সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আসলে কবি ছিলেন। ছবি করতে আসার পরে তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু কবি বলেই ছবি বানানোর বেলায় ইমেজকে গুরুত্ব দিতেন। মনে করতেন যে গল্প বলা সিনেমার মূল কাজ নয়। সেই কারণে খুব ভাল টেক্সট নিয়ে ছবি করতে পছন্দ করতেন না। এ বিষয়ে উনি ‘নষ্টনীড়’ গল্পটা থেকে সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা ছবি করার উদাহরণ অনেকবার দিয়েছেন। তাঁর মতে এরকম গল্প নিয়ে ছবি করলে সাহিত্য নিয়েই আলোচনা হয়, গল্পটা নিয়ে আলোচনা হয়, সিনেমাটা নিয়ে আর কথা বলা হয় না। উনি কিন্তু ইমেজ তৈরি করতে চাইতেন। ইমেজ তৈরি করার ক্ষেত্রে ক্যামেরার চলাচলে অনেকরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন। যেমন দূরত্ব ছবিতে তিনি ১৮ মিলিমিটার লেন্স নিয়ে কাজ করতে করতে হঠাৎ ৫০ মিলিমিটার লেন্সে চলে যান। কেন করলেন এরকম? বুদ্ধদেব বলেছিলেন ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা ছবিতেও সীতার আত্মঘাতের মুহূর্তে চোখের ক্লোজ আপ টেলিলেন্সে নেওয়া হয়।

উত্তরা করার সময় উনি খেয়াল রেখেছিলেন যে পুরুলিয়ার আদিম জনজীবন তুলে ধরতে হলে তাকে আন্তর্জাতিকতামুক্ত করে লাভ নেই। নেহাত আঞ্চলিকতা ছবির সীমা বাড়িয়ে দিতে পারে না। মানবিকতা প্রতিবন্ধী হয়ে আছে বোঝাতে ওই ছবিতে উনি আকিরা কুরোসাওয়ার ড্রিমস থেকে, ইঙ্গমার বার্গম্যানের সাইলেন্স থেকে উদাহরণ তৈরি করেছেন। আবার যখন কোস্তা-গাভরাসের জি দ্বারা অনুপ্রাণিত গৃহযুদ্ধ ছবিটাতে র‍্যাডিকাল লেফটদের সম্পর্কে কাজ করেছেন, সেখানে মোবাইল হ্যান্ড-হেল্ড ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন। সেই ব্যাপারটা নিখুঁতভাবে করার জন্য পরিচালক গৌতম ঘোষকে অন্যতম অভিনেতা হিসাবে ওই ছবিতে নিয়েছিলেন। কারণ গৌতম একজন অসাধারণ ক্যামেরা পার্সন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অর্থাৎ উনি সিনেমার ভাষা নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের এখানে সাধারণত যাঁরা সিনেমা করেন, তাঁরা আসলে সিনেমার লোক নন। তাঁরা খুব বেশি হলে অনুবাদক। মানে দোভাষীদের মত ট্রান্সলেশনের কাজটা করেন। আমি যদি ফ্রান্সে যাই, তাহলে একজন দোভাষীর সাহায্য নেব। যেহেতু আমি ফরাসী ভাষা জানি না, তাই একজন দোভাষী রাখতে হবে, যিনি আমাকে ইংরেজিতে বা বাংলায় ফরাসী ভাষার কথাবার্তা অনুবাদ করে বুঝিয়ে দেবেন। আমাদের দেশে সিনেমা বানানো হয় সাধারণভাবে ওরকম ধারণা নিয়েই। একটা ভাল গল্পকে যত্ন করে দৃশ্য এবং শব্দে অনুবাদ করে দেওয়া হয়। সেই কারণেই মানুষ চলতি কথায় সিনেমাকে বই বলেন। আমরা বাঙালিরা বা সাধারণভাবে ভারতীয়রা মনে করি সিনেমার ভাষা হল বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, হিন্দি ইত্যাদি। কারণ আমরা সংলাপ অনুসরণ করে গল্পটা বুঝতে চাই। কিন্তু আসলে ওটা সিনেমার একটা অংশ মাত্র। সিনেমার আরো অনেক উপাদান আছে, যা দিয়ে তার নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়। গল্পকে কেন্দ্রে রেখে সিনেমা বানানোর যে মেথড, তার বিরুদ্ধে এক ধরণের আর্ট সিনেমা, যা সিনেমার ভাষায় চলে, তা তৈরি করতে, গল্প ভাঙতে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা নিতে চেষ্টা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন হলেন বুদ্ধদেব। এই কারণেই তাঁর ছবি হয়ত জনপ্রিয় নয়।

বামপন্থী চিন্তাধারার বুদ্ধদেব সমাজ বাস্তবতার ব্যাখ্যায় গতানুগতিক মার্কসবাদী পন্থার বদলে যে দৈনন্দিনতা আছে, তা নিয়ে কাজ করেছেন। কবিতার ক্ষেত্রেও উনি নিকানোর পারার অনুগামী ছিলেন। অর্থাৎ অ্যান্টি পোয়েট্রি — যা দৈনন্দিনতার কথা বলে এবং আপাতভাবে কাব্যময় নয়।

এই কারণেই বুদ্ধদেব আমাদের চলচ্চিত্রের একজন ব্যতিক্রমী এবং স্মরণীয় পরিচালক।

অনুলিখন: প্রতীক

আরো পড়ুন

বোম্বে টকিজের শেষ প্রতিনিধি

Leave a Reply