বাংলা ভাষার সাথে পাকিস্তানের যথেষ্ট সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়নি, আক্ষেপ মহরীন জব্বারের

কয়েকদিন ধরে সোশাল মিডিয়ার বাঙালিরা দুটো ক্লিপ নিয়ে আপ্লুত। সেখানে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের এক টিভি সিরিয়ালের দৃশ্যে নায়িকা (য়ুমনা জ্যায়দি) রবীন্দ্রনাথের ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ গানটা গাইছেন। ডিপ ফেকের যুগে কোনকিছুতেই চট করে বিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু প্রথম ক্লিপ প্রকাশ্যে আসার কিছু পরেই সংশয় দূর হল। দেখা গেল দিল কেয়া করে নামের ওই সিরিয়ালের পরিচালক নিজেই ইনস্টাগ্রামে ওই গানের অন্য একটা অংশ পোস্ট করেছিলেন। পাকিস্তান এমন একটা দেশ, যে দেশের সরকার বাংলাভাষীদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তা থেকে এক বিরাট আন্দোলনের জন্ম হয়, যার পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, সেই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। স্বভাবতই তাঁর লেখা গান আজকের পাকিস্তানের টিভি সিরিয়ালে গাওয়া হয়েছে দেখে দুই বাংলার মানুষ আপ্লুত। পশ্চিমবঙ্গের খবরের কাগজে, ওয়েবসাইটে রীতিমত খবর। যদিও এই সিরিয়াল জিও টিভিতে দেখানো হয়েছিল ২০১৯-এ, ভারতে এখন একটা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত সে কারণেই এতদিন পরে সোশাল মিডিয়ার সূত্রে বাঙালির চোখে পড়া। এই গান পাকিস্তানের সিরিয়ালে কে ব্যবহার করলেন? কেনই বা ব্যবহার করলেন? তবে কি কোন বাঙালি আছেন এই প্রযোজনার নেপথ্যে? উদ্বেলিত বাঙালি হৃদয়ে অনেক প্রশ্ন। নাগরিক ডট নেটকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর আস্তানা থেকে এইসব প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিলেন ওই ধারাবাহিকের পরিচালক মহরীন জব্বার

মহরীনের প্রথম ছায়াছবি রামচন্দ পাকিস্তানি-তে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন কলকাতার দেবজ্যোতি মিশ্র। নন্দিতা দাস সে ছবিতে অভিনয়ও করেন। ফলে বাংলা বা কলকাতা তাঁর সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আপনি একেবারে প্রথম ছবি থেকে বাঙালিদের সাথে কাজ করছেন। রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে আপনার আলাপ কি সেই সূত্রে? নাকি অন্য কোনভাবে আপনার বাংলার সাথে যোগ ছিল এবং সে পথেই রবীন্দ্রনাথে পৌঁছেছেন?

আমি এই গানটা পেয়েছি আসলে আমার বন্ধু শর্বরী দেশপাণ্ডের কাছ থেকে, মানে সিরিয়ালে গানটা যে প্লেব্যাক করেছিল। ও একবার নিউ ইয়র্কে এসেছিল। তখন একটা আড্ডায় ওই গানটা গায়। শোনা মাত্রই গানটা আমাকে আকর্ষণ করে, যদিও আমি তখন কথাগুলোর মানে জানতাম না। কিন্তু ভাল লেগেছিল বলে আমি পরে ওকে গানটা অনুবাদ করে পাঠাতে বলি। অনুবাদ পড়ার পর গানটার প্রেমে পড়ে যাই। এতটাই, যে আমি বুঝতে পারি এই গানটা আমাকে দিল কেয়া করে-তে ব্যবহার করতেই হবে। কারণ য়ুমনা জ্যায়দির চরিত্রটার সাথে এই গানটা দারুণ মিশ খায়। তখন আমি শর্বরীকে গানটা রেকর্ড করে আমাকে পাঠাতে বলি।

আপনি কি বাংলায় বা অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন? ওই গানটার সংস্পর্শে আসার পরে ওঁর লেখা পড়া বা ওঁর গান শোনা কি অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে বা মাঝে মাঝে শুনছেন?

না, আমি কখনো কোন ভাষাতেই রবীন্দ্রনাথ পড়িনি। ওই গানটার মধ্যে দিয়েই আমি তাঁকে আবিষ্কার করি এবং আশ্চর্য হয়ে যাই। স্রেফ প্রেমে পড়ে যাই। ওটা আমার কাছেও একটা শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা ছিল। আশা করি ভবিষ্যতে এই শিক্ষাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

আচ্ছা, একটা উর্দু সিরিয়ালে বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করার কথা হঠাৎ কেন মনে হল?

