহিকের হিন্দিতেও সম্প্রচার করেছিল)।

তারও কয়েক বছর পরে আরেক প্রস্থ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বিয়ে-পাগলা, তোতলা তবলাবাদক গণশা আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের হাস্যকরা কিসসা – বিবাহ অভিযান

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের রচনা অবলম্বনে নির্মিত এই ধারাবাহিক পরিচালনা করেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব দেবকীকুমার বসুর ছেলে দেবকুমার বসু, ক্যামেরার কাজ করেছিলেন কানাই দে। বিলেত-ফেরত, ধোপদুরস্ত, লম্বা চেহারার গোরা আর পরিবর্তনশীল কলকাতা, ক্ষীয়মাণ যুবসমাজের পাশেই মানুষের মনে দিব্যি জায়গা করে নিয়েছিল সাদা ধুতি পাঞ্জাবির ছয় গেঁয়ো বন্ধুর বিচিত্র সব কাণ্ডকারখানা।

এই দুই জনপ্রিয় ধারাবাহিক বাদ দিয়েও আরও মনে রাখার মত নানা কাজ হয়েছে – সুবর্ণলতা, অভিনন্দন ভগীরথ, কালপুরুষ, উড়নচণ্ডী, সেই সময়, পূর্ব পশ্চিম, হুতোমের নকশা ইত্যাদি।

তা গত ১০-১৫ বছরে বাংলা সিরিয়ালের যা হাল, তাতে নয়ের দশকের সেসব স্মৃতিমেদুর দর্শকদের (যাঁদের মধ্যে অধিকাংশেরই চুল পেকে গিয়েছে) দুঃখ না পেয়ে বরং খুশি হওয়ারই কথা। কারণ পরিবর্ধিত বিবাহ অভিযান চলছে তো চলছেই। মানে নায়কের একাধিক বিয়ে না দেখাতে পারলে ধারাবাহিকের টিআরপি পড়ে যাওয়ার হেব্বি সম্ভাবনা। পারিবারিক কূটকচালি ছাড়া এসব ধারাবাহিকে আর কোনো সমস্যার কথা জানা যায় না, দেখাও যায় না। বরং মাঝেমধ্যে বাস্তবকে ছাপিয়ে ঠাকুর-দেবতারা উড়ে এসে জুড়ে বসে সমস্যার সমাধান করে দিয়ে যান। রূপসজ্জা আর সেটের অবাস্তব জগাখিচুড়ি তো আছেই।

দৈনন্দিনতার বাকি বিষয় আশয়ের মত টেলিভিশনের ঢালাও বেসরকারিকরণও ঘটে ওই নয়ের দশকেই। তারপর থেকে নিয়ম মেনেই ক্রমাবনতি। তার আগের অন্তত দু-আড়াই দশক, বলতে গেলে কলকাতা দূরদর্শনের সত্যিকার সোনার সময়। এক্ষেত্রে ১৯৮০-পরবর্তী বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সার্বিক দৈন্য হয়ত কিছুটা অনুঘটকের কাজ করেছিল। নাচ, গান, নাটক, সাহিত্য, বিজ্ঞান – এমন নানা ক্ষেত্রের বিদগ্ধ মানুষজন তখন কোনো না কোনোভাবে জায়গা পাচ্ছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়। রাধা স্টুডিওর ওই ছোট্ট একখানা ফ্লোরেই কত না অনুষ্ঠান হয়েছে তখন। উদয়শঙ্কর তখন জীবন সায়াহ্নে, তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শম্ভু মিত্র। সত্যজিৎ রায়ের লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তীর সঙ্গে কথোপকথনে শৈল চক্রবর্তী। কলকাতা মেট্রোয় বসেছে পয়লা বৈশাখ ভোরে নববর্ষের বৈঠক তেনজিং নোরগেকে নিয়ে তথ্যচিত্র হয়েছে, ওড়িশার সিমলিপালের ফরেস্ট রেঞ্জার সরোজ রাজ চৌধুরীর পোষা বাঘ খৈরীকে নিয়েও তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছিল কলকাতা দূরদর্শনে। প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতি, সার্বিক সংরক্ষণ মানসিকতার অভাবের খেসারত দিতে গিয়ে বহু অনুষ্ঠান হারিয়েও গিয়েছে। কিন্তু এখনো যা আছে, তা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত। সোশাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত পুরনো সেসব অনুষ্ঠানের পুনঃসম্প্রচারের অনুরোধ, আব্দার তো আর এমনি আসে না।

