জিতাংশু নাথ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল জি বাংলায় আরম্ভ হয়েছে নতুন ধারাবাহিক গৌরী এলো। প্রোমো এবং প্রথম দিনের শো থেকেই পরিষ্কার, ধারাবাহিকর নামচরিত্র গৌরী আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মেয়ে হলেও প্রকৃতপক্ষে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন। যদিও তার ক্ষমতা সম্পর্কে সে নিজে সচেতন নয়। কাকতালীয়ভাবেই হয়ত, ধারাবাহিক শুরু হওয়ার দিনটিই ছিল জাতীয় বিজ্ঞান দিবস। অর্থাৎ যে দিনে ভারতবর্ষের মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠার শপথ নেন, সেই দিনটিতেই মানুষের মনে অবিজ্ঞান ও অন্ধবিশ্বাসের বীজ বপনের আরও একটি প্রক্রিয়া শুরু হল।

ধারাবাহিকের প্রোমো বা প্রথম পর্বে নায়িকাকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারিণী বলে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। কিন্তু প্রদর্শিত ঘটনাক্রম থেকে সেই ইঙ্গিতই মিলছে। প্রোমোয় দেখা যায়, এক ধনী পরিবারে কালীপুজো হচ্ছে, প্রতিমার মুখ ঘোমটায় ঢাকা। এক চরিত্রের কথায় “মহাদেব আর কালীঠাকুরের যেদিন মিলন হবে, সেদিন ওই ঘোমটা সরবে”। এরপরেই নায়ক ও নায়িকার দেখা, আর তারপরেই প্রতিমার মাথা থেকে ঘোমটা সরে যাবে। এখানে মেয়েটির অলৌকিক ক্ষমতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। ধারাবাহিকের প্রথম পর্বেও এমনই একটি ঘটনা দেখা যায়। নায়িকাকে তার পালক বাবা গ্রামের কালীপুজোর দিন ঘরে দরজা বন্ধ করে রেখেছেন, তাই মন্দিরের দরজাও নাকি খুলছে না। অবশেষে মেয়েটির বাবা তাকে বাইরে বেরোতে অনুমতি দেবেন, সে পুকুর থেকে জল তুলে আনবে এবং মন্দিরের দরজাও খুলে যাবে। এমন ক্ষমতাকে অলৌকিক ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ কি সত্যিই থাকতে পারে? আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বহু মানুষ নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তাঁদের কেউই আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানের কাছে নিজের ক্ষমতার প্রশ্নাতীত প্রমাণ রাখতে পারেননি। এমন একজন অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারও নেই, যার দাবি নিঃসংশয়ে প্রমাণিত। অনেকেই প্রতারক বলে প্রমাণিত হয়েছেন, অনেকে আবার যুক্তিবাদীদের কাছে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ নিয়েও পরীক্ষার সময়ে অনুপস্থিত থেকে গা বাঁচিয়েছেন। আমেরিকায় জেমস র‍্যান্ডি ও হ্যারি হুডিনি, শ্রীলঙ্কায় ডঃ এ টি কোভুর, ভারতে প্রবীর ঘোষ প্রমুখ ব্যক্তি বারবার এমন বহু অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারের ভণ্ডামি প্রমাণ করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে উৎসাহী পাঠকরা প্রবীর ঘোষের অলৌকিক নয় লৌকিক (পাঁচ খণ্ড) এবং ভবানীপ্রসাদ সাহুর ভূত, ভগবান, শয়তান বনাম ডঃ কোভুর বই দুটি পড়ে দেখতে পারেন, অনেক তথ্যের সন্ধান পাবেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে অলৌকিকের অস্তিত্ব আজ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি, তাকে কেন টিভি ধারাবাহিকের মত একটি জনপ্রিয় মাধ্যমে তুলে ধরা হবে? বাংলা ধারাবাহিকের দর্শকসংখ্যা অনেক। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে কেন অবৈজ্ঞানিক ধারণা গিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে? ভারতীয় সংবিধানের ৫১এ (এইচ) অনুচ্ছেদ অনুসারে ভারতীয় নাগরিকের অন্যতম মৌলিক কর্তব্য হল: “To develop the scientific temper, humanism and the spirit of inquiry and reform.” অর্থাৎ বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবতাবাদ এবং অনুসন্ধান ও সংস্কারের মানসিকতা তৈরি করা। অথচ টিভির পর্দায় যা হচ্ছে তা ঠিক এর বিপরীত।