ওটা একেবারেই আবেগমথিত প্রতিক্রিয়া। আমার গানটা ভীষণ ভাল লেগেছিল আর ঘটনাচক্রে আমার সিরিয়ালের দুটো তিনটে মুহূর্তের সঙ্গে গানটার বক্তব্য আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছিল। আমার চিত্রনাট্যে তো গানটা প্রথমে ছিল না। পরে যখন সিরিয়ালের পুরো গল্পটা পড়ছি (আসমা নবীলের লেখা), তখন আমার মনে হল যে অমুক অমুক জায়গায় এই গানটাই সবচেয়ে উপযুক্ত।

পাকিস্তানের যুবক যুবতীদের মধ্যে কি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার চল আছে? আপনার সিরিয়ালে যেমন দেখিয়েছেন তেমনভাবে নিজেদের মধ্যে আড্ডায় তারা কি এসব গান গায়?

সত্যি কথা বলতে, যদি কারোর কোন বাঙালির সাথে পারিবারিক সম্পর্ক থাকে বা সে বাংলাদেশে কোন সময় থেকে থাকে, কি পশ্চিমবঙ্গের সাথে যোগাযোগ থাকে, তাহলে আলাদা কথা। নচেৎ নয়। আমি নিশ্চিত পাকিস্তানে সেরকম মানুষ অনেকেই আছেন, তবে সেরকম আড্ডায় আমার নিজের কখনো থাকার সুযোগ হয়নি। সুতরাং সিরিয়ালে যা দেখিয়েছি সেটা একেবারেই অভিনব দৃশ্য।

মজার কথা, আপনি যে বছরে জন্মেছেন সে বছরেই পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পশ্চিম পাকিস্তান আর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব  শুরু হয়েছিল উর্দু বনাম বাংলা নিয়ে, যে কারণে আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এখনো অনেকের উর্দু ভাষার প্রতি রাগ আছে। আবার এই ক্লিপগুলো জনপ্রিয় হয়েছেও কতকটা সেই কারণেই। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম এই নিয়ে খবর করেছে। মানুষ ভীষণ খুশি। অনেকের প্রশ্ন, পাকিস্তানে কি তাহলে বাংলার প্রতি আর কোন সাংস্কৃতিক বিরোধিতা নেই? মানে খুব নির্দিষ্টভাবে যদি জিজ্ঞেস করি, আপনার সিরিয়ালে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করায় কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? বাংলা গান ব্যবহার করেছেন বলে কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি তো?

আসলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম, আমি যখন তরুণ ছিলাম তখনকার কথা ধরেই বলছি, ১৯৭১-এর ঘটনাবলী নিয়ে খুব একটা আলাপ আলোচনা, পর্যবেক্ষণ — এসবের মধ্যে দিয়ে যায়নি। তার আবার একটা সুফল আছে। সেটা হল তাদের মধ্যে কোন বাংলা বিরোধিতা নেই। বাংলা ভাষাটা সম্পর্কে কোন গোঁড়ামিও নেই। তাদের মনের দরজা খোলা। তবে দুঃখের বিষয় বাংলা ভাষার সাথে পাকিস্তানের ততটা সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়নি, যতটা হিন্দির সাথে হয়েছে। যেমন বলিউডের সিনেমা আমাদের ওখানে দারুণ জনপ্রিয়। কারণটা অনেকটাই ভাষাগত। পাকিস্তানের মানুষ হিন্দিটা চট করে বুঝতে পারে। সেই কারণেই আমার মনে হয় বাংলা নিয়ে অনেককিছু করা যেতে পারে। এ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা দরকার। আমি তো বাংলা ব্যবহার করে কোন অসুবিধায় পড়িনি। মনে হয় না ভবিষ্যতেও কোন সমস্যা হবে।

দিল কেয়া করে টিভিতে দেখানো হয়েছিল ২০১৯-এ। “আমার পরান যাহা চায়”-এর ক্লিপগুলো সোশাল মিডিয়ায় এসে পড়ার পর আরো বেশকিছু পাকিস্তানি সিরিয়ালের ক্লিপ পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোতে বাংলা গান (রবীন্দ্রসঙ্গীত নয় অবশ্য) ব্যবহার করা হয়েছে। আপনার কি জানা আছে কবে থেকে এই ধারা শুরু হয়েছে? কেনই বা পাকিস্তানি সিরিয়ালে বাংলা গানের ব্যবহার শুরু হল? পাকিস্তানে কি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলা বলা মানুষজন আছেন? নাকি এটা ওটিটির যুগ, সেকথা মাথায় রেখে পরবর্তীকালে বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের যে দর্শকরা দেখবেন, তাঁদের আকর্ষণ করার জন্যে করা হচ্ছে?