১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা চলাকালীন দেশের দুই মেট্রোপলিটন শহরে নতুন দূরদর্শন কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। কলকাতায় ৯ আগস্ট, মাদ্রাজে তার ছদিন পরে। ভিএইচএফ (ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি) ব্যান্ডে কলকাতা কেন্দ্রের অবস্থান হয় চ্যানেল ৪ – পরিচিত ঘোষিকাদের গলায় ‘ব্যান্ড ১, চ্যানেল ৪’ ঘোষণা সেসময়ের দর্শকদের অনেকেরই নিশ্চয় মনে আছে। টালিগঞ্জের রাধা স্টুডিওর একখানা ফ্লোরকে উপযোগী করে পথচলা শুরু হল কলকাতা কেন্দ্রের, শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত (পরবর্তীকালে কলকাতা কেন্দ্রের বিশিষ্ট প্রযোজক) হাতজোড় করে, স্মিতহাস্যে বললেন ‘নমস্কার, কলকাতা টেলিভিশনের শুভ উদ্বোধনের মুহূর্তে আমাদের সাদর সম্ভাষণ গ্রহণ করুন।’ যদিও জেনে রাখা ভাল, কলকাতার বুকে টেলিভিশন সম্প্রচার কিন্তু ওদিনই প্রথম নয়। ১৯৭৪ সালের শেষদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল এসেছিল উপমহাদেশ সফরে, ভারতে পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলতে। বছর শেষের তৃতীয় টেস্ট ম্যাচটি খেলা হয়েছিল ইডেন উদ্যানে। গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের ব্যাটিং নৈপুণ্য (৫২ ও ১৩৯) আর মদনলাল-বিষেণ সিং বেদির বোলিংয়ের জোরে নবাব পতৌদির ভারত ক্লাইভ লয়েডের দলকে সেই ম্যাচে ৮৫ রানে হারায়, আকাশবাণী ভবনের ছাদে অ্যান্টেনা বসিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে সেই ম্যাচের সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচারের ব্যবস্থা হয়েছিল। দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতার ডিডি বাংলা নামকরণ হয় ১৯৯২ সালের ২০ আগস্ট, পশ্চিমবঙ্গের আরও দুই সম্প্রচার কেন্দ্র খোলা হয় কিছুটা পরে। শান্তিনিকেতন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬, জলপাইগুড়ি কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮। এরই মাঝে চালু হয়েছে প্রসার ভারতী।

১৯৯৮ সালটা লক্ষণীয়, কারণ বেসরকারিকরণের আবহে ওই বছরেই উপরমহলের সিদ্ধান্তে একাধিক স্লট পায় একটি প্রযোজক সংস্থা। তাদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত খাস খবর-এর নব্য প্রজন্ম এসে বদল ঘটায় সংবাদ পরিবেশনে। তা সেই স্বাদ বদলের ধারায় দূরদর্শনের সংবাদ পাঠের ‘সুইট’ স্টাইলের যে আর তেমন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না (পড়ুন, পুঁজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে), সেকথা দিব্যি বুঝছিলেন মিডিয়ার মাথারা। নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া, ১৯৯৯ সালের কান্দাহার বিমান ছিনতাই নিয়ে অনুভব সিনহার আইসি ৮১৪ ওয়েব সিরিজটি দেখে নেওয়া যেতে পারে। সেখানে ইন্ডিয়া হেডলাইন্সের মুখ্য সম্পাদক শালিনী চন্দ্রের (দিয়া মির্জা) একখানা ব্যঙ্গোক্তিতেই সে বদল স্পষ্ট।

চব্বিশ ঘন্টার সংবাদ চ্যানেল চলে আসার পর থেকে সে ধারা বদলাতে বদলাতে আজকে কোথায় এসে নেমেছে, তার পুনরুক্তির আর প্রয়োজন নেই। গত এক দশকে রাষ্ট্রযন্ত্রের আগ্রাসন যেভাবে বেড়েছে, তাতে দূরদর্শনের চরিত্রেও বদল এসেছে। কেবল সরকারি নীতির প্রচারই নয়, সময়বিশেষে ক্ষমতাসীন দলের প্রচারও করতে হয়। তবে ‘গণপ্রচার মাধ্যম’, এই পরিচয়-নির্দিষ্টতার কারণেই এখনো তার কিছুটা দায় আছে মানুষের প্রতি। সে ‘মানুষ’ এক নয়, বরং বিচিত্র।

কথাটা সহজ করে বলাই ভাল। এই মুহূর্তে কলকাতা দূরদর্শনে যে ঘরানার কাজ হয়, তার মান প্রথম দু-আড়াই দশকের মত নয় ঠিকই, তবে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতায় বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠানের যে প্রমিত পরিকাঠামো গড়ে তোলা গিয়েছে, সেই পরিকাঠামো অনুযায়ীই কাজ করার দায় আছে এখানকার প্রযোজকদের। ফলে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ মেনেও সুস্থ বিনোদন পরিবেশনের সুযোগ এখনো পুরোপুরি ফুরোয়নি। পারা যাবে কিনা তা নির্ভর করছে, যিনি কাজ করছেন, তাঁর অবস্থানের উপর।