অনেক টিভি ধারাবাহিক নিয়েই এরকম প্রশ্ন তোলা যায়, কেউ কেউ তোলেনও। কিন্তু সেসব ধারাবাহিকের নির্মাতা বা চ্যানেল কর্তৃপক্ষ সেসবে কর্ণপাত করেন না। কারণ টিআরপি “পরমং তপঃ”। তাঁরা জানেন, অলৌকিকতা, অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা, দেবদেবীর কৃপা — এইসব ধর্মীয় সুড়সুড়ি দর্শক ‘খায়’ ভাল। তাই চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দেওয়ার পরেও সিঁথির সিঁদুরের জোরে আর ঠাকুরের আশীর্বাদে প্রায় মৃত (এমনকি কয়েকটি ধারাবাহিকে একেবারেই মৃত) মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে তাঁদের দ্বিধা নেই। আর সেই ধারাবাহিক যদি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, বামাক্ষ্যাপা অথবা বাবা লোকনাথের জীবন কেন্দ্রিক হয়, তবে তো আর কথাই নেই। বিজ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অলৌকিক ঘটনা দেখাবার পাসপোর্ট মিলে যায় অনায়াসেই। জানা কথাই যে এর প্রতিবাদ করলে ঘরে বাইরে “ঠাকুরকে অপমান” করার জন্য টেকা দায় হয়ে উঠবে।

আবার ফিরে আসি গৌরী এলো ধারাবাহিকের প্রোমোতে। সেখানে ধারাবাহিকের নায়ককে “পুজো-আচ্চা, অন্ধবিশ্বাস” না মানা একটি চরিত্র হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই মত বদলের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। এর আগে অনেক ধারাবাহিকেই ঠিক একই ব্যাপার দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ সেখানেও ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নায়ক, পরমভক্ত নায়িকার সংস্পর্শে এসে বিশ্বাসীতে পরিণত হয়েছে। এইসব ধারাবাহিকে নায়কের চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। এইসব নায়কেরা সাধারণত বহুগুণে গুণান্বিত, কিন্তু চরিত্রের একটি প্রধান ‘দোষ’ ঈশ্বরে অবিশ্বাস। সাধারণত এই দোষের জন্য তারা দু-একবার অধঃপতিত হয়, তারপর নায়িকার প্রভাবে বিশ্বাসী হয়ে শেষমেশ তার উত্তরণ হয়। অর্থাৎ নাস্তিকতা একটি চারিত্রিক দোষ। সুতরাং ভগৎ সিং, মেঘনাদ সাহা, স্টিফেন হকিংয়ের মত বহু চিরস্মরণীয় ব্যক্তিই এই দোষে দুষ্ট।

বিশিষ্ট, শ্রদ্ধেয় নাস্তিকদের বিরাট তালিকা তৈরি করা যায়, কিন্তু তার প্রয়োজন নেই। আসল কথা হল, ঈশ্বরে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের উপর একজন মানুষ ভাল না মন্দ তা নির্ভর করে না। বিজ্ঞান ও যুক্তিবোধ অন্তত তাই বলে। কিন্তু এইসব ধারাবাহিকে ঈশ্বরে অবিশ্বাসকে চারিত্রিক দোষ হিসাবে, এমনকি কখনো কখনো অপরাধ হিসাবেও হাজির করা হয়। ভারতীয় সংবিধানের সর্বোচ্চ ব্যাখ্যাতা সুপ্রিম কোর্ট ২০০০ সালে বিখ্যাত ‘লিলি থমাস বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলার রায় দানের সময়ে মন্তব্য করেন, নাস্তিকতার প্রচার করলেই ধর্মপালনের অধিকারকে খর্ব করা হয় না এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সংবিধান নাস্তিকদের অধিকার রক্ষা করে।

এখানে বলা প্রয়োজন, বাংলা ধারাবাহিকে যে কোনোদিনই কুসংস্কারবিরোধী কোনো কাজ হয়নি, তা নয়। কয়েক বছর আগে স্টার জলসার অলৌকিক নয়, লৌকিক বলে একটি ধারাবাহিক ছিল এক ব্যাতিক্রমী প্রচেষ্টার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেটি অল্পদিনেই বন্ধ হয়ে যায়। এমন কাজের সংখ্যা হাতে গোনা।

অলৌকিকতার ধারণা অচল, অনড়। একবার যা বিশ্বাস করানো হয়েছে, তা-ই চিরসত্য। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ধারণা অনবরত বদলায়। টিভির পর্দায় নানারকম অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আজকাল বিজ্ঞানমনস্কতার মূলেই কুঠারাঘাত করা হচ্ছে। এর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ প্রয়োজন।

লেখক উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান শাখার ছাত্র, মতামত ব্যক্তিগত

আরও পড়ুন

নবীন প্রজন্মের পাকিস্তানিদের বাংলার প্রতি কোনও দ্বেষ নেই, বলছেন ভাইরাল হওয়া পাক সিরিয়ালের পরিচালক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.