আমি অন্য পাকিস্তানি সিরিয়ালের ক্লিপগুলো দেখিনি, তবে যদি এরকম হয়ে থাকে, আমার মনে হয় ব্যাপারটা চমৎকার। আমি যখন এই গানটা ব্যবহার করেছিলাম তখন কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করিনি। শর্বরী গানটা অপূর্ব গেয়েছিল। আর দেখলাম আমার সিরিয়ালের গল্পটার সাথে গানটা খাপ খাচ্ছে। ব্যাস, ওটাই কারণ। আমি খুব খুশি যে টিভিতে সিরিয়ালটা শেষ হয়ে যাওয়ার এত বছর পরে হলেও ব্যাপারটা আপনাদের নজরে পড়েছে এবং ভাল লাগছে।

শেষ প্রশ্ন। এই মুহূর্তে এই উপমহাদেশের শিল্পীদের পক্ষে আমাদের যৌথ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ভাগ করে নেওয়া কতটা কঠিন? সামাজিক বা রাজনৈতিক বাধা কতখানি? অদূর ভবিষ্যতে সেই বাধা সরে যাওয়ার আশা আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

দেখুন, মুশকিল হল এই তিনটে দেশের (ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) সরকারগুলোর মধ্যে কোনরকম মতপার্থক্য হলেই প্রথম আঘাতটা আসে শিল্পীদের উপর। অথচ তাঁদের একেবারে শেষে আক্রান্ত হওয়ার কথা। কিরকম মজার কথা ভাবুন, ব্যবসা বাণিজ্য চলতে থাকে অথচ তিনটে দেশেই শিল্পীদের এক কোণে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে এই পরিস্থিতিতেও এমন কেউ কেউ আছেন যাঁরা একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছেন। আপনি তো জানেনই, আমি ২০০৮ সালে রামচন্দ পাকিস্তানি করেছি ভারতীয় শিল্পীদের সঙ্গে। এক ঝুঠি লাভ স্টোরি করেছি জি ফাইভের জন্য। সম্ভবত ওদের জন্য আরো একটা কাজ আমি করব। আশা করি এই আদান প্রদান বন্ধ হবে না। কারণ আমার মনে হয় একমাত্র এই পথেই আমরা একে অপরকে জানতে পারি, চিনতে পারি। আমাদের একের অপরের সম্বন্ধে অনেক অজ্ঞতা আছে। আমাদের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝিও আছে। অথচ আমাদের কত মিল! কতকিছু রয়েছে যা আমরা সকলেই ভালবাসি। দেশের মাটির প্রতি আমাদের ভালবাসা একরকম, আমাদের খাদ্যাভ্যাস, আমাদের পোশাক আশাক — সবেতেই তো অনেক মিল। তফাতগুলো সত্ত্বেও এতগুলো মিল আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা তিনটে দেশের মানুষেরই মনুষ্যত্ব আছে। আমার মনে হয় না সেকথা যথেষ্ট জোর দিয়ে বলা হয়েছে, দেখানো হয়েছে। তাছাড়া আমার মনে হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে উপমহাদেশের অন্য দুটো দেশে পাকিস্তানের সংস্কৃতি যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছয়নি। বিশেষ করে ভারতে। সেখানে তেমনভাবে পাকিস্তানের নাটক বা সিনেমা দেখা যায় না, পাকিস্তানের সঙ্গীত শোনা যায় না বা সেখানকার বই পড়া যায় না। বরং পাকিস্তানে ভারতের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম অনেক সুলভ। তবে আমি আশাবাদী এবং মনে করি সবসময়ই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব নেওয়া উচিৎ। তাই আমার ধারণা ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

 

 

মহরীন জব্বার ও দিল কেয়া করে – ছবি উইকিপেডিয়া, টুইটার ও ইনস্টাগ্রাম থেকে

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.