কৃষিদর্শন যেমন দূরদর্শনের সবচেয়ে পুরনো অনুষ্ঠানগুলোর একটা। ভারতের কৃষি-পরিবেশ নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ এমন একখানা অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল কলকাতা কেন্দ্রেরও সাড়ে আট বছর আগে। এখনো সমস্ত আঞ্চলিক কেন্দ্রে ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সম্প্রচার হয়। বছর কয়েক আগে ক্ষেতখামারে বাজিমাত নামে একখানি ক্যুইজ শো শুরু হয়েছিল কলকাতা কেন্দ্রে, সেখানে অংশ নিতে আসতেন বাংলার নানা কৃষক পরিবার। হ্যাঁ, কর্পোরেট আগ্রাসনে ভারতের কৃষকদের পরিস্থিতি কোনদিকে চলেছে আর তাতে কতখানি ভূমিকা আছে রাষ্ট্রের, তা অজানা নয়। তবু সরকারি চ্যানেলে কৃষকদের নিয়ে রিয়্যালিটি শোয়ের ভাবনায় যে অভিনবত্ব আছে তা মানতেই হবে।

আরো পড়ুন বিজ্ঞান দিবসে টিভির পর্দায় বিজ্ঞানের শ্রাদ্ধবাসর রচনা

বিজ্ঞান সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও যেমন। এক সময়ে কোয়েস্ট-এর মত হাতে কলমে বিজ্ঞান শেখার অনুষ্ঠান হত কলকাতা কেন্দ্র থেকে, সঞ্চালনা করতেন বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার কাজের দুই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব – সমর বাগচী ও পার্থ ঘোষ। যদিও ইংরিজি ভাষায় সাজানো অনুষ্ঠানটির সম্প্রচার হত ডিডি ন্যাশনালে। নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গণেশের দুধপানের গণহিস্টিরিয়া আটকাতে বাংলার সক্রিয় বিজ্ঞান কর্মীদের সঙ্গে কলকাতা দূরদর্শন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। এখন সে বিজ্ঞানও নেই, বিজ্ঞান কর্মীরাও নেই। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের কলরব উঠলে বেসরকারি চ্যানেলে এসে ভিড় জমান ভীষণদর্শন জ্যোতিষীরা। কেবল ‘ম্যাড়মেড়ে’ দূরদর্শনে আগমন ঘটে দু-চারজন পদার্থবিদের। গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সরোজ ঘোষ আর পদার্থবিদ জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকর প্রয়াত হলে তাঁদের স্মরণে সাজানো হয় বিজ্ঞান প্রসঙ্গে অনুষ্ঠান।

চিকিৎসা সংক্রান্ত আলোচনার জন্য আছে সুস্বাস্থ্য, আইনের জটিল মারপ্যাঁচ বোঝাতে আইনজীবীরা আসেন আইনি কথা-য়। রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের প্ল্যাটফর্ম হিসাবে আছে যুক্তি তক্কো, সাঁওতালি ভাষার জন্য সানতাড়ি আখড়া। গত এক-দুবছরে দুটি পুরনো অনুষ্ঠান নতুন করে সাজানো হয়েছে। একটি তরুণদের নিয়ে অনুষ্ঠান ইউথ আড্ডা, অন্যটি প্রবীণ ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র ধাঁচের অনুষ্ঠান আমার সময়। আলোর পথযাত্রী-র মত সদ্য চালু হওয়া সিরিজও ইদানীং প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। সময়বিশেষে বিবিধ বিষয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের ফরমাশ আসে। সব মিলিয়ে আয়োজন তেমন ‘স্মার্ট’ নয় ঠিকই, তবে অপ্রয়োজনীয়ও নয়।

দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ বন্ধ, বেসরকারি চ্যানেলের সঙ্গে অসাড় প্রতিযোগিতা, সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের হাঁ-মুখে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছে জনপরিষেবার নানা প্রতিষ্ঠান। ওদিকে এক ভাষার পরিকল্পিত আধিপত্যবাদে প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষার সম্প্রচারের ধারণাও। সেই নিরিখে পরিকাঠামো বাঁচিয়ে কাজ করার চেষ্টা এই মুহূর্তে কলকাতা দূরদর্শনের কাছে এক অর্থে অস্তিত্বের সংগ্রামও বটে।

সরকারের মুখপাত্র হয়ে কাজ করাই তার প্রধান লক্ষ্য, ভারতের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে সে পরিচয়ের সমস্যাও যথেষ্ট। জরুরি অবস্থার সময়ে কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়ে কীভাবে ওই স্বৈরাচারের সপক্ষে বলানোর চেষ্টা হয়েছিল, সে ব্যাপারে প্রাক্তন কর্মীরা কদাচিৎ মুখ খুলেছেন। রামায়ণ-মহাভারতের সম্প্রচার কীভাবে হিন্দুত্ববাদী শক্তির পালে হাওয়া দিয়েছিল, তাও এখন চর্চিত। তারপরেও, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র-পরিকাঠামো এবং জনপরিষেবার দায়বদ্ধতায় সরকারি টেলিভিশনের বেঁচে থাকা প্রয়োজন। ওটুকু পরিকাঠামো না থাকলে বৃহৎ বেসরকারি পুঁজি, যা আদতে বহুত্ববাদের ঘোরতর বিরোধী, তার উপর যথাসম্ভব লাগাম টানার পরিসরটিও ভবিষ্যতে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.